প্রকাশকদের প্রত্যাশা পূরন হচ্ছে না অমর একুশে বইমেলায়
অমর একুশে বইমেলা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক জীবনের অন্যতম প্রধান আয়োজন। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বহনকারী এই বইমেলা শুধু বই বিক্রির কেন্দ্র নয়; এটি প্রকাশনা শিল্পের বার্ষিক অর্থনৈতিতেও ভুমিকা রাখে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে অনুষ্ঠিত এই মেলায় নতুন বই প্রকাশ, লেখক-পাঠকের যোগাযোগ এবং প্রকাশকদের আর্থিক সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারিত হয়। গত তিন বছরে (২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫) করোনার প্রভাব, অর্থনীতি মন্দা, কাগজের মূল্য বৃদ্ধি, মুদ্রণ ব্যয়, পাঠকের ক্রয়ক্ষমতা এবং ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাব সব মিলিয়ে বইমেলার আর্থিক চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ফলে প্রকাশকদের লাভ-লোকসানের হিসাব কষতে কপালে ভাজ পড়ে যাচ্ছে। বইমেলা মানেই প্রকাশকদের জন্য বইমেলা একটি বড় বিনিয়োগমূলক আয়োজন। যার প্রথমেই আসে কাগজ ক্রয়। এরপর স্টল ভাড়া ও নির্মাণ, মুদ্রণ, লেখক সম্মানী, ডিজাইন ও সম্পাদনা, বিপণন ও প্রচার, কর্মচারী ও ব্যবস্থাপনা খরচ।
২০২০-২০২২ সালে করোনা মহামারির প্রভাব কাটিয়ে ২০২৩ সালের বইমেলা ছিল পুনরুদ্ধারের বছর। পাঠকের উপস্থিতি আগের তুলনায় বেড়েছিল, তবে অর্থনৈতিক চাপ ছিল প্রবল। বাংলা একাডেমি ও প্রকাশক সমিতির তথ্য অনুযায়ী মোট বিক্রি আনুমানিক ৬০ থেকে ৬৫ কোটি টাকা। নতুন বই প্রকাশ প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি। বড় প্রকাশকদের বিক্রি হয় শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ও ছোট প্রকাশকদের বিক্রি অনেক কম। তবে ২০২৩ সালে বড় সমস্যা ছিল কাগজের দাম বৃদ্ধি। কাগজের দাম ২০২১-২২ সালের তুলনায় শতকরা ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেশি হওয়ায় মুদ্রণ ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং স্টল নির্মাণ খরচও বাড়ে। তাছাড়া বর্তমানে পাঠক সংখ্যাও অনেক কম। এতেকরে বড় প্রকাশকরা লভ্যাংশ কমিয়ে ও প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক পুশিংসেল করে কিছুটা ক্ষতি পুশিয়ে নিতে পারলেও মাঝারি ও ছোট প্রকাশকরা শতকরা ৫০ থেকে ৬০ টাকা লোকসানে বই বিক্রির পরও অনেক বই অবিক্রি থেকে যায়।
২০২৪ সালেও দেশের অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতির চাপে ছিল। নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, মধ্যবিত্তের ব্যয় সংকোচনের কারণে বই ক্রয় কমে যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়Ñ ঢাকায় একুশে বই মেলায় আনুমানিক প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়। মেলায় প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার নতুন বই জায়গা পায়। তবে ২০২৪ সালে উল্লেখযোগ্য হারে অনলাইনে বই বিক্রি বেড়ে যায়।
ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় কাগজের দাম বৃদ্ধি পায়। এছাড়া মুদ্রণ খরচও বিগত বছর তুলনায় শতকরা ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সে কারণে এবছও প্রকাশকরা আশানারূপ লাভের মুখ দেখতে পায়নি। ২০২৫ সালের বইমেলা প্রকাশনা শিল্পের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণÑ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, ডিজিটাল বা পিডিএফ বইয়ের প্রসার। গত বছর অমর একুশে বই মেলায় আনুমানিক প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়। যার মধ্যে প্রায় চার হাজারের মতো নতুন বই। গত তিন বছরে কাগজের দাম প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে হুমকির সম্মখিন প্রকাশনা শিল্প। বিশেষ করে মাঝারি ও ছোট ব্যাবসায়ীরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পরেছে।
তবে এবারের বই মেলায় সৃষ্টি হয়েছে নতুন সমস্যা। আর তা হলো দিন-ক্ষণ। আয়োজক কমিটির সিদ্ধান্ত মতে ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ শুরু হবার কথা। তবে প্রকাশনা শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরে আয়োজনসহ চার দফা দাবি জানিয়েছেন সাধারণ প্রকাশকরা। ইতোমধ্যে ৩২১ প্রকাশক জানিয়েছেন সময় পরিবর্তন না করে সরকার যদি ২০ ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু করে তাহলে তারা অংশগ্রহণ করবে না।
তাদের বক্তব্য হলোÑ এবারের বইমেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে আমরা তিনটি বড় সংকটের মুখোমুখি। প্রথমত, অর্থনৈতিক বাস্তবতাÑ ফেব্রুয়ারির শুরুতেই রোজা ও সামনে ঈদ থাকায় মানুষের ব্যয় পোশাক ও খাদ্যে কেন্দ্রীভূত থাকে, উপরন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রধান ক্রেতা শিক্ষার্থীরা ঢাকায় থাকবেন না; পাঠকশূন্য মেলায় স্টল নেওয়া নিশ্চিত লোকসান। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকালীন লজিস্টিক সংকটÑ প্রেস ও বাইন্ডিং শ্রমিক এবং স্টল নির্মাণের কারিগর পাওয়া কঠিন, নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, ফলে তাড়াহুড়ো করে মেলা আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। আর তৃতীয়ত, মানবিক ও ধর্মীয় বাস্তবতাÑ স্টলের অধিকাংশ কর্মী শিক্ষার্থী; ঈদের আগে তারা বাড়ি যেতে চাইবেন, যা ঠেকানো অমানবিক, আর রোজা রেখে সারাদিন কাজ করে ইফতারের পর ক্লান্ত শরীরে স্টলে দাঁড়িয়ে কাজ করা তাদের ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবিক অধিকারের পরিপন্থি।
২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাধারণ প্রকাশকদের পক্ষে এসব দাবি জানান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) প্রকাশক এবং অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬-এর সদস্য মাহরুখ মহিউদ্দিন।
প্রকাশকদের অন্য তিনটি দাবি হচ্ছে- স্টল ও প্যাভিলিয়ন ভাড়া মওকুফ ও সরকারি খরচে অবকাঠামো নির্মাণ করা; শিক্ষার্থী ও পাঠকদের জন্য সরকারি ‘বই-ভাতা’ বা প্রণোদনা চালু করা; এবং সরকারিভাবে প্রতিটি মানসম্মত বইয়ের ন্যূনতম ৩০০ কপি কিনে নেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প আজ এক চরম অস্তিত্ব সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। অমর একুশে বইমেলা কেবল বই বিক্রির স্থান নয়, এটি আমাদের জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো- আন্তর্জাতিক জরিপে পাঠাভ্যাসে বাংলাদেশ ১০২ দেশের মধ্যে ৯৭তম, দেশে প্রকাশিত ৯৫ শতাংশ বইয়ের প্রথম মুদ্রণ ৩০০ কপি বা তার কম, আর এর ৭০ শতাংশ বই সেই কপিও বিক্রি হয় না। বিগত দেড় বছরে বই বিক্রি কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। উন্নত দেশে রাষ্ট্র যেখানে লাইব্রেরি ও পাঠকের জন্য হাজার হাজার কপি বই কিনে লেখক ও প্রকাশকদের সুরক্ষা দেয়, সেখানে আমাদের প্রকাশকরা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ঝুঁকিতে সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা থেকে বই প্রকাশ করে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় টিকে থাকা নিছক ব্যবসা নয়, এটি এক ধরনের আত্মত্যাগ বা ‘স্যাক্রিফাইস’। তাই প্রকাশনা শিল্প রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং এবারের বইমেলা ঈদের পরে আয়োজন এখন সময়ের দাবি।
আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির দাবীÑ করোনা পরবর্তী গত তিন বছর প্রকাশনা শিল্প ‘চরম মন্দার’ ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বলে প্রকাশকদের ভাষ্য। তারা বলছেন, “এই পরিস্থিতিতে আরও একটি অসফল মেলায় অংশ নিয়ে অবশিষ্ট পুঁজি হারানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।” কিন্তু বইমেলা পরিচালনা কমিটির সভায় প্রকাশক প্রতিনিধিদের নিয়েই বইমেলা ২০ ফেব্রুয়ারি শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব সেলিম রেজা বলেছেন, “বইমেলা আয়োজনের কাজ যখন প্রায় ৬০ ভাগ সম্পন্ন, তখন কিছু সম্মানিত প্রকাশক ঈদের পর বইমেলা আয়োজন করার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন। আমরা প্রকাশকদের বক্তব্য শুনেছি। তাদেরকে বলা হয়েছে কেন ঈদের পর বইমেলা আয়োজন করা দুরুহ।
কারণÑ“তখন এপ্রিল মাস এসে যাবে। এপ্রিল মাসে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ থাকে। ধুলোবালির উপদ্রব বাড়ে। কালবৈশাখীসহ বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা থাকে প্রবল। এই সময় মাসব্যাপী বইমেলার আয়োজন করা বাস্তবসম্মত নয়।”
বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব সেলিম রেজা সেদিন লিখিত বক্তব্যে বলেন, গতবছর যেসব প্রকাশনা সংস্থা মেলায় অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্য থেকে ৫২৭টি এবং নতুন ৫৩টি প্রতিষ্ঠান এবার বইমেলায় অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করে স্টলের জন্য আবেদন করেছে। ইতোমধ্যে পুরনো ৫২৭টি এবং নতুন ২৪টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি শতাধিক প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশগ্রহণের জন্য স্টল বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছে।
আকাশ সাংস্কৃতি তথা ইউটিউব, ফেসবুক, সার্স ইঞ্জিন, চ্যাটজিপিটি, জিমিনি-র মতো অনলাইন মাধ্যম প্রিন্ট বইয়ের প্রধান প্রতিদন্দ্বি হয়ে উঠেছে। এখন আর কেউ সাথে বই-খাতা রাখতে চায় না। মোবাইলে ভয়েস রাইটের মাধ্যমে মোবাইলে অনলাইন সহযোগীতায় তারা সব সমস্য মোকাবেলা ও সুবিধা ভোগ করে থাকেন। এ কারণে পাঠক এখন যে শুধু বই পড়ছে না তা নয় লিখতেও ভুলে যাচ্ছে। এখন কোন পরিবারে বুক সেল্ফ না থাকলেও মাথাপিছু এ্যনড্রয়েড মোবাইল আছে। এবং তারা সর্বক্ষণ তাই নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছে।
- লেখক: সদস্য, সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটি























