দীর্ঘ অস্বস্তি ও অবিশ্বাসের পর্ব পেরিয়ে আবারও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে দিল্লি ও ঢাকা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফর সেই প্রক্রিয়ারই প্রতীক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই যোগাযোগ কি সত্যিই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে, নাকি অতীতের ছায়া আবারও সামনে এসে দাঁড়াবে?
প্রথমত, সাম্প্রতিক সফরটি নিছক আনুষ্ঠানিক নয়—বরং তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থেকে শুরু করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক, এমনকি যৌথ সফরের পরিকল্পনাও ইঙ্গিত দেয়—দুই দেশই সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী। গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, বাণিজ্য সুবিধা পুনর্বহাল এবং জ্বালানি সহযোগিতা—এসব আলোচ্য বিষয় দেখায়, সম্পর্ককে আবার বাস্তবভিত্তিক পথে ফেরানোর চেষ্টা চলছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, কূটনীতির টেবিলে বসার আগেই সম্পর্কের ভেতরে জমে উঠেছে আস্থার সংকট। ‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগান কেবল একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত ছিল না; এটি ছিল জনমতের একটি অংশের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ভারত-বিরোধী মনোভাব, পণ্য বয়কটের ডাক, সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা—এসব ঘটনা সম্পর্কের ভেতরে গভীর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি করেছে। একইভাবে ভারতের পক্ষ থেকেও ভিসা কার্যক্রম সীমিত করা ও বাণিজ্য সুবিধা প্রত্যাহার—এসব পদক্ষেপ পারস্পরিক বিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে।
এখানেই মূল চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার তুলনামূলক সহজ হলেও জনগণের মানসিক দূরত্ব কমানো অনেক কঠিন। কারণ উভয় দেশের রাজনীতিতেই অভ্যন্তরীণ চাপ রয়েছে। বাংলাদেশে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ভারতেরও নিজস্ব কৌশলগত ও রাজনৈতিক বিবেচনা আছে।
তবে ইতিবাচক দিকও কম নয়। দিল্লির সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ—যেমন ঢাকায় একজন মুসলিম বুদ্ধিজীবীকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানোর ভাবনা—এটি প্রতীকী হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এটি দেখায়, ভারত অন্তত বাংলাদেশের জনমতের একটি অংশকে গুরুত্ব দিতে চাইছে। একইভাবে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নিয়মিত যোগাযোগ ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ইঙ্গিতও আশাব্যঞ্জক।
সবশেষে বলা যায়, দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অতীতের অবিশ্বাসকে পেছনে ফেলে যদি দুই দেশ বাস্তববাদী ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতার পথে এগোতে পারে, তবে সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে। অন্যথায়, এই কূটনৈতিক উষ্ণতা ক্ষণস্থায়ী হয়ে আবারও শীতলতার দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।