Dhaka রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আত্মসংযম ও সংগঠনে আনত হই

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে একটি নতুন আর্থসামাজিক পরিবেশে দেশ ও জাতির সামনে স্বাগত মাহে রমজান। সিয়াম সাধনায় সবার জীবন শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক-আধ্যাত্মিক জীবনযাপনে অভূতপূর্ব মর্যাদা ও কৃচ্ছ্রতা সাধনের দ্বারা অনির্বচনীয় শৃঙ্খলামণ্ডিত হয়ে ওঠে। সুতরাং এ মাসের মর্যাদা রক্ষা করে চলা ও এর তাৎপর্য অনুধাবন অর্জনের জন্য বেশ কয়েকটি উপায় উপলব্ধির অবকাশ রয়েছে। এর মধ্যে এ মাসে ‘মানুষের দিশারি এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী’ হিসেবে পবিত্র কুরআন শুধু পাঠ নয়; জীবনযাপনে তা অনুসরণের চেষ্টা করা, রোজা রেখে খাদ্যপানীয় গ্রহণে শুধু বিরত থাকা নয়, এর বাস্তবিক অবস্থা অনুধাবনের চেষ্টা করা, কর্মভাবনা ও বাস্তবায়নে কৃচ্ছ্রতা সাধন, আত্মশুদ্ধি, অন্যের দুঃখ-কষ্টের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ এবং সহানুভূতি পোষণ করা, দেশ পরিচালনায়, ব্যবসাবাণিজ্যে বিনিয়োগে মানবকল্যাণকে প্রাধান্য দেয়া, সব বিপদাপদ মোকাবেলায় ধৈর্য ধারণ করা সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

এই রমজান মাসেই ২৭ তারিখে (৬১০ সালের ২৮ জুলাই, সোমবার) বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর কাছে প্রত্যাদেশ (ওহি) প্রেরিত হয়, ‘পাঠ করো তোমার প্রতিপালকের নামে’, যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক’ হতে। পাঠ করো। আর তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন- শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না।’ (৯৬তম সূরা, আলাক আয়াত ১-৫) এটিই আল কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ ওহি এবং এটি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, কলমের সাহায্যে শিক্ষা দেয়ার নির্দেশ আল কুরআনের মাধ্যমে মানবজাতির প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রথম ও প্রধান নির্দেশ। মাহে রমজানে আসা এই নির্দেশনা অন্ধকার হতে আলোর পথে আসার এবং অজ্ঞানতার বেড়াজাল পার হওয়ার অনুপ্রেরণা। আল কুরআন মানুষের দিশারি এবং এর নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে মানুষ পেতে পারে সঠিক ও কল্যাণপ্রদ জীবনযাপনে যাবতীয় পরামর্শ ও প্রেরণা। ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শংকর দয়াল শর্মা কুরআনকে অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ অনুধাবন-অনুসরণীয় ঐশী কিতাব হিসেবে এর থেকে নির্দেশনা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মুসলমানরা কুরআনের তাৎপর্য অনুধাবনে সক্ষম হলে তারা দিশেহারা হবে না। মানসম্মত শিক্ষাদানের তাগিদ এখানেই। দেশের নতুন শিক্ষামন্ত্রী যেমনটি বলেছেন, সবাইকে পড়ার টেবিলে বিদ্যায়তনে ফিরতে হবে, শিক্ষকদেরও বেশি বেশি করে হোমওয়ার্ক করতে হবে, শিক্ষাদানে যত্নবান হতে হবে। এভাবে আত্মসংগঠনে ব্রতী হতে হবে।

সংযম ও কৃচ্ছ্রতা সাধনের মাসেই লক্ষ করা যাচ্ছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মহড়া চলছে, চাহিদা ও সরবরাহে সঙ্কট সৃষ্টি করে অধিক লাভবান হয়ে সারা বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার নেশায় যেন মেতে উঠেছেন পণ্য ও সেবা সরবরাহকারী ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন দফতরের সেবকমণ্ডলী। নির্ভেজাল এবং পারস্পরিক কল্যাণ ও সমঝোতার ভিত্তিতে পরিচালিত ব্যবসাবাণিজ্যকে গুরুত্বসহকারে নিয়ে ব্যবসাবাণিজ্যে বিনিয়োগ করাই কল্যাণকর। আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘সেসব লোক, যাদেরকে ব্যবসাবাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে এবং সালাত কায়েম ও জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না, তারা ভয় করে সেদিনকে যেদিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।’ (সূরা নূর-৩৭) ব্যবসাবাণিজ্য ও পারস্পরিক লেনদেনে স্বচ্ছতা, বৈধতা ও সুষ্ঠুতা যেসব মৌল নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ১. পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার মনোভাব। মুনাফার ক্ষেত্রে একজনের বেশি মুনাফা আর অপরজনের বেশি লোকসানের মনোভাব অবশ্যই পরিত্যাজ্য। ২. পারস্পরিক স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি। জোরপূর্বক সম্মতি আদায় বৈধ বলে গণ্য হবে না। ৩. কোনো প্রকার প্রতারণা, আত্মসাৎ, ক্ষতি ও পাপাচারের উদ্দেশ্য থাকতে পারবে না। যেসব বস্তুর কারবার হারাম, সেসবের ব্যবসা করা যাবে না।

দেশ ও জাতির অর্থনৈতিক এই সঙ্কটময় মুহূর্তে এটি সবার উপলব্ধির আওতায় আসা আবশ্যক যে, যে ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগের দ্বারা কল্যাণকর পণ্য বা সামগ্রী উৎপন্ন তথা বিপণন হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, দেশজ সম্পদ উৎপাদনে গঠনমূলক অবদান রাখতে সক্ষম হয় সে ব্যবসাবাণিজ্যকে কল্যাণকর মানতে হবে। ঠিক এ সময় অপ্রয়োজনীয় বাড়তি ব্যয় পরিহার অপরিহার্য। অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ বলে একটি কথা প্রচলিত আছে। দেখা যায় তোষামোদি ও চাটুকারিতায় অনেকেই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে নিজের দলের কিংবা সবার জন্য ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন পরিবর্তন প্রেক্ষাপট দেখা যায় দলীয় বাহিনী, চাটুকার, বর্ণচোরা, আত্মীয়বর্গ ও চাঁদাবাজ খয়ের খাঁ’রাই জাতীয় নেতৃত্বকে ডুবিয়েছে। এসব ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করেই সবাইকে সম্পৃক্ত করে দেশ রাজনীতি তথা সমাজ সংসার অর্থনীতির সংস্কার সাধনে সাধনার প্রয়োজন হবে।

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অভিনন্দন জানাতে, মন্ত্রী-মিনিস্টারদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বড় বড় কোম্পনি, সরকারি সংস্থা ও ব্যাংকের বিশাল আকারের বিজ্ঞাপন, ফুলেল শুভেচ্ছায় মাত্রারিক্তি খরচের টাকা আয় ও ব্যয় ব্যাপারে সংযম ও কৃচ্ছ্রতা সাধনের সুযোগ খুঁজতে হবে। ওই টাকা সরকারের দারিদ্র্যবিমোচন তহবিলে যেতে পারে।

‘সবর’ বা ধৈর্য অবলম্বন মাহে রমজানে সিয়াম সাধনার একটি মহান শিক্ষা। আল কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘এবং আমি তোমাদিগকে ভয়, ক্ষুধা এবং ধনসম্পদ, জীবন ও ফলফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা অবশ্য পরীক্ষা করব। তুমি (হে রাসূল) শুভ সংবাদ দাও ধৈর্যশীলদেরকে।’ ভূরাজনৈতিক ভায়রা-ভাইদের ব্যাপক অপপ্রচার অপতৎপরতায় শুধু বাংলাদেশ কেন গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতে সবার মন বিষাক্ত হয়ে উঠছে । এ সঙ্কটময়কালে বাংলাদেশের সবাইকে আল কুরআনের সূরা আল বাকারার ১৫৩ আয়াতে ‘ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে প্রার্থনা’ করার পরামর্শ দিয়ে বলা হয়, ‘আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন’। আরবি ‘সবর’ শব্দের বহুমাত্রিক অর্থ ও তাৎপর্য রয়েছে। সবরের ব্যবহারিক অর্থ হতে পারে- ১. ধীরস্থিরতা অবলম্বন, তাড়াহুড়ো না করা; ২. অব্যাহত অধ্যবসায়, একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা, দৃঢ়তা, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকা; ৩. কোনো তাৎক্ষণিক কিংবা হঠাৎ কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা না করা; ৪. বিপদাপদে পরাজয় কিংবা বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতেও বিপদ ও বিসংবাদকে ঠাণ্ডামাথায় সহজে ও সানন্দে গ্রহণ করা অর্থাৎ- ‘ওই সব পরিস্থিতিতে শোকাভিভূত কিংবা ক্রোধান্বিত কিংবা হঠকারী না হওয়া।’ বলাবাহুল্য ‘সবর’ মানবিক গুণাবলির মধ্যে শ্রেষ্ঠতর এবং এর মানসিক ও আত্মিক তাৎপর্য অপরিসীম। সবরের গুণ অর্জন স্বাভাবিকভাবেই সহজ নয়। আর এ কারণে এটি অর্জনেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। (সূরা বাকারাহ-২৫০)।

ভয়, ক্ষুধা, ধন-মালের, ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নানান দুর্ঘটনা উদ্ভূত বলে প্রতীয়মান হয়। সন্দেহ নেই এতে মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটে- ব্যক্তি তথা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যেকোনো সময় বিভিন্ন দুর্ভোগ ও দুর্বিপাক আপতিত হতে পারে। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, প্লাবন ইত্যাদি যখন গোটা সমাজের ওপর দুর্দশা ও বিপদ নিয়ে আসে তখন গোটা সমাজ তথা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে তা ধৈর্যের সাথেই মোকাবেলা করা উচিত। ধীরস্থিরভাবে যেকোনো বিপদ অতিক্রম করার লক্ষ্যে সার্বিক প্রচেষ্টা চালাতে হয়। সূরা ‘আসর’-এ স্পষ্টতই উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।’ (আয়াত : ২-৩) বিপদে অন্যের সহযোগিতার বিষয়টিও এখানে বিশেষ তাৎপর্যবহ। বিপদগ্রস্ত সমাজের সবাই ধৈর্যধারণেই কেবল সীমাবদ্ধ থাকবে না পরস্পর সহযোগিতা অর্থাৎ- বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির বৈষয়িক সাহায্যে এগিয়ে আসাও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি পরিস্থিতিতে জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং পারস্পরিক সাহায্য আদান প্রদানে ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে ওই প্রয়াসে উপযোগী নেতৃত্ব দান ও সফল কর্মসম্পাদনে সহায়তা করা বাঞ্ছনীয়। এরূপ ভূমিকা পালনে কোনো বিপর্যয়ই কোনো সমাজকে কাবু করতে পারে না।

মানবিক অধিকারের স্বীকৃতি, সাম্য এবং সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে মাহে রমজানের মহান শিক্ষায় এ সত্য প্রতিফলিত হয়, কোনো মানুষ অপর মানুষকে যেন নীচ ও ঘৃণ্য মনে না করে; বরং নিজের বংশগত মর্যাদা, আঞ্চলিক স্বার্থ, দলমত, পরিবার, অথবা ধনসম্পদ ইত্যাদির ভিত্তিতে গর্ব না করে। কেননা, এগুলো প্রকৃত গর্বের বিষয় নয়। এহেন গর্বের কারণে পারস্পরিক ঘৃণা ও বিদ্বেষের ভিত্তি স্থাপিত হয়। ইসলামের শিক্ষা হলো সব মানুষ একই পিতা-মাতার সন্তান হওয়ার দিক দিয়ে ভাই ভাই এবং পরিবার, গোত্র অথবা ধনদৌলতের দিক দিয়ে যে প্রভেদ আল্লাহ তায়ালা রেখেছেন, তা গর্বের জন্য নয়, পারস্পরিক পরিচয়ের জন্য।

আল কুরআনে ব্যক্তিদের পারস্পরিক হক, আদব ও সামাজিক রীতিনীতি নির্দেশ করা হয়েছে, ‘তাদের অধিকাংশ অনুমানেরই অনুসরণ করে, সত্যের পরিবর্তে অনুমান কোনো কাজে আসে না। তারা যা করে আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’ (সূরা ইউনুস-৩৬) ‘তোমরা একে-অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে-অপরকে মন্দ নামে ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নামে ডাকা গর্হিত কাজ। হে মুমিনরা! তোমরা বহুবিধ অনুমান করা থেকে দূরে থাকো, কারণ অনুমান কোনো ক্ষেত্রে পাপ এবং তোমরা একে-অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে-অপরের পশ্চাতে নিন্দা করো না।… (সূরা হুজুরাত : ১১-১২) আয়াতগুলোতে- ১. অনুমান করা; ২. কারো গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করা; ৩. কাউকে ঠাট্টা ও উপহাস করা; ৪. কাউকে দোষারোপ করা এবং ৫. কারো পশ্চাতে নিন্দা করা বা গিবতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনুমান বা ধারণা করা থেকে বিরত থাকার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- কতক ধারণা পাপ। প্রত্যেক ধারণাই পাপ নয়। অতএব কোন ধারণা পাপ তা জানা জরুরি সাব্যস্ত করতেই সাবধানতা অবলম্বনের এ নির্দেশ। কুরতবি তার তাফসিরে লিখেছেন, নিষিদ্ধ ধারণা বলতে এ ক্ষেত্রে যেমন অপবাদ বোঝানো হয়েছে অর্থাৎ- কোনো ব্যক্তির প্রতি শক্তিশালী প্রমাণ ব্যতিরেকে কোনো দোষারোপ করা।

লেখক : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
প্রকাশের সময় ০৫:৪৭:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
৯১ পড়া হয়েছে

আত্মসংযম ও সংগঠনে আনত হই

প্রকাশের সময় ০৫:৪৭:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে একটি নতুন আর্থসামাজিক পরিবেশে দেশ ও জাতির সামনে স্বাগত মাহে রমজান। সিয়াম সাধনায় সবার জীবন শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক-আধ্যাত্মিক জীবনযাপনে অভূতপূর্ব মর্যাদা ও কৃচ্ছ্রতা সাধনের দ্বারা অনির্বচনীয় শৃঙ্খলামণ্ডিত হয়ে ওঠে। সুতরাং এ মাসের মর্যাদা রক্ষা করে চলা ও এর তাৎপর্য অনুধাবন অর্জনের জন্য বেশ কয়েকটি উপায় উপলব্ধির অবকাশ রয়েছে। এর মধ্যে এ মাসে ‘মানুষের দিশারি এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী’ হিসেবে পবিত্র কুরআন শুধু পাঠ নয়; জীবনযাপনে তা অনুসরণের চেষ্টা করা, রোজা রেখে খাদ্যপানীয় গ্রহণে শুধু বিরত থাকা নয়, এর বাস্তবিক অবস্থা অনুধাবনের চেষ্টা করা, কর্মভাবনা ও বাস্তবায়নে কৃচ্ছ্রতা সাধন, আত্মশুদ্ধি, অন্যের দুঃখ-কষ্টের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ এবং সহানুভূতি পোষণ করা, দেশ পরিচালনায়, ব্যবসাবাণিজ্যে বিনিয়োগে মানবকল্যাণকে প্রাধান্য দেয়া, সব বিপদাপদ মোকাবেলায় ধৈর্য ধারণ করা সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

এই রমজান মাসেই ২৭ তারিখে (৬১০ সালের ২৮ জুলাই, সোমবার) বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর কাছে প্রত্যাদেশ (ওহি) প্রেরিত হয়, ‘পাঠ করো তোমার প্রতিপালকের নামে’, যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক’ হতে। পাঠ করো। আর তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন- শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না।’ (৯৬তম সূরা, আলাক আয়াত ১-৫) এটিই আল কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ ওহি এবং এটি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, কলমের সাহায্যে শিক্ষা দেয়ার নির্দেশ আল কুরআনের মাধ্যমে মানবজাতির প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রথম ও প্রধান নির্দেশ। মাহে রমজানে আসা এই নির্দেশনা অন্ধকার হতে আলোর পথে আসার এবং অজ্ঞানতার বেড়াজাল পার হওয়ার অনুপ্রেরণা। আল কুরআন মানুষের দিশারি এবং এর নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে মানুষ পেতে পারে সঠিক ও কল্যাণপ্রদ জীবনযাপনে যাবতীয় পরামর্শ ও প্রেরণা। ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শংকর দয়াল শর্মা কুরআনকে অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ অনুধাবন-অনুসরণীয় ঐশী কিতাব হিসেবে এর থেকে নির্দেশনা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মুসলমানরা কুরআনের তাৎপর্য অনুধাবনে সক্ষম হলে তারা দিশেহারা হবে না। মানসম্মত শিক্ষাদানের তাগিদ এখানেই। দেশের নতুন শিক্ষামন্ত্রী যেমনটি বলেছেন, সবাইকে পড়ার টেবিলে বিদ্যায়তনে ফিরতে হবে, শিক্ষকদেরও বেশি বেশি করে হোমওয়ার্ক করতে হবে, শিক্ষাদানে যত্নবান হতে হবে। এভাবে আত্মসংগঠনে ব্রতী হতে হবে।

সংযম ও কৃচ্ছ্রতা সাধনের মাসেই লক্ষ করা যাচ্ছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মহড়া চলছে, চাহিদা ও সরবরাহে সঙ্কট সৃষ্টি করে অধিক লাভবান হয়ে সারা বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার নেশায় যেন মেতে উঠেছেন পণ্য ও সেবা সরবরাহকারী ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন দফতরের সেবকমণ্ডলী। নির্ভেজাল এবং পারস্পরিক কল্যাণ ও সমঝোতার ভিত্তিতে পরিচালিত ব্যবসাবাণিজ্যকে গুরুত্বসহকারে নিয়ে ব্যবসাবাণিজ্যে বিনিয়োগ করাই কল্যাণকর। আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘সেসব লোক, যাদেরকে ব্যবসাবাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে এবং সালাত কায়েম ও জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না, তারা ভয় করে সেদিনকে যেদিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।’ (সূরা নূর-৩৭) ব্যবসাবাণিজ্য ও পারস্পরিক লেনদেনে স্বচ্ছতা, বৈধতা ও সুষ্ঠুতা যেসব মৌল নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ১. পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার মনোভাব। মুনাফার ক্ষেত্রে একজনের বেশি মুনাফা আর অপরজনের বেশি লোকসানের মনোভাব অবশ্যই পরিত্যাজ্য। ২. পারস্পরিক স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি। জোরপূর্বক সম্মতি আদায় বৈধ বলে গণ্য হবে না। ৩. কোনো প্রকার প্রতারণা, আত্মসাৎ, ক্ষতি ও পাপাচারের উদ্দেশ্য থাকতে পারবে না। যেসব বস্তুর কারবার হারাম, সেসবের ব্যবসা করা যাবে না।

দেশ ও জাতির অর্থনৈতিক এই সঙ্কটময় মুহূর্তে এটি সবার উপলব্ধির আওতায় আসা আবশ্যক যে, যে ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগের দ্বারা কল্যাণকর পণ্য বা সামগ্রী উৎপন্ন তথা বিপণন হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, দেশজ সম্পদ উৎপাদনে গঠনমূলক অবদান রাখতে সক্ষম হয় সে ব্যবসাবাণিজ্যকে কল্যাণকর মানতে হবে। ঠিক এ সময় অপ্রয়োজনীয় বাড়তি ব্যয় পরিহার অপরিহার্য। অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ বলে একটি কথা প্রচলিত আছে। দেখা যায় তোষামোদি ও চাটুকারিতায় অনেকেই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে নিজের দলের কিংবা সবার জন্য ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন পরিবর্তন প্রেক্ষাপট দেখা যায় দলীয় বাহিনী, চাটুকার, বর্ণচোরা, আত্মীয়বর্গ ও চাঁদাবাজ খয়ের খাঁ’রাই জাতীয় নেতৃত্বকে ডুবিয়েছে। এসব ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করেই সবাইকে সম্পৃক্ত করে দেশ রাজনীতি তথা সমাজ সংসার অর্থনীতির সংস্কার সাধনে সাধনার প্রয়োজন হবে।

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অভিনন্দন জানাতে, মন্ত্রী-মিনিস্টারদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বড় বড় কোম্পনি, সরকারি সংস্থা ও ব্যাংকের বিশাল আকারের বিজ্ঞাপন, ফুলেল শুভেচ্ছায় মাত্রারিক্তি খরচের টাকা আয় ও ব্যয় ব্যাপারে সংযম ও কৃচ্ছ্রতা সাধনের সুযোগ খুঁজতে হবে। ওই টাকা সরকারের দারিদ্র্যবিমোচন তহবিলে যেতে পারে।

‘সবর’ বা ধৈর্য অবলম্বন মাহে রমজানে সিয়াম সাধনার একটি মহান শিক্ষা। আল কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘এবং আমি তোমাদিগকে ভয়, ক্ষুধা এবং ধনসম্পদ, জীবন ও ফলফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা অবশ্য পরীক্ষা করব। তুমি (হে রাসূল) শুভ সংবাদ দাও ধৈর্যশীলদেরকে।’ ভূরাজনৈতিক ভায়রা-ভাইদের ব্যাপক অপপ্রচার অপতৎপরতায় শুধু বাংলাদেশ কেন গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতে সবার মন বিষাক্ত হয়ে উঠছে । এ সঙ্কটময়কালে বাংলাদেশের সবাইকে আল কুরআনের সূরা আল বাকারার ১৫৩ আয়াতে ‘ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে প্রার্থনা’ করার পরামর্শ দিয়ে বলা হয়, ‘আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন’। আরবি ‘সবর’ শব্দের বহুমাত্রিক অর্থ ও তাৎপর্য রয়েছে। সবরের ব্যবহারিক অর্থ হতে পারে- ১. ধীরস্থিরতা অবলম্বন, তাড়াহুড়ো না করা; ২. অব্যাহত অধ্যবসায়, একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা, দৃঢ়তা, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকা; ৩. কোনো তাৎক্ষণিক কিংবা হঠাৎ কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা না করা; ৪. বিপদাপদে পরাজয় কিংবা বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতেও বিপদ ও বিসংবাদকে ঠাণ্ডামাথায় সহজে ও সানন্দে গ্রহণ করা অর্থাৎ- ‘ওই সব পরিস্থিতিতে শোকাভিভূত কিংবা ক্রোধান্বিত কিংবা হঠকারী না হওয়া।’ বলাবাহুল্য ‘সবর’ মানবিক গুণাবলির মধ্যে শ্রেষ্ঠতর এবং এর মানসিক ও আত্মিক তাৎপর্য অপরিসীম। সবরের গুণ অর্জন স্বাভাবিকভাবেই সহজ নয়। আর এ কারণে এটি অর্জনেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। (সূরা বাকারাহ-২৫০)।

ভয়, ক্ষুধা, ধন-মালের, ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নানান দুর্ঘটনা উদ্ভূত বলে প্রতীয়মান হয়। সন্দেহ নেই এতে মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটে- ব্যক্তি তথা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যেকোনো সময় বিভিন্ন দুর্ভোগ ও দুর্বিপাক আপতিত হতে পারে। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, প্লাবন ইত্যাদি যখন গোটা সমাজের ওপর দুর্দশা ও বিপদ নিয়ে আসে তখন গোটা সমাজ তথা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে তা ধৈর্যের সাথেই মোকাবেলা করা উচিত। ধীরস্থিরভাবে যেকোনো বিপদ অতিক্রম করার লক্ষ্যে সার্বিক প্রচেষ্টা চালাতে হয়। সূরা ‘আসর’-এ স্পষ্টতই উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।’ (আয়াত : ২-৩) বিপদে অন্যের সহযোগিতার বিষয়টিও এখানে বিশেষ তাৎপর্যবহ। বিপদগ্রস্ত সমাজের সবাই ধৈর্যধারণেই কেবল সীমাবদ্ধ থাকবে না পরস্পর সহযোগিতা অর্থাৎ- বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির বৈষয়িক সাহায্যে এগিয়ে আসাও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি পরিস্থিতিতে জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং পারস্পরিক সাহায্য আদান প্রদানে ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে ওই প্রয়াসে উপযোগী নেতৃত্ব দান ও সফল কর্মসম্পাদনে সহায়তা করা বাঞ্ছনীয়। এরূপ ভূমিকা পালনে কোনো বিপর্যয়ই কোনো সমাজকে কাবু করতে পারে না।

মানবিক অধিকারের স্বীকৃতি, সাম্য এবং সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে মাহে রমজানের মহান শিক্ষায় এ সত্য প্রতিফলিত হয়, কোনো মানুষ অপর মানুষকে যেন নীচ ও ঘৃণ্য মনে না করে; বরং নিজের বংশগত মর্যাদা, আঞ্চলিক স্বার্থ, দলমত, পরিবার, অথবা ধনসম্পদ ইত্যাদির ভিত্তিতে গর্ব না করে। কেননা, এগুলো প্রকৃত গর্বের বিষয় নয়। এহেন গর্বের কারণে পারস্পরিক ঘৃণা ও বিদ্বেষের ভিত্তি স্থাপিত হয়। ইসলামের শিক্ষা হলো সব মানুষ একই পিতা-মাতার সন্তান হওয়ার দিক দিয়ে ভাই ভাই এবং পরিবার, গোত্র অথবা ধনদৌলতের দিক দিয়ে যে প্রভেদ আল্লাহ তায়ালা রেখেছেন, তা গর্বের জন্য নয়, পারস্পরিক পরিচয়ের জন্য।

আল কুরআনে ব্যক্তিদের পারস্পরিক হক, আদব ও সামাজিক রীতিনীতি নির্দেশ করা হয়েছে, ‘তাদের অধিকাংশ অনুমানেরই অনুসরণ করে, সত্যের পরিবর্তে অনুমান কোনো কাজে আসে না। তারা যা করে আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’ (সূরা ইউনুস-৩৬) ‘তোমরা একে-অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে-অপরকে মন্দ নামে ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নামে ডাকা গর্হিত কাজ। হে মুমিনরা! তোমরা বহুবিধ অনুমান করা থেকে দূরে থাকো, কারণ অনুমান কোনো ক্ষেত্রে পাপ এবং তোমরা একে-অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে-অপরের পশ্চাতে নিন্দা করো না।… (সূরা হুজুরাত : ১১-১২) আয়াতগুলোতে- ১. অনুমান করা; ২. কারো গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করা; ৩. কাউকে ঠাট্টা ও উপহাস করা; ৪. কাউকে দোষারোপ করা এবং ৫. কারো পশ্চাতে নিন্দা করা বা গিবতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনুমান বা ধারণা করা থেকে বিরত থাকার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- কতক ধারণা পাপ। প্রত্যেক ধারণাই পাপ নয়। অতএব কোন ধারণা পাপ তা জানা জরুরি সাব্যস্ত করতেই সাবধানতা অবলম্বনের এ নির্দেশ। কুরতবি তার তাফসিরে লিখেছেন, নিষিদ্ধ ধারণা বলতে এ ক্ষেত্রে যেমন অপবাদ বোঝানো হয়েছে অর্থাৎ- কোনো ব্যক্তির প্রতি শক্তিশালী প্রমাণ ব্যতিরেকে কোনো দোষারোপ করা।

লেখক : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান