প্রায় সাড়ে তিনশো বিঘা জায়গা—এতটুকু ভূখণ্ডের মধ্যেই রয়েছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।
- প্রকাশের সময় ০২:৩৮:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৬ বার দেখা হয়েছে
এই রাষ্ট্রের আছে নিজস্ব পতাকা, নিজস্ব মুদ্রা, নিজস্ব ডাকব্যবস্থা, নিজস্ব আইন, নিজস্ব নিরাপত্তাবাহিনী—এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানও আছেন।
কিন্তু আরও অদ্ভুত বিষয় হলো, এই ছোট্ট দেশের ভেতরেই রয়েছে বিশাল এক ব্যাসিলিকা, পৃথিবীর বিখ্যাত জাদুঘর, শত শত বছরের পুরোনো শিল্পকর্ম, ঐতিহাসিক ভবন, উদ্যান, রেলস্টেশন, পোস্ট অফিস এবং নিজস্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
আবার একটি সাধারণ দেশের মানচিত্রে যে জিনিসগুলো থাকার কথা, তার অনেক কিছুই এখানে নেই।
নেই কোনো বিমানবন্দর। নেই কোনো সমুদ্রবন্দর। নেই কোনো নদী বা প্রাকৃতিক হ্রদ। নেই বড় কোনো শিল্পাঞ্চল। নেই বিশাল কোনো আবাসিক এলাকা।
পুরো দেশটির আয়তন মাত্র ০.৪৪ বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ প্রায় ৪৪ হেক্টর।
তারপরও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে এই ছোট্ট জায়গাটির গুরুত্ব অসাধারণ।
ইতালির রাজধানী রোমের বুকের মধ্যে দেয়ালঘেরা এই রাষ্ট্রটির নাম—ভ্যাটিকান সিটি।
একটি দেশের আয়তন এত ছোট হলে তার জীবন কেমন হতে পারে?
সেখানে মানুষ কোথায় থাকে? রাষ্ট্র কীভাবে চলে? কে আইন তৈরি করে? কে নিরাপত্তা দেয়? কোথা থেকে আসে অর্থ?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মাত্র ৪৪ হেক্টরের একটি রাষ্ট্র কীভাবে পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হয়ে উঠল?
চলুন, প্রবেশ করা যাক পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট স্বাধীন রাষ্ট্র—ভ্যাটিকান সিটিতে।
রোমের ব্যস্ত শহরের ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে হঠাৎ চোখের সামনে খুলে যায় বিশাল এক চত্বর।
সামনে বিশাল গম্বুজ, চারদিকে দীর্ঘ স্তম্ভের সারি।
এটি সেন্ট পিটার্স স্কয়ার।
আর এর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা—ভ্যাটিকান সিটির সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনাগুলোর একটি।
ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের কাছে এই স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্থাপত্য, শিল্প ও ইতিহাসের দিক থেকেও এর গুরুত্ব বিশ্বজুড়ে।
ব্যাসিলিকার ভেতরে রয়েছে মাইকেলেঞ্জেলোর বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘পিয়েতা’।
মার্বেলে তৈরি এই শিল্পকর্মে যিশু খ্রিস্টের মৃত্যুর পর তাঁর দেহ কোলে নিয়ে বসে থাকা মেরিকে দেখানো হয়েছে।
কিন্তু ভ্যাটিকানের শিল্পভাণ্ডার এখানেই শেষ নয়।
এরপর রয়েছে ভ্যাটিকান মিউজিয়ামস।
এটি শুধু একটি সাধারণ জাদুঘর নয়। বিভিন্ন গ্যালারি ও সংগ্রহশালায় ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন, ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, পাণ্ডুলিপি এবং ধর্মীয় শিল্পের বিশাল সংগ্রহ।
আর এই সংগ্রহের সবচেয়ে বিখ্যাত অংশগুলোর একটি হলো সিস্টিন চ্যাপেল।
এর ছাদে মাইকেলেঞ্জেলোর আঁকা বিশাল চিত্রকর্ম শিল্পের ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি।
দেয়ালে রয়েছে ‘দ্য লাস্ট জাজমেন্ট’।
কিন্তু সিস্টিন চ্যাপেলের গুরুত্ব শুধু শিল্পে সীমাবদ্ধ নয়।
নতুন পোপ নির্বাচনের সময় কার্ডিনালদের কনক্লেভও এই চ্যাপেলেই অনুষ্ঠিত হয়।
অর্থাৎ একই জায়গা একদিকে পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত শিল্পস্থাপনা, অন্যদিকে ক্যাথলিক চার্চের নেতৃত্ব নির্বাচনের ঐতিহাসিক স্থান।
ভ্যাটিকানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভ্যাটিকান গার্ডেনস।
সবুজ গাছপালা, পথ, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং শান্ত পরিবেশে ঘেরা এই অংশটি বাইরের ব্যস্ত রোম শহরের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি তৈরি করে।
তবে ভ্যাটিকানকে শুধু গির্জা, জাদুঘর আর বাগানের দেশ ভাবলে ভুল হবে।
কারণ এর ভেতরে রয়েছে একটি রাষ্ট্রের
প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামোও।
সরকারি দপ্তর রয়েছে।
ডাকব্যবস্থা রয়েছে।
যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে।
রেল অবকাঠামো রয়েছে।
এমনকি নিজস্ব ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
তবে এখানে রেলস্টেশন থাকলেও এটি কোনো সাধারণ দেশের ব্যস্ত রেলস্টেশনের মতো নয়। ভ্যাটিকানের রেলপথ মূলত ইতালির রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত একটি সীমিত অবকাঠামো।
আর বিমানবন্দরের ক্ষেত্রে ভ্যাটিকানের পরিস্থিতি আরও আলাদা।
দেশটির নিজস্ব কোনো বিমানবন্দর নেই।
তাই বিশ্বের কোনো প্রান্ত থেকে ভ্যাটিকানে আসতে হলে প্রথমে ইতালির বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়। এরপর সড়কপথে রোম শহরের ভেতর দিয়ে পৌঁছাতে হয় এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে।
একইভাবে কোনো সমুদ্রবন্দরও নেই।
কারণ ভ্যাটিকান চারদিক থেকেই ইতালির ভূখণ্ড দ্বারা ঘেরা।
নেই কোনো নদী।
নেই কোনো প্রাকৃতিক হ্রদ।
নেই বড় কোনো শিল্পকারখানা।
নেই বিস্তীর্ণ কৃষিজমি।
অর্থাৎ একটি সাধারণ দেশের অর্থনীতি যেসব জায়গার ওপর দাঁড়ায়, ভ্যাটিকানের ক্ষেত্রে সেই চিত্র একেবারেই আলাদা।
আর এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই রাষ্ট্রটি পরিচালিত হয় কীভাবে?
ভ্যাটিকান সিটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র।
এর রাষ্ট্রপ্রধান হলেন পোপ।
কিন্তু এটি সাধারণ সংসদীয় গণতন্ত্র নয়।
এখানে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে পোপকে নির্বাচিত করে না।
নতুন পোপ নির্বাচিত হন ক্যাথলিক চার্চের কার্ডিনালদের কনক্লেভের মাধ্যমে।
পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি শুধু ক্যাথলিক চার্চের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হন না; তিনি ভ্যাটিকান সিটি স্টেটের সার্বভৌমও হন।
অর্থাৎ একই ব্যক্তি এখানে ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব—দুই ভূমিকাই পালন করেন।
তবে রাষ্ট্রের প্রতিটি কাজ পোপ নিজে বসে পরিচালনা করেন না।
দৈনন্দিন প্রশাসনের জন্য রয়েছে আলাদা প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তা।
ভ্যাটিকান সিটির আইন প্রণয়নের জন্য রয়েছে Pontifical Commission for Vatican City State।
আর প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে Governorate of Vatican City State।
বিচারব্যবস্থার জন্যও রয়েছে নিজস্ব কাঠামো।
অর্থাৎ আয়তনে ছোট হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ভ্যাটিকানের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ভ্যাটিকান বেশ আলাদা।
রাষ্ট্রটির নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী হলো ভ্যাটিকান জেন্ডারমেরি।
তারা আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষায় দায়িত্ব পালন করে।
আর পোপের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি ঐতিহাসিক বাহিনীর নাম—সুইস গার্ড।
তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক দেখে অনেকের কাছে এটি শুধু আনুষ্ঠানিক বাহিনী বলে মনে হতে পারে। কিন্তু পোপের নিরাপত্তায় তাদের দায়িত্ব বাস্তব এবং গুরুত্বপূর্ণ।
এবার আসা যাক ভ্যাটিকানের মানুষের কথায়।
২০২৪ সালের সরকারি হিসাবে ভ্যাটিকান সিটির মোট জনসংখ্যা ছিল ৮৮২ জন।
একটি দেশের জনসংখ্যা হিসেবে সংখ্যাটি অবিশ্বাস্য রকম ছোট।
কিন্তু ভ্যাটিকানের নাগরিকত্ব ব্যবস্থাও সাধারণ দেশের মতো নয়।
এখানে জন্ম নিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়া যায় না।
ভ্যাটিকানের নাগরিকত্ব মূলত নির্দিষ্ট পদ, দায়িত্ব বা অনুমোদিত অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কেউ রাষ্ট্রের জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করছেন, কেউ পোপের অধীনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিযুক্ত, আবার কেউ বিশেষ কারণে সেখানে বসবাসের অনুমতি পেয়েছেন—এ ধরনের অবস্থার সঙ্গে নাগরিকত্বের সম্পর্ক থাকতে পারে।
দায়িত্ব বা নাগরিকত্বের ভিত্তি শেষ হলে সেই নাগরিকত্বও পরিবর্তিত হতে পারে।
এই কারণে ভ্যাটিকানের জনসংখ্যা এবং নাগরিকত্ব—দুটিই অন্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি বিশেষ ধরনের।
আর এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা পরিষ্কার করা দরকার।
ভ্যাটিকান সিটি আর Holy See একই জিনিস নয়।
ভ্যাটিকান সিটি হলো একটি ভূখণ্ড এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র।
অন্যদিকে Holy See হলো ক্যাথলিক চার্চের কেন্দ্রীয় শাসন ও প্রতিনিধিত্বকারী কর্তৃপক্ষ।
পোপ উভয়ের সঙ্গেই যুক্ত।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে Holy See-এর ভূমিকা ভ্যাটিকান সিটির ভূখণ্ডের চেয়ে অনেক বড়।
Holy See বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে এবং ক্যাথলিক চার্চের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব করে।
তাই ভ্যাটিকানের প্রভাবকে শুধু ৪৪ হেক্টরের একটি দেশের প্রভাব হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না।
এর প্রভাব ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ক্যাথলিক সম্প্রদায় এবং তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে।
কিন্তু এই অবস্থানে ভ্যাটিকান কীভাবে পৌঁছাল?
এর জন্য ফিরে যেতে হবে বহু শতাব্দী পেছনে।
একসময় পোপদের নিয়ন্ত্রণে ইতালির বড় একটি অংশ নিয়ে গড়ে উঠেছিল Papal States।
কিন্তু উনিশ শতকে ইতালির একীকরণ আন্দোলনের সময় সেই রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যেতে থাকে।
১৮৭০ সালে ইতালীয় বাহিনী রোম দখল করে।
এরপর পোপ এবং ইতালীয় রাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধ শুরু হয়।
এই বিরোধের অবসান ঘটে ১৯২৯ সালে।
সে বছর Holy See এবং ইতালির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় Lateran Treaty।
এই চুক্তির মাধ্যমে ভ্যাটিকান সিটির সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি পায়।
অর্থাৎ আজকের ভ্যাটিকান সিটি মূলত সেই চুক্তির মাধ্যমেই আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
একটি দেয়ালঘেরা ছোট্ট ভূখণ্ড তখন শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র নয়—আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
এবার প্রশ্ন—যে দেশে নেই বড় শিল্প, নেই কৃষি, নেই বিশাল বাজার, সেই দেশের অর্থ আসে কোথা থেকে?
ভ্যাটিকানের অর্থনৈতিক কাঠামো মূলত তার বিশেষ পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল।
ভ্যাটিকান মিউজিয়ামের প্রবেশমূল্য থেকে আয় আসে।
ডাকটিকিট ও স্মারক মুদ্রা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশনা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম থেকেও আয় হয়।
এর পাশাপাশি Holy See-এর সঙ্গে সম্পর্কিত অনুদান ও বিভিন্ন আর্থিক উৎস রয়েছে।
ভ্যাটিকানের নিজস্ব ইউরো কয়েনও রয়েছে।
ইতালির সঙ্গে চুক্তির অধীনে ভ্যাটিকান ইউরো ব্যবহার করে এবং নিজস্ব নকশার ইউরো কয়েন ইস্যু করতে পারে।
এই কয়েনগুলোর অনেকগুলো আবার সংগ্রাহকদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণীয়।
ডাকটিকিটের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংগ্রাহকরা ভ্যাটিকানের ডাকটিকিট সংগ্রহ করেন।
আর রয়েছে Institute for the Works of Religion—সংক্ষেপে IOR।
এটিকে সাধারণভাবে ‘ভ্যাটিকান ব্যাংক’ বলা হলেও এটি সাধারণ মানুষের জন্য পরিচালিত কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়।
মূলত Holy See এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কার্যক্রমের জন্য এর ভূমিকা রয়েছে।
এখন যদি প্রশ্ন করা হয়—ভ্যাটিকানে মানুষের দৈনন্দিন জীবন কেমন?
উত্তরটা কিছুটা ভিন্ন।
এটি এমন কোনো দেশ নয় যেখানে বিশাল শপিং মল, ব্যস্ত শিল্পাঞ্চল, বড় আবাসিক পাড়া কিংবা অসংখ্য সাধারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
দেশটির বড় অংশই প্রশাসনিক, ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখানে যারা কাজ করেন, তাদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন রোমের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা-যাওয়া করেন।
অর্থাৎ ভ্যাটিকানের দেয়ালের ভেতরে কাজ করা এবং ভ্যাটিকানের নাগরিক হওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।
আর পর্যটকদের জন্য এই ছোট্ট রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা।
প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ আসে সেন্ট পিটার্স স্কয়ার দেখতে।
কেউ আসে ধর্মীয় কারণে।
কেউ আসে ইতিহাসের জন্য।
কেউ আসে মাইকেলেঞ্জেলোর শিল্প দেখতে।
আবার কেউ শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে নিজের চোখে দেখার জন্য আসে।
এই কারণেই ভ্যাটিকান একই সঙ্গে একটি রাষ্ট্র, একটি ধর্মীয় কেন্দ্র এবং একটি বিশাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভাণ্ডার।
একদিকে এখানে রয়েছে রাষ্ট্রের পতাকা, মুদ্রা, ডাকব্যবস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসন।
অন্যদিকে রয়েছে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা, সিস্টিন চ্যাপেল, ভ্যাটিকান মিউজিয়ামস এবং শত শত বছরের শিল্প ও ইতিহাস।
আর এর বাইরেও রয়েছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান—Holy See—যার মাধ্যমে ভ্যাটিকানের ধর্মীয় ও কূটনৈতিক প্রভাব তার ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের অনেক বাইরে পৌঁছে যায়।
ভ্যাটিকান সিটির দিকে তাকালে তাই একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায়।
মানচিত্রে এটি এত ছোট যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এর অনেকটা অংশ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা সম্ভব।
জনসংখ্যা এক হাজারেরও কম।
নিজস্ব বিমানবন্দর নেই।
সমুদ্রবন্দর নেই।
নদী নেই।
প্রাকৃতিক হ্রদ নেই।
বড় শিল্পাঞ্চল নেই।
তারপরও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এই দেশের নাম জানে।
কারণ একটি রাষ্ট্রের গুরুত্ব সবসময় তার আয়তন দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
কখনো তার গুরুত্ব তৈরি হয় ইতিহাস থেকে।
কখনো সংস্কৃতি থেকে।
কখনো ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে।
আর কখনো একটি প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক প্রভাব সেই ছোট্ট ভূখণ্ডকে বিশ্বের মানচিত্রে অনেক বড় করে তোলে।
ভ্যাটিকান সিটি ঠিক তেমনই একটি রাষ্ট্র।
রোমের ভেতরে দেয়ালঘেরা প্রায় ৪৪ হেক্টরের এই ক্ষুদ্র দেশটি আসলে শুধু একটি ছোট দেশ নয়।
এটি একই সঙ্গে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র, ক্যাথলিক চার্চের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত একটি ভূখণ্ড এবং পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
তাই ভ্যাটিকানকে বুঝতে হলে শুধু তার মানচিত্রের দিকে তাকালে হবে না।
তাকাতে হবে তার ইতিহাসের দিকে।
তার প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে।
তার শিল্প ও সংস্কৃতির দিকে।
এবং সবচেয়ে বেশি—তার সেই অদৃশ্য প্রভাবের দিকে, যা ৪৪ হেক্টরের দেয়াল পেরিয়ে পৃথিবীর বহু দেশে পৌঁছে গেছে।
মানচিত্রে ভ্যাটিকান সিটি ছোট।
কিন্তু ইতিহাসের পাতায়—এই ছোট্ট দেশটির জায়গা অনেক বড়।



























