চরাঞ্চলের শিক্ষা সংকট: কারণ ও করণীয়
- প্রকাশের সময় ০৯:০৭:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২২ বার দেখা হয়েছে
বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের একজন শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে আমার। এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় বারবার আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, উপকূলীয় ও নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যে প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে শিক্ষাজীবন পরিচালনা করে, তা মূল ভূখণ্ডের শিক্ষার্থীদের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা। সাতক্ষীরার মতো জেলা, যার একটি বড় অংশ শ্যামনগর, কালিগঞ্জ ও আশাশুনির মতো উপকূলীয় উপজেলা নিয়ে গঠিত, সেখানে চরাঞ্চল ও নদীভাঙন কবলিত এলাকার শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা এখন সময়ের দাবি।
চরাঞ্চলের শিক্ষা সংকট কোনো একক কারণে সৃষ্ট নয়, এটি ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার সমন্বিত রূপ। চরাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা নদী বা খাল দ্বারা বিচ্ছিন্ন। বর্ষা মৌসুমে এই বিচ্ছিন্নতা চরম আকার ধারণ করে। শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন নৌকায় নদী পার হয়ে, কাদাপথ ভেঙে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের দূরত্ব কয়েক কিলোমিটার হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে তা কার্যত দুর্গম হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি চরাঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে গিয়ে এই ঘাটতি আরও প্রকট হয়। একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সেবা এলাকা অনেক সময় কয়েকটি চর মিলিয়ে বিস্তৃত থাকে, যার ফলে বহু শিক্ষার্থীর জন্য নিয়মিত উপস্থিতি বাস্তবিকভাবে অসম্ভব হয়ে যায়।
শিক্ষক সংকটও এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। চরাঞ্চলে পদায়িত শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই দুর্গমতা ও জীবনযাত্রার কষ্টের কারণে দীর্ঘমেয়াদে থাকতে চান না। ফলে শিক্ষক পদায়ন ও স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা শিক্ষার গুণগত মান ক্ষুণ্ন করে। অন্যদিকে চরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মূল জীবিকা মাছ ধরা, কৃষিকাজ বা দিনমজুরি হওয়ায় পরিবারের অর্থনৈতিক প্রয়োজনে শিশুরা, বিশেষত কিশোর ছেলে মেয়েরা, প্রায়শই আয় রোজগারে যুক্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে স্কুল ছেড়ে দেওয়ার হার বেড়ে যায়। মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের প্রবণতা এখনো চরাঞ্চলে তুলনামূলক বেশি, এবং দূরবর্তী বিদ্যালয়ে যাতায়াতের অনিরাপত্তা এই সিদ্ধান্তকে আরও ত্বরান্বিত করে।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় আইলা, সিডর, আম্পান, ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়। প্রতিটি দুর্যোগের পর বিদ্যালয় ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়, এবং শিক্ষাক্রম দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়। করোনাকালীন অনলাইন শিক্ষার অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে, বিদ্যুৎ সংযোগ ও ইন্টারনেট সুবিধার অভাবে চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কার্যত শিক্ষার মূল প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এই ডিজিটাল বিভাজন এখনো দূর হয়নি এবং প্রযুক্তির সুযোগ থেকে এই শিক্ষার্থীরা এখনো অনেকটাই পিছিয়ে আছে।
শুধু সমস্যা চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়, একজন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি বাস্তবায়নযোগ্য ও টেকসই সমাধানের দিকেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে। প্রথমত, সরকারি অর্থায়নে স্কুল বোট বা নৌযান সার্ভিস চালু করা যেতে পারে, বিশেষত বর্ষা মৌসুমে। স্থানীয় প্রশাসন ও এনজিওর সমন্বয়ে এ ধরনের উদ্যোগ ইতিমধ্যে কিছু এলাকায় সফলতা দেখিয়েছে এবং এর পরিধি বাড়ানো দরকার। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি চরে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যালয় স্থাপন সম্ভব না হলেও, নিকটবর্তী কয়েকটি চরের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ক্লাস্টার স্কুল এবং প্রাথমিক স্তরে ছোট স্যাটেলাইট শাখা চালুর মাধ্যমে দূরত্বের সমস্যা কমানো সম্ভব।
শিক্ষক সংকট মোকাবিলার জন্য দুর্গম এলাকায় নিয়োজিত শিক্ষকদের বিশেষ ভাতা, আবাসন সুবিধা এবং ত্বরিত পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হলে তাঁরা দীর্ঘমেয়াদে সেখানে টিকে থাকতে উৎসাহিত হবেন। প্রয়োজনে স্থানীয়ভাবে যোগ্য তরুণ তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের উদ্যোগও ফলপ্রসূ হতে পারে। এর পাশাপাশি দারিদ্র্যজনিত ঝরে পড়া রোধে বিদ্যমান উপবৃত্তি কর্মসূচিকে চরাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও পর্যাপ্ত করতে হবে, যাতে পরিবার শিশুকে কাজে পাঠানোর পরিবর্তে বিদ্যালয়ে পাঠাতে উৎসাহিত হয়।
আমার নিজের কর্মক্ষেত্র কারিগরি শিক্ষা এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধানের দিক দেখাতে পারে। চরাঞ্চলের বাস্তবতায় মৎস্য চাষ, কৃষি প্রযুক্তি, পর্যটন ও আতিথেয়তা, বিশেষত সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায়, এবং হালকা যন্ত্রপাতি মেরামতের মতো বিষয়ে স্বল্পমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি জীবিকা সংশ্লিষ্ট দক্ষতাও অর্জন করতে পারবে। এতে শিক্ষা ছেড়ে দেওয়ার আর্থিক চাপ কিছুটা লাঘব হবে।
নতুন বিদ্যালয় ভবন নির্মাণে উঁচু ভিত্তি, বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য নকশা যা প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করতে পারে, এবং টেকসই নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দুর্যোগের পরও শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত পুনরায় শুরু করা সম্ভব হয়। সোলার প্যানেলভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও কমিউনিটি ডিজিটাল সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে চরাঞ্চলে সীমিত পরিসরে হলেও ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। অফলাইন রেকর্ডেড ক্লাস বা রেডিওভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমও একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
সবশেষে অভিভাবক সমাবেশ, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে অবিরাম সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতি মালিকানার অনুভূতি তৈরি করা প্রয়োজন।
চরাঞ্চলের শিশুরাও এই দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক। ভৌগোলিক প্রতিকূলতা তাদের অধিকারকে সীমিত করার কারণ হতে পারে না। সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় জেলায় দীর্ঘদিন শিক্ষকতার সুবাদে আমি দেখেছি, সামান্য সহায়তা ও সংগঠিত উদ্যোগ পেলে এই এলাকার শিক্ষার্থীরাও অসাধারণ সম্ভাবনার পরিচয় দিতে পারে। প্রয়োজন কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সদিচ্ছা, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত পরিকল্পনা এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণ। এই তিনের সমন্বয়েই চরাঞ্চলের শিক্ষা সংকট নিরসনের পথ তৈরি হতে পারে।
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।



















