Dhaka বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে

বেসরকারি গ্রন্থাগার মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি ও সরকারের দায়িত্ব

  • মোঃ আলমগীর হোসেন
  • প্রকাশের সময় ০৬:৩৯:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
  • ৩৪ বার দেখা হয়েছে

একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু রাস্তাঘাট, সেতু, ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি হলো—জ্ঞানী, সচেতন, যুক্তিবাদী, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক। আর এমন নাগরিক তৈরির অন্যতম সহজ, নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান হলো গ্রন্থাগার। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের ফলে মানুষের হাতের মুঠোয় এখন বিপুল পরিমাণ তথ্য। কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য সবসময় জ্ঞানের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য এবং অসত্য তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহার যেমন জ্ঞান ও সৃজনশীলতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি যাচাই না করা তথ্য, বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিও এবং ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত করার চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। এই তথ্য-দূষণের সময়ে মানুষকে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান, যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও সত্যনিষ্ঠ তথ্যের কাছে ফিরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারি গ্রন্থাগারের পাশাপাশি বেসরকারি ও কমিউনিটি গ্রন্থাগারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে সরকারি গ্রন্থাগারের সুযোগ সীমিত, সেখানে একটি বেসরকারি গ্রন্থাগার হতে পারে জ্ঞানচর্চা, পাঠাভ্যাস, তথ্যসেবা, সামাজিক সচেতনতা এবং স্থানীয় উন্নয়নের অন্যতম কেন্দ্র।

বেসরকারি গ্রন্থাগার কেন গুরুত্বপূর্ণ: বেসরকারি গ্রন্থাগারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর শেকড় ও মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। এটি সাধারণত উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো প্রকল্প নয়; বরং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন, উদ্যোগ ও ভালোবাসা থেকে গড়ে ওঠে।
কোনো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি, একদল স্বপ্নবান তরুণ, প্রবাসী, সামাজিক সংগঠন কিংবা গ্রামের মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় একটি বেসরকারি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ফলে এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
একজন কৃষক তার ফসলের রোগবালাই সম্পর্কে জানতে গ্রন্থাগারে আসতে পারেন। একজন শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের বাইরে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। একজন চাকরিপ্রার্থী নিয়োগের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। একজন নারী স্বাস্থ্য, আইন, অধিকার ও জীবিকা সম্পর্কে জানতে পারেন। একজন তরুণ ক্যারিয়ার, প্রযুক্তি বা উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়ে তথ্য পেতে পারেন।
তাই আজকের দিনে বেসরকারি গ্রন্থাগারকে শুধু “বই রাখার ঘর” হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে ধীরে ধীরে একটি “কমিউনিটি নলেজ সেন্টার” বা স্থানীয় জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বেসরকারি গ্রন্থাগারের ভূমিকা: ডিজিটাল যুগে শিশু-কিশোর ও তরুণদের একটি বড় অংশ মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রিলস ও শর্ট ভিডিওতে দীর্ঘ সময় ব্যয় করছে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ; কিন্তু অনবরত স্ক্রল করার অভ্যাস কখনো গভীর পাঠের বিকল্প হতে পারে না।
বই পড়ার মাধ্যমে মানুষ শুধু তথ্য অর্জন করে না; তার মনোযোগ, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, কল্পনাশক্তি, যুক্তিবোধ ও সৃজনশীলতা বিকশিত হয়। তাই নতুন প্রজন্মকে বইয়ের সঙ্গে যুক্ত করা এখন একটি সামাজিক দায়িত্ব।
একটি সক্রিয় বেসরকারি গ্রন্থাগার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সেখানে আয়োজন করা যেতে পারে—
* সাপ্তাহিক পাঠচক্র;
* বই পর্যালোচনা ও আলোচনা;
* বিতর্ক প্রতিযোগিতা;
* কুইজ প্রতিযোগিতা;
* রচনা ও প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা;
* হাতের লেখা প্রতিযোগিতা;
* গল্প বলা ও গল্প শোনার আসর;
* লেখক ও পাঠকের মতবিনিময়;
* শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল কার্যক্রম।
এসব আয়োজন শিশু-কিশোর ও তরুণদের মোবাইলনির্ভর অবসর থেকে বই, জ্ঞান ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

সচেতন নাগরিক তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গ্রন্থাগার: একটি গ্রন্থাগার চাইলে একটি এলাকার সামাজিক ও নাগরিক সচেতনতার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এখানে শুধু গল্প-উপন্যাস কিংবা একাডেমিক বই নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অধিকার সংশ্লিষ্ট তথ্যও সহজলভ্য করা প্রয়োজন।
সামাজিক সচেতনতার ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী ও শিশুর অধিকার, যৌতুকবিরোধী সচেতনতা, মাদকবিরোধী আন্দোলন, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, মানবাধিকার এবং সামাজিক মূল্যবোধ বিষয়ে বই ও তথ্য রাখা যেতে পারে।
একইভাবে নাগরিক সচেতনতার জন্য আইন, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব, ভোটার সচেতনতা, তথ্য অধিকার, দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা এবং সরকারি সেবা সম্পর্কিত তথ্য সহজভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
ডিজিটাল যুগের প্রয়োজন বিবেচনায় নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার, সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা, গুজব শনাক্তকরণ, তথ্য যাচাই এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়েও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।
পোস্টার, লিফলেট, পুস্তিকা, আলোচনা সভা, উঠান বৈঠক, প্রশিক্ষণ ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে গ্রন্থাগার এই জ্ঞান মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে।

কৃষি, মৎস্য ও জীবিকায় গ্রন্থাগারের ভূমিকা: বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। একজন কৃষক যদি আধুনিক কৃষি পদ্ধতি, উন্নত বীজ, মাটি পরীক্ষা, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাতকরণ এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য পান, তাহলে তার উৎপাদন ও আয় উভয়ই বাড়তে পারে।
তাই ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ের বেসরকারি গ্রন্থাগারে কৃষি বিষয়ক বই, সরকারি কৃষি নির্দেশিকা, কৃষি প্রযুক্তি ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য এবং ডিজিটাল কৃষি তথ্যসেবা রাখা যেতে পারে।
একইভাবে মৎস্যচাষ, পশুপালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ফ্রিল্যান্সিং ও কর্মসংস্থান বিষয়ে তথ্য সহজলভ্য করা যেতে পারে।
এভাবে গ্রন্থাগার শুধু জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান থাকবে না; এটি স্থানীয় মানুষের জীবিকা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সহায়ক কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করতে পারবে।

ডিজিটাল যুগে গ্রন্থাগারের নতুন ভূমিকা: আজকের গ্রন্থাগার শুধু বইয়ের তাক ও পাঠকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সময়ের সঙ্গে গ্রন্থাগারের সেবার ধরনও পরিবর্তন করতে হবে। একটি প্রত্যন্ত এলাকার বেসরকারি গ্রন্থাগারে যদি কম্পিউটার, ইন্টারনেট, প্রিন্টার এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল রিসোর্স থাকে, তাহলে একজন শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, একজন চাকরিপ্রার্থী চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখতে পারে, একজন কৃষক কৃষি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি সেবা সম্পর্কে জানতে পারে। একটি কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগও কখনো কখনো একটি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে। তবে ডিজিটাল তথ্য ব্যবহারের পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাই ও ডিজিটাল সাক্ষরতা শেখানো অত্যন্ত জরুরি। কারণ তথ্য পাওয়া এবং সঠিক তথ্য শনাক্ত করা—দুটি ভিন্ন দক্ষতা।

গ্রন্থাগার হতে পারে তরুণদের নিরাপদ সামাজিক পরিসর: তরুণ সমাজ একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও গঠনমূলক বিনোদনের সুযোগ সীমিত হলে তরুণদের একটি অংশ মাদক, অপরাধ, সহিংসতা, অনলাইন আসক্তি কিংবা অন্যান্য নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
একটি সক্রিয় গ্রন্থাগার তরুণদের জন্য নিরাপদ ও ইতিবাচক সামাজিক পরিসর তৈরি করতে পারে। সেখানে তারা বই পড়বে, বিতর্ক করবে, ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা করবে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেবে, তথ্যপ্রযুক্তি শিখবে এবং স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত হবে।
ধীরে ধীরে একটি গ্রন্থাগার হয়ে উঠতে পারে একটি এলাকার জ্ঞান, সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক নেতৃত্ব তৈরির কেন্দ্র।

সরকারের দায়িত্ব কোথায়?  বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলো সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও অধিকাংশ গ্রন্থাগার নানা সমস্যায় পরিচালিত হয়। কোথাও পর্যাপ্ত বই নেই, কোথাও নিজস্ব ভবন নেই, কোথাও আসবাবপত্রের সংকট, আবার কোথাও প্রশিক্ষিত গ্রন্থাগারিক বা নিয়মিত পরিচালন ব্যয়ের ব্যবস্থা নেই। তাই সরকারকে বেসরকারি গ্রন্থাগারকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
১. সহজ নিবন্ধন ও সরকারি স্বীকৃতি: বেসরকারি গ্রন্থাগারের নিবন্ধন ও স্বীকৃতি প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ, অনলাইনভিত্তিক ও হয়রানিমুক্ত করা প্রয়োজন।
যেসব গ্রন্থাগার বাস্তবে নিয়মিত পাঠকসেবা ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাদের যথাযথ সরকারি স্বীকৃতি ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
২. নিয়মিত বই ও উপকরণ সহায়তা: শুধু এককালীন অনুদান দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়। যোগ্য ও সক্রিয় বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে নীতিমালার আওতায় নিয়মিত বই, আলমারি, টেবিল-চেয়ার, কম্পিউটার, প্রিন্টার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার গ্রন্থাগারগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি প্রয়োজন।
৩. গ্রন্থাগারিকদের দক্ষতা উন্নয়ন: আধুনিক গ্রন্থাগারিক শুধু বই সংরক্ষণ করবেন না; তাকে হতে হবে একজন তথ্য-সহায়ক ও কমিউনিটি জ্ঞানকর্মী।
সরকারি উদ্যোগে বেসরকারি গ্রন্থাগারিকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণের বিষয় হতে পারে—
* ডিজিটাল লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনা;
* তথ্য অনুসন্ধান ও তথ্য যাচাই;
* শিশু-কিশোরদের পাঠাভ্যাস উন্নয়ন;
* ডিজিটাল সাক্ষরতা;
* গুজব ও অপতথ্য শনাক্তকরণ;
* কমিউনিটি সচেতনতা;
* পাঠকসেবা ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা।
৪. সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগারের মধ্যে নেটওয়ার্ক: একই উপজেলা বা জেলার সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোর মধ্যে সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে।
বই বিনিময়, যৌথ পাঠচক্র, প্রশিক্ষণ, বইমেলা, আলোচনা সভা ও তথ্যসম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা করা সম্ভব।
৫. ডিজিটাল সংযোগ ও প্রযুক্তি সহায়তা: নির্বাচিত বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে ধাপে ধাপে কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল রিসোর্সের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
এতে একটি ইউনিয়ন পর্যায়ের গ্রন্থাগার ধীরে ধীরে স্থানীয় মানুষের ডিজিটাল জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
৬. স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করা: ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও অন্যান্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি গ্রন্থাগার উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সম্পদ, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং সরকারি সহায়তার সমন্বয়ে গ্রন্থাগারগুলোকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
৭. জাতীয় গ্রন্থাগার উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তি: দেশের গ্রন্থাগার উন্নয়ন পরিকল্পনায় বেসরকারি ও কমিউনিটি গ্রন্থাগারকে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
কারণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের কাছে জ্ঞান ও তথ্য পৌঁছে দিতে শুধু সরকারি গ্রন্থাগার যথেষ্ট নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক উদ্যোগের সমন্বিত শক্তিই পারে এই ঘাটতি পূরণ করতে।

একটি বাস্তবসম্মত মডেল: “ইউনিয়ন কমিউনিটি জ্ঞান কেন্দ্র”
প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি কার্যকর “ইউনিয়ন কমিউনিটি জ্ঞান কেন্দ্র” প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
এটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে পরিচালিত হতে পারে, তবে স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে এর মূল শক্তি।
একটি আদর্শ ইউনিয়ন জ্ঞান কেন্দ্রে থাকতে পারে—
১. বই ও পত্রিকা কর্নার: বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষের উপযোগী বই, সংবাদপত্র ও সাময়িকী।
২. ডিজিটাল সেবা ও প্রযুক্তি কর্নার: কম্পিউটার, ইন্টারনেট, অনলাইন শিক্ষা, সরকারি সেবা ও ডিজিটাল তথ্য।
৩. শিশু-কিশোর কর্নার: শিশুদের উপযোগী বই, গল্প, বিজ্ঞানচর্চা, কুইজ, পাঠচক্র ও সৃজনশীল কার্যক্রম।
৪. কৃষি, মৎস্য, দক্ষতা ও ক্যারিয়ার কর্নার: কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, কারিগরি শিক্ষা, চাকরি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে তথ্য।
৫. নারী, শিশু ও সামাজিক সচেতনতা কর্নার: নারী ও শিশুর অধিকার, আইন, স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদকবিরোধী সচেতনতা ও মানবাধিকার বিষয়ক তথ্য।
এ ধরনের একটি কেন্দ্র একটি ইউনিয়নের শিক্ষা, তথ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নের বহুমুখী কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে।

শুধু অনুদান নয়, প্রয়োজন অংশীদারিত্ব: বেসরকারি গ্রন্থাগারের উন্নয়নে শুধু এককালীন অনুদান দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর অংশীদারিত্ব। সরকার দিতে পারে নীতিগত, কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। স্থানীয় জনগণ দিতে পারে স্বেচ্ছাশ্রম ও সামাজিক সহযোগিতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দিতে পারে পাঠক ও স্বেচ্ছাসেবক। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতার (CSR) আওতায় বই, কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও অন্যান্য উপকরণ দিতে পারে। অর্থাৎ— সরকার + স্থানীয় জনগণ + শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান + বেসরকারি খাত + সামাজিক সংগঠন। এই পাঁচ পক্ষের সম্মিলিত অংশীদারিত্বে গড়ে উঠতে পারে একটি শক্তিশালী গ্রন্থাগার আন্দোলন।

একটি রাস্তা মানুষকে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে নিয়ে যায়; কিন্তু একটি বই মানুষকে অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যেতে পারে। একটি ভবন হয়তো একটি প্রজন্মকে আশ্রয় দিতে পারে, কিন্তু একটি গ্রন্থাগার একটি প্রজন্মের চিন্তা ও ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। আজ তাই বেসরকারি গ্রন্থাগারকে করুণা বা দয়ার চোখে দেখার সময় নয়। এটিকে দেখতে হবে জাতীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ ও অংশীদার হিসেবে। আমরা যদি প্রতিটি ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কার্যকর গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করতে পারি, যদি সেখানে বইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল তথ্য, কৃষি ও জীবিকার জ্ঞান, নাগরিক অধিকার, শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল বিকাশ এবং সামাজিক সচেতনতার সুযোগ তৈরি করতে পারি, তাহলে একটি গ্রন্থাগার শুধু পাঠক তৈরি করবে না—তৈরি করবে সচেতন নাগরিক, দক্ষ তরুণ, দায়িত্বশীল পরিবার এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। সরকার, জনগণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, সামাজিক সংগঠন ও বেসরকারি খাত যদি একসঙ্গে এগিয়ে আসে, তাহলে বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলো বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে— একটি বই একজন মানুষের চিন্তা বদলাতে পারে, আর একটি গ্রন্থাগার একটি প্রজন্মের চিন্তা বদলে দিতে পারে। সুতরাং, বেসরকারি গ্রন্থাগারকে শুধু একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে নয়, জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার এখনই সময়।

  • লেখক: গণমামাধ্যম ব্যক্তিত্ব
সম্পর্কিত

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে

বেসরকারি গ্রন্থাগার মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি ও সরকারের দায়িত্ব

প্রকাশের সময় ০৬:৩৯:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু রাস্তাঘাট, সেতু, ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি হলো—জ্ঞানী, সচেতন, যুক্তিবাদী, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক। আর এমন নাগরিক তৈরির অন্যতম সহজ, নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান হলো গ্রন্থাগার। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের ফলে মানুষের হাতের মুঠোয় এখন বিপুল পরিমাণ তথ্য। কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য সবসময় জ্ঞানের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য এবং অসত্য তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহার যেমন জ্ঞান ও সৃজনশীলতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি যাচাই না করা তথ্য, বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিও এবং ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত করার চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। এই তথ্য-দূষণের সময়ে মানুষকে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান, যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও সত্যনিষ্ঠ তথ্যের কাছে ফিরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারি গ্রন্থাগারের পাশাপাশি বেসরকারি ও কমিউনিটি গ্রন্থাগারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে সরকারি গ্রন্থাগারের সুযোগ সীমিত, সেখানে একটি বেসরকারি গ্রন্থাগার হতে পারে জ্ঞানচর্চা, পাঠাভ্যাস, তথ্যসেবা, সামাজিক সচেতনতা এবং স্থানীয় উন্নয়নের অন্যতম কেন্দ্র।

বেসরকারি গ্রন্থাগার কেন গুরুত্বপূর্ণ: বেসরকারি গ্রন্থাগারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর শেকড় ও মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। এটি সাধারণত উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো প্রকল্প নয়; বরং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন, উদ্যোগ ও ভালোবাসা থেকে গড়ে ওঠে।
কোনো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি, একদল স্বপ্নবান তরুণ, প্রবাসী, সামাজিক সংগঠন কিংবা গ্রামের মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় একটি বেসরকারি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ফলে এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
একজন কৃষক তার ফসলের রোগবালাই সম্পর্কে জানতে গ্রন্থাগারে আসতে পারেন। একজন শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের বাইরে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। একজন চাকরিপ্রার্থী নিয়োগের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। একজন নারী স্বাস্থ্য, আইন, অধিকার ও জীবিকা সম্পর্কে জানতে পারেন। একজন তরুণ ক্যারিয়ার, প্রযুক্তি বা উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়ে তথ্য পেতে পারেন।
তাই আজকের দিনে বেসরকারি গ্রন্থাগারকে শুধু “বই রাখার ঘর” হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে ধীরে ধীরে একটি “কমিউনিটি নলেজ সেন্টার” বা স্থানীয় জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বেসরকারি গ্রন্থাগারের ভূমিকা: ডিজিটাল যুগে শিশু-কিশোর ও তরুণদের একটি বড় অংশ মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রিলস ও শর্ট ভিডিওতে দীর্ঘ সময় ব্যয় করছে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ; কিন্তু অনবরত স্ক্রল করার অভ্যাস কখনো গভীর পাঠের বিকল্প হতে পারে না।
বই পড়ার মাধ্যমে মানুষ শুধু তথ্য অর্জন করে না; তার মনোযোগ, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, কল্পনাশক্তি, যুক্তিবোধ ও সৃজনশীলতা বিকশিত হয়। তাই নতুন প্রজন্মকে বইয়ের সঙ্গে যুক্ত করা এখন একটি সামাজিক দায়িত্ব।
একটি সক্রিয় বেসরকারি গ্রন্থাগার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সেখানে আয়োজন করা যেতে পারে—
* সাপ্তাহিক পাঠচক্র;
* বই পর্যালোচনা ও আলোচনা;
* বিতর্ক প্রতিযোগিতা;
* কুইজ প্রতিযোগিতা;
* রচনা ও প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা;
* হাতের লেখা প্রতিযোগিতা;
* গল্প বলা ও গল্প শোনার আসর;
* লেখক ও পাঠকের মতবিনিময়;
* শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল কার্যক্রম।
এসব আয়োজন শিশু-কিশোর ও তরুণদের মোবাইলনির্ভর অবসর থেকে বই, জ্ঞান ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

সচেতন নাগরিক তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গ্রন্থাগার: একটি গ্রন্থাগার চাইলে একটি এলাকার সামাজিক ও নাগরিক সচেতনতার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এখানে শুধু গল্প-উপন্যাস কিংবা একাডেমিক বই নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অধিকার সংশ্লিষ্ট তথ্যও সহজলভ্য করা প্রয়োজন।
সামাজিক সচেতনতার ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী ও শিশুর অধিকার, যৌতুকবিরোধী সচেতনতা, মাদকবিরোধী আন্দোলন, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, মানবাধিকার এবং সামাজিক মূল্যবোধ বিষয়ে বই ও তথ্য রাখা যেতে পারে।
একইভাবে নাগরিক সচেতনতার জন্য আইন, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব, ভোটার সচেতনতা, তথ্য অধিকার, দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা এবং সরকারি সেবা সম্পর্কিত তথ্য সহজভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
ডিজিটাল যুগের প্রয়োজন বিবেচনায় নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার, সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা, গুজব শনাক্তকরণ, তথ্য যাচাই এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়েও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।
পোস্টার, লিফলেট, পুস্তিকা, আলোচনা সভা, উঠান বৈঠক, প্রশিক্ষণ ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে গ্রন্থাগার এই জ্ঞান মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে।

কৃষি, মৎস্য ও জীবিকায় গ্রন্থাগারের ভূমিকা: বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। একজন কৃষক যদি আধুনিক কৃষি পদ্ধতি, উন্নত বীজ, মাটি পরীক্ষা, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাতকরণ এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য পান, তাহলে তার উৎপাদন ও আয় উভয়ই বাড়তে পারে।
তাই ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ের বেসরকারি গ্রন্থাগারে কৃষি বিষয়ক বই, সরকারি কৃষি নির্দেশিকা, কৃষি প্রযুক্তি ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য এবং ডিজিটাল কৃষি তথ্যসেবা রাখা যেতে পারে।
একইভাবে মৎস্যচাষ, পশুপালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ফ্রিল্যান্সিং ও কর্মসংস্থান বিষয়ে তথ্য সহজলভ্য করা যেতে পারে।
এভাবে গ্রন্থাগার শুধু জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান থাকবে না; এটি স্থানীয় মানুষের জীবিকা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সহায়ক কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করতে পারবে।

ডিজিটাল যুগে গ্রন্থাগারের নতুন ভূমিকা: আজকের গ্রন্থাগার শুধু বইয়ের তাক ও পাঠকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সময়ের সঙ্গে গ্রন্থাগারের সেবার ধরনও পরিবর্তন করতে হবে। একটি প্রত্যন্ত এলাকার বেসরকারি গ্রন্থাগারে যদি কম্পিউটার, ইন্টারনেট, প্রিন্টার এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল রিসোর্স থাকে, তাহলে একজন শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, একজন চাকরিপ্রার্থী চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখতে পারে, একজন কৃষক কৃষি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি সেবা সম্পর্কে জানতে পারে। একটি কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগও কখনো কখনো একটি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে। তবে ডিজিটাল তথ্য ব্যবহারের পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাই ও ডিজিটাল সাক্ষরতা শেখানো অত্যন্ত জরুরি। কারণ তথ্য পাওয়া এবং সঠিক তথ্য শনাক্ত করা—দুটি ভিন্ন দক্ষতা।

গ্রন্থাগার হতে পারে তরুণদের নিরাপদ সামাজিক পরিসর: তরুণ সমাজ একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও গঠনমূলক বিনোদনের সুযোগ সীমিত হলে তরুণদের একটি অংশ মাদক, অপরাধ, সহিংসতা, অনলাইন আসক্তি কিংবা অন্যান্য নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
একটি সক্রিয় গ্রন্থাগার তরুণদের জন্য নিরাপদ ও ইতিবাচক সামাজিক পরিসর তৈরি করতে পারে। সেখানে তারা বই পড়বে, বিতর্ক করবে, ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা করবে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেবে, তথ্যপ্রযুক্তি শিখবে এবং স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত হবে।
ধীরে ধীরে একটি গ্রন্থাগার হয়ে উঠতে পারে একটি এলাকার জ্ঞান, সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক নেতৃত্ব তৈরির কেন্দ্র।

সরকারের দায়িত্ব কোথায়?  বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলো সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও অধিকাংশ গ্রন্থাগার নানা সমস্যায় পরিচালিত হয়। কোথাও পর্যাপ্ত বই নেই, কোথাও নিজস্ব ভবন নেই, কোথাও আসবাবপত্রের সংকট, আবার কোথাও প্রশিক্ষিত গ্রন্থাগারিক বা নিয়মিত পরিচালন ব্যয়ের ব্যবস্থা নেই। তাই সরকারকে বেসরকারি গ্রন্থাগারকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
১. সহজ নিবন্ধন ও সরকারি স্বীকৃতি: বেসরকারি গ্রন্থাগারের নিবন্ধন ও স্বীকৃতি প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ, অনলাইনভিত্তিক ও হয়রানিমুক্ত করা প্রয়োজন।
যেসব গ্রন্থাগার বাস্তবে নিয়মিত পাঠকসেবা ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাদের যথাযথ সরকারি স্বীকৃতি ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
২. নিয়মিত বই ও উপকরণ সহায়তা: শুধু এককালীন অনুদান দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়। যোগ্য ও সক্রিয় বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে নীতিমালার আওতায় নিয়মিত বই, আলমারি, টেবিল-চেয়ার, কম্পিউটার, প্রিন্টার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার গ্রন্থাগারগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি প্রয়োজন।
৩. গ্রন্থাগারিকদের দক্ষতা উন্নয়ন: আধুনিক গ্রন্থাগারিক শুধু বই সংরক্ষণ করবেন না; তাকে হতে হবে একজন তথ্য-সহায়ক ও কমিউনিটি জ্ঞানকর্মী।
সরকারি উদ্যোগে বেসরকারি গ্রন্থাগারিকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণের বিষয় হতে পারে—
* ডিজিটাল লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনা;
* তথ্য অনুসন্ধান ও তথ্য যাচাই;
* শিশু-কিশোরদের পাঠাভ্যাস উন্নয়ন;
* ডিজিটাল সাক্ষরতা;
* গুজব ও অপতথ্য শনাক্তকরণ;
* কমিউনিটি সচেতনতা;
* পাঠকসেবা ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা।
৪. সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগারের মধ্যে নেটওয়ার্ক: একই উপজেলা বা জেলার সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোর মধ্যে সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে।
বই বিনিময়, যৌথ পাঠচক্র, প্রশিক্ষণ, বইমেলা, আলোচনা সভা ও তথ্যসম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা করা সম্ভব।
৫. ডিজিটাল সংযোগ ও প্রযুক্তি সহায়তা: নির্বাচিত বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে ধাপে ধাপে কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল রিসোর্সের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
এতে একটি ইউনিয়ন পর্যায়ের গ্রন্থাগার ধীরে ধীরে স্থানীয় মানুষের ডিজিটাল জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
৬. স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করা: ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও অন্যান্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি গ্রন্থাগার উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সম্পদ, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং সরকারি সহায়তার সমন্বয়ে গ্রন্থাগারগুলোকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
৭. জাতীয় গ্রন্থাগার উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তি: দেশের গ্রন্থাগার উন্নয়ন পরিকল্পনায় বেসরকারি ও কমিউনিটি গ্রন্থাগারকে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
কারণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের কাছে জ্ঞান ও তথ্য পৌঁছে দিতে শুধু সরকারি গ্রন্থাগার যথেষ্ট নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক উদ্যোগের সমন্বিত শক্তিই পারে এই ঘাটতি পূরণ করতে।

একটি বাস্তবসম্মত মডেল: “ইউনিয়ন কমিউনিটি জ্ঞান কেন্দ্র”
প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি কার্যকর “ইউনিয়ন কমিউনিটি জ্ঞান কেন্দ্র” প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
এটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে পরিচালিত হতে পারে, তবে স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে এর মূল শক্তি।
একটি আদর্শ ইউনিয়ন জ্ঞান কেন্দ্রে থাকতে পারে—
১. বই ও পত্রিকা কর্নার: বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষের উপযোগী বই, সংবাদপত্র ও সাময়িকী।
২. ডিজিটাল সেবা ও প্রযুক্তি কর্নার: কম্পিউটার, ইন্টারনেট, অনলাইন শিক্ষা, সরকারি সেবা ও ডিজিটাল তথ্য।
৩. শিশু-কিশোর কর্নার: শিশুদের উপযোগী বই, গল্প, বিজ্ঞানচর্চা, কুইজ, পাঠচক্র ও সৃজনশীল কার্যক্রম।
৪. কৃষি, মৎস্য, দক্ষতা ও ক্যারিয়ার কর্নার: কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, কারিগরি শিক্ষা, চাকরি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে তথ্য।
৫. নারী, শিশু ও সামাজিক সচেতনতা কর্নার: নারী ও শিশুর অধিকার, আইন, স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদকবিরোধী সচেতনতা ও মানবাধিকার বিষয়ক তথ্য।
এ ধরনের একটি কেন্দ্র একটি ইউনিয়নের শিক্ষা, তথ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নের বহুমুখী কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে।

শুধু অনুদান নয়, প্রয়োজন অংশীদারিত্ব: বেসরকারি গ্রন্থাগারের উন্নয়নে শুধু এককালীন অনুদান দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর অংশীদারিত্ব। সরকার দিতে পারে নীতিগত, কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। স্থানীয় জনগণ দিতে পারে স্বেচ্ছাশ্রম ও সামাজিক সহযোগিতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দিতে পারে পাঠক ও স্বেচ্ছাসেবক। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতার (CSR) আওতায় বই, কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও অন্যান্য উপকরণ দিতে পারে। অর্থাৎ— সরকার + স্থানীয় জনগণ + শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান + বেসরকারি খাত + সামাজিক সংগঠন। এই পাঁচ পক্ষের সম্মিলিত অংশীদারিত্বে গড়ে উঠতে পারে একটি শক্তিশালী গ্রন্থাগার আন্দোলন।

একটি রাস্তা মানুষকে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে নিয়ে যায়; কিন্তু একটি বই মানুষকে অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যেতে পারে। একটি ভবন হয়তো একটি প্রজন্মকে আশ্রয় দিতে পারে, কিন্তু একটি গ্রন্থাগার একটি প্রজন্মের চিন্তা ও ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। আজ তাই বেসরকারি গ্রন্থাগারকে করুণা বা দয়ার চোখে দেখার সময় নয়। এটিকে দেখতে হবে জাতীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ ও অংশীদার হিসেবে। আমরা যদি প্রতিটি ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কার্যকর গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করতে পারি, যদি সেখানে বইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল তথ্য, কৃষি ও জীবিকার জ্ঞান, নাগরিক অধিকার, শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল বিকাশ এবং সামাজিক সচেতনতার সুযোগ তৈরি করতে পারি, তাহলে একটি গ্রন্থাগার শুধু পাঠক তৈরি করবে না—তৈরি করবে সচেতন নাগরিক, দক্ষ তরুণ, দায়িত্বশীল পরিবার এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। সরকার, জনগণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, সামাজিক সংগঠন ও বেসরকারি খাত যদি একসঙ্গে এগিয়ে আসে, তাহলে বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলো বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে— একটি বই একজন মানুষের চিন্তা বদলাতে পারে, আর একটি গ্রন্থাগার একটি প্রজন্মের চিন্তা বদলে দিতে পারে। সুতরাং, বেসরকারি গ্রন্থাগারকে শুধু একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে নয়, জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার এখনই সময়।

  • লেখক: গণমামাধ্যম ব্যক্তিত্ব