শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত এডামস পিক, স্থানীয় ভাষায় যার নাম শ্রী পাদায়া—অর্থ ‘পবিত্র পদচিহ্ন’। এটি বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় ও বহু ধর্মাবলম্বীর কাছে পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।
পাহাড়টির গঠন অনেকটা জাবালে নূর-এর মতো। প্রায় ২,২৪৩ মিটার উচ্চতার এই চূড়াটি দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন মেঘের মধ্যে ভাসমান কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। বছরের বেশিরভাগ সময়ই এটি মেঘ ও বৃষ্টিতে আচ্ছাদিত থাকে।
ধারণা করা হয়, পৃথিবীর প্রথম মানব ও নবী হজরত আদম (আ.) এখানে অবতরণ করেছিলেন। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি এই পাহাড়ে নেমে দীর্ঘ ১০০ বছর শুধুমাত্র ডান পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পাহাড়ের চূড়ায় সংরক্ষিত বিশাল আকৃতির একটি পদচিহ্নকে অনেকেই তাঁর পায়ের ছাপ বলে বিশ্বাস করেন।
এই পদচিহ্নের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ৪ ফুট ৭ ইঞ্চি বলে প্রচলিত রয়েছে। এটিকে সংরক্ষণের জন্য শ্রীলঙ্কা সরকার একটি বিশেষ কাঠামো নির্মাণ করেছে, যেখানে নিরাপত্তার জন্য লোহার গেট রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, পদচিহ্নটি কেবলামুখী বলে অনেকে মনে করেন, অর্থাৎ কাবা শরিফ-এর দিকে মুখ করা।
তবে শুধু মুসলিমদের কাছেই নয়, বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এই পাহাড়টি সমানভাবে পবিত্র। অনেক বৌদ্ধ বিশ্বাস করেন, এটি গৌতম বুদ্ধ-এর পদচিহ্ন। ফলে এটি একটি বহুধর্মীয় তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।
১৯০৩ সালে পাহাড়ে ওঠার জন্য পাথরের সিঁড়ি ও লোহার রেলিং নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে চূড়ায় পৌঁছাতে প্রায় ৪,০০০ ধাপ অতিক্রম করতে হয় এবং সময় লাগে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা। পথটি ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হওয়ায় বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
বছরের মাত্র তিন থেকে চার মাস এই পাহাড়ে আরোহণ করা সম্ভব হয়। বাকি সময় মেঘে ঢেকে থাকায় এটি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। তীর্থযাত্রীরা এখানে এসে নিজ নিজ ধর্মীয় রীতিতে ইবাদত বা উপাসনা করেন। সেখানে একটি ঘণ্টা রয়েছে, যেখানে অনেকেই মনোবাসনা পূরণের আশায় ঘণ্টা বাজান।
এই রহস্যময় পাহাড় নিয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থও রয়েছে, যার মধ্যে The Sacred Footprint উল্লেখযোগ্য। হাজার বছরের ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক গুরুত্বের কারণে এডামস পিক আজও বিশ্ববাসীর কাছে বিস্ময় ও ভক্তির প্রতীক হয়ে আছে।
ভিডিও দেখুন