Dhaka রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৩ মাস ২৫ দিন পর বাড়ি ফিরল শুভ দাসের মরদেহ

ভাগ্য বদলাতে লেবাননে গিয়েছিলেন শুভ, ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে

আব্দুর রহমান
  • প্রকাশের সময় ০৫:৩৪:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২ বার দেখা হয়েছে

ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর সময় কত স্বপ্নই না দেখেছিলেন সুরঞ্জন দাস। সংসারের অভাব ঘুচবে, ধারদেনা শোধ হবে, ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনার খরচ জুটবে। একদিন হয়তো ছেলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাবে। সেই স্বপ্ন নিয়েই ২৩ বছরের শুভ দাস পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর লেবাননে। কিন্তু ভাগ্য যেন তাঁর পরিবারের জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার ৩ মাস ২৫ দিন পর রোববার সকালে কফিনবন্দী হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন শুভ। যে ছেলেকে একদিন জীবিত ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন মা-বাবা, তাঁকে ফিরতে হলো নিথর দেহ হয়ে।
শুভর মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন মা শিখা দাস, বাবা সুরঞ্জন দাস ও স্বজনেরা। ছেলেকে শেষবারের মতো দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন প্রতিবেশী ও স্বজনেরা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয় মানুষটিকে কাছে পেলেও তাঁকে আর ছুঁয়ে দেখার, কথা বলার কিংবা জড়িয়ে ধরার সুযোগ নেই—এই বাস্তবতাই যেন আরও ভারী করে তোলে শোকের পরিবেশ।
শুভ দাস কলারোয়া উপজেলার শ্রীপতিপুর গ্রামের ভ্যানচালক সুরঞ্জন দাস ও ধানচাতাল শ্রমিক শিখা দাসের মেজো ছেলে।
অভাবের সংসারে বড় হয়েছেন শুভ। বাবার ভ্যান চালানো আর মায়ের শ্রমের আয়ে সংসার চালানোই ছিল কঠিন। তবু পরিবারের জন্য কিছু করার তাগিদ ছিল তাঁর। সেই তাগিদ থেকেই বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত।
ছেলেকে লেবাননে পাঠাতে পরিবারের শেষ সম্বলও হাতছাড়া করতে হয়েছিল। জমি ও গবাদিপশু বিক্রি করা হয়। ধারদেনাও করতে হয়। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, শুভ বিদেশে গিয়ে কাজ করবেন, ঋণের বোঝা কমাবেন এবং সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবেন।
শেষ পর্যন্ত শুভ লেবাননে পৌঁছান। সেখানে কাজও শুরু করেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিয়মিত দেশে টাকা পাঠাতেন। সেই টাকায় সংসারের খরচ চলত, পাশাপাশি ধারদেনাও শোধ করা হতো। দূরদেশে থেকেও পরিবারের চিন্তাই ছিল তাঁর মাথায়। কিন্তু সেই জীবন খুব বেশি দিন স্থায়ী হলো না।
চলতি বছরের ১২ মে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের জেবদিন এলাকায় রুটি বহনকারী একটি গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিন বাংলাদেশি প্রবাসী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শফিকুল ইসলাম, আশাশুনি উপজেলার নাহিদুল ইসলাম নাহিদ এবং কলারোয়ার শুভ দাস।
একটি ফোনকল বদলে দেয় শুভর পরিবারের সবকিছু। যে পরিবার কয়েক মাস আগেও ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল, হঠাৎ সেই পরিবারকে অপেক্ষা করতে হয় ছেলের মরদেহের জন্য। শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলামের মরদেহ গত ২৭ জুন দেশে আনা হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় শুভর মরদেহ ফিরতে আরও দীর্ঘ সময় লাগে।
এই দীর্ঘ অপেক্ষা পরিবারের জন্য ছিল আরেক দফা যন্ত্রণা। প্রতিদিন হয়তো তাঁদের মনে হয়েছে—আজ বুঝি শুভ ফিরবে। কিন্তু দিন গড়িয়েছে, সপ্তাহ পেরিয়েছে, মাস পেরিয়েছে। অবশেষে রোববার সকালে ফিরলেন শুভ। তবে জীবিত নয়; কফিনে করে। শুভর বাবা সুরঞ্জন দাস বলেন, পরিবারের অভাব-অনটন দূর করার আশায় জমি, গবাদিপশু বিক্রি এবং ধারদেনা করে ছেলেকে লেবাননে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর আশা ছিল, ছেলে বিদেশে কাজ করে পরিবারের কষ্ট দূর করবে। কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
একজন বাবার কাছে সন্তানের মরদেহ গ্রহণের চেয়ে কঠিন দৃশ্য আর কী হতে পারে? যে ছেলের আয় দিয়ে পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলানোর স্বপ্ন ছিল, সেই ছেলেকেই এখন শেষবারের মতো বিদায় দিতে হচ্ছে। শুধু একটি পরিবার নয়, শুভর মৃত্যুর সঙ্গে থমকে গেছে একটি পরিবারের ভবিষ্যতের অনেক হিসাবও। বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ, সংসারের খরচ, ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনা—সবকিছু এখন নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে শুভর পরিবারকে সহায়তার কথাও জানানো হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের খুলনাস্থ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সহকারী পরিচালক মঈন আহমেদ জানান, মরদেহ সৎকারের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং যুদ্ধে নিহত হওয়ার কারণে বিশেষ অনুদান হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আর্থিক অনুদান হিসেবে ৩ লাখ টাকা এবং বীমা বাবদ আরও ১০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর পরিবারের। সরকারি এই সহায়তা হয়তো পরিবারের কিছুটা আর্থিক সংকট কমাতে পারে। কিন্তু যে শূন্যতা শুভ রেখে গেলেন, সেটি কোনো অর্থেই পূরণ হওয়ার নয়।
শুভ গিয়েছিলেন পরিবারের ভাগ্য বদলাতে। ফিরলেন নিজের ভাগ্য বদলানোর আগেই। তিন মাস ২৫ দিনের অপেক্ষার পর রোববার তাঁর বাড়ির উঠানে পৌঁছেছে একটি কফিন। কফিনের ভেতর শুয়ে আছেন সেই তরুণ, যাকে ঘিরে মা-বাবার ছিল কত স্বপ্ন। স্বপ্নের দেশে গিয়ে শুভ আর স্বপ্ন নিয়ে ফিরতে পারলেন না। ফিরলেন শুধু স্মৃতি হয়ে।

সম্পর্কিত

পৃথিবী, মহাসাগর ও ইতিহাসের অজানা অধ্যায় নিয়ে সেরা বাংলা ডকুমেন্টারি

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

স্বাদে, মানে ও ভালোবাসায়—লেক ভিউ কেক

৩ মাস ২৫ দিন পর বাড়ি ফিরল শুভ দাসের মরদেহ

ভাগ্য বদলাতে লেবাননে গিয়েছিলেন শুভ, ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে

প্রকাশের সময় ০৫:৩৪:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর সময় কত স্বপ্নই না দেখেছিলেন সুরঞ্জন দাস। সংসারের অভাব ঘুচবে, ধারদেনা শোধ হবে, ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনার খরচ জুটবে। একদিন হয়তো ছেলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাবে। সেই স্বপ্ন নিয়েই ২৩ বছরের শুভ দাস পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর লেবাননে। কিন্তু ভাগ্য যেন তাঁর পরিবারের জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার ৩ মাস ২৫ দিন পর রোববার সকালে কফিনবন্দী হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন শুভ। যে ছেলেকে একদিন জীবিত ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন মা-বাবা, তাঁকে ফিরতে হলো নিথর দেহ হয়ে।
শুভর মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন মা শিখা দাস, বাবা সুরঞ্জন দাস ও স্বজনেরা। ছেলেকে শেষবারের মতো দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন প্রতিবেশী ও স্বজনেরা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয় মানুষটিকে কাছে পেলেও তাঁকে আর ছুঁয়ে দেখার, কথা বলার কিংবা জড়িয়ে ধরার সুযোগ নেই—এই বাস্তবতাই যেন আরও ভারী করে তোলে শোকের পরিবেশ।
শুভ দাস কলারোয়া উপজেলার শ্রীপতিপুর গ্রামের ভ্যানচালক সুরঞ্জন দাস ও ধানচাতাল শ্রমিক শিখা দাসের মেজো ছেলে।
অভাবের সংসারে বড় হয়েছেন শুভ। বাবার ভ্যান চালানো আর মায়ের শ্রমের আয়ে সংসার চালানোই ছিল কঠিন। তবু পরিবারের জন্য কিছু করার তাগিদ ছিল তাঁর। সেই তাগিদ থেকেই বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত।
ছেলেকে লেবাননে পাঠাতে পরিবারের শেষ সম্বলও হাতছাড়া করতে হয়েছিল। জমি ও গবাদিপশু বিক্রি করা হয়। ধারদেনাও করতে হয়। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, শুভ বিদেশে গিয়ে কাজ করবেন, ঋণের বোঝা কমাবেন এবং সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবেন।
শেষ পর্যন্ত শুভ লেবাননে পৌঁছান। সেখানে কাজও শুরু করেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিয়মিত দেশে টাকা পাঠাতেন। সেই টাকায় সংসারের খরচ চলত, পাশাপাশি ধারদেনাও শোধ করা হতো। দূরদেশে থেকেও পরিবারের চিন্তাই ছিল তাঁর মাথায়। কিন্তু সেই জীবন খুব বেশি দিন স্থায়ী হলো না।
চলতি বছরের ১২ মে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের জেবদিন এলাকায় রুটি বহনকারী একটি গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিন বাংলাদেশি প্রবাসী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শফিকুল ইসলাম, আশাশুনি উপজেলার নাহিদুল ইসলাম নাহিদ এবং কলারোয়ার শুভ দাস।
একটি ফোনকল বদলে দেয় শুভর পরিবারের সবকিছু। যে পরিবার কয়েক মাস আগেও ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল, হঠাৎ সেই পরিবারকে অপেক্ষা করতে হয় ছেলের মরদেহের জন্য। শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলামের মরদেহ গত ২৭ জুন দেশে আনা হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় শুভর মরদেহ ফিরতে আরও দীর্ঘ সময় লাগে।
এই দীর্ঘ অপেক্ষা পরিবারের জন্য ছিল আরেক দফা যন্ত্রণা। প্রতিদিন হয়তো তাঁদের মনে হয়েছে—আজ বুঝি শুভ ফিরবে। কিন্তু দিন গড়িয়েছে, সপ্তাহ পেরিয়েছে, মাস পেরিয়েছে। অবশেষে রোববার সকালে ফিরলেন শুভ। তবে জীবিত নয়; কফিনে করে। শুভর বাবা সুরঞ্জন দাস বলেন, পরিবারের অভাব-অনটন দূর করার আশায় জমি, গবাদিপশু বিক্রি এবং ধারদেনা করে ছেলেকে লেবাননে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর আশা ছিল, ছেলে বিদেশে কাজ করে পরিবারের কষ্ট দূর করবে। কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
একজন বাবার কাছে সন্তানের মরদেহ গ্রহণের চেয়ে কঠিন দৃশ্য আর কী হতে পারে? যে ছেলের আয় দিয়ে পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলানোর স্বপ্ন ছিল, সেই ছেলেকেই এখন শেষবারের মতো বিদায় দিতে হচ্ছে। শুধু একটি পরিবার নয়, শুভর মৃত্যুর সঙ্গে থমকে গেছে একটি পরিবারের ভবিষ্যতের অনেক হিসাবও। বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ, সংসারের খরচ, ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনা—সবকিছু এখন নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে শুভর পরিবারকে সহায়তার কথাও জানানো হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের খুলনাস্থ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সহকারী পরিচালক মঈন আহমেদ জানান, মরদেহ সৎকারের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং যুদ্ধে নিহত হওয়ার কারণে বিশেষ অনুদান হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আর্থিক অনুদান হিসেবে ৩ লাখ টাকা এবং বীমা বাবদ আরও ১০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর পরিবারের। সরকারি এই সহায়তা হয়তো পরিবারের কিছুটা আর্থিক সংকট কমাতে পারে। কিন্তু যে শূন্যতা শুভ রেখে গেলেন, সেটি কোনো অর্থেই পূরণ হওয়ার নয়।
শুভ গিয়েছিলেন পরিবারের ভাগ্য বদলাতে। ফিরলেন নিজের ভাগ্য বদলানোর আগেই। তিন মাস ২৫ দিনের অপেক্ষার পর রোববার তাঁর বাড়ির উঠানে পৌঁছেছে একটি কফিন। কফিনের ভেতর শুয়ে আছেন সেই তরুণ, যাকে ঘিরে মা-বাবার ছিল কত স্বপ্ন। স্বপ্নের দেশে গিয়ে শুভ আর স্বপ্ন নিয়ে ফিরতে পারলেন না। ফিরলেন শুধু স্মৃতি হয়ে।