Dhaka মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব অর্থনীতি আসলে কতটা ভঙ্গুর?

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০৬:০৯:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ৪ বার দেখা হয়েছে

আমরা প্রতিদিন যে জ্বালানি ব্যবহার করি, বাজারে যে পণ্য কিনে আনি বা যে স্মার্টফোনটি আমাদের হাতে থাকে—এগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থা টিকে রয়েছে দুটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক চ্যানেলের ওপর। পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরের মুখে বাব-এল-মান্দেব প্রণালী।

ভেবে দেখেছেন কি—যদি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বা কোনো সামুদ্রিক অবরোধের ফলে এই দুটি প্রণালী একই সাথে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতির কী অবস্থা হবে?

এটা কি কেবল কোনো পণ্যের দাম বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি গোটা পৃথিবী এক নজিরবিহীন মন্দা ও অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হবে?

আজ আমরা বিস্তারিত দেখব এই দুটি জলপথ দীর্ঘমেয়াদী বন্ধ হলে ঠিক কীভাবে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে পুরো বিশ্ব।

আসুন প্রথমে এই দুই চোকপয়েন্টের ক্ষমতা অনুধাবন করা যাক।

হরমুজ প্রণালী:

এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর তথা আরব সাগরের সাথে যুক্ত করেছে। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ২১ মাইল চওড়া, যার মধ্যে আবার জাহাজের জন্য নিরাপদ চলাচলের চ্যানেলটি মাত্র দুই মাইল চওড়া।
কিন্তু এত ক্ষুদ্র পথ হওয়া সত্ত্বেও এটি পৃথিবীর এক নম্বর ‘অয়েল চোকপয়েন্ট’। প্রতিদিন আন্তর্জাতিক বাজারে আসা মোট অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ থেকে ২১ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়।

সৌদি আরব, ইরাক, ইউএই, কুয়েত, কাতার এবং ইরানের অর্থনীতি সরাসরি এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। কাতার থেকে এশিয়া ও ইউরোপে যাওয়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির বড় অংশই যায় এই পথ দিয়ে।

বাব-এল-মান্দেব প্রণালী:

লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মাঝে অবস্থিত ইয়েমেন এবং জিবুতির মধ্যকার এই সংকীর্ণ প্রণালীটি হলো সুয়েজ খালের মূল প্রবেশদ্বার। এশিয়া থেকে ইউরোপের সংক্ষিপ্ততম নৌপথ পরিচালনা করে এই জলপথ।
বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১২ শতাংশ এবং কন্টেইনার জাহাজের প্রায় ৩০ শতাংশ চলাচল করে এই এক প্রণালী দিয়ে। অর্থাৎ, সুয়েজ খালের আসল রিমোট কন্ট্রোল লুকিয়ে আছে এই বাব-এল-মান্দেবে।

এবার চিন্তা করুন সেই ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির কথা—যদি কোনো কারণে দুটি প্রণালী একসাথে একেবারে বন্ধ হয়ে যায়, তবে ঠিক কী ঘটবে?

প্রথম ডমিনো ইফেক্টটি পড়বে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো একদিনেই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল গায়েব হয়ে যাওয়া।
বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব বা ইউএই-এর কিছু পাইপলাইন থাকলেও তা এই সুবিশাল চাহিদার মাত্র ২৫ শতাংশ পূরণ করতে পারবে।

ফলাফল?

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রাতের মধ্যে ১২০, ১৫০ এমনকি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কিন্তু বিপর্যয় এখানেই শেষ নয়। ইউরোপ যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের এলএনজি
(LNG) বা গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, ঠিক তখন হরমুজ ও বাব-এল-মান্দেব বন্ধ থাকা মানে ইউরোপ এবং এশিয়ার বহু দেশে গ্যাসের সরবরাহ থমকে যাওয়া। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ হবে, হাজার হাজার কলকারখানা স্থবির হয়ে পড়বে এবং বিশ্বজুড়ে শুরু হবে লোডশেডিংয়ের অন্ধকার দিন।

দ্বিতীয় বড় আঘাতটি লাগবে বিশ্ব শিপিং লাইনে। বাব-এল-মান্দেব প্রণালী দীর্ঘমেয়দিী বন্ধ হলে সুয়েজ খাল পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়বে। কারণ লোহিত সাগরে নিরাপদে ঢোকার কোনো পথই থাকবে না।

এর সমাধান হিসেবে কন্টেইনার জাহাজগুলোকে সেই ১৯ শতকের পুরোনো রুট ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ, এশিয়া থেকে ইউরোপে যেতে হলে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে ‘কেপ অব গুড হোপ’ অতিক্রম করতে হবে।

এই পরিবর্তনের ফলে প্রতিটি ট্রিপে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার সামুদ্রিক মাইল বেশি পাড়ি দিতে হবে। সহজ ভাষায়, শিপিং পারাপারে ১০ থেকে ১৫ দিন অতিরিক্ত সময় লাগবে।
এতে করে জাহাজের জন্য বাড়তি হাজার হাজার টন জ্বালানি লাগবে, নাবিকদের বেতন বাড়বে এবং সামুদ্রিক বীমা বা ইন্স্যুরেন্স ফি আকাশ ছুঁয়ে যাবে। বিশ্বজুড়ে কন্টেইনার শিপিংয়ের খরচ এক ধাক্কায় ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

।অতিরিক্ত শিপিং খরচের চরম পরিণতি ভোগ করবে সাধারণ ভোক্তা, অর্থাৎ আপনি এবং আমি।

বর্তমান বিশ্বের আধুনিক শিল্প কারখানাগুলো চলে ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ (Just-In-Time) লজিস্টিক মডেলে। অর্থাৎ কোনো কারখানায় দুই বা তিন মাসের অতিরিক্ত কাঁচামাল জমিয়ে রাখা হয় না। শিপমেন্ট আসবে, আর সরাসরি অ্যাসেম্বলি লাইনে কাজ শুরু হবে।

কিন্তু এই ১৫ দিনের শিপিং বিলম্ব পুরো সাপ্লাই চেইনের চাকা থামিয়ে দেবে। এশিয়া থেকে চিপ বা মেকানিক্যাল পার্টস না পৌঁছালে ইউরোপের গাড়ি কারখানা, আমেরিকার ইলেকট্রনিক্স কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। পোশাক খাত, সার এবং নিত্যপণ্য পরিবহনে সৃষ্টি হবে বিশাল জটলা।

খাদ্যসামগ্রী ও কাঁচামালের এই সংকট বিশ্বজুড়ে জন্ম দেবে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি। প্রতিটি দেশে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি প্রবেশ করবে এক মারাত্মক ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মন্দার যুগে।

প্রশ্ন জাগতে পারে, বিশ্বের পরাশক্তিগুলো কি এই সংকটের কথা জানে না?
অবশ্যই জানে। আর এ কারণেই এই দুটি জলপথ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিক নজরদারিতে থাকা অঞ্চল। যুক্তরাষ্ট্র তাদের পঞ্চম নৌবহর (US 5th Fleet) বাহরাইনে মোতায়েন করে রেখেছে এই হরমুজের সুরক্ষায়। ওদিকে জিবুতিতে আমেরিকা, ফ্রান্স এমনকি চীনের নিজস্ব সামরিক ঘাঁটি রয়েছে কেবল এই বাব-এল-মান্দেব ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।

ইরান বা আঞ্চলিক অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো খুব ভালো করেই জানে—এই দুটি জলপথের একটিতেও যদি স্থায়ীভাবে হাত দেওয়া হয়, তবে তা কেবল স্থানীয় যুদ্ধ থাকবে না; তা রূপ নেবে সরাসরি বৈশ্বিক সংঘাতে। কারণ এই পথগুলো বন্ধ হওয়া মানে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর পেটে লাথি পড়ার মতো অবস্থা তৈরি হওয়া

আপনার কি মনে হয়, বিশ্বের পরাশক্তিগুলো কি কখনো এই সমুদ্রপথগুলোর নিরাপদ বিকল্প রুট তৈরি করতে পারবে? নাকি আমাদের অর্থনীতি সবসময় এই দুই চোকপয়েন্টের ওপরই বন্দি থাকবে? আপনার মতামত নিচে কমেন্ট সেকশনে জানান।

ভিডিও দেখুন: হরমুজ প্রণালী ও বাব আল মান্দেবের গুরুত্ব

সম্পর্কিত

পৃথিবী, মহাসাগর ও ইতিহাসের অজানা অধ্যায় নিয়ে সেরা বাংলা ডকুমেন্টারি

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

পছন্দের চিকিৎসকের সিরিয়াল নিতে ক্লিক করুন

স্বাদে, মানে ও ভালোবাসায়—লেক ভিউ কেক

বিশ্ব অর্থনীতি আসলে কতটা ভঙ্গুর?

প্রকাশের সময় ০৬:০৯:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমরা প্রতিদিন যে জ্বালানি ব্যবহার করি, বাজারে যে পণ্য কিনে আনি বা যে স্মার্টফোনটি আমাদের হাতে থাকে—এগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থা টিকে রয়েছে দুটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক চ্যানেলের ওপর। পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরের মুখে বাব-এল-মান্দেব প্রণালী।

ভেবে দেখেছেন কি—যদি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বা কোনো সামুদ্রিক অবরোধের ফলে এই দুটি প্রণালী একই সাথে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতির কী অবস্থা হবে?

এটা কি কেবল কোনো পণ্যের দাম বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি গোটা পৃথিবী এক নজিরবিহীন মন্দা ও অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হবে?

আজ আমরা বিস্তারিত দেখব এই দুটি জলপথ দীর্ঘমেয়াদী বন্ধ হলে ঠিক কীভাবে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে পুরো বিশ্ব।

আসুন প্রথমে এই দুই চোকপয়েন্টের ক্ষমতা অনুধাবন করা যাক।

হরমুজ প্রণালী:

এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর তথা আরব সাগরের সাথে যুক্ত করেছে। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ২১ মাইল চওড়া, যার মধ্যে আবার জাহাজের জন্য নিরাপদ চলাচলের চ্যানেলটি মাত্র দুই মাইল চওড়া।
কিন্তু এত ক্ষুদ্র পথ হওয়া সত্ত্বেও এটি পৃথিবীর এক নম্বর ‘অয়েল চোকপয়েন্ট’। প্রতিদিন আন্তর্জাতিক বাজারে আসা মোট অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ থেকে ২১ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়।

সৌদি আরব, ইরাক, ইউএই, কুয়েত, কাতার এবং ইরানের অর্থনীতি সরাসরি এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। কাতার থেকে এশিয়া ও ইউরোপে যাওয়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির বড় অংশই যায় এই পথ দিয়ে।

বাব-এল-মান্দেব প্রণালী:

লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মাঝে অবস্থিত ইয়েমেন এবং জিবুতির মধ্যকার এই সংকীর্ণ প্রণালীটি হলো সুয়েজ খালের মূল প্রবেশদ্বার। এশিয়া থেকে ইউরোপের সংক্ষিপ্ততম নৌপথ পরিচালনা করে এই জলপথ।
বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১২ শতাংশ এবং কন্টেইনার জাহাজের প্রায় ৩০ শতাংশ চলাচল করে এই এক প্রণালী দিয়ে। অর্থাৎ, সুয়েজ খালের আসল রিমোট কন্ট্রোল লুকিয়ে আছে এই বাব-এল-মান্দেবে।

এবার চিন্তা করুন সেই ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির কথা—যদি কোনো কারণে দুটি প্রণালী একসাথে একেবারে বন্ধ হয়ে যায়, তবে ঠিক কী ঘটবে?

প্রথম ডমিনো ইফেক্টটি পড়বে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো একদিনেই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল গায়েব হয়ে যাওয়া।
বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব বা ইউএই-এর কিছু পাইপলাইন থাকলেও তা এই সুবিশাল চাহিদার মাত্র ২৫ শতাংশ পূরণ করতে পারবে।

ফলাফল?

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রাতের মধ্যে ১২০, ১৫০ এমনকি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কিন্তু বিপর্যয় এখানেই শেষ নয়। ইউরোপ যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের এলএনজি
(LNG) বা গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, ঠিক তখন হরমুজ ও বাব-এল-মান্দেব বন্ধ থাকা মানে ইউরোপ এবং এশিয়ার বহু দেশে গ্যাসের সরবরাহ থমকে যাওয়া। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ হবে, হাজার হাজার কলকারখানা স্থবির হয়ে পড়বে এবং বিশ্বজুড়ে শুরু হবে লোডশেডিংয়ের অন্ধকার দিন।

দ্বিতীয় বড় আঘাতটি লাগবে বিশ্ব শিপিং লাইনে। বাব-এল-মান্দেব প্রণালী দীর্ঘমেয়দিী বন্ধ হলে সুয়েজ খাল পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়বে। কারণ লোহিত সাগরে নিরাপদে ঢোকার কোনো পথই থাকবে না।

এর সমাধান হিসেবে কন্টেইনার জাহাজগুলোকে সেই ১৯ শতকের পুরোনো রুট ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ, এশিয়া থেকে ইউরোপে যেতে হলে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে ‘কেপ অব গুড হোপ’ অতিক্রম করতে হবে।

এই পরিবর্তনের ফলে প্রতিটি ট্রিপে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার সামুদ্রিক মাইল বেশি পাড়ি দিতে হবে। সহজ ভাষায়, শিপিং পারাপারে ১০ থেকে ১৫ দিন অতিরিক্ত সময় লাগবে।
এতে করে জাহাজের জন্য বাড়তি হাজার হাজার টন জ্বালানি লাগবে, নাবিকদের বেতন বাড়বে এবং সামুদ্রিক বীমা বা ইন্স্যুরেন্স ফি আকাশ ছুঁয়ে যাবে। বিশ্বজুড়ে কন্টেইনার শিপিংয়ের খরচ এক ধাক্কায় ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

।অতিরিক্ত শিপিং খরচের চরম পরিণতি ভোগ করবে সাধারণ ভোক্তা, অর্থাৎ আপনি এবং আমি।

বর্তমান বিশ্বের আধুনিক শিল্প কারখানাগুলো চলে ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ (Just-In-Time) লজিস্টিক মডেলে। অর্থাৎ কোনো কারখানায় দুই বা তিন মাসের অতিরিক্ত কাঁচামাল জমিয়ে রাখা হয় না। শিপমেন্ট আসবে, আর সরাসরি অ্যাসেম্বলি লাইনে কাজ শুরু হবে।

কিন্তু এই ১৫ দিনের শিপিং বিলম্ব পুরো সাপ্লাই চেইনের চাকা থামিয়ে দেবে। এশিয়া থেকে চিপ বা মেকানিক্যাল পার্টস না পৌঁছালে ইউরোপের গাড়ি কারখানা, আমেরিকার ইলেকট্রনিক্স কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। পোশাক খাত, সার এবং নিত্যপণ্য পরিবহনে সৃষ্টি হবে বিশাল জটলা।

খাদ্যসামগ্রী ও কাঁচামালের এই সংকট বিশ্বজুড়ে জন্ম দেবে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি। প্রতিটি দেশে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি প্রবেশ করবে এক মারাত্মক ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মন্দার যুগে।

প্রশ্ন জাগতে পারে, বিশ্বের পরাশক্তিগুলো কি এই সংকটের কথা জানে না?
অবশ্যই জানে। আর এ কারণেই এই দুটি জলপথ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিক নজরদারিতে থাকা অঞ্চল। যুক্তরাষ্ট্র তাদের পঞ্চম নৌবহর (US 5th Fleet) বাহরাইনে মোতায়েন করে রেখেছে এই হরমুজের সুরক্ষায়। ওদিকে জিবুতিতে আমেরিকা, ফ্রান্স এমনকি চীনের নিজস্ব সামরিক ঘাঁটি রয়েছে কেবল এই বাব-এল-মান্দেব ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।

ইরান বা আঞ্চলিক অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো খুব ভালো করেই জানে—এই দুটি জলপথের একটিতেও যদি স্থায়ীভাবে হাত দেওয়া হয়, তবে তা কেবল স্থানীয় যুদ্ধ থাকবে না; তা রূপ নেবে সরাসরি বৈশ্বিক সংঘাতে। কারণ এই পথগুলো বন্ধ হওয়া মানে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর পেটে লাথি পড়ার মতো অবস্থা তৈরি হওয়া

আপনার কি মনে হয়, বিশ্বের পরাশক্তিগুলো কি কখনো এই সমুদ্রপথগুলোর নিরাপদ বিকল্প রুট তৈরি করতে পারবে? নাকি আমাদের অর্থনীতি সবসময় এই দুই চোকপয়েন্টের ওপরই বন্দি থাকবে? আপনার মতামত নিচে কমেন্ট সেকশনে জানান।

ভিডিও দেখুন: হরমুজ প্রণালী ও বাব আল মান্দেবের গুরুত্ব