Dhaka রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সেচে স্বচ্ছতা না থাকলে কৃষি টিকবে কীভাবে?

শুষ্ক মৌসুমে পানি না থাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের চিকনদিয়া খাল-সংলগ্ন প্রায় এক হাজার বিঘা জমি বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে থাকে। কৃষকের দীর্ঘদিনের দাবির পর সেখানে সেচ পাম্প বসানোর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। কিন্তু আশার বদলে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট-মোটর ও বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে সরকারি বরাদ্দের অর্থই কৃষকদের কাছ থেকে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ‘আবেদন ফি’, কোথাও ‘সংযোগ ফি’-নানা নামে অর্থ আদায়ের কথা বলছেন ভুক্তভোগীরা। চার কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পাশের চারটি বিলে বোরো আবাদ নির্ভর করে কৃত্রিম সেচের ওপর। দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, পুরোনো মোটরের বকেয়া বিল পরিশোধ বাবদ ২০ হাজার টাকা এবং নতুন মিটার-সংযোগ পেতে ৫৭ হাজার টাকাসহ বিভিন্ন টেবিলে স্বাক্ষরের জন্য অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে এক কৃষককে। সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ অনিয়ম অস্বীকার করলেও লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এ পরিস্থিতি কেবল প্রশাসনিক জটিলতার নয়; এটি কৃষকের অস্তিত্বের প্রশ্ন। অনেকেই সুদে টাকা নিয়ে জমি আবাদ করেছেন। পানি না পেলে ফসল নষ্ট হবে, ঋণ শোধে ব্যর্থ হলে ঘরছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে-এমন বাস্তবতা গ্রামীণ অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। ডিজেলচালিত সেচে যে চাষ সম্ভব, তা অধিক ব্যয়বহুল; ফলে লাভ তো দূরের কথা, লোকসানই সঙ্গী হয়। প্রশ্ন হলো, সেচ প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ না থাকলে তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? খাল খনন, স্থায়ী পাম্পিং স্টেশন ও সময়মতো বিদ্যুৎ সংযোগ-এসব পরিকল্পনা ছাড়া প্রকল্প ঘোষণা কেবল প্রত্যাশা বাড়ায়, বাস্তবায়ন না হলে হতাশা গভীর করে। মাঠপর্যায়ে ‘দালালচক্র’ বা অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের অভিযোগ থাকলে তা দ্রুত তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। অবিলম্বে স্বচ্ছ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। এছাড়াও জরুরি ভিত্তিতে মিটার-সংযোগ সম্পন্ন করে চলতি মৌসুমের ফসল রক্ষা। পাশাপাশি চিকনদিয়া খাল পুনঃখনন ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ। এবং সেচ-সংশ্লিষ্ট সব ফি ও প্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করে ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করা-যাতে কৃষক জানেন, কোন খাতে কত অর্থ বৈধ। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি। সেচে অনিশ্চয়তা ও স্বচ্ছতার অভাব সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করে। ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন, প্রতিশ্রুতির চেয়ে জবাবদিহিই পারে কৃষকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। এখন প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ-যাতে লাল হয়ে যাওয়া ধানের চারা আবার সবুজ হয়ে ওঠে।

সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
প্রকাশের সময় ০৫:২৬:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬
৬০ পড়া হয়েছে

সেচে স্বচ্ছতা না থাকলে কৃষি টিকবে কীভাবে?

প্রকাশের সময় ০৫:২৬:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

শুষ্ক মৌসুমে পানি না থাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের চিকনদিয়া খাল-সংলগ্ন প্রায় এক হাজার বিঘা জমি বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে থাকে। কৃষকের দীর্ঘদিনের দাবির পর সেখানে সেচ পাম্প বসানোর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। কিন্তু আশার বদলে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট-মোটর ও বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে সরকারি বরাদ্দের অর্থই কৃষকদের কাছ থেকে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ‘আবেদন ফি’, কোথাও ‘সংযোগ ফি’-নানা নামে অর্থ আদায়ের কথা বলছেন ভুক্তভোগীরা। চার কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পাশের চারটি বিলে বোরো আবাদ নির্ভর করে কৃত্রিম সেচের ওপর। দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, পুরোনো মোটরের বকেয়া বিল পরিশোধ বাবদ ২০ হাজার টাকা এবং নতুন মিটার-সংযোগ পেতে ৫৭ হাজার টাকাসহ বিভিন্ন টেবিলে স্বাক্ষরের জন্য অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে এক কৃষককে। সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ অনিয়ম অস্বীকার করলেও লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এ পরিস্থিতি কেবল প্রশাসনিক জটিলতার নয়; এটি কৃষকের অস্তিত্বের প্রশ্ন। অনেকেই সুদে টাকা নিয়ে জমি আবাদ করেছেন। পানি না পেলে ফসল নষ্ট হবে, ঋণ শোধে ব্যর্থ হলে ঘরছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে-এমন বাস্তবতা গ্রামীণ অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। ডিজেলচালিত সেচে যে চাষ সম্ভব, তা অধিক ব্যয়বহুল; ফলে লাভ তো দূরের কথা, লোকসানই সঙ্গী হয়। প্রশ্ন হলো, সেচ প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ না থাকলে তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? খাল খনন, স্থায়ী পাম্পিং স্টেশন ও সময়মতো বিদ্যুৎ সংযোগ-এসব পরিকল্পনা ছাড়া প্রকল্প ঘোষণা কেবল প্রত্যাশা বাড়ায়, বাস্তবায়ন না হলে হতাশা গভীর করে। মাঠপর্যায়ে ‘দালালচক্র’ বা অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের অভিযোগ থাকলে তা দ্রুত তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। অবিলম্বে স্বচ্ছ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। এছাড়াও জরুরি ভিত্তিতে মিটার-সংযোগ সম্পন্ন করে চলতি মৌসুমের ফসল রক্ষা। পাশাপাশি চিকনদিয়া খাল পুনঃখনন ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ। এবং সেচ-সংশ্লিষ্ট সব ফি ও প্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করে ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করা-যাতে কৃষক জানেন, কোন খাতে কত অর্থ বৈধ। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি। সেচে অনিশ্চয়তা ও স্বচ্ছতার অভাব সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করে। ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন, প্রতিশ্রুতির চেয়ে জবাবদিহিই পারে কৃষকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। এখন প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ-যাতে লাল হয়ে যাওয়া ধানের চারা আবার সবুজ হয়ে ওঠে।