উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় চলতি বোরো মৌসুমে ধান আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং বাজারে ধানের দামে ধস—এই দুই চাপে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। রেকর্ড উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও উৎপাদন খরচের সঙ্গে কম দামের সমন্বয় না হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে। জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ৮০ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে আবাদ হয়েছে ৮২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে। অতিরিক্ত আবাদ মূলত ঘের এলাকার সম্প্রসারণের মাধ্যমে হয়েছে। আশাশুনি, প্রতাপনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় এই চিত্র দেখা গেছে। তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন ভালো হলেও সেচ, জ্বালানি ও বাজারদরের অস্থিরতায় লাভের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রইচপুর গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, “জমিতে ঠিকমতো পানি না দিলে ধান ভালো হয় না। কিন্তু বিদ্যুৎ নিয়মিত পাওয়া যায় না, ডিজেলও সংকটে। লাইনে দাঁড়িয়ে কম জ্বালানি নিতে হচ্ছে, আবার অনেক জায়গায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ৪০ বছর ধরে চাষ করছি, কিন্তু এখন সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছি।”
মন্টুমিয়ার বাগানবাড়ি এলাকার কৃষক লিটন বাবু বলেন, “লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো পানি তুলতে পারছি না। রাতে সেচ দিতে গেলে অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সমস্যা আরও বেড়েছে।” খড়িবিলা এলাকার কৃষক শরিফুল ইসলাম জানান, তিনি ১১ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। “প্রতি বিঘায় রোপণ খরচ প্রায় ২,৫০০ টাকা। সার, বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে লাভ তো দূরের কথা, কোনো মতে খরচ উঠবে। এক বিঘা জমির লিজই ২০ হাজার টাকা। শুধু লিজ বাবদই ১১ বিঘায় প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে,” বলেন তিনি। কৃষকদের অভিযোগ, গত বছর প্রতি বস্তা ধান ২৩০০ থেকে ২৪০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার তা নেমে এসেছে ১৬০০ থেকে ১৭০০ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচই তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাদের দাবি, সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ধানের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ না হলে ভবিষ্যতে অনেক কৃষক চাষাবাদ থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “সাতক্ষীরা একটি খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা। এখানে আউশ, আমন ও বোরো—তিন মৌসুমেই ধান উৎপাদন হয়। এ বছর ফসল অত্যন্ত ভালো হয়েছে এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “তেল ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব খুব বেশি পড়বে না। কারণ সম্প্রতি ৫ থেকে ৬ দিনের বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা অনেক এলাকায় সেচের চাপ কমিয়েছে। যেখানে সমস্যা রয়েছে, সেখানে কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠে কাজ করছেন।”