Dhaka রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

একুশে ফেব্রুয়ারি

স্মৃতির আবেগ থেকে ভাষার দায়িত্বে

ফারদিন রেদোয়ান

একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের এমন একটি দিন, যা এলেই চারপাশের পরিবেশ বদলে যায়। প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া, কালো ব্যাজ, গান, কবিতা-সবকিছু মিলিয়ে দিনটি গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধার আবহ তৈরি করে। ছোটবেলা থেকে আমরা শিখে আসি, এই দিনটি ভাষার জন্য আত্মত্যাগের দিন, আত্মমর্যাদার দিন, বাঙালি পরিচয়ের দিন। কিন্তু প্রতি বছর একুশ এলেই আমার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে-আমরা কি সত্যিই ভাষার প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করছি, নাকি একুশ ধীরে ধীরে শুধুই একটি আনুষ্ঠানিক স্মরণদিবসে পরিণত হচ্ছে?

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল কেবল ভাষার স্বীকৃতির দাবি নয়; এটি ছিল সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। যারা রাজপথে নেমেছিলেন, তারা জানতেন না ভবিষ্যতে তাদের নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে। তারা শুধু বিশ্বাস করতেন-মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই বিশ্বাসের জন্য জীবন দেওয়ার মতো সাহসই একুশকে বিশ্ব ইতিহাসে অনন্য করে তুলেছে। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়-এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।

কিন্তু এই গর্বের পাশাপাশি বাস্তবতার দিকেও তাকানো জরুরি। আমরা ভাষা শহীদদের স্মরণ করি, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষার ব্যবহার কতটা নিশ্চিত করছি? শহরের অনেক পরিবারে এখন শিশুদের সঙ্গে বাংলা ভাষায় কথা বলার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, ছোটবেলা থেকেই বিদেশি ভাষায় অভ্যস্ত হওয়া ভবিষ্যতের জন্য বেশি উপকারী। ফলে শিশুরা ধীরে ধীরে নিজের মাতৃভাষার প্রতি স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য হারিয়ে ফেলছে। এটি হয়তো ইচ্ছাকৃত নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি ভাষার জন্য উদ্বেগজনক একটি প্রবণতা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারও ভাষার ক্ষেত্রে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বাংলা ভাষার বিকৃত বানান, অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি-বাংলা মিশ্রণ, কিংবা বাংলা লেখার পরিবর্তে অন্য ভাষা ব্যবহার-এসব এখন খুব সাধারণ দৃশ্য। ভাষা সময়ের সঙ্গে বদলাবে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবর্তন আর অবহেলার মধ্যে পার্থক্য আছে। আমরা যদি নিজেরাই ভাষার প্রতি যত্নশীল না হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে সেই সচেতনতা আশা করা কঠিন।

আমার কাছে একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু আবেগের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনার দিন। আমরা কি নিয়মিত বাংলা বই পড়ি? নতুন প্রজন্মকে বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি? বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্র তৈরি করছি? যদি এসব প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক না হয়, তাহলে একুশের প্রতি আমাদের ভালোবাসা অনেকটাই প্রতীকী হয়ে থাকে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আধুনিকতার সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক। বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর। শিক্ষা, গবেষণা, সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট-সব ক্ষেত্রেই ভাষার ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। বাংলা ভাষাকে যদি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা না যায়, তাহলে মানুষ ব্যবহারিক প্রয়োজনেই অন্য ভাষার ওপর নির্ভর করবে। ভাষা টিকে থাকে ব্যবহারের মাধ্যমে, শুধু আবেগের মাধ্যমে নয়।

একুশের চেতনা আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়-ভাষা মানে বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান। পৃথিবীর অনেক ভাষা আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল বার্তাই হলো, প্রতিটি মানুষের নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার রয়েছে। তাই নিজের ভাষাকে ভালোবাসার পাশাপাশি অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন। ভাষার মর্যাদা রক্ষা মানে সংকীর্ণতা নয়, বরং সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস।

সবশেষে, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-ভাষা কোনো স্থির বিষয় নয়, এটি একটি জীবন্ত সত্তা। আমরা যত বেশি ব্যবহার করব, যত বেশি চর্চা করব, ততই এটি সমৃদ্ধ হবে। আর যদি ব্যবহার কমে যায়, অবহেলা বাড়ে, তাহলে ভাষা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে।

শহীদদের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়; বরং প্রতিদিনের জীবনে বাংলা ভাষাকে সম্মান করা, সঠিকভাবে ব্যবহার করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর সৌন্দর্য ও শক্তিকে তুলে ধরা। একুশ তখনই অর্থবহ হবে, যখন ভাষা আমাদের কথায়, চিন্তায়, লেখায় এবং জীবনচর্চায় সমানভাবে উপস্থিত থাকবে। কারণ ভাষা বেঁচে থাকলেই বেঁচে থাকে একটি জাতির স্মৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, সাংবাদিক

সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
প্রকাশের সময় ০৪:৪৪:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
৮১ পড়া হয়েছে

একুশে ফেব্রুয়ারি

স্মৃতির আবেগ থেকে ভাষার দায়িত্বে

প্রকাশের সময় ০৪:৪৪:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের এমন একটি দিন, যা এলেই চারপাশের পরিবেশ বদলে যায়। প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া, কালো ব্যাজ, গান, কবিতা-সবকিছু মিলিয়ে দিনটি গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধার আবহ তৈরি করে। ছোটবেলা থেকে আমরা শিখে আসি, এই দিনটি ভাষার জন্য আত্মত্যাগের দিন, আত্মমর্যাদার দিন, বাঙালি পরিচয়ের দিন। কিন্তু প্রতি বছর একুশ এলেই আমার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে-আমরা কি সত্যিই ভাষার প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করছি, নাকি একুশ ধীরে ধীরে শুধুই একটি আনুষ্ঠানিক স্মরণদিবসে পরিণত হচ্ছে?

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল কেবল ভাষার স্বীকৃতির দাবি নয়; এটি ছিল সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। যারা রাজপথে নেমেছিলেন, তারা জানতেন না ভবিষ্যতে তাদের নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে। তারা শুধু বিশ্বাস করতেন-মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই বিশ্বাসের জন্য জীবন দেওয়ার মতো সাহসই একুশকে বিশ্ব ইতিহাসে অনন্য করে তুলেছে। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়-এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।

কিন্তু এই গর্বের পাশাপাশি বাস্তবতার দিকেও তাকানো জরুরি। আমরা ভাষা শহীদদের স্মরণ করি, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষার ব্যবহার কতটা নিশ্চিত করছি? শহরের অনেক পরিবারে এখন শিশুদের সঙ্গে বাংলা ভাষায় কথা বলার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, ছোটবেলা থেকেই বিদেশি ভাষায় অভ্যস্ত হওয়া ভবিষ্যতের জন্য বেশি উপকারী। ফলে শিশুরা ধীরে ধীরে নিজের মাতৃভাষার প্রতি স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য হারিয়ে ফেলছে। এটি হয়তো ইচ্ছাকৃত নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি ভাষার জন্য উদ্বেগজনক একটি প্রবণতা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারও ভাষার ক্ষেত্রে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বাংলা ভাষার বিকৃত বানান, অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি-বাংলা মিশ্রণ, কিংবা বাংলা লেখার পরিবর্তে অন্য ভাষা ব্যবহার-এসব এখন খুব সাধারণ দৃশ্য। ভাষা সময়ের সঙ্গে বদলাবে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবর্তন আর অবহেলার মধ্যে পার্থক্য আছে। আমরা যদি নিজেরাই ভাষার প্রতি যত্নশীল না হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে সেই সচেতনতা আশা করা কঠিন।

আমার কাছে একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু আবেগের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনার দিন। আমরা কি নিয়মিত বাংলা বই পড়ি? নতুন প্রজন্মকে বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি? বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্র তৈরি করছি? যদি এসব প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক না হয়, তাহলে একুশের প্রতি আমাদের ভালোবাসা অনেকটাই প্রতীকী হয়ে থাকে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আধুনিকতার সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক। বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর। শিক্ষা, গবেষণা, সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট-সব ক্ষেত্রেই ভাষার ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। বাংলা ভাষাকে যদি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা না যায়, তাহলে মানুষ ব্যবহারিক প্রয়োজনেই অন্য ভাষার ওপর নির্ভর করবে। ভাষা টিকে থাকে ব্যবহারের মাধ্যমে, শুধু আবেগের মাধ্যমে নয়।

একুশের চেতনা আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়-ভাষা মানে বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান। পৃথিবীর অনেক ভাষা আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল বার্তাই হলো, প্রতিটি মানুষের নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার রয়েছে। তাই নিজের ভাষাকে ভালোবাসার পাশাপাশি অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন। ভাষার মর্যাদা রক্ষা মানে সংকীর্ণতা নয়, বরং সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস।

সবশেষে, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-ভাষা কোনো স্থির বিষয় নয়, এটি একটি জীবন্ত সত্তা। আমরা যত বেশি ব্যবহার করব, যত বেশি চর্চা করব, ততই এটি সমৃদ্ধ হবে। আর যদি ব্যবহার কমে যায়, অবহেলা বাড়ে, তাহলে ভাষা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে।

শহীদদের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়; বরং প্রতিদিনের জীবনে বাংলা ভাষাকে সম্মান করা, সঠিকভাবে ব্যবহার করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর সৌন্দর্য ও শক্তিকে তুলে ধরা। একুশ তখনই অর্থবহ হবে, যখন ভাষা আমাদের কথায়, চিন্তায়, লেখায় এবং জীবনচর্চায় সমানভাবে উপস্থিত থাকবে। কারণ ভাষা বেঁচে থাকলেই বেঁচে থাকে একটি জাতির স্মৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, সাংবাদিক