Dhaka রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধে জোরদার পদক্ষেপ জরুরি

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ হুমকি। জীবন রক্ষার জন্য তৈরি ওষুধই যখন মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাজারে বিক্রি হয়, তখন তা রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে রোগীর জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব ওষুধ কার্যকারিতা হারায়, আবার কখনো ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে গুরুতর জটিলতা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। জেনেশুনে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করা নিছক অনিয়ম নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের অপরাধ।

রাজধানীর ফিটফোর্ড বাবুবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি ওষুধ বাজারে প্রকাশ্যে বিদেশি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযোগ রয়েছে, সংঘবদ্ধ একটি সিন্ডিকেট সীমান্ত ও আকাশপথে এসব ওষুধ দেশে এনে রাজধানী থেকে মফস্বল পর্যন্ত সরবরাহ করছে। ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি ও অস্ত্রোপচারের মতো গুরুতর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের ক্ষেত্রেও এই অনিয়ম দেখা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশের অভিযোগ। যদি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ভেতর থেকেই অনিয়মের তথ্য ফাঁস বা অবহেলা ঘটে, তাহলে আইন প্রয়োগ কার্যকর হয় না। এতে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয় এবং অবৈধ ব্যবসা বিস্তৃত হয়।

সরকার ২০১৭ সালে মানসম্পন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘মডেল ফার্মেসি’ চালুর উদ্যোগ নেয়। এসব ফার্মেসিতে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট রাখা, সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের ওষুধ না রাখার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। বর্তমানে দেশে আড়াই হাজারের বেশি মডেল ফার্মেসি চালু থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানেও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া যাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে হবে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত, বিমানবন্দর এবং পাইকারি বাজারে নজরদারি জোরদার করতে হবে, যাতে অবৈধ ওষুধ দেশে প্রবেশ করতে না পারে। তৃতীয়ত, ওষুধ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি জনগণের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা ওষুধ কেনার আগে মেয়াদ ও মান যাচাই করেন।

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধে এখনই কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। মানুষের জীবন নিয়ে কোনো ধরনের আপস চলতে পারে না। নিরাপদ ও মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক ও মানবিক কর্তব্য।

সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
প্রকাশের সময় ০৫:৩৭:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
৮৯ পড়া হয়েছে

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধে জোরদার পদক্ষেপ জরুরি

প্রকাশের সময় ০৫:৩৭:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ হুমকি। জীবন রক্ষার জন্য তৈরি ওষুধই যখন মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাজারে বিক্রি হয়, তখন তা রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে রোগীর জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব ওষুধ কার্যকারিতা হারায়, আবার কখনো ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে গুরুতর জটিলতা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। জেনেশুনে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করা নিছক অনিয়ম নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের অপরাধ।

রাজধানীর ফিটফোর্ড বাবুবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি ওষুধ বাজারে প্রকাশ্যে বিদেশি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযোগ রয়েছে, সংঘবদ্ধ একটি সিন্ডিকেট সীমান্ত ও আকাশপথে এসব ওষুধ দেশে এনে রাজধানী থেকে মফস্বল পর্যন্ত সরবরাহ করছে। ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি ও অস্ত্রোপচারের মতো গুরুতর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের ক্ষেত্রেও এই অনিয়ম দেখা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশের অভিযোগ। যদি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ভেতর থেকেই অনিয়মের তথ্য ফাঁস বা অবহেলা ঘটে, তাহলে আইন প্রয়োগ কার্যকর হয় না। এতে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয় এবং অবৈধ ব্যবসা বিস্তৃত হয়।

সরকার ২০১৭ সালে মানসম্পন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘মডেল ফার্মেসি’ চালুর উদ্যোগ নেয়। এসব ফার্মেসিতে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট রাখা, সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের ওষুধ না রাখার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। বর্তমানে দেশে আড়াই হাজারের বেশি মডেল ফার্মেসি চালু থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানেও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া যাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে হবে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত, বিমানবন্দর এবং পাইকারি বাজারে নজরদারি জোরদার করতে হবে, যাতে অবৈধ ওষুধ দেশে প্রবেশ করতে না পারে। তৃতীয়ত, ওষুধ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি জনগণের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা ওষুধ কেনার আগে মেয়াদ ও মান যাচাই করেন।

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধে এখনই কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। মানুষের জীবন নিয়ে কোনো ধরনের আপস চলতে পারে না। নিরাপদ ও মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক ও মানবিক কর্তব্য।