হাবু ও পাঁঠার গল্প
ষাটোর্ধ জগদীশ সরকার শুধু গায়ে গতরেই বড় হয়েছে। বুদ্ধি বলতে কোন কিছু তার মধ্যে নাই। এজন্য সারাদিন মানুষের গালমন্দ শুনতে হয় তাকে। বাড়িতে গেলেও তার শান্তি নাই ঝগড়াটে বউটা সারাদিন বক বক করতে থাকে। সবাই তাকে সারাদিন অপমান করে। এমনকি সদ্য কথা বলতে শিখেছে এরকম ছোট বাচ্চারাও তার সামনে নাচতে নাচতে এসে বলে, হাবু-গু খাবু? কিংবা, জগদীশ কাঁচা কলা ভাতে দিস, তুই না পারলে তোর তোর বউকে দিস। ওমনি ওর রাগী বউটা ঝাঁটা হাতে তেড়ে আসে। সবাই তখন দৌঁড়ে পালায়। নিবুর্দ্ধিতার কারণে জগদীশ সরকারের নাম জগদীশ সরকার থেকে হাবু হয়ে গেছে। অত্র দু’চার অঞ্চলের লোকজন তাকে বোকার হদ্দ হিসেবে চিনে। ওর বৌয়ের হয়েছে যত জ্বালা। জমিদার বাড়িতে ঝিঁয়ের কাজ করে কোন রকমে সংসার চালায়। বোকা হাবু কাজকর্ম কিছুই করেনা।
জমিদার বাড়ির সামনে বড় বটগাছটার সামনে ছেলে ছোকরাদের সঙ্গে কখনো ডাংগুলি কখনোবা মার্বেল খেলে। মাঝে মাঝে জমিদার বাড়ির কর্তামশায় বা গিন্নি মার ছোটখাটো ফরমায়েশ খাটে। বিনিময়ে এক-আধ বেলা আহার কিংবা দু’চার পয়সা গাঁটে জোটে। তা দিয়ে হাবু তামাক কিনে। অবসরে শান বাঁধানো গাছের নিচে বসে তুমুল ধোঁয়া।উড়িয়ে হুস হুস করে তামাকে টান দেয়। হরিষপুর গ্রামের জমিদার বাড়ির পাশে জগদীশ সরকারের চৌদ্দ পুরুষের বাস। তার বাবা জমিদার বাড়ির জমিজমা চাষ আর ফরমায়েশ খাটতো। জগদীশ ওরফে হাবু বাবা মার একমাত্র সন্তান। সন্তান হয়না বলে কত দেবতার মানসা, কবিরাজি,তাবিজ, কবজ, শিকড় বাকড়, ওষুধ, ঝাড়ফুঁক, ওঝা, বদ্যি কোন কিছুতেই কিছু হয়না। একপর্যায়ে সন্তান হওয়ার আশাই ছেড়ে দেয় ওরা। অবশেষে শেষ বয়সে এক ফকির বাবার জল পড়ার কেরামতিতে বাবা মায়ের কোল আলোকিত করে আসে এ জগদীশ। শেষ বয়সের সন্তান বলে কথা। আদরের শেষ থাকেনা তার। মাথায় তুলে রাখবে নাকি কোলে তুলে রাখবে ভেবে পায়না তারা। এরকম ভাবে ছোটবেলা থেকে বাবা মার খুব আদর যত্নে বড় হয় জগদীশ। জগদীশের বাবা মা তাকে কোন রকম কাজকর্ম করতে দিতেন না। যদি কাজ করতে গিয়ে আঘাত পায় এই ভয়ে। এ নিয়ে পাড়া প্রতিবেশীরা জগদীশের বাবা মাকে প্রায় বলতো-
জগাকে এতো আদর তোরা দিসনে। পরে কিন্তু সামলাতে পারবি না।
পরে পাড়া প্রতিবেশীদের কথাই অক্ষরে অক্ষরে ঠিক হয়। জগদীশের বাবা মা যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন তার ততটা সমস্যা হয়নি। বাবা মা মা মারা যাওয়ার পর বিপদে পড়ে যায় সে। জমিদার মশায় তার বাড়ির এক ঝিঁয়ের সঙ্গে বিয়ে দেন তাকে।
জমিদার বাবু তাকে একদিন বললেন,
-হাবু সামনে তো জমিদার বাড়ির কালীপূজোর সময় চলে আসলো। আর মাত্র কটা দিন বাঁকী। যোগার যন্ত করতে হবে তো। বলি দেওয়ার জন্য পাঁঠা কিনতে হবে। সামনের বিষ্যুদবার দিন পাঁঠা কিনতে হাটে যাবো, তুই আমার সঙ্গে হাটে যাবি। তুই শুধু পাঁঠাটা টেনে নিয়ে আসবি।
সম্মতিতে মনের আনন্দে সহাস্যে মাথা দোলায় হাবু। দেখতে দেখতে চলে আসে হাটবার। জমিদার মশায় ঘোড়ার গাড়িতে চেপে হাটে যায় আর হাবু নির্ধারিত দিনে অনেক আগে হাটে পৌঁছে যায়। জমিদার মশায় বড়সড় আর নাদুস নুদুস দেখে একটা পাঁঠা কিনে হাবুর হাতে দিয়ে বলেন, তুই গাঁয়ের মধ্যেকার সোজা রাস্তা দিয়ে হেঁটে আয়। আমরা গাড়িতে আসছি। জমিদার মশায় হাবুকে সবকিছু সুন্দর করে বুঝে দিয়ে চলে এলেন। হাবুও কথামতো গ্রামের মেঠোপথ ধরে পাঁঠার দড়ি টেনে নিয়ে আসতে লাগলো। পথে সন্ধ্যে হয়ে এলো। তখনার দিন একটু সন্ধ্যা নামলেই যেন ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যেত। গা ছমছম করতো। মনে বিশাল সাহস সঞ্চার করে হাঁটতে হাঁটতে পাঁঠার দড়ি ধরে জমিদার বাড়ির সামনে উপস্থিত হলো হাবু। হাবুকে দেখে জমিদার মশায় বললেন কিরে হাবু পাঁঠা কোথায়? হাবু তখন পেছনে তাকিয়ে দেখে পাঁঠা নাই। শুধু দড়িটা ধরে আছে সে। অন্ধকারে গলার দড়ি ঢিলে হয়ে ছুটে গেছে পাঁঠা তা ঠাঁওরই করতে পারেনি হাবু। এতো দুর রাস্তা সে শুধু দড়ি টনে নিয়ে এসেছে। জমিদার মশায় হাবুর এমন কান্ড দেখে খুব রুষ্ট হলেন। আর তখন থেকে জগদীশ হয়ে গেল হাবু।



























