উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে খাদ্য নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। লবণাক্ত জমির পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে, পাশাপাশি বেড়িবাঁধ ভাঙন, সুপেয় পানির সংকট, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো সংকট গভীর হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, অনিয়ন্ত্রিত লবণ পানির চিংড়ি চাষ এবং উপকূলীয় পোল্ডার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। এতে কৃষিনির্ভর জীবিকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আশির দশক থেকে শুরু হওয়া লবণ পানির চিংড়ি চাষ বর্তমানে শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, দেবহাটা, আশাশুনি, সদর ও তালা উপজেলায় বিস্তৃত হয়েছে। এতে হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে, কমে গেছে ধানসহ খাদ্যশস্য উৎপাদন। গবেষণা অনুযায়ী, বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার সাম্প্রতিক দশকে আরও বেড়েছে। আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (আইপিসিসি) সতর্ক করেছে, ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, যার বড় প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের উপকূলে। ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ এক মিটার বাড়লে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ উপকূলীয় ভূমি প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সাতক্ষীরার নিম্নাঞ্চল এ ঝুঁকির সবচেয়ে বেশি শিকার হবে বলে গবেষকরা মনে করছেন। ইতিমধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা ৫০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, ফলে সুপেয় পানির সংকটে পড়েছে প্রায় কোটি মানুষ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষ প্রতিদিন নিরাপদ পানির পরিবর্তে লবণাক্ত পানি গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি আর্সেনিক, আয়রন ও ফ্লোরাইড দূষণও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার একটি বড় অংশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে। এতে কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ, লবণাক্ততা সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, সুপেয় পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা আরও জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।