দেশের মানুষ সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রত্যাশা নিয়ে সামনে এগোতে চায়। তারা চায় দুর্নীতি কমবে, সরকারি দপ্তরে হয়রানি বন্ধ হবে, যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে এবং রাষ্ট্রীয় সেবার সুফল পৌঁছাবে সাধারণ মানুষের কাছে। কিন্তু এসব প্রত্যাশা পূরণে কতটা অগ্রগতি হচ্ছে, তা বোঝার জন্য শুধু সরকারি কর্মসূচি, অভিযান কিংবা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মাঠপর্যায়ে উপস্থিতি দেখলে চলবে না। দেখতে হবে, মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আসছে কি না। কারণ, সরকারের সাফল্যের আসল পরীক্ষা প্রচারে নয়, মানুষের অভিজ্ঞতায়।
সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন কাজে সরাসরি অংশ নেওয়া, জলাশয় বা নালায় নেমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ এবং মন্ত্রীদের অভিযান ও পরিদর্শনে অংশগ্রহণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের পেছনে জনসচেতনতা তৈরি কিংবা দ্রুত সমস্যা সমাধানের সদিচ্ছা থাকতে পারে। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি অনেক সময় কাজের গতি বাড়াতেও সহায়তা করে। তবে প্রশ্ন হলো, এসব উদ্যোগের সুফল কত দিন স্থায়ী হচ্ছে?
একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিজে নালায় নেমে কচুরিপানা পরিষ্কার করলেন—দৃশ্যটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিচ্ছন্নতা নিয়মিত বজায় রাখার ব্যবস্থা না থাকলে কয়েক দিন পর পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর করা, পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একজন কর্মকর্তা নিজে কাজ করে যতটুকু করতে পারবেন, সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে তার চেয়ে অনেক বড় ফল অর্জন করা সম্ভব।
একই কথা মন্ত্রীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো মন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শন করলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিলেন কিংবা কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে সরব হলেন—এসব উদ্যোগের মূল্যায়ন হওয়া উচিত পরবর্তী ফলাফলের ভিত্তিতে। পরিদর্শনের পর চিকিৎসাসেবা উন্নত হলো কি না, অভিযানের পর অপরাধ কমল কি না, অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলো কি না—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত উপস্থিতি সাময়িকভাবে আলোচনার জন্ম দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন এবং জবাবদিহি।
রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো ব্যক্তির একক প্রচেষ্টায় চলে না। একটি দেশের প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচারব্যবস্থা এবং সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করতে হয়। কোনো সমস্যা সমাধানে একজন কর্মকর্তার তাৎক্ষণিক উদ্যোগ প্রশংসনীয় হতে পারে; কিন্তু সেই সমস্যা যেন বারবার ফিরে না আসে, তার ব্যবস্থা করাই প্রশাসনের প্রকৃত দক্ষতা।
দুর্নীতি: উন্নয়ন ও সুশাসনের বড় বাধা
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ দুর্নীতি। ঘুষ, সরকারি অর্থের অপব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে জনপরিসরে আলোচনায় এসেছে। এসব সমস্যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
একজন সাধারণ মানুষ যখন সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দিতে বাধ্য হন, তখন উন্নয়নের বড় বড় প্রতিশ্রুতি তাঁর কাছে অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে। একজন যোগ্য প্রার্থী যখন নিয়োগে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ তোলেন, তখন তাঁর মনে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। আবার সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা না পেলে কিংবা ন্যায়বিচার পেতে দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়। তাই দুর্নীতি দমন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি নাগরিকের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সুশাসনেরও প্রশ্ন।
দুর্নীতির ব্যাপকতা নিয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা উদ্বেগজনক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণাসূচক বা করাপশন পারসেপশনস ইনডেক্সে (সিপিআই) বাংলাদেশ ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল। এই সূচক বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়িক মহলের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সরকারি খাতে দুর্নীতির ধারণা পরিমাপ করে। এটি দেশের প্রতিটি নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিতে জড়িত থাকার সরাসরি পরিমাপ নয়। তবু আন্তর্জাতিক এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সে সময় দেশের সুশাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটিয়েছিল।
অতীতের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। সরকার পরিবর্তন হলেই দুর্নীতির সংস্কৃতি বদলে যায় না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রয়োজন প্রশাসনিক সংস্কার, নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া সহজ; কিন্তু ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একইভাবে আইন প্রয়োগ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্নীতি দমনে চাই নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি
দুর্নীতি দমনের দায়িত্ব শুধু দুর্নীতি দমন কমিশনের নয়। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারি সেবাদানকারী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর করা এবং অনিয়মের অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, তাঁর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। তদন্তের স্বাধীনতা, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযান যদি শুধু কম প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, আর প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত না হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে আইনের অসম প্রয়োগের ধারণা তৈরি হতে পারে। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বাড়ার পরিবর্তে আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অভিযানের সংখ্যা দিয়ে নয়, অনিয়ম প্রতিরোধে তার কার্যকারিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ দিয়ে দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগের মূল্যায়ন করা উচিত।
এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন কতটি অভিযান পরিচালনা করল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিযোগ যাচাই, অনুসন্ধান ও তদন্তের মান, আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা। কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত প্রভাব যেন বিবেচ্য না হয়। একইভাবে কমিশনের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
স্বজনপ্রীতি বন্ধ না হলে দক্ষ প্রশাসন গড়া কঠিন
দুর্নীতির সঙ্গে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রভাবের সম্পর্কও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সরকারি নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টনে যোগ্যতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা রাজনৈতিক আনুগত্য প্রাধান্য পেলে প্রশাসনের দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যোগ্য ব্যক্তিরা বঞ্চিত হন, আর রাষ্ট্রীয় সেবার মানও কমে যেতে পারে।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা ও নির্ধারিত বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ বা পদোন্নতির অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁদের কাজের মূল্যায়ন হওয়া উচিত দক্ষতা, সততা এবং দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে; রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়।
প্রশাসন কোনো দল বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়। এটি জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নতুন করে দলীয় প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা তৈরি হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে জনগণের সেবায় নিয়োজিত করা।
এ ক্ষেত্রে শুধু নিয়োগে স্বচ্ছতা আনলেই হবে না। সরকারি ক্রয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, বদলি-পদায়ন, সেবাদান এবং সরকারি সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিয়মের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব জায়গায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত এবং তথ্যের স্বচ্ছতা কম, সেখানে অনিয়মের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব স্বচ্ছ করা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য করা প্রয়োজন।
অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা প্রায়ই উঠে আসে। দেশটিতে দুর্নীতি তদন্তের জন্য পৃথক প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগ এবং সরকারি প্রশাসনে জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতাও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ও নীতির কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
তবে কোনো দেশের উন্নয়নকে একজন শাসকের ব্যক্তিগত সততা বা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার একক ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথাযথ নয়। অর্থনৈতিক নীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা, শিক্ষা, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারসহ নানা বিষয় একটি দেশের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের জন্যও প্রয়োজন অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট: দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নিতে হলে আইন ও নিয়ম সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কাজ করার সক্ষমতা দিতে হয়। শুধু কঠোর বক্তব্য বা বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে দুর্নীতির সংস্কৃতি বদলানো সম্ভব নয়। অনিয়মের সুযোগ কমানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অপরাধের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।
কার্ড ও কর্মসূচির পাশাপাশি মানুষের বাস্তব সমস্যা সমাধান জরুরি
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বিভিন্ন ধরনের সহায়তা কার্ড এবং ভাতা দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু দেশের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন, কৃষি ও শিল্পের বিকাশ এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপও প্রয়োজন।
মানুষের সমস্যা একমাত্র সহায়তা বিতরণের মাধ্যমে সমাধান করা যায় না। সরকারি সেবা পেতে যেন ঘুষ দিতে না হয়, হাসপাতালে যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেন যোগ্যতার মূল্যায়ন হয় এবং কর্মসংস্থানে যেন বৈষম্যের শিকার হতে না হয়—এসব বিষয় সরাসরি মানুষের জীবনমানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সরকারের উচিত জনসেবার মান উন্নয়নে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা। কোন দপ্তরে সেবা পেতে কত সময় লাগছে, নাগরিকদের অভিযোগ কতটা নিষ্পত্তি হচ্ছে, সরকারি প্রকল্পের ব্যয় ও কাজের মান কেমন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা হলে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা সহজ হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নাগরিকেরা তাঁদের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ ও প্রত্যাশা তুলে ধরেন। এসব মন্তব্য সব সময় পুরো জনগোষ্ঠীর মতামতের প্রতিনিধিত্ব করে না। তবু নাগরিকদের অভিজ্ঞতা ও অসন্তোষের ধরন বোঝার জন্য এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। এর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের তথ্য, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ বিশ্লেষণ করে নীতিনির্ধারকদের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা প্রয়োজন।
সরকারের সমালোচনা হলেই সেটিকে বিরোধিতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। যুক্তিসংগত সমালোচনা প্রশাসনের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে এবং নীতি সংশোধনে সহায়তা করতে পারে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা পাওয়াই যেন কোনো সরকারি উদ্যোগের সাফল্য নির্ধারণের মাপকাঠি না হয়। জনস্বার্থে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তার ফলাফল নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
মন্ত্রীদের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা
রাষ্ট্র পরিচালনায় মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মাঠপর্যায়ে যাওয়া, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা এবং অভিযানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করার প্রয়োজন থাকতে পারে। তবে এসব কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করা।
একজন মন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শন করে অনিয়ম চিহ্নিত করলেন। এরপর চিকিৎসক ও কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত হলো কি না, ওষুধের সংকট কমল কি না, রোগীদের হয়রানি বন্ধ হলো কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। একইভাবে কোনো মাদকবিরোধী অভিযানের পর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হলো কি না, তা মূল্যায়ন করতে হবে। অভিযানের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি তার বাস্তব ফলাফলও বিবেচনায় নিতে হবে।
একজন প্রতিমন্ত্রী বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিজে প্রতিটি সমস্যা সমাধান করতে পারবেন না। তাঁদের দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়া, প্রয়োজনীয় সম্পদ ও জনবল নিশ্চিত করা, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়তা করা এবং কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা। ব্যক্তিগত উপস্থিতি কোনো উদ্যোগের সূচনা হতে পারে, কিন্তু কার্যকর প্রতিষ্ঠান ছাড়া সেই উদ্যোগকে দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়।
পরিবেশ রক্ষা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, মাদক নিয়ন্ত্রণ কিংবা সরকারি সেবার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ, দায়িত্ব, সময়সীমা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবেই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমে পরিণত হবে।
প্রতিশ্রুতির চেয়ে ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সামনে কয়েকটি অগ্রাধিকার স্পষ্ট। সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়ানো, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে কার্যকর ব্যবস্থা রাখা, সরকারি ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা এবং নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা—এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তব অগ্রগতি অর্জন সম্ভব।
সরকারি সেবা ডিজিটাল করা, প্রয়োজনীয় তথ্য নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই দুর্নীতি বন্ধ হবে না। ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা, তথ্যের নির্ভুলতা, নাগরিকদের প্রবেশাধিকার এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হবে তখনই, যখন অভিযোগের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষ সুবিধা পাবে না। একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার রক্ষা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার অভাব নেই। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সৎ নেতৃত্বের পাশাপাশি দক্ষ প্রশাসন, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণ সরকারের কাছে শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়, সেই উন্নয়নের সুফলও দেখতে চায়। তারা চায় ন্যায্য অধিকার, স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার পরিবেশ।
সরকারের সাফল্য তাই কতজন মন্ত্রী মাঠে গেলেন, কতটি অভিযান পরিচালিত হলো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতটা আলোচনা তৈরি হলো—শুধু তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। দেখতে হবে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হচ্ছে কি না, সরকারি সেবার মান বাড়ছে কি না, নিয়োগে যোগ্যতার মূল্যায়ন হচ্ছে কি না এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে কি না।
ভোটের হিসাব নির্দিষ্ট সময়ে হয়, কিন্তু জনগণের আস্থা অর্জনের কাজ প্রতিদিনের। সরকার পরিবর্তনের পরও যদি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের পুরোনো চিত্র বহাল থাকে, তাহলে পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। তাই এখন প্রয়োজন ব্যক্তিকেন্দ্রিক তৎপরতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, প্রচারণার পরিবর্তে বাস্তবায়ন এবং ক্ষমতার প্রভাবের পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।
দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারলে শুধু সরকারের ভাবমূর্তি উন্নত হবে না, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে এবং দেশের উন্নয়নের ভিত্তিও শক্তিশালী হবে। শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের সাফল্য নির্ধারিত হবে তার প্রচারের ব্যাপ্তি দিয়ে নয়, বরং জনগণের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারল, সেই হিসাবেই।
লেখক: সম্পাদক, সাহিত্যপাতা।
আব্দুর রহমান 

























