Dhaka সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
এক কাপ গাহওয়ায় ৩০০ বছরের গল্প

সৌদি কফিতে মিশে আছে ঐতিহ্য, আতিথেয়তা ও ভালোবাসা

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০৫:০১:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
  • / ২১ বার দেখা হয়েছে

গতকাল ১ অক্টোবর পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক কফি দিবস। বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে কফি জনপ্রিয় একটি পানীয়। তবে সৌদি আরবে কফির গল্প কেবল স্বাদ কিংবা পানীয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির সামাজিক জীবন, কৃষি, আতিথেয়তা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে কফি।

সৌদি আরবে ঐতিহ্যবাহী কফি পরিচিত ‘সৌদি কফি’ বা ‘গাহওয়া’ নামে। বাড়িতে অতিথি এলে কফি পরিবেশন করা দেশটির সমাজে সম্মান ও আতিথেয়তার অন্যতম প্রকাশ। বিশেষ করে মজলিসে অতিথিদের ছোট ফিনজান কাপে কফি পরিবেশনের রীতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। আরবি কফি পরিবেশনের এই ঐতিহ্যকে UNESCO আরব সমাজের উদারতা ও আতিথেয়তার প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তিন শতাব্দীর কফির ইতিহাস

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে কফি চাষের ইতিহাস প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। জাজান, আসির ও আল-বাহার পাহাড়ি অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে কফি চাষ স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।

বিশেষ করে খাওলানি জনগোষ্ঠীর কফি চাষের ঐতিহ্য ও জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২২ সালে খাওলানি কফি চাষের এই ঐতিহ্য UNESCO-এর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

সৌদি কফি সাধারণত হালকা রঙের হয়। এতে প্রধানত এলাচ ব্যবহার করা হলেও অঞ্চল ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী জাফরান, লবঙ্গ, আদা কিংবা দারুচিনিও যোগ করা হয়। ঐতিহ্যবাহী কফি পরিবেশনের পাত্রকে বলা হয় দাল্লা, আর ছোট কাপের নাম ফিনজান।

অতিথিকে কফি পরিবেশন সৌদিতে শুধু পানীয় দেওয়ার বিষয় নয়; এটি সম্মান, সৌজন্য ও আন্তরিকতার সামাজিক রীতি। নিজের খামারে উৎপাদিত কফি অতিথির সামনে পরিবেশন করা অনেকের কাছেই বিশেষ গর্বের বিষয়।

ঐতিহ্যের পাশে আধুনিক কফি সংস্কৃতি

সময়ের সঙ্গে সৌদি আরবের কফি সংস্কৃতিতেও এসেছে পরিবর্তন। ঐতিহ্যবাহী গাহওয়ার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে দেশটিতে আধুনিক ক্যাফে ও স্পেশালটি কফি সংস্কৃতির দ্রুত বিকাশ ঘটেছে।

একদিকে দাল্লায় পরিবেশিত হচ্ছে এলাচের সুবাসমাখা গাহওয়া, অন্যদিকে আধুনিক ক্যাফেতে জনপ্রিয় হচ্ছে এসপ্রেসো, ফিল্টার কফি এবং নানা ধরনের ব্রিউইং পদ্ধতি। অর্থাৎ পুরোনো ঐতিহ্য ও আধুনিক কফি সংস্কৃতি পাশাপাশি এগিয়ে চলছে।

সৌদিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব বিশ্বের উচ্চ কফি-ভোক্তা দেশগুলোর একটি। দেশটিতে কফি খাতে বছরে সৌদিদের ব্যয় ১ বিলিয়ন সৌদি রিয়ালেরও বেশি।

বাড়ছে স্থানীয় উৎপাদন

কফি পান ও আমদানির পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সৌদি আরব। ২০২৫ সালের সৌদি সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জাজান, আসির ও আল-বাহা অঞ্চলে প্রায় ৩ লাখ ৯৮ হাজার কফি গাছ এবং ২ হাজার ৫০০টির বেশি খামার ছিল। এসব খামারের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৪০০ টন বলে উল্লেখ করা হয়।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, জাজান, আসির, আল-বাহা, মক্কা ও নাজরান—এই পাঁচ অঞ্চলে ১৩ লাখের বেশি উৎপাদনশীল কফি গাছ রয়েছে। এসব অঞ্চল থেকে বছরে ৮৭০ টনের বেশি কফি উৎপাদিত হচ্ছে বলেও জানানো হয়।

‘ইয়ার অব সৌদি কফি’

কফির এই ঐতিহ্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে সৌদি আরব ২০২২ সালকে ‘ইয়ার অব সৌদি কফি’ ঘোষণা করেছিল। উদ্যোগটির মাধ্যমে স্থানীয় কফি, কৃষক, ঐতিহ্যবাহী প্রস্তুতপ্রণালি এবং সৌদি আতিথেয়তার সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।

ফলে সৌদি আরবে কফির গল্প এখন আর শুধু এক কাপ গাহওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় তিন শতাব্দীর কৃষি ঐতিহ্য, স্থানীয় কৃষকের জীবন-জীবিকা, UNESCO স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং অতিথিপরায়ণতার দীর্ঘ সামাজিক রীতি। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের আধুনিক কফি সংস্কৃতিও এই গল্পে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।

আন্তর্জাতিক কফি দিবসে সৌদি আরবের গাহওয়া তাই হয়ে ওঠে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক—যেখানে ছোট্ট এক ফিনজান কফির সঙ্গে মিশে থাকে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন আর অতিথির প্রতি ভালোবাসা।

পৃথিবী, মহাসাগর ও ইতিহাসের অজানা অধ্যায় নিয়ে সেরা বাংলা ডকুমেন্টারি

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

পছন্দের চিকিৎসকের সিরিয়াল নিতে ক্লিক করুন

স্বাদে, মানে ও ভালোবাসায়—লেক ভিউ কেক

এক কাপ গাহওয়ায় ৩০০ বছরের গল্প

সৌদি কফিতে মিশে আছে ঐতিহ্য, আতিথেয়তা ও ভালোবাসা

প্রকাশের সময় ০৫:০১:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

গতকাল ১ অক্টোবর পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক কফি দিবস। বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে কফি জনপ্রিয় একটি পানীয়। তবে সৌদি আরবে কফির গল্প কেবল স্বাদ কিংবা পানীয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির সামাজিক জীবন, কৃষি, আতিথেয়তা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে কফি।

সৌদি আরবে ঐতিহ্যবাহী কফি পরিচিত ‘সৌদি কফি’ বা ‘গাহওয়া’ নামে। বাড়িতে অতিথি এলে কফি পরিবেশন করা দেশটির সমাজে সম্মান ও আতিথেয়তার অন্যতম প্রকাশ। বিশেষ করে মজলিসে অতিথিদের ছোট ফিনজান কাপে কফি পরিবেশনের রীতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। আরবি কফি পরিবেশনের এই ঐতিহ্যকে UNESCO আরব সমাজের উদারতা ও আতিথেয়তার প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তিন শতাব্দীর কফির ইতিহাস

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে কফি চাষের ইতিহাস প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। জাজান, আসির ও আল-বাহার পাহাড়ি অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে কফি চাষ স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।

বিশেষ করে খাওলানি জনগোষ্ঠীর কফি চাষের ঐতিহ্য ও জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২২ সালে খাওলানি কফি চাষের এই ঐতিহ্য UNESCO-এর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

সৌদি কফি সাধারণত হালকা রঙের হয়। এতে প্রধানত এলাচ ব্যবহার করা হলেও অঞ্চল ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী জাফরান, লবঙ্গ, আদা কিংবা দারুচিনিও যোগ করা হয়। ঐতিহ্যবাহী কফি পরিবেশনের পাত্রকে বলা হয় দাল্লা, আর ছোট কাপের নাম ফিনজান।

অতিথিকে কফি পরিবেশন সৌদিতে শুধু পানীয় দেওয়ার বিষয় নয়; এটি সম্মান, সৌজন্য ও আন্তরিকতার সামাজিক রীতি। নিজের খামারে উৎপাদিত কফি অতিথির সামনে পরিবেশন করা অনেকের কাছেই বিশেষ গর্বের বিষয়।

ঐতিহ্যের পাশে আধুনিক কফি সংস্কৃতি

সময়ের সঙ্গে সৌদি আরবের কফি সংস্কৃতিতেও এসেছে পরিবর্তন। ঐতিহ্যবাহী গাহওয়ার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে দেশটিতে আধুনিক ক্যাফে ও স্পেশালটি কফি সংস্কৃতির দ্রুত বিকাশ ঘটেছে।

একদিকে দাল্লায় পরিবেশিত হচ্ছে এলাচের সুবাসমাখা গাহওয়া, অন্যদিকে আধুনিক ক্যাফেতে জনপ্রিয় হচ্ছে এসপ্রেসো, ফিল্টার কফি এবং নানা ধরনের ব্রিউইং পদ্ধতি। অর্থাৎ পুরোনো ঐতিহ্য ও আধুনিক কফি সংস্কৃতি পাশাপাশি এগিয়ে চলছে।

সৌদিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব বিশ্বের উচ্চ কফি-ভোক্তা দেশগুলোর একটি। দেশটিতে কফি খাতে বছরে সৌদিদের ব্যয় ১ বিলিয়ন সৌদি রিয়ালেরও বেশি।

বাড়ছে স্থানীয় উৎপাদন

কফি পান ও আমদানির পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সৌদি আরব। ২০২৫ সালের সৌদি সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জাজান, আসির ও আল-বাহা অঞ্চলে প্রায় ৩ লাখ ৯৮ হাজার কফি গাছ এবং ২ হাজার ৫০০টির বেশি খামার ছিল। এসব খামারের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৪০০ টন বলে উল্লেখ করা হয়।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, জাজান, আসির, আল-বাহা, মক্কা ও নাজরান—এই পাঁচ অঞ্চলে ১৩ লাখের বেশি উৎপাদনশীল কফি গাছ রয়েছে। এসব অঞ্চল থেকে বছরে ৮৭০ টনের বেশি কফি উৎপাদিত হচ্ছে বলেও জানানো হয়।

‘ইয়ার অব সৌদি কফি’

কফির এই ঐতিহ্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে সৌদি আরব ২০২২ সালকে ‘ইয়ার অব সৌদি কফি’ ঘোষণা করেছিল। উদ্যোগটির মাধ্যমে স্থানীয় কফি, কৃষক, ঐতিহ্যবাহী প্রস্তুতপ্রণালি এবং সৌদি আতিথেয়তার সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।

ফলে সৌদি আরবে কফির গল্প এখন আর শুধু এক কাপ গাহওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় তিন শতাব্দীর কৃষি ঐতিহ্য, স্থানীয় কৃষকের জীবন-জীবিকা, UNESCO স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং অতিথিপরায়ণতার দীর্ঘ সামাজিক রীতি। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের আধুনিক কফি সংস্কৃতিও এই গল্পে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।

আন্তর্জাতিক কফি দিবসে সৌদি আরবের গাহওয়া তাই হয়ে ওঠে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক—যেখানে ছোট্ট এক ফিনজান কফির সঙ্গে মিশে থাকে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন আর অতিথির প্রতি ভালোবাসা।