Dhaka রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ক্ষমতার রহস্যাবৃত যুদ্ধ ও বাংলাদেশ

বিশ্বব্যাপী অমানবিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। ক্ষমতার দম্ভ, দ্বন্দ্ব আর অহিংস চিন্তা থেকে এই কাজগুলো করছে ছাত্র-যুব-জনতা বিরোধী বিশ্বশত্রুরা। আর একারণেই সাধারণ মানুষের জীবনহানী বাড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার জবাব এখন দিচ্ছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও নিহত হয়েছেন হামলায়। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে হামলা করেছে ইরান। তবে একথাও সত্য যে, জাতি হিসেবে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মধ্যেই বাড়ছে ভেদাভেদ। হয়তো এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই মিত্র দেশ ইসরায়েল ও সৌদি আরব কয়েক সপ্তাহ ধরে এ হামলার পক্ষে চাপ দিচ্ছিল ট্রাম্পকে। তারই ফল দেখা যাচ্ছে এখন। তবে আমি তৃতীয় বিশ্বের দেশ বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক-রাজনীতিক ও সংবাদকর্মী হিসেবে বলতে চাই- যত দ্রুত সম্ভব, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংকটের সমাধান কূটনৈতিকভাবেই হোক। এই বিষয়ে অবশ্য একাধিকবার কথা বলেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তবে গত এক মাসে গোপনে তিনি ট্রাম্পকে একাধিকবার ব্যক্তিগতভাবে ফোন করেন। সেখানে তিনি হামলার পক্ষে মত দেন। একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। যতদূর জেনেছি- সৌদি নেতা মার্কিন কর্মকর্তাদেরকে সতর্কও করে দেন যে এখনই হামলা না চালালে ভবিষ্যতে ইরান আরও বেপরোয়া, শক্তিশালী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। যুবরাজ সালমানের এই অবস্থানকে সমর্থন দিয়েছেন তার ভাই ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান। তিনিও গেল জানুয়ারি মাসে এক বৈঠকে হামলা না চালালে কী কী ঘটতে পারে, তা তুলে ধরেন মার্কিন কর্মকর্তাদের সামনে। সৌদি আরবের এই অবস্থানের পেছনে কাজ করেছে ২টি কারণ। প্রথমটি হলো- নিজেদের তেলের স্থাপনাগুলোর ওপর ইরানের হামলা এড়ানোর ইচ্ছা, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে রিয়াদের প্রধান আঞ্চলিক শত্রু দমনের ইচ্ছা। সেই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখলাম- নির্মমভাবে বিশ্বব্যাপী আলোচিত ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এক যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন।
অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এক্স হ্যান্ডেলে লিখে জানিয়েছেন, শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) তেহরানে খামেনির বাসভবন লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। এই হামলায় খামেনির কন্যা, জামাতা এবং নাতিও নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ট্রাম্পের দাবি, খামেনিই এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও উন্নত ট্র্যাকিং সিস্টেমের নজরদারি এড়াতে পারেননি। অথচ ইতিহাস বলছে- আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে ইরানের হাল ধরেন। খামেনি যেখানে ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক ভিত্তি গড়েছিলেন, খামেনি সেখানে ইরানের সামরিক ও আধ্যাত্মিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে এক অপরাজেয় প্রতিরোধ বলয় তৈরি করেছিলেন। ১৯৮০-র দশকে ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি তার যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা-ই পরবর্তী কয়েক দশক ইরানের পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তার শাসনামলে ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ (আইআরজিসি) একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তার করে। খামেনির দীর্ঘ শাসনামল যেমন অর্জনে ভরপুর ছিল তেমনি তা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়েছে। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচন এবং ২০২২ সালে নারী অধিকার নিয়ে হওয়া বিক্ষোভসহ বিভিন্ন সময়ে তাকে কঠিন জনরোষের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যতদূর জেনেছি- ২০২৬ সালের শুরুতে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সৃষ্ট দেশব্যাপী বিক্ষোভ দমনে সরকার কঠোর অবস্থান নিলে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয় বলে অভিযোগ আছে। একথাও সত্য যে, খামেনির অতিরিক্ত জাতীয়তাবাদ ও পশ্চিমা বিরোধিতার চড়া মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ ইরানিদের, যা তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে রেখেছে।
আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে খামেনির সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ গড়ে তোলা। হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুতিদের মতো গোষ্ঠীগুলোকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ব্যুহ তৈরি করেছিলেন। তবে ২০২৪ সালে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং হামাস-হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের হত্যাকাণ্ডের ফলে এই অক্ষ কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগেই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের ভেতরে হামলা চালায়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খামেনি তার আপোষহীন অবস্থানে অটল ছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সরকার পরিবর্তনের ডাক দিয়ে ‘বড় ধরনের সামরিক অভিযান’ শুরু করেন, তখন খামেনিই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে ইরানি জাতি কখনও আত্মসমর্পণ করবে না। তার মৃত্যুতে ইরানের ইতিহাসে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটল, যা দেশটিকে এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্থ শুধু ইরানই নয়; ক্ষতিগ্রস্থ হবে বিশ্ব মুসলিমের আগামী।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ায় ওয়াশিংটন ও তেল আবিবে উচ্ছ্বাসের খবর মিললেও নয়াদিল্লি ও ঢাকায় দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ। ইরানের নেতৃত্বে এ পরিবর্তন ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশেও পররাষ্ট্রনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আমি ধারণা করছি। বাংলাদেশ সরকার নতুন হওয়ায় অত্যন্ত গভীর চিন্তাভাবনায় অতিবাহিত করছে সময়। তবে ভারত সরকার এখন পর্যন্ত ইসরাইল ও ইরান সংঘাতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার কেবল শান্তি ও সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। কারণ ইসরাইল ও ইরান দুদেশই ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এমন পরিস্থিতিতে খামেনির মৃত্যু দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে ভারতের কৌশলগত অংশীদার। শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কও দুদেশের মধ্যে গভীর। কাশ্মীর ইস্যুসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে অতীতে তেহরান ভারতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলে উল্লেখ করা হয়। ফলে ইরানের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বন্দর ব্যবহার করে পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য করে ভারত। কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগেও এই পথ ব্যবহার করা হয়। চাবাহার বন্দরকে কেন্দ্র করে ভারত বহু বছর ধরে বিনিয়োগ করেছে এবং এটিকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে গড়ে তুলেছে। ইরানে যদি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্রপন্থী কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে, তাহলে চাবাহার প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ভারতের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে বিশ্বব্যাপী যা-ই হোক আর না হোক, মধ্য এশিয়ায় ভারতের প্রভাব কমে গেলে সেই শূন্যতা কাজে লাগাতে পারে চীন ও পাকিস্তান। চীন ইতোমধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। চাবাহার বন্দর কার্যকর না থাকলে আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে বাণিজ্য ও কৌশলগত সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। ইরানের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের একটি অংশ পরিচালিত হয়। ইউরেনিয়াম ও রেয়ার আর্থ খনিজসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহনেও এই রুট ব্যবহৃত হয়। ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে সেই বাণিজ্যিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ভারতের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের বিষয়ে যেমন আমি সোচ্চার, তেমনি দক্ষিণ এশিয়াসহ মুসলিম বিশ্বের সকল সংকট সমাধান নিয়ে সক্রিয় থাকি কলমে-কর্মে-রাজপথে। সেই ধারাবাহিকতায় অনুমান করছি- ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এলে পাকিস্তান পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নজির রয়েছে। ইরান দুর্বল হলে এই অঞ্চলে পাকিস্তানের ভূমিকা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। এত কিছুর পরও যখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী নিরব ভূমিকায় সময় অতিক্রম করছেন, তখন ভারতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর কূটনৈতিক মহলে সক্রিয় যোগাযোগ বজায় রেখেছেন বলে জানা গেছে। সরকারি পর্যায়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে নয়াদিল্লি পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে তেহরানে সামপ্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ভারতের জন্য ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ায় এই পরিবর্তন নয়াদিল্লির কূটনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক মহল। সেই সাথে হরমুজ প্রণালীর বিষয়েও একটা বেদনাসময় এগিয়ে আসছে বলে আমি মোমিন মেহেদী অনুমান করছি। কারণ- বাংলাদেশের জ্বালানি আসার রাস্তাটা এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা আর অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেই সাথে চরম জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকারের সম্ভাবনাও উঁকি দিচ্ছে। এমতবস্থায় থাকতে হবে সতর্ক এবং সক্রিয় প্রিয় বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের কল্যাণের জন্য। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধআগুন যেন নিবৃত হয়, এমন প্রত্যয়ে চলুন এগিয়ে যাই…

মোমিন মেহেদী : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাভাস

সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
প্রকাশের সময় ০৫:২২:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬
৬৯ পড়া হয়েছে

ক্ষমতার রহস্যাবৃত যুদ্ধ ও বাংলাদেশ

প্রকাশের সময় ০৫:২২:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

বিশ্বব্যাপী অমানবিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। ক্ষমতার দম্ভ, দ্বন্দ্ব আর অহিংস চিন্তা থেকে এই কাজগুলো করছে ছাত্র-যুব-জনতা বিরোধী বিশ্বশত্রুরা। আর একারণেই সাধারণ মানুষের জীবনহানী বাড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার জবাব এখন দিচ্ছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও নিহত হয়েছেন হামলায়। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে হামলা করেছে ইরান। তবে একথাও সত্য যে, জাতি হিসেবে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মধ্যেই বাড়ছে ভেদাভেদ। হয়তো এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই মিত্র দেশ ইসরায়েল ও সৌদি আরব কয়েক সপ্তাহ ধরে এ হামলার পক্ষে চাপ দিচ্ছিল ট্রাম্পকে। তারই ফল দেখা যাচ্ছে এখন। তবে আমি তৃতীয় বিশ্বের দেশ বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক-রাজনীতিক ও সংবাদকর্মী হিসেবে বলতে চাই- যত দ্রুত সম্ভব, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংকটের সমাধান কূটনৈতিকভাবেই হোক। এই বিষয়ে অবশ্য একাধিকবার কথা বলেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তবে গত এক মাসে গোপনে তিনি ট্রাম্পকে একাধিকবার ব্যক্তিগতভাবে ফোন করেন। সেখানে তিনি হামলার পক্ষে মত দেন। একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। যতদূর জেনেছি- সৌদি নেতা মার্কিন কর্মকর্তাদেরকে সতর্কও করে দেন যে এখনই হামলা না চালালে ভবিষ্যতে ইরান আরও বেপরোয়া, শক্তিশালী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। যুবরাজ সালমানের এই অবস্থানকে সমর্থন দিয়েছেন তার ভাই ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান। তিনিও গেল জানুয়ারি মাসে এক বৈঠকে হামলা না চালালে কী কী ঘটতে পারে, তা তুলে ধরেন মার্কিন কর্মকর্তাদের সামনে। সৌদি আরবের এই অবস্থানের পেছনে কাজ করেছে ২টি কারণ। প্রথমটি হলো- নিজেদের তেলের স্থাপনাগুলোর ওপর ইরানের হামলা এড়ানোর ইচ্ছা, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে রিয়াদের প্রধান আঞ্চলিক শত্রু দমনের ইচ্ছা। সেই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখলাম- নির্মমভাবে বিশ্বব্যাপী আলোচিত ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এক যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন।
অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এক্স হ্যান্ডেলে লিখে জানিয়েছেন, শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) তেহরানে খামেনির বাসভবন লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। এই হামলায় খামেনির কন্যা, জামাতা এবং নাতিও নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ট্রাম্পের দাবি, খামেনিই এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও উন্নত ট্র্যাকিং সিস্টেমের নজরদারি এড়াতে পারেননি। অথচ ইতিহাস বলছে- আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে ইরানের হাল ধরেন। খামেনি যেখানে ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক ভিত্তি গড়েছিলেন, খামেনি সেখানে ইরানের সামরিক ও আধ্যাত্মিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে এক অপরাজেয় প্রতিরোধ বলয় তৈরি করেছিলেন। ১৯৮০-র দশকে ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি তার যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা-ই পরবর্তী কয়েক দশক ইরানের পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তার শাসনামলে ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ (আইআরজিসি) একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তার করে। খামেনির দীর্ঘ শাসনামল যেমন অর্জনে ভরপুর ছিল তেমনি তা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়েছে। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচন এবং ২০২২ সালে নারী অধিকার নিয়ে হওয়া বিক্ষোভসহ বিভিন্ন সময়ে তাকে কঠিন জনরোষের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যতদূর জেনেছি- ২০২৬ সালের শুরুতে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সৃষ্ট দেশব্যাপী বিক্ষোভ দমনে সরকার কঠোর অবস্থান নিলে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয় বলে অভিযোগ আছে। একথাও সত্য যে, খামেনির অতিরিক্ত জাতীয়তাবাদ ও পশ্চিমা বিরোধিতার চড়া মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ ইরানিদের, যা তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে রেখেছে।
আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে খামেনির সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ গড়ে তোলা। হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুতিদের মতো গোষ্ঠীগুলোকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ব্যুহ তৈরি করেছিলেন। তবে ২০২৪ সালে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং হামাস-হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের হত্যাকাণ্ডের ফলে এই অক্ষ কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগেই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের ভেতরে হামলা চালায়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খামেনি তার আপোষহীন অবস্থানে অটল ছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সরকার পরিবর্তনের ডাক দিয়ে ‘বড় ধরনের সামরিক অভিযান’ শুরু করেন, তখন খামেনিই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে ইরানি জাতি কখনও আত্মসমর্পণ করবে না। তার মৃত্যুতে ইরানের ইতিহাসে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটল, যা দেশটিকে এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্থ শুধু ইরানই নয়; ক্ষতিগ্রস্থ হবে বিশ্ব মুসলিমের আগামী।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ায় ওয়াশিংটন ও তেল আবিবে উচ্ছ্বাসের খবর মিললেও নয়াদিল্লি ও ঢাকায় দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ। ইরানের নেতৃত্বে এ পরিবর্তন ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশেও পররাষ্ট্রনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আমি ধারণা করছি। বাংলাদেশ সরকার নতুন হওয়ায় অত্যন্ত গভীর চিন্তাভাবনায় অতিবাহিত করছে সময়। তবে ভারত সরকার এখন পর্যন্ত ইসরাইল ও ইরান সংঘাতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার কেবল শান্তি ও সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। কারণ ইসরাইল ও ইরান দুদেশই ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এমন পরিস্থিতিতে খামেনির মৃত্যু দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে ভারতের কৌশলগত অংশীদার। শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কও দুদেশের মধ্যে গভীর। কাশ্মীর ইস্যুসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে অতীতে তেহরান ভারতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলে উল্লেখ করা হয়। ফলে ইরানের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বন্দর ব্যবহার করে পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য করে ভারত। কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগেও এই পথ ব্যবহার করা হয়। চাবাহার বন্দরকে কেন্দ্র করে ভারত বহু বছর ধরে বিনিয়োগ করেছে এবং এটিকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে গড়ে তুলেছে। ইরানে যদি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্রপন্থী কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে, তাহলে চাবাহার প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ভারতের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে বিশ্বব্যাপী যা-ই হোক আর না হোক, মধ্য এশিয়ায় ভারতের প্রভাব কমে গেলে সেই শূন্যতা কাজে লাগাতে পারে চীন ও পাকিস্তান। চীন ইতোমধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। চাবাহার বন্দর কার্যকর না থাকলে আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে বাণিজ্য ও কৌশলগত সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। ইরানের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের একটি অংশ পরিচালিত হয়। ইউরেনিয়াম ও রেয়ার আর্থ খনিজসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহনেও এই রুট ব্যবহৃত হয়। ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে সেই বাণিজ্যিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ভারতের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের বিষয়ে যেমন আমি সোচ্চার, তেমনি দক্ষিণ এশিয়াসহ মুসলিম বিশ্বের সকল সংকট সমাধান নিয়ে সক্রিয় থাকি কলমে-কর্মে-রাজপথে। সেই ধারাবাহিকতায় অনুমান করছি- ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এলে পাকিস্তান পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নজির রয়েছে। ইরান দুর্বল হলে এই অঞ্চলে পাকিস্তানের ভূমিকা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। এত কিছুর পরও যখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী নিরব ভূমিকায় সময় অতিক্রম করছেন, তখন ভারতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর কূটনৈতিক মহলে সক্রিয় যোগাযোগ বজায় রেখেছেন বলে জানা গেছে। সরকারি পর্যায়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে নয়াদিল্লি পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে তেহরানে সামপ্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ভারতের জন্য ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ায় এই পরিবর্তন নয়াদিল্লির কূটনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক মহল। সেই সাথে হরমুজ প্রণালীর বিষয়েও একটা বেদনাসময় এগিয়ে আসছে বলে আমি মোমিন মেহেদী অনুমান করছি। কারণ- বাংলাদেশের জ্বালানি আসার রাস্তাটা এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা আর অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেই সাথে চরম জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকারের সম্ভাবনাও উঁকি দিচ্ছে। এমতবস্থায় থাকতে হবে সতর্ক এবং সক্রিয় প্রিয় বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের কল্যাণের জন্য। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধআগুন যেন নিবৃত হয়, এমন প্রত্যয়ে চলুন এগিয়ে যাই…

মোমিন মেহেদী : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাভাস