Dhaka রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

একটি লাল জামার জন্য

মুহাম্মদ রাইস উদ্দিন
“বাবা ও বাবা, আমারে নতুন কাপড় কিনে দিবা না? দুইদিন পরেই তো ঈদ। রোজার ঈদেও তো জামা দেও নাই। তুমি না কইছিলা কুরবানির ঈদে লাল টকটকে একটা জামা কিনা দিবা? করিমনরে ওর বাবা কি সুন্দর জামা আর জুতা কিনা দিছে!”
মেয়ের আবদারের বিপরীতে বাবা শেখ আওয়ালের মুখে কোনো কথা নেই। অভাবের তাড়নায় পাথর হয়ে যাওয়া বাবা তখনই কাঁদে, যখন সে পরিবারের প্রিয় মুখগুলোর অতি সামান্য আবদারটুকু মেটাতে ব্যর্থ হয়। বাবার নীরবতা সইতে না পেরে ছোট্ট মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে উঠান পেরিয়ে চলে গেল।
মেয়ের এই আকুতি শুনে মা সখিনা বিবির দুচোখ জলে ভরে উঠল। তিনি রাগে আর অভিমানে স্বামীকে শুনিয়ে বললেন, “তুমি কেমন বাবা গো? একটা মাত্র মাইয়া, তারে একটা কাপড় কিনা দিবার পারো না? তোমার তো মইরা যাওয়াই ভালো! একটা লাল জামার জন্য মাইয়াটা কতদিন ধইরা পথ চাইয়া আছে, বোঝো না?”
বউয়ের কথায় শেখ আওয়াল এবার গর্জে উঠলেন, “চুপ থাকবি কি না ক? তোরে না কইছি গরুটা বেচা হইলেই তোগো নতুন কাপড় কিনা দিমু। গরু বেচতে না পারলে টাকা পামু কই?”
সখিনা বিবি দমবার পাত্রী নন, “কয়টা হাট তো ঘুরাইলা, বেচা হয় না ক্যান? তোমার আর গরু পালা লাগবো না! গত দুই বছরও হাট থেইকা গরু ফিরাইয়া আনছিলা।”
আওয়াল শেখ আর কথা বাড়ালেন না। মনের ভেতর জেদ চাপল—এবার গরু বিক্রি করতেই হবে। বিকেলে পরম মমতায় গরুটিকে গোসল করিয়ে তিনি গাবতলীর হাটের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। পথে বারবার মেয়ের সেই নিষ্পাপ মুখটা ভেসে উঠছিল। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে তিল তিল করে বড় করা গরুটির ওপর অনেক আশা তার। এবার নাকি ভারতীয় গরু কম আসবে, তাই মনে মনে ভালো দামের স্বপ্ন বুনছেন।
গোধূলি লগ্নে যখন তিনি হাটে পৌঁছালেন, চারদিকে তখন হাজারো মানুষের শোরগোল। সারা রাত নির্ঘুম কাটল ক্রেতা সামলাতে। ভোর হতেই ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। গ্রামের হাটে যে গরুর দাম উঠেছিল ৮০-৯০ হাজার, গাবতলীতে এক ব্যাপারী তা ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকায় কিনে নিলেন। মাত্র ৫০ হাজার টাকায় কেনা গরু ছয় মাস লালন-পালন করে আজ লাভের মুখ দেখলেন শেখ আওয়াল। খুশিতে তার চোখে পানি চলে এলো।
দাম মিটিয়ে ক্রেতা যখন গরুটিকে নিয়ে যাচ্ছিল, অবলা প্রাণীটি বারবার শেখ আওয়ালের দিকে ছুটে আসছিল। মায়ার টানে আওয়াল শেখ ডাক দিলেন, “ভাই, একটু খাড়ান!”
ক্রেতা ভাবলেন দাম হয়তো আরও বাড়াতে চাইবেন। কিন্তু আওয়াল শেখ কাছে গিয়ে নিজের গলার গামছা দিয়ে গরুর শরীরটা শেষবারের মতো মুছে দিলেন। পরম মমতায় গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন, “অনেক যত্ন কইরা পালছি ভাই, অনেক শান্ত গরু। সাবধানে নিয়েন।”
একজন মালিকের চোখে তখন পশুর প্রতি ভালোবাসা দেখে ক্রেতা থমকে গেলেন। সেখানে কোনো লোভ ছিল না, ছিল সন্তানের মতো স্নেহ। কিন্তু পেটের দায় বড় দায়। চিরচেনা সেই গোয়াল ছেড়ে গরুটিকে চলে যেতে হলো অজানার পথে।
টাকা পকেটে নিয়ে আওয়াল শেখ ছুটলেন মার্কেটে। মেয়ের জন্য সেই লাল রঙের ঝলমলে জামা আর বউয়ের জন্য সুন্দর একটা তাঁতের শাড়ি কিনলেন। সারারাত না খাওয়া শরীরটা এবার ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল। বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশে একটি চায়ের দোকানে থামলেন। তখন এক ডাব বিক্রেতার হাকডাক শুনে ভাবলেন একটা ডাব খেলে শরীরটা জুড়াবে।
কিন্তু আওয়াল শেখ জানতেন না, সেই ডাব বিক্রেতা ছিল এক দুষ্কৃতকারী দলের সদস্য।
“এই ডাবওয়ালা ভাই, একটা কচি দেখে মিষ্টি ডাব দাও তো।”
বিক্রেতা সুকৌশলে ডাবের ভেতর নেশাজাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে পাইপ দিয়ে এগিয়ে দিল। তৃষ্ণার্ত আওয়াল শেখ এক চুমুতেই তা শেষ করে আবার হাঁটা শুরু করলেন। কিছুদূর যেতেই তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। দুজন লোক তাকে অনুসরণ করছিল, একজন কাছে এসে আলাপ জমানোর ভান করল। কিছুক্ষণ পরই শেখ আওয়াল জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
পিশাচের দল তার পকেটের সব টাকা আর সাধের সেই লাল জামা-শাড়ি নিয়ে চম্পট দিল। জনশূন্য পথে পড়ে রইলেন এক নিঃস্ব বাবা।
যখন তার জ্ঞান ফিরল, ততক্ষণে ঈদের চাঁদ দেখা গেছে। আনন্দ নয়, একরাশ শূন্যতা আর হাহাকার নিয়ে বাড়ি ফিরলেন তিনি। ছয় মাসের হাড়ভাঙা খাটুনি, সব স্বপ্ন এক মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে গেল। শেখ আওয়ালের মুখে সব শুনে সখিনা বিবির কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
শহরের কোনো এক কোণে হয়তো এক দস্যুর মেয়ে সেই লাল জামাটা পরে হাসছে, কিন্তু সে জানে না—এই জামার লাল রঙের আড়ালে মিশে আছে এক অসহায় বাবার রক্তজল করা ঘাম আর এক ছোট্ট মেয়ের আর্তনাদ।
সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
প্রকাশের সময় ০৬:১০:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬
২৯ পড়া হয়েছে

একটি লাল জামার জন্য

প্রকাশের সময় ০৬:১০:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬
“বাবা ও বাবা, আমারে নতুন কাপড় কিনে দিবা না? দুইদিন পরেই তো ঈদ। রোজার ঈদেও তো জামা দেও নাই। তুমি না কইছিলা কুরবানির ঈদে লাল টকটকে একটা জামা কিনা দিবা? করিমনরে ওর বাবা কি সুন্দর জামা আর জুতা কিনা দিছে!”
মেয়ের আবদারের বিপরীতে বাবা শেখ আওয়ালের মুখে কোনো কথা নেই। অভাবের তাড়নায় পাথর হয়ে যাওয়া বাবা তখনই কাঁদে, যখন সে পরিবারের প্রিয় মুখগুলোর অতি সামান্য আবদারটুকু মেটাতে ব্যর্থ হয়। বাবার নীরবতা সইতে না পেরে ছোট্ট মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে উঠান পেরিয়ে চলে গেল।
মেয়ের এই আকুতি শুনে মা সখিনা বিবির দুচোখ জলে ভরে উঠল। তিনি রাগে আর অভিমানে স্বামীকে শুনিয়ে বললেন, “তুমি কেমন বাবা গো? একটা মাত্র মাইয়া, তারে একটা কাপড় কিনা দিবার পারো না? তোমার তো মইরা যাওয়াই ভালো! একটা লাল জামার জন্য মাইয়াটা কতদিন ধইরা পথ চাইয়া আছে, বোঝো না?”
বউয়ের কথায় শেখ আওয়াল এবার গর্জে উঠলেন, “চুপ থাকবি কি না ক? তোরে না কইছি গরুটা বেচা হইলেই তোগো নতুন কাপড় কিনা দিমু। গরু বেচতে না পারলে টাকা পামু কই?”
সখিনা বিবি দমবার পাত্রী নন, “কয়টা হাট তো ঘুরাইলা, বেচা হয় না ক্যান? তোমার আর গরু পালা লাগবো না! গত দুই বছরও হাট থেইকা গরু ফিরাইয়া আনছিলা।”
আওয়াল শেখ আর কথা বাড়ালেন না। মনের ভেতর জেদ চাপল—এবার গরু বিক্রি করতেই হবে। বিকেলে পরম মমতায় গরুটিকে গোসল করিয়ে তিনি গাবতলীর হাটের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। পথে বারবার মেয়ের সেই নিষ্পাপ মুখটা ভেসে উঠছিল। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে তিল তিল করে বড় করা গরুটির ওপর অনেক আশা তার। এবার নাকি ভারতীয় গরু কম আসবে, তাই মনে মনে ভালো দামের স্বপ্ন বুনছেন।
গোধূলি লগ্নে যখন তিনি হাটে পৌঁছালেন, চারদিকে তখন হাজারো মানুষের শোরগোল। সারা রাত নির্ঘুম কাটল ক্রেতা সামলাতে। ভোর হতেই ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। গ্রামের হাটে যে গরুর দাম উঠেছিল ৮০-৯০ হাজার, গাবতলীতে এক ব্যাপারী তা ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকায় কিনে নিলেন। মাত্র ৫০ হাজার টাকায় কেনা গরু ছয় মাস লালন-পালন করে আজ লাভের মুখ দেখলেন শেখ আওয়াল। খুশিতে তার চোখে পানি চলে এলো।
দাম মিটিয়ে ক্রেতা যখন গরুটিকে নিয়ে যাচ্ছিল, অবলা প্রাণীটি বারবার শেখ আওয়ালের দিকে ছুটে আসছিল। মায়ার টানে আওয়াল শেখ ডাক দিলেন, “ভাই, একটু খাড়ান!”
ক্রেতা ভাবলেন দাম হয়তো আরও বাড়াতে চাইবেন। কিন্তু আওয়াল শেখ কাছে গিয়ে নিজের গলার গামছা দিয়ে গরুর শরীরটা শেষবারের মতো মুছে দিলেন। পরম মমতায় গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন, “অনেক যত্ন কইরা পালছি ভাই, অনেক শান্ত গরু। সাবধানে নিয়েন।”
একজন মালিকের চোখে তখন পশুর প্রতি ভালোবাসা দেখে ক্রেতা থমকে গেলেন। সেখানে কোনো লোভ ছিল না, ছিল সন্তানের মতো স্নেহ। কিন্তু পেটের দায় বড় দায়। চিরচেনা সেই গোয়াল ছেড়ে গরুটিকে চলে যেতে হলো অজানার পথে।
টাকা পকেটে নিয়ে আওয়াল শেখ ছুটলেন মার্কেটে। মেয়ের জন্য সেই লাল রঙের ঝলমলে জামা আর বউয়ের জন্য সুন্দর একটা তাঁতের শাড়ি কিনলেন। সারারাত না খাওয়া শরীরটা এবার ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল। বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশে একটি চায়ের দোকানে থামলেন। তখন এক ডাব বিক্রেতার হাকডাক শুনে ভাবলেন একটা ডাব খেলে শরীরটা জুড়াবে।
কিন্তু আওয়াল শেখ জানতেন না, সেই ডাব বিক্রেতা ছিল এক দুষ্কৃতকারী দলের সদস্য।
“এই ডাবওয়ালা ভাই, একটা কচি দেখে মিষ্টি ডাব দাও তো।”
বিক্রেতা সুকৌশলে ডাবের ভেতর নেশাজাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে পাইপ দিয়ে এগিয়ে দিল। তৃষ্ণার্ত আওয়াল শেখ এক চুমুতেই তা শেষ করে আবার হাঁটা শুরু করলেন। কিছুদূর যেতেই তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। দুজন লোক তাকে অনুসরণ করছিল, একজন কাছে এসে আলাপ জমানোর ভান করল। কিছুক্ষণ পরই শেখ আওয়াল জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
পিশাচের দল তার পকেটের সব টাকা আর সাধের সেই লাল জামা-শাড়ি নিয়ে চম্পট দিল। জনশূন্য পথে পড়ে রইলেন এক নিঃস্ব বাবা।
যখন তার জ্ঞান ফিরল, ততক্ষণে ঈদের চাঁদ দেখা গেছে। আনন্দ নয়, একরাশ শূন্যতা আর হাহাকার নিয়ে বাড়ি ফিরলেন তিনি। ছয় মাসের হাড়ভাঙা খাটুনি, সব স্বপ্ন এক মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে গেল। শেখ আওয়ালের মুখে সব শুনে সখিনা বিবির কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
শহরের কোনো এক কোণে হয়তো এক দস্যুর মেয়ে সেই লাল জামাটা পরে হাসছে, কিন্তু সে জানে না—এই জামার লাল রঙের আড়ালে মিশে আছে এক অসহায় বাবার রক্তজল করা ঘাম আর এক ছোট্ট মেয়ের আর্তনাদ।