আমাদের দেশের অসংখ্য তরুণ উন্নত জীবনের আশায় প্রতিনিয়ত অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াচ্ছেন। দালালচক্র বৈধ ভিসা ও নিরাপদ যাত্রার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের বিদেশে পাঠানোর আশ্বাস দেয়। কিন্তু বাস্তবে মাঝপথেই বদলে যায় সেই প্রতিশ্রুতির পথ। জঙ্গল, দুর্গম সীমান্ত, অনাহার, অসুস্থতা এবং চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে তাদের অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে আটকে রেখে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। মানুষের স্বপ্ন ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এই নিষ্ঠুর ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে।
United Nations High Commissioner for Refugees–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল সর্বাধিক। গত এক দশকে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা গেছে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ, যাঁদের মধ্যে প্রতিবছর অন্তত ৫০০ জন বাংলাদেশি। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি সম্ভাবনার নির্মম সমাপ্তি।
প্রশ্ন হলো—কেন এত তরুণ জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায়। বেকারত্ব, দক্ষতার অভাব, সীমিত আয়ের সুযোগ এবং বিদেশে সাফল্যের অতিরঞ্জিত গল্প তরুণদের প্রলুব্ধ করছে। স্থানীয় দালালরা সামাজিক সম্পর্ক ব্যবহার করে বিশ্বাস অর্জন করে এবং অনেক পরিবারও প্রবাসী আত্মীয়দের সাফল্য দেখে একই পথকে নিরাপদ মনে করে। ফলে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা থাকলেও তা বাস্তব সিদ্ধান্তে যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পারে না।
এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, মানব পাচার ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামপর্যায়ে দালালদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং দ্রুত বিচার কার্যকর করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ করতে হবে। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা এবং স্বচ্ছ রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে অবৈধ পথের আকর্ষণ অনেকটাই কমে যাবে। তৃতীয়ত, গণসচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল মৃতদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নয়; বরং এমন মৃত্যুর পথ বন্ধ করা। প্রতারণার ফাঁদে পড়ে তরুণদের জীবন যেন ঝুঁকির মুখে না পড়ে, সে জন্য এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। তরুণদের স্বপ্নকে নিরাপদ বাস্তবতায় রূপ দিতে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।