সময় বয়ে যায়, সভ্যতা গড়ে ওঠে আবার ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে এক অদ্ভুত রহস্য নিয়ে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে ,মানুষের তৈরি এক অবিশ্বাস্য বিস্ময়—গিজার গ্রেট পিরামিড। ইতিহাসের আদিমতম অধ্যায় থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক বিজ্ঞান—শত শত বছর ধরে গবেষক, বিজ্ঞানী আর সাধারণ মানুষকে বুদ করে রেখেছে চিরন্তন কিছু প্রশ্ন। যতবারই মানুষ ভেবেছে সে পিরামিডের রহস্য উন্মোচন করে ফেলেছে, ততবারই পিরামিড তার বুক থেকে বের করেছে নতুন কোনো ধাঁধা। স্বাগত জানাচ্ছি—গিজার গ্রেট পিরামিডের অন্তহীন রহস্যের সন্ধানে
আজ আমরা কোনো রূপকথা বা কাল্পনিক তত্ত্ব নয়, বরং মুখোমুখি হবো আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের সামনে থাকা কিছু কঠিন বাস্তব প্রশ্নের।
৪,৫০০ বছর আগের সেই সময়ে, যখন এখানে কোনো পিরামিডই ছিল না।
তখন এই গিজা মালভূমিতে ঠিক কী ছিল? ধু-ধু প্রান্তর নাকি অন্য কিছু? প্রথম কোন আদিম জাতি এখানে এসে বসবাস শুরু করেছিল এবং তারা আসলে কারা ছিল?
তারা আসার পর কীভাবে, কবে মানুষের মনে এই বিশাল স্থাপত্য তৈরির চিন্তা এলো?
পিরামিডের সর্বনিম্ন পাথর ওজন দেড় থেকে 2 টন,আর সর্বোচ্চ পাথরের ওজন থেকে ৭০ থেকে ৮০ টন পর্যন্ত,
৪,৫০০ বছর আগে চাকা বা আধুনিক ক্রেন ছাড়া সাধারণ মানুষ কীভাবে এই বিশাল গ্রানাইট পাথর খনি থেকে কেটে এনে পিরামিডের একেবারে মাথায় , ৪৮১ ফুটফুট উঁচুতে নিখুঁতভাবে বসালো?
কেবল গিজার গ্রেট পিরামিডেই আছে ২৩ লক্ষ পাথরের ব্লক !
গবেষকদের মতে, এই পুরো কাঠামোটি দাঁড় করাতে সময় লেগেছিল আনুমানিক ২০ থেকে ২৬ বছর । যার মানে দাঁড়ায়—নির্মাণকাজ চলাকালীন প্রতি আড়াই মিনিটে একটি করে বিশালাকার পাথর টেনে এনে নিখুঁতভাবে স্থাপন করতে হয়েছিল!
কিন্তু মাত্র প্রতি আড়াই মিনিটে একটি করে পাথর বসানোর এই অবিশ্বাস্য গতি তারা পেল কোথায় ? এই অসম্ভব যজ্ঞে ঠিক কতজন শ্রমিক দিন-রাত কাজ করেছিল?
এই পুরো কাঠামোটি কিন্তু কোনো আয়তক্ষেত্র নয়, এটি প্রায় ১৩ একর জমি জুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটি বিশাল বর্গক্ষেত্র! কিন্তু এই ১৩ একর ভূমিতে মোট কতটি পাথর সাজানো আছে আর সরাসরি মাটিকে স্পর্শ করে থাকা সেই ৫০ হাজারেরও বেশি বড় পাথরের ওজনই বা কত ?
পিরামিডের সর্বোচ্চ চূড়ায় থাকা ২ টন ওজনের সেই রহস্যময় বর্গাকার ‘পিরামিডিয়ন’ বা ক্যাপস্টোনের আকৃতি ও পরিমাপ কেমন ছিল—যা আজ ইতিহাস থেকে চিরতরে গায়েব হয়ে গেছে ?
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খাবেন যখন জানবেন, মাটির বুকের এই পিরামিডগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান সরাসরি মিলে যায় আকাশের ওরিয়ন নক্ষत्रপুঞ্জের তিনটি উজ্জ্বল তারার বিন্যাসের সাথে! কোনো দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া এই মহাজাগতিক নিখুঁত হিসাব তারা কীভাবে করলো?
কোন ফারাও এর সময়ে এটি তৈরি হয়েছিল? কেন তৈরী হয়েছিলো ?সেই ফারাও খুফু কতদিন বেঁচে ছিলেন ?
মিশরীয়দের মমি করার সেই আদিম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটিই বা কী ছিল, যার কারণে হাজার হাজার বছর ধরে একটি লাশ অবিকল রয়ে যায়?
তাহলে যার জন্য এই বিশাল আয়োজন, সেই ফারাও খুফুর মূল সমাধি কক্ষের গ্রানাইটের কফিনটি আজ সম্পূর্ণ খালি কেন? কোথায় গেল ফারাওয়ের মমি এবং তাঁর সমস্ত ধনসম্পদ?
আজকের ভিডিওতে আমরা আদিম ইতিহাস থেকে আজ পর্যন্ত পাওয়া নিখুঁত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও আধুনিক বিজ্ঞানের থার্মাল স্ক্যানিং রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে পিরামিডের আসল ইতিহাস এবং এর পেছনের সব বাস্তব রহস্য এক এক করে উন্মোচন করবো।
* ইতিহাসের চাকা যদি আমরা আজ থেকে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার বছর পেছনে ঘুরিয়ে দিই, তবে দেখবো আজকের এই শুষ্ক মরুভূমি তখন পুরোপুরি এমন ছিল না। তখন এটি ছিল একটি সবুজ চারণভূমি এবং বলা হতো Green Sahara, যেখানে ছিল অজস্র হ্রদ আর বন্যপ্রাণী। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দের দিকে জলবায়ুর এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে এবং সাহারা ,মরুভূমিতে রূপ নিতে শুরু করে। তখন সেখানকার আদিম আফ্রিকান যাযাবর উপজাতিরা পানির খোঁজে পূর্ব দিকে, অর্থাৎ জীবনদায়ী নীল নদের অববাহিকায় চলে আসে। একই সাথে বর্তমান সুদান ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু যাযাবর গোষ্ঠীও এখানে এসে জড়ো হয়।
নীল নদের উর্বর পলিমাটিতে এসে এই যাযাবর মানুষগুলো যাযাবর জীবন ছেড়ে কৃষিভিত্তিক স্থায়ী সমাজ গড়ে তোলে। এদের মধ্যেই গড়ে উঠেছিল আদিম ‘বাদারিয়ান’ ও ‘মেরিম্দে’সংস্কৃতি।
হাজার বছর ধরে একসাথে থাকতে থাকতে এরা নিজেদের মধ্যে এক অনন্য ধর্মীয় ও সামাজিক বন্ধন তৈরি করে। পরবর্তীতে, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩১৫০ অব্দে রাজা নারমার নামের একজন পরাক্রমশালী রাজা এই বিচ্ছিন্ন উপজাতি ও ছোট ছোট রাজ্যগুলোকে একত্রিত করে পৃথিবীর প্রথম অখণ্ড সাম্রাজ্য এবং একক ‘মিশরীয় জাতি’ গড়ে তোলেন।
আর এই আদিম উপজাতিদের বংশধরেরাই পরবর্তীতে নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের তাগিদে তৈরি করেছিল পিরামিড। মিশরীয়রা প্রবলভাবে বিশ্বাস করতো, মৃত্যুর পরও জীবন আছে। আর পরকালের এই যাত্রাকে সফল করতে তারা মৃতদেহকে পচন থেকে বাঁচানোর এক অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল—যাকে আমরা বলি মমি ।
এই জটিল প্রক্রিয়ায় প্রথমে মৃতদেহের ভেতরের হৃৎপিণ্ড বাদে মস্তিষ্ক, ফুসফুসের মতো নরম অঙ্গগুলো বের করে ফেলা হতো, কারণ এগুলো দ্রুত পচে যায়। এরপর শরীরকে পুরোপুরি শুকিয়ে ফেলার জন্য ব্যবহার করা হতো এক বিশেষ ধরনের খনিজ লবণ, যার নাম ‘নেট্রন’ ।
দীর্ঘ ৪০ দিন এই লবণে মৃতদেহটি ঢেকে রাখা হতো, যাতে শরীরের সব আর্দ্রতা বা পানি শুষে নেওয়া যায়। সবশেষে, শরীরটি পুরোপুরি শুষ্ক হয়ে গেলে সুগন্ধি তেল ও রজন মাখিয়ে শত শত গজ লিনেন কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে ফেলা হতো।
এই মমিগুলোকে তারা প্রথমে মাটির নিচে কবর দিত এবং ওপরে চারকোনা মাটির ঢিবি বানিয়ে রাখতো, যাকে বলা হতো ‘মাস্তাবা’ ।
কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ অব্দে, ফারাও জোসারের আমলে তার প্রধান স্থপতি ইমহোতেপ একটির ওপর আরেকটি, মোট ৬টি মাস্টাবা স্তরে স্তরে সাজিয়ে তৈরি করলেন পৃথিবীর প্রথম পিরামিড—’ধাপ বিশিষ্ট পিরামিড’। এখান থেকেই শুরু হলো পিরামিড যুগের মহাযাত্রা।
* আর এই পিরামিড যুগের সর্বোচ্চ শিখর হলো গিজার গ্রেট পিরামিড। প্রাচীন মিশরের চতুর্থ রাজবংশের শক্তিশালী ফারাও খুফুর আমলে এটি তৈরি হয়েছিল।
ফারাও খুফু সিংহাসনে বসার পরপরই তাঁর নিজের সমাধিক্ষেত্র হিসেবে এই বিশাল পিরামিডটির নির্মাণকাজ শুরু করান। তিনি আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ বছর বেঁচে ছিলেন এবং প্রায় ২৩ থেকে ২৬ বছর মিশর শাসন করেছিলেন।
পিরামিডের পুরো ভিত্তিটি কোনো সাধারণ আয়তক্ষেত্র নয়, এটি আসলে একটি নিখুঁত বর্গক্ষেত্র, যা প্রায় ১৩ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত !
এর ভিত্তিটি এতটাই বিশাল যে এর ভেতরে একসাথে প্রায় ১০টি আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার মাঠ এঁটে যাবে ! নির্মাণের সময় এর আদিম উচ্চতা ছিল প্রায় ১৪৬.৬ মিটার অর্থাৎ ৪৮১ ফুট।
তবে হাজার বছর ধরে আবহাওয়া ও ক্ষয়ের কারণে এর বর্তমান উচ্চতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৮.৫ মিটার অর্থাৎ ৪৫৪.৪ ফুট।
এই ১৩ একর ভূমির ওপর পুরো পিরামিডটি তৈরি করতে ছোট-বড় মিলিয়ে আনুমানিক ২৩ লক্ষ পাথরের ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে !
এই ২৩ লক্ষ পাথরের সম্মিলিত মোট ওজন প্রায় ৬০ লক্ষ টন!
অনেকেই ভাবেন, পিরামিডগুলো তৈরি করেছিল চাবুক খাওয়া হাজার হাজার অত্যাচারিত ক্রীতদাস। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে। ১৯৮৮ সালে বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ড. মার্ক লেনার গিজা পিরামিডের ঠিক দক্ষিণ-পূর্বে আবিষ্কার করেন একটি বিশাল ‘ওয়ার্কার্স ভিলেজ’ বা শ্রমিকদের শহর।
সেখানে খননকার্য চালিয়ে যা পাওয়া গেছে, তা বিজ্ঞানীদেরও চমকে দিয়েছে। সেখানে পাওয়া গেছে বিশাল বিশাল খাবার ঘর, উন্নত শয়নকক্ষ এবং হাজার হাজার পশুর হাড় । স্টেবল আইসোটোপ অ্যানালিসিস করে দেখা গেছে, পিরামিডের সাধারণ শ্রমিকরা প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে গরু, ভেড়া এবং ছাগলের উচ্চ প্রোটিনযুক্ত মাংস খেত, যা তৎকালীন মিশরের সাধারণ কৃষকদের ভাগ্যেও জুটতো না !
শুধু তাই নয়, সেখানে মিলেছে উন্নত চিকিৎসার প্রমাণ। কঙ্কালগুলোর হাড় পরীক্ষা করে দেখা গেছে, কোনো শ্রমিকের হাত বা পা ভেঙে গেলে রাজকীয় চিকিৎসকেরা নিখুঁত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা জুড়ে দিয়েছিলেন, এমনকি মস্তিষ্কের সফল অপারেশনের প্রমাণও মিলেছে!
ক্রীতদাসদের পেছনে কোনো রাষ্ট্র এত অর্থ ও রাজকীয় চিকিৎসা ব্যয় করে না।
পিরামিড তৈরিতে মাঠে সক্রিয়ভাবে কাজ করা এই ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ শ্রমিক ছিলেন মিশরের সম্মানিত ও বেতনভুক্ত নাগরিক ।
কিন্তু প্রশ্ন আসে কীভাবে চাকা বা আধুনিক ক্রেন ছাড়া এগুলো ওপরে তোলা হলো
২০১৩ সালে লোহিত সাগরের তীরে ওয়াদি আল-জারফ নামক একটি প্রাচীন বন্দরে ,
ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক পিয়েরে তালে একটি অভূতপূর্ব জিনিস আবিষ্কার করেন।
সেটি ছিল ৪,৫০০ বছর পুরোনো আসল প্যাপিরাসের টুকরো, যা আসলে পিরামিড তৈরির সময়কার একজন ফোরম্যান বা সুপারভাইজার ‘ম্যারের’ -এর ডায়েরি বা লগবুক!
এই ডায়েরি থেকে জানা যায়, মিশরীয়রা কীভাবে নিখুঁত লজিস্টিকস মেইনটেইন করতো । তারা নীল নদ থেকে কৃত্রিম খাল কেটে সরাসরি পিরামিডের পাদদেশ পর্যন্ত পানি নিয়ে এসেছিল। তুরা খনি থেকে সাদা চুনাপাথর কেটে বিশেষ নৌকায় করে খালের মাধ্যমে সরাসরি পিরামিডের গোড়ায় আনা হতো
তারপর
বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, মিশরীয়রা পিরামিডের চারপাশে কাদা ও বালু দিয়ে বিশাল বিশাল ঢালু পথ বা র্যাম্প তৈরি করেছিল।
আর বালু যাতে সহজে পিছলে যায়, সেজন্য স্লেজের সামনে পানি ঢালা হতো। এই বিশাল যজ্ঞ সম্পন্ন করতে মাঠে সক্রিয়ভাবে এই ২০ থেকে ৩০,০০০ দক্ষ কারিগর এবং তাদের সহায়তাকারী দল কাজ করতো।
ফরাসি স্থপতি জঁ-পিয়ের হুদিনের মতে, পিরামিডের বাইরের র্যাম্প ছাড়াও এর ভেতরের দিকে একটি অভ্যন্তরীণ সর্পিল র্যাম্প ছিল, যার মাধ্যমে পাথরগুলোকে ভেতরের সুড়ঙ্গ দিয়ে আস্তে আস্তে চূড়ার দিকে ঠেলে তোলা হতো
* পিরামিড তৈরিতে ব্যবহৃত পাথরগুলোর ওজন সব জায়গায় সমান নয়। পুরো পিরামিডের ওজন ধরে রাখার জন্য প্রথম স্তরে, অর্থাৎ সরাসরি মাটিকে স্পর্শ করে আছে আনুমানিক ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০টি পাথরের ব্লক ।
মাটিকে স্পর্শ করে থাকা এই প্রথম স্তরের একেকটি পাথরের ওজন ছিল প্রায় ৭ থেকে ১৫ টন পর্যন্ত ! পিরামিডের ওপরের দিকে ব্যবহৃত সাধারণ চুনাপাথরের ব্লকগুলোর ওজন তুলনামূলক কম, যার সর্বনিম্ন ওজন ছিল প্রায় ১.৫ থেকে ২ টন।
কিন্তু সবচেয়ে বড় বিস্ময় লুকিয়ে আছে পিরামিডের ঠিক ভেতরে—ফারাওয়ের মূল সমাধি কক্ষ বা ‘রাজার কক্ষে’ ।
এই কক্ষের ছাদটি ধরে রাখতে যে বিশালাকার লাল গ্রানাইট পাথরগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, তার একেকটির ওজন ৭০ থেকে ৮০ টন পর্যন্ত !
এর একেকটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭ ফুট, প্রস্থ প্রায় ৫ ফুট এবং উচ্চতা প্রায় ৭ ফুট !
৮০০ কিলোমিটার দূরের আসওয়ান খনি থেকে এই বিশাল আয়তাকার গ্রানাইট পাথরগুলো কেটে এনে পিরামিডের ৪৮১ ফুট উঁচুতে কীভাবে নিখুঁতভাবে বসানো হয়েছিল, তা আজও প্রকৌশলবিদ্যার এক সমাধানহীন রহস্য ।
পিরামিডের একদম মাথায় যে বিশেষ পাথরটি বসানো হয়েছিল, তাকে বলা হতো ‘পিরামিডিয়ন’ বা ক্যাপস্টোন।
এর আকৃতি ছিল একটি নিখুঁত ছোট পিরামিডের মতো । এর নিচের বর্গাকার ভূমির সাইজ ছিল আনুমানিক ৪.৫ থেকে ৫.৫ ফুট এবং এর উচ্চতা ছিল প্রায় ৩ থেকে ৩.৫ ফুট।
আর এর ওজন ছিল ১ থেকে ২ টন।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই শীর্ষ পাথরটি অত্যন্ত মসৃণ করে কেটে তার ওপর সোনা ও রূপার মিশ্রণ প্রলেপ দেওয়া হতো।
যখন মরুভূমির বুকে সূর্য উঠতো, তখন এই সোনার চূড়াটি চকচক করতো এবং বহুদূর থেকে আলো প্রতিফলিত করতো। তবে চোর-লুটেরা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই আদিম সোনার পিরামিডিয়নটি আজ সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে।
* কিন্তু পিরামিডের রহস্য কেবল মাটির বুকেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সংযোগ রয়েছে সরাসরি মহাকাশের সাথে! আকাশে ওরিয়ন নক্ষত্রপুঞ্জ বা কালপুরুষের কোমরের যে তিনটি উজ্জ্বল তারা রয়েছে, গিজার তিনটি পিরামিড ঠিক সেই তারার অবস্থান মেনে হুবহু সারিবদ্ধভাবে তৈরি করা হয়েছে! একে বলা হয় ‘ওরিয়ন কোরিলেশন থিওরি’।
প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, ওরিয়ন নক্ষত্রপুঞ্জ হলো তাদের পরকালের দেবতা ওসাইরিসের বাসস্থান। আর পিরামিডের ভেতরের বিশেষ সুড়ঙ্গ বা ‘এয়ার শ্যাফট’ গুলোর মুখ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যা সরাসরি আকাশের এই নক্ষত্রগুলোর দিকে নির্দেশ করে। যেন মৃত্যুর পর ফারাও খুফুর আত্মা সরাসরি সেই নক্ষত্রে পৌঁছাতে পারে।
তবে যার জন্য ২৩ লক্ষ পাথর আর ২০ বছরের এই মহাযজ্ঞ, সেই ফারাও খুফুর মূল সমাধি কক্ষের গ্রানাইটের কফিনটি আজ সম্পূর্ণ খালি ।
সেখানে কোনো মমি বা ধনসম্পদ কিছুই পাওয়া যায়নি। তাহলে কোথায় গেল ফারাওয়ের মমি?
আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আধুনিক বিজ্ঞানীরা যখন ‘কসমিক রে’ ,বা মহাজাগতিক রশ্মি এবং থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে পিরামিডের ভেতরে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন, তখন প্রতিনিয়ত নতুন রহস্য বেরিয়ে আসছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বিজ্ঞানীরা গ্রেট পিরামিডের প্রবেশপথের ঠিক ওপরে সম্পূর্ণ নতুন একটি গোপন সুড়ঙ্গ বা করিডোর এবং পিরামিডের একদম কেন্দ্রে এক বিশাল মহাশূন্যতার সন্ধান পেয়েছেন !
বিশ্বখ্যাত মিশরবিদদের ধারণা, ফারাও খুফুর আসল মমিটি হয়তো পিরামিডের ভেতরেই এমন কোনো গোপন লটারী বা গুপ্তকক্ষে আজও অক্ষত অবস্থায় লুকিয়ে আছে, যা আজ পর্যন্ত কোনো মানুষের চোখ দেখেনি।
গিজার এই গ্রেট পিরামিড আসলে কেবল লক্ষ লক্ষ পাথরের স্তূপ কিংবা কোনো ফারাও রাজার সমাধি ক্ষেত্র নয়; এটি প্রাচীন মানুষের মেধা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা এবং প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য মহাকাব্য ।
প্রকৃতির শত ঝড়-ঝাপটা, বিধ্বংসী ভূমিকম্প আর মানুষের হাজার বছরের লুঠপাটের পরও এই আদিম বিস্ময় আজও মরুভূমির বুকে অটুট দাঁড়িয়ে আছে ।
সত্য এটাই যে—আদিম যুগের সেই বালুকাময় প্রান্তর থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজকের আধুনিক যুগ পেরিয়েও মানুষের মনে চিরকাল এক পরম বিস্ময় আর অমীমাংসিত রহস্যের নাম হয়েই বেঁচে থাকবে।
সাহিত্যপাতা 



























