Dhaka শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৈলাশ: যে পর্বতের চূড়ায় আজও মানুষের পায়ের ছাপ নেই

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০৬:১২:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৩৯ বার দেখা হয়েছে

পশ্চিম তিব্বতের দুর্গম মালভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উঁচু এক পর্বত। পৃথিবীর সর্বোচ্চ নয়, তবু কোটি মানুষের কাছে এটি পবিত্র। চার ধর্মের বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এর নাম। পর্বতারোহীরা একসময় চূড়ায় ওঠার কথা ভেবেছেন, কেউ চেষ্টা করেছেন; কিন্তু স্বীকৃত ইতিহাসে আজও নেই সফল শৃঙ্গারোহণের রেকর্ড। কেন?

পৃথিবীর বড় বড় পর্বতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যেন জয়-পরাজয়ের। কে প্রথম উঠলেন, কে নতুন পথ আবিষ্কার করলেন, কে সবচেয়ে দ্রুত চূড়ায় পৌঁছালেন—পর্বতারোহণের ইতিহাসে এমন প্রশ্নের কমতি নেই। এভারেস্টের চূড়ায় প্রথম মানুষের পদচিহ্ন পড়েছে ১৯৫৩ সালে। এরপর বহুবার জয় হয়েছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

কিন্তু তিব্বতের কৈলাশের গল্প আলাদা।

এখানে চূড়ায় ওঠাকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয় না। বরং পর্বতটিকে ঘিরে হাঁটা, প্রার্থনা করা এবং দূর থেকে শ্রদ্ধা জানানোই বহু মানুষের কাছে বড় সাধনা।

তাই কৈলাশের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার উচ্চতা নয়। বরং এমন এক পবিত্র পর্বত হিসেবে তার পরিচয়, যার চূড়ায় মানুষের সফল আরোহণের কোনো স্বীকৃত রেকর্ড নেই।

মানচিত্রে কৈলাশ

কৈলাশ অবস্থিত চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নগারি প্রিফেকচারে। তিব্বতি ভাষায় এর একটি পরিচিত নাম গাং রিনপোচে। উচ্চতা ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার।

ভৌগোলিকভাবে এটি কৈলাশ বা গাংদিসে পর্বতশ্রেণির অংশ। চারপাশের তিব্বতি মালভূমি বিস্তীর্ণ, শুষ্ক এবং দুর্গম। বছরের বড় সময়ই এখানে ঠান্ডা তীব্র থাকে। উচ্চতার কারণে অক্সিজেনও সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় অনেক কম।

কৈলাশের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে রয়েছে মানস সরোবর। এর পশ্চিমে রাক্ষসতাল।

মানস সরোবর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৫৮৮ মিটার ওপরে অবস্থিত। এটি বিশ্বের উচ্চতম মিঠা পানির হ্রদগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। রাক্ষসতাল আবার লবণাক্ত হ্রদ।

দুটি হ্রদ পাশাপাশি অবস্থান করলেও ধর্মীয় কল্পনায় তাদের পরিচয় একেবারেই আলাদা। মানস সরোবর পবিত্রতার প্রতীক; রাক্ষসতালকে ঘিরে আছে পুরাণ ও লোকবিশ্বাসের নানা গল্প।

একই পর্বত, চার ধর্ম

কৈলাশের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক সম্ভবত এখানেই।

একটি পর্বতকে চারটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের মানুষ পবিত্র মনে করে।

হিন্দু ধর্মে কৈলাশ ভগবান শিবের আবাস হিসেবে পরিচিত। ধর্মীয় বিশ্বাসে শিব এখানে ধ্যানমগ্ন থাকেন—এমন ধারণা বহু মানুষের কাছে গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে।

তিব্বতি বৌদ্ধ ঐতিহ্যে কৈলাশ পবিত্র পর্বত। এর সঙ্গে মহাজাগতিক পর্বত মেরুর ধারণারও সম্পর্ক রয়েছে।

জৈন ঐতিহ্যে কৈলাশকে কখনো অষ্টাপদ পর্বতের সঙ্গে অভিন্ন মনে করা হয় এবং প্রথম তীর্থংকর ঋষভনাথের মুক্তিলাভের স্থানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে এই পরিচয় নিয়ে সব জৈন সম্প্রদায়ের মধ্যে একমত ধারণা নেই।

আর তিব্বতের প্রাচীন বön ধর্মের অনুসারীদের কাছেও কৈলাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র স্থান।

UNESCO World Heritage Centre-এর Tentative List-এ থাকা ‘Scenic and historic area of Sacred Mountains and Lakes’ নথিতেও কৈলাশ ও মানস সরোবরকে বহু ধর্মীয় ঐতিহ্যের পবিত্র ভূদৃশ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার—কৈলাশ এখনো UNESCO World Heritage List-এর চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত স্থান নয়। এটি চীনের Tentative List-এ থাকা একটি প্রস্তাবিত এলাকা।

চূড়ার বদলে পরিক্রমা

কৈলাশে তীর্থযাত্রার মূল আকর্ষণ পর্বতারোহণ নয়। বরং পর্বতের চারপাশে পরিক্রমা।

তিব্বতি ভাষায় এই পরিক্রমাকে বলা হয় কোরা

প্রচলিত পরিক্রমার পথ প্রায় ৫২ কিলোমিটার। পথটি কোনো সমতল হাঁটার রাস্তা নয়। কোথাও খাড়া, কোথাও পাথুরে; কোথাও বরফে ঢাকা। তার সঙ্গে রয়েছে উচ্চতার চাপ, ঠান্ডা ও কম অক্সিজেন।

তবু মানুষ এই পথ পাড়ি দেন।

কেউ সাধারণভাবে হাঁটেন। কেউ প্রার্থনা করতে করতে এগিয়ে যান। আবার কেউ পুরো শরীর মাটিতে প্রসারিত করে প্রণাম করেন, তারপর উঠে কয়েক পা এগিয়ে আবার একইভাবে প্রণাম করেন।

এখানে লক্ষ্য চূড়ায় পৌঁছানো নয়।

লক্ষ্য হলো পবিত্র পর্বতকে ঘিরে একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা সম্পন্ন করা।

কৈলাশ তাই পর্বতারোহণের প্রচলিত ধারণাকেই যেন উল্টে দেয়।

চার নদীর গল্পে কতটা সত্য?

কৈলাশ নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত তথ্যগুলোর একটি হলো—এই পর্বত থেকেই নাকি চারটি বিশাল নদীর জন্ম।

বিষয়টি এত সরল নয়।

কৈলাশ-মানস সরোবর অঞ্চল বৃহত্তর তিব্বতি মালভূমির এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জলভূমি, যার সঙ্গে সিন্ধু, শতদ্রু, ব্রহ্মপুত্রের উজানভাগ এবং কর্ণালি নদীর জলপ্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে।

অর্থাৎ এই নদীগুলোর উৎসাঞ্চল বৃহত্তর কৈলাশ-মানস সরোবর ও তিব্বতি মালভূমির ভূপ্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু ‘কৈলাশের চূড়া থেকে চারটি নদী বের হয়েছে’—এভাবে বলা ভূগোলকে অতিরঞ্জিত করা।

প্রকৃতির এই জলব্যবস্থাই অবশ্য কৈলাশ অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। ধর্মীয় পবিত্রতার পাশাপাশি এই অঞ্চল এশিয়ার জলভূগোলেও গুরুত্বপূর্ণ।

যারা উঠতে চেয়েছিলেন

কৈলাশের চূড়ায় সফল আরোহণের কোনো স্বীকৃত রেকর্ড নেই। কিন্তু এর মানে এই নয় যে পর্বতারোহীরা কখনো এর দিকে তাকাননি।

১৯২৬ সালে ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও পর্বতারোহী হিউ রাটলেজ কৈলাশ অঞ্চলে যান। ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়, তিনি পর্বতের সম্ভাব্য আরোহণপথ নিয়ে চিন্তা করেছিলেন। একই সময়ে কর্নেল আর. সি. উইলসন-ও কৈলাশের সম্ভাব্য রুট অনুসন্ধান করেন।

তাঁদের অভিযান কৈলাশের চূড়ায় পৌঁছায়নি।

১৯৩৫ সালে অস্ট্রিয়ান পর্বতারোহী হারবার্ট টিচি কৈলাশ পরিক্রমা করেন। ১৯৩৬ সালে অগুস্তো গানসারও পর্বতটি প্রদক্ষিণ করেন।

এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি—পরিক্রমা আর শৃঙ্গারোহণ এক বিষয় নয়।

কৈলাশকে ঘিরে অনেক সময় এই দুটি বিষয় এক করে ফেলা হয়।

মেসনার কেন উঠলেন না?

কৈলাশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে আলোচিত পর্বতারোহীদের একজন রাইনহোল্ড মেসনার।

পর্বতারোহণের ইতিহাসে তাঁর নাম কিংবদন্তির মতো। তিনি বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি শৃঙ্গ আরোহণকারী প্রথম ব্যক্তিদের একজন।

কৈলাশে ওঠার সুযোগের কথাও তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

১৯৮০-এর দশকে চীনা কর্তৃপক্ষ তাঁকে কৈলাশে আরোহণের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। মেসনার সেই সুযোগ গ্রহণ করেননি।

এই ঘটনাকে অনেক সময় কৈলাশের ধর্মীয় মর্যাদার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা প্রয়োজন। মেসনারকে ঠিক কী ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল—এ নিয়ে বিভিন্ন প্রকাশিত বর্ণনায় পার্থক্য আছে। তাই বিষয়টিকে নিঃসন্দেহে ‘সরকারি অনুমতি’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেয়ে ‘আরোহণের সুযোগের প্রস্তাব’ হিসেবে বলা বেশি নিরাপদ।

২০০১: বিতর্কের বছর

কৈলাশের আরোহণের ইতিহাসে ২০০১ সালও গুরুত্বপূর্ণ।

সে বছর একটি স্প্যানিশ দলের কৈলাশে ওঠার পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র বিতর্ক হয়। পর্বতারোহী মহল ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনেকেই এর বিরোধিতা করেন।

অভিযানটি শেষ পর্যন্ত কৈলাশের চূড়ায় সফল আরোহণে পরিণত হয়নি।

এই ঘটনার পর কৈলাশে আরোহণের ওপর নিষেধাজ্ঞার অবস্থান আরও দৃঢ় হয়।

তবে ২০০১ সালের ঘটনা নিয়ে পুরোনো বিভিন্ন প্রতিবেদনে তথ্যের পার্থক্য রয়েছে। তাই ঘটনাটিকে ‘একটি বিতর্কিত আরোহণ-পরিকল্পনা’ হিসেবে উপস্থাপন করাই বেশি নির্ভরযোগ্য।

মিলারেপার গল্প, কিন্তু প্রমাণ নয়

কৈলাশকে ঘিরে তিব্বতি বৌদ্ধদের মধ্যে সাধক মিলারেপাকে নিয়ে একটি বিখ্যাত কিংবদন্তি রয়েছে।

গল্পে বলা হয়, মিলারেপা কৈলাশের চূড়ায় উঠেছিলেন। কখনো আবার তাঁর সঙ্গে অন্য এক সাধকের আধ্যাত্মিক প্রতিযোগিতার কাহিনিও বলা হয়।

গল্পগুলো আকর্ষণীয়।

কিন্তু এগুলো ধর্মীয় কিংবদন্তি।

আধুনিক পর্বতারোহণের নথি হিসেবে এগুলোকে গ্রহণ করা যায় না।

কৈলাশ নিয়ে তথ্যভিত্তিক কোনো লেখা বা প্রামাণ্যচিত্রে তাই ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়ে বলা উচিত—এটি বিশ্বাসের কাহিনি, প্রমাণিত শৃঙ্গারোহণের ইতিহাস নয়।

পিরামিডের রহস্য

কৈলাশের ছবি দেখলে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো এর আকৃতি।

কিছু দিক থেকে পর্বতটিকে প্রায় পিরামিডের মতো দেখায়। তুষার ও পাথরের রেখা তার আকৃতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

এই দৃশ্য থেকেই জন্ম নিয়েছে নানা তত্ত্ব।

কেউ বলেন, কৈলাশ আসলে একটি বিশাল পিরামিড।

কেউ বলেন, এটি মানুষের তৈরি কোনো প্রাচীন স্থাপনা।

কেউ আবার এর সঙ্গে ভিনগ্রহের সভ্যতার যোগসূত্র খোঁজেন।

কিন্তু এসব দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

কৈলাশ একটি প্রাকৃতিক পর্বত। এর অস্বাভাবিক ও সমমিত আকৃতি মানুষের কৌতূহল তৈরি করতে পারে, কিন্তু কৌতূহল কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়।

সময় কি সেখানে অন্যভাবে চলে?

কৈলাশ নিয়ে আরেকটি বহুল প্রচলিত গল্প—সেখানে নাকি সময়ের গতি বদলে যায়।

কেউ বলেন, চুল ও নখ দ্রুত বাড়ে। কেউ বলেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে।

কিন্তু এসব দাবির নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

উচ্চ উচ্চতায় কম অক্সিজেন, ঠান্ডা, শুষ্কতা ও শারীরিক চাপ মানুষের শরীরে নানা প্রভাব ফেলতে পারে। ক্লান্তি, মাথা ঘোরা কিংবা সময়ের অনুভূতিতে পরিবর্তনও ঘটতে পারে।

কিন্তু এর অর্থ সময়ের প্রকৃত গতি বদলে যাওয়া নয়।

কৈলাশের রহস্যকে আকর্ষণীয় করতে গিয়ে তাই বৈজ্ঞানিক সত্যকে গল্পের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা উচিত নয়।

কেন কেউ ওঠে না?

এই প্রশ্নের উত্তর একক নয়।

প্রথম কারণ—ধর্মীয় শ্রদ্ধা।

দ্বিতীয়ত—পর্বতের পরিবেশ।

কৈলাশ প্রায় ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উঁচু। উচ্চতার সঙ্গে কম অক্সিজেন, ঠান্ডা, তীব্র বাতাস, বরফ ও দুর্গম ভূপ্রকৃতি যুক্ত হয়েছে।

তবে কৈলাশ পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু বা সবচেয়ে কঠিন পর্বত নয়।

তাই ‘কৈলাশকে কোনো মানুষ জয় করতে পারেনি কারণ এটি পৃথিবীর অজেয় পর্বত’—এমন ব্যাখ্যাও অতিরঞ্জিত।

কৈলাশের বিশেষত্ব হলো, এখানে প্রকৃতির কঠিন পরিবেশের সঙ্গে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস যুক্ত হয়েছে।

একজন পর্বতারোহী যেখানে চূড়াকে একটি লক্ষ্য হিসেবে দেখতে পারেন, একজন তীর্থযাত্রী সেখানে দেখতে পারেন দেবতার আবাস।

দৃষ্টিভঙ্গির এই পার্থক্যই কৈলাশকে অনন্য করেছে।

UNESCO-র স্বীকৃতি কোথায়?

কৈলাশের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আরেকটি ভুল প্রায়ই হয়।

অনেকে বলেন, ‘UNESCO কৈলাশকে World Heritage Site ঘোষণা করেছে।’

এটি সঠিক নয়।

কৈলাশ ও মানস সরোবর-সংলগ্ন পবিত্র ভূদৃশ্য UNESCO-র Tentative List-এ রয়েছে।

Tentative List হলো কোনো দেশের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ World Heritage মনোনয়নের তালিকা। এটি চূড়ান্ত World Heritage স্বীকৃতি নয়।

অর্থাৎ কৈলাশের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু এটিকে বর্তমানে UNESCO World Heritage Site বলা যাবে না।

আসল রহস্য কোথায়?

কৈলাশকে ঘিরে রহস্যের কমতি নেই।

কিন্তু সব রহস্যের পেছনে অলৌকিক ব্যাখ্যা খোঁজার প্রয়োজনও নেই।

কৈলাশের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হয়তো এটাই—

একটি পর্বতকে ঘিরে চারটি ধর্মীয় ঐতিহ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজস্ব বিশ্বাস তৈরি করেছে।

মানুষ এখানে এসেছে, পরিক্রমা করেছে, প্রার্থনা করেছে।

পর্বতারোহীরা এর দিকে তাকিয়েছেন।

কেউ ওঠার কথা ভেবেছেন।

কেউ চেষ্টা করেছেন।

কেউ সুযোগ পেয়েও ওঠেননি।

আর আজও কোনো স্বীকৃত সফল শৃঙ্গারোহণের রেকর্ড নেই।

এখানে প্রকৃতি ও বিশ্বাস একে অপরকে ছাপিয়ে যায় না; বরং পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে।

জয়ের নয়, শ্রদ্ধার

পৃথিবীর অনেক পর্বতের ইতিহাস লেখা হয়েছে জয় দিয়ে।

কৈলাশের ইতিহাস লেখা হয়েছে পরিক্রমা দিয়ে।

অনেক পর্বতারোহীর কাছে একটি শৃঙ্গ মানে চ্যালেঞ্জ।

কৈলাশের ক্ষেত্রে বহু মানুষের কাছে সেই শৃঙ্গ মানে প্রার্থনা।

এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানো মানুষের সামর্থ্যের প্রতীক হতে পারে।

কৈলাশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হয়তো মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

এই কারণেই কৈলাশকে শুধু ‘অজেয় পর্বত’ বলা হয়তো তার প্রকৃত অর্থকে ছোট করে ফেলে।

এটি এমন একটি পর্বত, যাকে বহু মানুষ জয় করতে চান না

তাঁরা শুধু তার চারপাশে হাঁটেন।

তার দিকে তাকান।

প্রার্থনা করেন।

তারপর ফিরে যান।

তুষারঢাকা কৈলাশ তখনও দাঁড়িয়ে থাকে।

নীরব।

অপরিবর্তিত।

মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়।

কিন্তু পর্বত থেকে যায়।

হয়তো এটাই কৈলাশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—

সবকিছু জয় করতে হয় না।
কিছু কিছু জিনিসকে শুধু শ্রদ্ধা করলেই হয়।

আর সেই কারণেই—

কৈলাশ জয়ের নয়, শ্রদ্ধার পর্বত।

সম্পর্কিত

পৃথিবী, মহাসাগর ও ইতিহাসের অজানা অধ্যায় নিয়ে সেরা বাংলা ডকুমেন্টারি

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

কৈলাশ: যে পর্বতের চূড়ায় আজও মানুষের পায়ের ছাপ নেই

প্রকাশের সময় ০৬:১২:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

পশ্চিম তিব্বতের দুর্গম মালভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উঁচু এক পর্বত। পৃথিবীর সর্বোচ্চ নয়, তবু কোটি মানুষের কাছে এটি পবিত্র। চার ধর্মের বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এর নাম। পর্বতারোহীরা একসময় চূড়ায় ওঠার কথা ভেবেছেন, কেউ চেষ্টা করেছেন; কিন্তু স্বীকৃত ইতিহাসে আজও নেই সফল শৃঙ্গারোহণের রেকর্ড। কেন?

পৃথিবীর বড় বড় পর্বতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যেন জয়-পরাজয়ের। কে প্রথম উঠলেন, কে নতুন পথ আবিষ্কার করলেন, কে সবচেয়ে দ্রুত চূড়ায় পৌঁছালেন—পর্বতারোহণের ইতিহাসে এমন প্রশ্নের কমতি নেই। এভারেস্টের চূড়ায় প্রথম মানুষের পদচিহ্ন পড়েছে ১৯৫৩ সালে। এরপর বহুবার জয় হয়েছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

কিন্তু তিব্বতের কৈলাশের গল্প আলাদা।

এখানে চূড়ায় ওঠাকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয় না। বরং পর্বতটিকে ঘিরে হাঁটা, প্রার্থনা করা এবং দূর থেকে শ্রদ্ধা জানানোই বহু মানুষের কাছে বড় সাধনা।

তাই কৈলাশের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার উচ্চতা নয়। বরং এমন এক পবিত্র পর্বত হিসেবে তার পরিচয়, যার চূড়ায় মানুষের সফল আরোহণের কোনো স্বীকৃত রেকর্ড নেই।

মানচিত্রে কৈলাশ

কৈলাশ অবস্থিত চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নগারি প্রিফেকচারে। তিব্বতি ভাষায় এর একটি পরিচিত নাম গাং রিনপোচে। উচ্চতা ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার।

ভৌগোলিকভাবে এটি কৈলাশ বা গাংদিসে পর্বতশ্রেণির অংশ। চারপাশের তিব্বতি মালভূমি বিস্তীর্ণ, শুষ্ক এবং দুর্গম। বছরের বড় সময়ই এখানে ঠান্ডা তীব্র থাকে। উচ্চতার কারণে অক্সিজেনও সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় অনেক কম।

কৈলাশের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে রয়েছে মানস সরোবর। এর পশ্চিমে রাক্ষসতাল।

মানস সরোবর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৫৮৮ মিটার ওপরে অবস্থিত। এটি বিশ্বের উচ্চতম মিঠা পানির হ্রদগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। রাক্ষসতাল আবার লবণাক্ত হ্রদ।

দুটি হ্রদ পাশাপাশি অবস্থান করলেও ধর্মীয় কল্পনায় তাদের পরিচয় একেবারেই আলাদা। মানস সরোবর পবিত্রতার প্রতীক; রাক্ষসতালকে ঘিরে আছে পুরাণ ও লোকবিশ্বাসের নানা গল্প।

একই পর্বত, চার ধর্ম

কৈলাশের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক সম্ভবত এখানেই।

একটি পর্বতকে চারটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের মানুষ পবিত্র মনে করে।

হিন্দু ধর্মে কৈলাশ ভগবান শিবের আবাস হিসেবে পরিচিত। ধর্মীয় বিশ্বাসে শিব এখানে ধ্যানমগ্ন থাকেন—এমন ধারণা বহু মানুষের কাছে গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে।

তিব্বতি বৌদ্ধ ঐতিহ্যে কৈলাশ পবিত্র পর্বত। এর সঙ্গে মহাজাগতিক পর্বত মেরুর ধারণারও সম্পর্ক রয়েছে।

জৈন ঐতিহ্যে কৈলাশকে কখনো অষ্টাপদ পর্বতের সঙ্গে অভিন্ন মনে করা হয় এবং প্রথম তীর্থংকর ঋষভনাথের মুক্তিলাভের স্থানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে এই পরিচয় নিয়ে সব জৈন সম্প্রদায়ের মধ্যে একমত ধারণা নেই।

আর তিব্বতের প্রাচীন বön ধর্মের অনুসারীদের কাছেও কৈলাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র স্থান।

UNESCO World Heritage Centre-এর Tentative List-এ থাকা ‘Scenic and historic area of Sacred Mountains and Lakes’ নথিতেও কৈলাশ ও মানস সরোবরকে বহু ধর্মীয় ঐতিহ্যের পবিত্র ভূদৃশ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার—কৈলাশ এখনো UNESCO World Heritage List-এর চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত স্থান নয়। এটি চীনের Tentative List-এ থাকা একটি প্রস্তাবিত এলাকা।

চূড়ার বদলে পরিক্রমা

কৈলাশে তীর্থযাত্রার মূল আকর্ষণ পর্বতারোহণ নয়। বরং পর্বতের চারপাশে পরিক্রমা।

তিব্বতি ভাষায় এই পরিক্রমাকে বলা হয় কোরা

প্রচলিত পরিক্রমার পথ প্রায় ৫২ কিলোমিটার। পথটি কোনো সমতল হাঁটার রাস্তা নয়। কোথাও খাড়া, কোথাও পাথুরে; কোথাও বরফে ঢাকা। তার সঙ্গে রয়েছে উচ্চতার চাপ, ঠান্ডা ও কম অক্সিজেন।

তবু মানুষ এই পথ পাড়ি দেন।

কেউ সাধারণভাবে হাঁটেন। কেউ প্রার্থনা করতে করতে এগিয়ে যান। আবার কেউ পুরো শরীর মাটিতে প্রসারিত করে প্রণাম করেন, তারপর উঠে কয়েক পা এগিয়ে আবার একইভাবে প্রণাম করেন।

এখানে লক্ষ্য চূড়ায় পৌঁছানো নয়।

লক্ষ্য হলো পবিত্র পর্বতকে ঘিরে একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা সম্পন্ন করা।

কৈলাশ তাই পর্বতারোহণের প্রচলিত ধারণাকেই যেন উল্টে দেয়।

চার নদীর গল্পে কতটা সত্য?

কৈলাশ নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত তথ্যগুলোর একটি হলো—এই পর্বত থেকেই নাকি চারটি বিশাল নদীর জন্ম।

বিষয়টি এত সরল নয়।

কৈলাশ-মানস সরোবর অঞ্চল বৃহত্তর তিব্বতি মালভূমির এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জলভূমি, যার সঙ্গে সিন্ধু, শতদ্রু, ব্রহ্মপুত্রের উজানভাগ এবং কর্ণালি নদীর জলপ্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে।

অর্থাৎ এই নদীগুলোর উৎসাঞ্চল বৃহত্তর কৈলাশ-মানস সরোবর ও তিব্বতি মালভূমির ভূপ্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু ‘কৈলাশের চূড়া থেকে চারটি নদী বের হয়েছে’—এভাবে বলা ভূগোলকে অতিরঞ্জিত করা।

প্রকৃতির এই জলব্যবস্থাই অবশ্য কৈলাশ অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। ধর্মীয় পবিত্রতার পাশাপাশি এই অঞ্চল এশিয়ার জলভূগোলেও গুরুত্বপূর্ণ।

যারা উঠতে চেয়েছিলেন

কৈলাশের চূড়ায় সফল আরোহণের কোনো স্বীকৃত রেকর্ড নেই। কিন্তু এর মানে এই নয় যে পর্বতারোহীরা কখনো এর দিকে তাকাননি।

১৯২৬ সালে ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও পর্বতারোহী হিউ রাটলেজ কৈলাশ অঞ্চলে যান। ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়, তিনি পর্বতের সম্ভাব্য আরোহণপথ নিয়ে চিন্তা করেছিলেন। একই সময়ে কর্নেল আর. সি. উইলসন-ও কৈলাশের সম্ভাব্য রুট অনুসন্ধান করেন।

তাঁদের অভিযান কৈলাশের চূড়ায় পৌঁছায়নি।

১৯৩৫ সালে অস্ট্রিয়ান পর্বতারোহী হারবার্ট টিচি কৈলাশ পরিক্রমা করেন। ১৯৩৬ সালে অগুস্তো গানসারও পর্বতটি প্রদক্ষিণ করেন।

এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি—পরিক্রমা আর শৃঙ্গারোহণ এক বিষয় নয়।

কৈলাশকে ঘিরে অনেক সময় এই দুটি বিষয় এক করে ফেলা হয়।

মেসনার কেন উঠলেন না?

কৈলাশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে আলোচিত পর্বতারোহীদের একজন রাইনহোল্ড মেসনার।

পর্বতারোহণের ইতিহাসে তাঁর নাম কিংবদন্তির মতো। তিনি বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি শৃঙ্গ আরোহণকারী প্রথম ব্যক্তিদের একজন।

কৈলাশে ওঠার সুযোগের কথাও তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

১৯৮০-এর দশকে চীনা কর্তৃপক্ষ তাঁকে কৈলাশে আরোহণের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। মেসনার সেই সুযোগ গ্রহণ করেননি।

এই ঘটনাকে অনেক সময় কৈলাশের ধর্মীয় মর্যাদার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা প্রয়োজন। মেসনারকে ঠিক কী ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল—এ নিয়ে বিভিন্ন প্রকাশিত বর্ণনায় পার্থক্য আছে। তাই বিষয়টিকে নিঃসন্দেহে ‘সরকারি অনুমতি’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেয়ে ‘আরোহণের সুযোগের প্রস্তাব’ হিসেবে বলা বেশি নিরাপদ।

২০০১: বিতর্কের বছর

কৈলাশের আরোহণের ইতিহাসে ২০০১ সালও গুরুত্বপূর্ণ।

সে বছর একটি স্প্যানিশ দলের কৈলাশে ওঠার পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র বিতর্ক হয়। পর্বতারোহী মহল ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনেকেই এর বিরোধিতা করেন।

অভিযানটি শেষ পর্যন্ত কৈলাশের চূড়ায় সফল আরোহণে পরিণত হয়নি।

এই ঘটনার পর কৈলাশে আরোহণের ওপর নিষেধাজ্ঞার অবস্থান আরও দৃঢ় হয়।

তবে ২০০১ সালের ঘটনা নিয়ে পুরোনো বিভিন্ন প্রতিবেদনে তথ্যের পার্থক্য রয়েছে। তাই ঘটনাটিকে ‘একটি বিতর্কিত আরোহণ-পরিকল্পনা’ হিসেবে উপস্থাপন করাই বেশি নির্ভরযোগ্য।

মিলারেপার গল্প, কিন্তু প্রমাণ নয়

কৈলাশকে ঘিরে তিব্বতি বৌদ্ধদের মধ্যে সাধক মিলারেপাকে নিয়ে একটি বিখ্যাত কিংবদন্তি রয়েছে।

গল্পে বলা হয়, মিলারেপা কৈলাশের চূড়ায় উঠেছিলেন। কখনো আবার তাঁর সঙ্গে অন্য এক সাধকের আধ্যাত্মিক প্রতিযোগিতার কাহিনিও বলা হয়।

গল্পগুলো আকর্ষণীয়।

কিন্তু এগুলো ধর্মীয় কিংবদন্তি।

আধুনিক পর্বতারোহণের নথি হিসেবে এগুলোকে গ্রহণ করা যায় না।

কৈলাশ নিয়ে তথ্যভিত্তিক কোনো লেখা বা প্রামাণ্যচিত্রে তাই ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়ে বলা উচিত—এটি বিশ্বাসের কাহিনি, প্রমাণিত শৃঙ্গারোহণের ইতিহাস নয়।

পিরামিডের রহস্য

কৈলাশের ছবি দেখলে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো এর আকৃতি।

কিছু দিক থেকে পর্বতটিকে প্রায় পিরামিডের মতো দেখায়। তুষার ও পাথরের রেখা তার আকৃতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

এই দৃশ্য থেকেই জন্ম নিয়েছে নানা তত্ত্ব।

কেউ বলেন, কৈলাশ আসলে একটি বিশাল পিরামিড।

কেউ বলেন, এটি মানুষের তৈরি কোনো প্রাচীন স্থাপনা।

কেউ আবার এর সঙ্গে ভিনগ্রহের সভ্যতার যোগসূত্র খোঁজেন।

কিন্তু এসব দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

কৈলাশ একটি প্রাকৃতিক পর্বত। এর অস্বাভাবিক ও সমমিত আকৃতি মানুষের কৌতূহল তৈরি করতে পারে, কিন্তু কৌতূহল কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়।

সময় কি সেখানে অন্যভাবে চলে?

কৈলাশ নিয়ে আরেকটি বহুল প্রচলিত গল্প—সেখানে নাকি সময়ের গতি বদলে যায়।

কেউ বলেন, চুল ও নখ দ্রুত বাড়ে। কেউ বলেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে।

কিন্তু এসব দাবির নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

উচ্চ উচ্চতায় কম অক্সিজেন, ঠান্ডা, শুষ্কতা ও শারীরিক চাপ মানুষের শরীরে নানা প্রভাব ফেলতে পারে। ক্লান্তি, মাথা ঘোরা কিংবা সময়ের অনুভূতিতে পরিবর্তনও ঘটতে পারে।

কিন্তু এর অর্থ সময়ের প্রকৃত গতি বদলে যাওয়া নয়।

কৈলাশের রহস্যকে আকর্ষণীয় করতে গিয়ে তাই বৈজ্ঞানিক সত্যকে গল্পের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা উচিত নয়।

কেন কেউ ওঠে না?

এই প্রশ্নের উত্তর একক নয়।

প্রথম কারণ—ধর্মীয় শ্রদ্ধা।

দ্বিতীয়ত—পর্বতের পরিবেশ।

কৈলাশ প্রায় ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উঁচু। উচ্চতার সঙ্গে কম অক্সিজেন, ঠান্ডা, তীব্র বাতাস, বরফ ও দুর্গম ভূপ্রকৃতি যুক্ত হয়েছে।

তবে কৈলাশ পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু বা সবচেয়ে কঠিন পর্বত নয়।

তাই ‘কৈলাশকে কোনো মানুষ জয় করতে পারেনি কারণ এটি পৃথিবীর অজেয় পর্বত’—এমন ব্যাখ্যাও অতিরঞ্জিত।

কৈলাশের বিশেষত্ব হলো, এখানে প্রকৃতির কঠিন পরিবেশের সঙ্গে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস যুক্ত হয়েছে।

একজন পর্বতারোহী যেখানে চূড়াকে একটি লক্ষ্য হিসেবে দেখতে পারেন, একজন তীর্থযাত্রী সেখানে দেখতে পারেন দেবতার আবাস।

দৃষ্টিভঙ্গির এই পার্থক্যই কৈলাশকে অনন্য করেছে।

UNESCO-র স্বীকৃতি কোথায়?

কৈলাশের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আরেকটি ভুল প্রায়ই হয়।

অনেকে বলেন, ‘UNESCO কৈলাশকে World Heritage Site ঘোষণা করেছে।’

এটি সঠিক নয়।

কৈলাশ ও মানস সরোবর-সংলগ্ন পবিত্র ভূদৃশ্য UNESCO-র Tentative List-এ রয়েছে।

Tentative List হলো কোনো দেশের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ World Heritage মনোনয়নের তালিকা। এটি চূড়ান্ত World Heritage স্বীকৃতি নয়।

অর্থাৎ কৈলাশের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু এটিকে বর্তমানে UNESCO World Heritage Site বলা যাবে না।

আসল রহস্য কোথায়?

কৈলাশকে ঘিরে রহস্যের কমতি নেই।

কিন্তু সব রহস্যের পেছনে অলৌকিক ব্যাখ্যা খোঁজার প্রয়োজনও নেই।

কৈলাশের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হয়তো এটাই—

একটি পর্বতকে ঘিরে চারটি ধর্মীয় ঐতিহ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজস্ব বিশ্বাস তৈরি করেছে।

মানুষ এখানে এসেছে, পরিক্রমা করেছে, প্রার্থনা করেছে।

পর্বতারোহীরা এর দিকে তাকিয়েছেন।

কেউ ওঠার কথা ভেবেছেন।

কেউ চেষ্টা করেছেন।

কেউ সুযোগ পেয়েও ওঠেননি।

আর আজও কোনো স্বীকৃত সফল শৃঙ্গারোহণের রেকর্ড নেই।

এখানে প্রকৃতি ও বিশ্বাস একে অপরকে ছাপিয়ে যায় না; বরং পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে।

জয়ের নয়, শ্রদ্ধার

পৃথিবীর অনেক পর্বতের ইতিহাস লেখা হয়েছে জয় দিয়ে।

কৈলাশের ইতিহাস লেখা হয়েছে পরিক্রমা দিয়ে।

অনেক পর্বতারোহীর কাছে একটি শৃঙ্গ মানে চ্যালেঞ্জ।

কৈলাশের ক্ষেত্রে বহু মানুষের কাছে সেই শৃঙ্গ মানে প্রার্থনা।

এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানো মানুষের সামর্থ্যের প্রতীক হতে পারে।

কৈলাশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হয়তো মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

এই কারণেই কৈলাশকে শুধু ‘অজেয় পর্বত’ বলা হয়তো তার প্রকৃত অর্থকে ছোট করে ফেলে।

এটি এমন একটি পর্বত, যাকে বহু মানুষ জয় করতে চান না

তাঁরা শুধু তার চারপাশে হাঁটেন।

তার দিকে তাকান।

প্রার্থনা করেন।

তারপর ফিরে যান।

তুষারঢাকা কৈলাশ তখনও দাঁড়িয়ে থাকে।

নীরব।

অপরিবর্তিত।

মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়।

কিন্তু পর্বত থেকে যায়।

হয়তো এটাই কৈলাশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—

সবকিছু জয় করতে হয় না।
কিছু কিছু জিনিসকে শুধু শ্রদ্ধা করলেই হয়।

আর সেই কারণেই—

কৈলাশ জয়ের নয়, শ্রদ্ধার পর্বত।