সাতক্ষীরায় পাটকাঠিতে বাজিমাত
- প্রকাশের সময় ১০:৩৮:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৫ বার দেখা হয়েছে
সাতক্ষীরায় পাটকাঠিতে বাজিমাত করেছে চাষিরা। পাটকাঠিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা। কৃষকের কাছ থেকে পাটকাঠি কিনে ব্যবসায়ীরা তা নিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন মোকাম ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। ফলে পাটকাঠি এখন কৃষকের বাড়তি আয়ের একটি উৎস হয়ে উঠেছে। একসময় পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর পাটকাঠি পড়ে থাকত অবহেলায়। রান্নার জ্বালানি, ঘরের বেড়া কিংবা পানের বরজে ব্যবহার ছাড়া এর তেমন কোনো মূল্য ছিল না। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর কৃষকেরা পাটকাঠি রোদে শুকিয়ে আঁটি বেঁধে রাখছেন। শুকিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পাইকারেরা কৃষকের বাড়ি থেকেই এসব পাটকাঠি কিনে নিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার নির্দিষ্ট বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করছেন। এতে আগে যে পাটকাঠি অনেক সময় পড়ে থেকে নষ্ট হতো, এখন সেটি বিক্রি করে কৃষকেরা বাড়তি অর্থ পাচ্ছেন।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে জেলাতে এবার পাটের আবাদও বেড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার সাত উপজেলায় ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার বেল। বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে জেলার উৎপাদিত পাটের বাজারমূল্য ২০০ কোটি টাকা এবং পাঠকাটির মূল্য ৩০-৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। তালা উপজেলার খলিষখালি গ্রামের কৃষক আলিম বলেন, ‘আগে পাটকাঠি তেমন দাম পেত না। অনেক সময় জমিতেই পড়ে থাকত। এখন ব্যবসায়ীরা বাড়িতে এসে পাটকাঠি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। পাটকাঠি বিক্রি করে বাড়তি কিছু টাকা পাওয়া যাচ্ছে। এতে কৃষকের উপকার হচ্ছে।’ স্থানীয় ব্যবসায়ী নেছার হক বলেন, ‘আগে পাটকাঠির ক্রেতা ছিল মূলত স্থানীয় মানুষ। এখন বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বড় ব্যবসায়ীরাও পাটকাঠি কিনছেন। চাহিদা বাড়ায় ব্যবসায়ীরাও বিভিন্ন এলাকা থেকে পাটকাঠি সংগ্রহ করছেন।’ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ২০১২ সাল থেকে পাটকাঠির ছাই বা চারকোল রপ্তানি হচ্ছে। একসময় চীন ছিল এর প্রধান বাজার। এখন কানাডা, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশেও বাংলাদেশের চারকোল যাচ্ছে। রপ্তানি বাড়ায় দেশে এ পণ্য উৎপাদনের কারখানাও বাড়ছে। ফলে সাতক্ষীরাতে এর আবাদও বাড়ছে। বিসিসিসিএমইএর সভাপতি মির্জা জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে বছরে ৩০ লাখ টনের বেশি পাটকাঠি উৎপাদিত হয়। এর একটি অংশ পার্টিকেল বোর্ডসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হয়। বড় একটি অংশ এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এসব পাটকাঠি চারকোলসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা গেলে এই খাত থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে পাটকাঠি থেকে চারকোল তৈরিতে বিশেষ চুল্লি ব্যবহার করা হয়। প্রায় ৪৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পাটকাঠি পুড়িয়ে প্রাথমিকভাবে কয়লা তৈরি করা হয়। পরে বিশেষ ক্রাশার মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করে চারকোল তৈরি করা হয়। এর প্রধান উপাদান কার্বন। পাটকাঠির পাশাপাশি তুষ থেকেও একই ধরনের প্রক্রিয়ায় চারকোল উৎপাদন করা হয়। চারকোল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, পাটকাঠির সহজলভ্যতা ও বিদেশে চাহিদা থাকায় এ খাতের সম্ভাবনা অনেক। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চারকোল তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। এর ফলে কৃষকের উৎপাদিত পাটকাঠির জন্য স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি শিল্পভিত্তিক বাজারও তৈরি হচ্ছে। পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চারকোলের নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। এ বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে। একটি কারিগরি কমিটি নীতিমালা প্রস্তুতের কাজ করছে। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পাটকাঠি এখন আর ফেলে দেওয়ার মতো কোনো উপজাত নয়। এটি কৃষকের বাড়তি আয়ের একটি সম্ভাবনাময় উৎস। পাটকাঠির ব্যবহার ও বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের আয় বাড়বে। বিশেষ করে চারকোলসহ শিল্পে এর ব্যবহার বাড়াতে পারলে পাটকাঠির অর্থনৈতিক মূল্য আরও বাড়বে।’



























