রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা নতুন মাত্রা পেয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অবৈধ কারবারের একটি বড় অংশ এখন নিয়ন্ত্রণ করছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। তারা শুধু মাদক বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; তাদের হাতে অবৈধ পিস্তল, রিভলভার ও ধারালো অস্ত্রও রয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনাও বাড়ছে। সম্প্রতি অভিযানে গিয়ে খিলগাঁও অঞ্চলের পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমানের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর কয়েক শ স্পটে মাদক কারবার চলছে। এর বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে কিশোর-তরুণদের মাধ্যমে, যারা মূলত বড় মাদকচক্রের মাঠপর্যায়ের কর্মী। তারা মাদক বিক্রি, সরবরাহ ও অর্থ আদায়ের দায়িত্ব পালন করে। মাদক ব্যবসায় বাধা এলে তারা সহিংস হয়ে ওঠে, এমনকি খুনোখুনিতেও জড়িয়ে পড়ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একটি গবেষণা বলছে, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে। জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি এই সংখ্যা একটি ভয়ংকর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা বাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি।
মাদক ব্যবসার ধরনও বদলে গেছে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে গোপনে মাদক কেনাবেচা হচ্ছে। ফেসবুকের ক্লোজড গ্রুপ, ভুয়া অ্যাকাউন্ট, সংকেতপূর্ণ পোস্ট, এমনকি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দাম নির্ধারণ ও সরবরাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এ পরিস্থিতিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অনেক সময় নিরস্ত্র অবস্থায় অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন। তাই এই বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও আধুনিক সরঞ্জাম দেওয়া জরুরি। তবে শুধু অস্ত্র দেওয়াই সমস্যার সমাধান নয়। প্রয়োজন সমন্বিত কৌশল—যেখানে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও শিক্ষামূলক উদ্যোগও থাকবে।
মাদক সমস্যার মূল শিকড়ে পৌঁছাতে হলে বড় মাদকচক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তরুণদের জন্য ইতিবাচক বিনোদন, কর্মসংস্থান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোও জরুরি।
মাদক শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। তাই এখনই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সবাইকে সম্মিলিতভাবে এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিস্তার রোধ করা আজ কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই।




























