তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে ক্ষুধার গল্প
রাজধানীর মিরপুরের একটি মোড়ে সকাল সাড়ে আটটার পর থেকেই ভিড় বাড়তে থাকে। একটি ট্রাক এসে দাঁড়ায়। চারপাশে দ্রুত লাইন তৈরি হয়। কারও হাতে প্লাস্টিকের বোতল, কারও হাতে পুরোনো তেলের জার। সবার লক্ষ্য এক- স্বল্প দামে ভোজ্যতেল পাওয়া। লাইনের শেষ দিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন রফিকুল ইসলাম। পেশায় রিকশাচালক। ভোরেই কাজ শুরু করার কথা থাকলেও আজ তিনি এসেছেন তেলের লাইনে। “কালও আসছিলাম, পাই নাই,” বললেন তিনি। “আজ যদি পাই, তাহলে দুই দিন একটু স্বস্তি।”
সরকার নির্ধারিত দামে তেল বিক্রির ঘোষণা থাকলেও খোলা বাজারে এর দাম বেশি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ট্রাক সেলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তবে সরবরাহ সীমিত হওয়ায় সবাই তেল পান না।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের মধ্যে ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান, একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক। তিনি বললেন, “আমরা বাজারে গেলে সবকিছুর দাম বেশি। আবার এখানে এলে পাওয়া যাবে কি না, সেই নিশ্চয়তা নেই।”
ট্রাকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক কর্মী মাইকিং করে জানালেন, “একজনকে এক লিটার করে দেওয়া হবে।” এই ঘোষণার পর লাইনে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হয়। অনেকেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
একপর্যায়ে হুড়োহুড়ির মধ্যে এক বৃদ্ধ পড়ে যান। আশপাশের কয়েকজন তাকে তুলে বসান। পরে তিনি আবার লাইনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন।
এদিকে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনাও বাড়ে। লাইনের সামনে থাকা লোকজন তেল পেলেও পেছনের দিকের অনেকেই শঙ্কায় পড়েন- তাদের জন্য তেল থাকবে কি না।
প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর রফিকুল ইসলাম লাইনের সামনে পৌঁছানোর আগেই ঘোষণা আসে, “তেল শেষ।”
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে সরে যান। কথা বলতে চাইলে শুধু বলেন, “বাসায় কী বলব, বুঝতেছি না।”
রফিকুল ইসলামের পরিবারে পাঁচজন সদস্য। প্রতিদিনের রান্নায় তেলের ব্যবহার কমিয়ে আনা হয়েছে। “আগে এক লিটার নিতাম, এখন আধা লিটারেও ভাবতে হয়,” বলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়া, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা- সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। মিরপুরের এই দৃশ্য এক দিনের নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে- যেখানে প্রয়োজনের চেয়ে সরবরাহ কম, আর অপেক্ষা বেশি। দিন শেষে যারা তেল পান, তাদের মুখে স্বস্তি। আর যারা পান না, তারা ফিরে যান অনিশ্চয়তা নিয়ে- পরদিন আবার লাইনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিয়ে।



























