Dhaka সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কিশোর মানেই সমাজের আলো, কিশোরই শক্তি!

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০৮:২৯:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৩ বার দেখা হয়েছে
  • সাইদুল বাসার

আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও আলোচিত শব্দগুলোর একটি ‘কিশোর গ্যাং’। রাজধানীর অলিগলি থেকে মফস্বল শহর—বিভিন্ন জায়গায় উঠতি বয়সী কিশোরদের হাতে মারামারি, অস্ত্রের মহড়া কিংবা নানা অপরাধের খবর সামনে আসছে। সম্প্রতি সাতক্ষীরায় জাকারিয়া খান নামের এক যুবক কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় নিহত হওয়ার ঘটনা বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের মেলায় উদ্বোধনের তিন দিনের মধ্যে দুই দিন কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতের অভিযোগও উঠেছে।

প্রশ্ন হলো, যে বয়সে কিশোরদের হাতে কলম, বই ও খেলাধুলার সরঞ্জাম থাকার কথা, সেই বয়সে তারা কেন অপরাধের জগতে পা বাড়াচ্ছে?

কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা শুধু সাতক্ষীরার নয়; দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক সংকট, মাদক, বেকারত্ব, অসৎ সঙ্গ, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সুস্থ বিনোদনের সুযোগের অভাবসহ নানা কারণ কাজ করতে পারে।

অভিযোগ রয়েছে, এলাকার কিছু প্রভাবশালী ‘বড় ভাই’ নিজেদের স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করেন। মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার কিংবা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের ব্যবহার করা হলে কিশোরদের মধ্যে ক্ষমতার ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা একসময় ভয় দেখানো ও সহিংসতাকে স্বাভাবিক বলে ভাবতে শুরু করে।

পাড়া-মহল্লায় খেলার মাঠ, পাঠাগার ও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারও কিশোরদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে কর্মব্যস্ত অভিভাবকেরা সন্তানের মানসিক অবস্থা ও বন্ধুবান্ধবের বিষয়ে পর্যাপ্ত খোঁজ রাখতে পারেন না। শুধু পরীক্ষার ফল বা প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের দিকে নজর না দিয়ে সন্তানের মানসিক বিকাশ ও সামাজিক পরিবেশের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

কোরআন-হাদিসের আলোকে অসৎ সঙ্গ

কিশোর অপরাধ ও অসৎ সঙ্গের বিষয়ে ইসলামে সতর্ক করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-মায়েদার ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করতে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা না করতে।

সুরা আত-তাহরীমের ৬ নম্বর আয়াতে নিজেদের ও পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়া এবং বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্বের বিষয়টি এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়।

অসৎ সঙ্গের পরিণতি সম্পর্কেও কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে। সুরা আয-যুখরুফের ৬৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সেদিন বন্ধুরাই একে অপরের শত্রু হবে; তবে আল্লাহভীরুরা এর ব্যতিক্রম।

শুধু দমন নয়, প্রয়োজন পুনর্বাসন

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কিশোর গ্যাং উৎখাত করা হবে। একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে লেখাপড়া ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু পুলিশি অভিযান বা কিশোরদের আটক করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। অপরাধের সঙ্গে জড়িত কিশোরদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের সংশোধন, কাউন্সেলিং, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে যদি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ‘বড় ভাই’ থাকে, তদন্তের মাধ্যমে তাদেরও শনাক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যেন অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সুরক্ষা না দেয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় খেলার মাঠ, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য নিরাপদ বিনোদনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করা গেলে তাদের শক্তি ইতিবাচক কাজে ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।

অভিভাবকদেরও সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তারা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে—এসব বিষয়ে নজর রাখতে হবে। তবে নজরদারি যেন কেবল শাসননির্ভর না হয়ে বোঝাপড়া ও আস্থার ভিত্তিতে হয়।

পথভ্রষ্ট কিশোরদের অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে কারিগরি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। কারণ আজকের কিশোরই আগামী দিনের নাগরিক, কর্মী, উদ্যোক্তা ও নেতৃত্বের অংশ।

কিশোররা কোনো বোঝা নয়; তারা সমাজের শক্তি। তাদের হাতে অস্ত্র নয়, বই ও খেলাধুলার সরঞ্জাম তুলে দিতে হবে। ভয় নয়, তাদের সামনে তৈরি করতে হবে সম্ভাবনার পথ। দমন, সংশোধন, শিক্ষা, পরিবার এবং সুস্থ সামাজিক পরিবেশ—সবকিছুর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব।

কিশোরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে আমাদের ভাবতে হবে—কেন সে সেই পথে গেল। কারণ সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আজকের কিশোরই আগামী দিনের সমাজ বদলের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

সম্পর্কিত

পৃথিবী, মহাসাগর ও ইতিহাসের অজানা অধ্যায় নিয়ে সেরা বাংলা ডকুমেন্টারি

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

পছন্দের চিকিৎসকের সিরিয়াল নিতে ক্লিক করুন

স্বাদে, মানে ও ভালোবাসায়—লেক ভিউ কেক

কিশোর মানেই সমাজের আলো, কিশোরই শক্তি!

প্রকাশের সময় ০৮:২৯:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
  • সাইদুল বাসার

আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও আলোচিত শব্দগুলোর একটি ‘কিশোর গ্যাং’। রাজধানীর অলিগলি থেকে মফস্বল শহর—বিভিন্ন জায়গায় উঠতি বয়সী কিশোরদের হাতে মারামারি, অস্ত্রের মহড়া কিংবা নানা অপরাধের খবর সামনে আসছে। সম্প্রতি সাতক্ষীরায় জাকারিয়া খান নামের এক যুবক কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় নিহত হওয়ার ঘটনা বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের মেলায় উদ্বোধনের তিন দিনের মধ্যে দুই দিন কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতের অভিযোগও উঠেছে।

প্রশ্ন হলো, যে বয়সে কিশোরদের হাতে কলম, বই ও খেলাধুলার সরঞ্জাম থাকার কথা, সেই বয়সে তারা কেন অপরাধের জগতে পা বাড়াচ্ছে?

কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা শুধু সাতক্ষীরার নয়; দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক সংকট, মাদক, বেকারত্ব, অসৎ সঙ্গ, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সুস্থ বিনোদনের সুযোগের অভাবসহ নানা কারণ কাজ করতে পারে।

অভিযোগ রয়েছে, এলাকার কিছু প্রভাবশালী ‘বড় ভাই’ নিজেদের স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করেন। মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার কিংবা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের ব্যবহার করা হলে কিশোরদের মধ্যে ক্ষমতার ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা একসময় ভয় দেখানো ও সহিংসতাকে স্বাভাবিক বলে ভাবতে শুরু করে।

পাড়া-মহল্লায় খেলার মাঠ, পাঠাগার ও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারও কিশোরদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে কর্মব্যস্ত অভিভাবকেরা সন্তানের মানসিক অবস্থা ও বন্ধুবান্ধবের বিষয়ে পর্যাপ্ত খোঁজ রাখতে পারেন না। শুধু পরীক্ষার ফল বা প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের দিকে নজর না দিয়ে সন্তানের মানসিক বিকাশ ও সামাজিক পরিবেশের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

কোরআন-হাদিসের আলোকে অসৎ সঙ্গ

কিশোর অপরাধ ও অসৎ সঙ্গের বিষয়ে ইসলামে সতর্ক করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-মায়েদার ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করতে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা না করতে।

সুরা আত-তাহরীমের ৬ নম্বর আয়াতে নিজেদের ও পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়া এবং বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্বের বিষয়টি এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়।

অসৎ সঙ্গের পরিণতি সম্পর্কেও কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে। সুরা আয-যুখরুফের ৬৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সেদিন বন্ধুরাই একে অপরের শত্রু হবে; তবে আল্লাহভীরুরা এর ব্যতিক্রম।

শুধু দমন নয়, প্রয়োজন পুনর্বাসন

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কিশোর গ্যাং উৎখাত করা হবে। একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে লেখাপড়া ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু পুলিশি অভিযান বা কিশোরদের আটক করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। অপরাধের সঙ্গে জড়িত কিশোরদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের সংশোধন, কাউন্সেলিং, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে যদি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ‘বড় ভাই’ থাকে, তদন্তের মাধ্যমে তাদেরও শনাক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যেন অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সুরক্ষা না দেয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় খেলার মাঠ, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য নিরাপদ বিনোদনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করা গেলে তাদের শক্তি ইতিবাচক কাজে ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।

অভিভাবকদেরও সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তারা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে—এসব বিষয়ে নজর রাখতে হবে। তবে নজরদারি যেন কেবল শাসননির্ভর না হয়ে বোঝাপড়া ও আস্থার ভিত্তিতে হয়।

পথভ্রষ্ট কিশোরদের অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে কারিগরি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। কারণ আজকের কিশোরই আগামী দিনের নাগরিক, কর্মী, উদ্যোক্তা ও নেতৃত্বের অংশ।

কিশোররা কোনো বোঝা নয়; তারা সমাজের শক্তি। তাদের হাতে অস্ত্র নয়, বই ও খেলাধুলার সরঞ্জাম তুলে দিতে হবে। ভয় নয়, তাদের সামনে তৈরি করতে হবে সম্ভাবনার পথ। দমন, সংশোধন, শিক্ষা, পরিবার এবং সুস্থ সামাজিক পরিবেশ—সবকিছুর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব।

কিশোরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে আমাদের ভাবতে হবে—কেন সে সেই পথে গেল। কারণ সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আজকের কিশোরই আগামী দিনের সমাজ বদলের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।