বরফ গলে যেখানে, লবণ জমে সেখানে
- প্রকাশের সময় ১২:৩৫:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৫২ বার দেখা হয়েছে
পৃথিবীর দুই প্রান্তে দুটি জনপদ। একটি হিমালয়ের কোলে, যেখানে হাজার বছর ধরে জমে থাকা বরফ এখন আর নিজের জায়গায় স্থির থাকতে পারছে না। আরেকটি বঙ্গোপসাগরের কিনারে, যেখানে সমুদ্রের লবণ প্রতি বছর একটু একটু করে মাটির গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। প্রথমটি নেপাল, দ্বিতীয়টি সাতক্ষীরা। দূরত্বে এই দুই জায়গার মাঝে হাজার কিলোমিটারেরও বেশি ব্যবধান, ভূগোলে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ। কিন্তু একটি অদৃশ্য সুতো এই দুই জনপদকে বেঁধে রেখেছে, আর সেই সুতোর নাম জলবায়ু পরিবর্তন।যেখানে বরফ গলছে, সেই একই কারণে অন্য প্রান্তে লবণ জমছে। এটি কোনো কাব্যিক অতিশয়োক্তি নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা, যা আমাদের চোখের সামনেই ঘটে চলেছে।
২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখ সকালে নেপালের লাংটাং জাতীয় উদ্যানে একটি হিমবাহের অংশবিশেষ হঠাৎ ধসে পড়ে। হিমবাহের নিচের শিলাস্তর দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে ঘটা এই ধস বিশাল পরিমাণ বরফ, পাথর ও পলি নিয়ে ছুটে যায় ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর গতিপথ ধরে। প্রায় একশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এই ধ্বংসাত্মক স্রোত একের পর এক গ্রাম ভাসিয়ে নেয়, সেতু ও সড়ক গুঁড়িয়ে দেয়, এমনকি চীন সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ফটকও মুছে দেয়। এক সপ্তাহের মধ্যে জানা যায়, তেরো শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ তখনো নিখোঁজ ছিলেন। স্রোতের টানে কিছু মৃতদেহ দেড়শ কিলোমিটার দূরে প্রতিবেশী ভারতের ভূখণ্ড পর্যন্ত ভেসে যায়।
এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। হিমালয়ের হিমবাহগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে দ্রুত গলছে ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। যে বরফ শত শত বছর ধরে পাহাড়ের গায়ে আটকে ছিল, তা এখন যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই।
সাতক্ষীরার গল্প আলাদা, কিন্তু একই শিকড় থেকে গজানো। এই উপকূলীয় জেলায় লবণাক্ততা প্রতি বছর বাড়ছে, যার ফলে আগের মতো অনেক ফসলের আবাদ আর সম্ভব হচ্ছে না এবং কৃষকদের বাধ্য হয়ে চাষপদ্ধতি বদলাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বহু পরিবার নিরাপদ খাবার পানির সংকটে ভুগছে, টাকা দিয়ে পানি কিনে খাওয়াই এখন অনেকের কাছে একমাত্র উপায়। এটি একটি নীরব বিপর্যয়, যা প্রতিদিন একটু একটু করে মানুষের জীবনযাত্রা কেড়ে নিচ্ছে, কোনো শিরোনাম ছাড়াই।
স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি উপকূলীয় জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সাতক্ষীরায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঁচ হাজার গাছের চারা রোপণের কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এই উদ্যোগ মূল্যবান, কিন্তু একটি গাছের চারা কোনো ভাঙা বাঁধ মেরামত করতে পারে না, কোনো জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে পারে না।
বরফ গলা আর লবণ জমা, এই দুটি প্রক্রিয়া দেখতে সম্পূর্ণ বিপরীত মনে হলেও আসলে একই ইঞ্জিনের দুটি আউটপুট। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে, আর সেই বর্ধিত সমুদ্র সাতক্ষীরার মতো নিচু উপকূলীয় জমিতে লবণ ঠেলে দিচ্ছে। নেপালের পাহাড়ে যে তাপমাত্রা বরফখণ্ডকে অস্থির করে তুলেছিল, সেই একই তাপমাত্রা বঙ্গোপসাগরের জলকে স্ফীত করছে এবং সাতক্ষীরার মাটিকে অনুর্বর করে তুলছে।
দেশের অন্যান্য প্রান্তেও এই মৌসুমে সতর্কতা এসেছে। তিস্তাসহ দেশের উত্তর, উত্তরপূর্ব ও দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এই পূর্বাভাসগুলো প্রমাণ করে, বাংলাদেশের নদীব্যবস্থা এমনিতেই একটি নাজুক ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উজানের যেকোনো পরিবর্তন ভাটিতে অনুভূত হতে বাধ্য।
সাতক্ষীরা ব-দ্বীপীয় ভূগোলের একেবারে প্রান্তে দাঁড়ানো একটি জেলা। ইছামতি, কালিন্দী ও কপোতাক্ষের মতো নদী এই জেলাকে ঘিরে রেখেছে, আর এসব নদীর ওপর নির্মিত অনেক বাঁধ বছরের পর বছর ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত। আয়লা ও সিডরের মতো ঘূর্ণিঝড় এই দুর্বলতা বারবার উন্মোচন করে দিয়েছে। শ্যামনগর ও তালার মতো উপজেলায় পানি ঢুকে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা লেগে থাকা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা।নেপালের হিমবাহের মতো, সাতক্ষীরার বাঁধও এমন একটি বিন্দুর দিকে এগোচ্ছে, যেখানে দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতা হঠাৎ ভেঙে পড়তে পারে। প্রশ্ন শুধু সময়ের।
প্রথমত, বাঁধ ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিক তদারকি প্রয়োজন, দুর্যোগ ঘটার পর মেরামতের চিরাচরিত অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্রাম পর্যায়ে দ্রুত পৌঁছানো একটি কার্যকর পূর্বসতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। তৃতীয়ত, নিরাপদ পানীয় জলের সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন, কারণ এই সংকট প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং বড় দুর্যোগের সময় মানুষের সহনক্ষমতা কমিয়ে দেয়। চতুর্থত, হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পুরো অববাহিকা জুড়ে তথ্য আদানপ্রদান জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে উজানের একটি ঘটনা সময়মতো ভাটির মানুষের কাছে সতর্কবার্তা হয়ে পৌঁছায়।
বরফ গলে যেখানে, লবণ জমে সেখানে। এই বাক্যটি শুধু একটি কাব্যিক পর্যবেক্ষণ নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা। নেপালের পাহাড়ে যে বিপর্যয় ঘটে গেছে, তার পানি সরাসরি সাতক্ষীরার মাটি স্পর্শ করবে না। কিন্তু যে বৈশ্বিক শক্তি সেই বিপর্যয় ঘটিয়েছে, সেই একই শক্তি প্রতিদিন সাতক্ষীরার মাটিতে লবণ জমিয়ে যাচ্ছে, তার বাঁধকে দুর্বল করে যাচ্ছে। দূরত্বের বিভ্রমে যদি আমরা এই সতর্কতা উপেক্ষা করি, তাহলে আগামী কোনো এক ভরা কটালের রাতে সাতক্ষীরার মানুষকেও হয়তো সেই একই আকস্মিকতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, যার মুখোমুখি নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার মানুষ দাঁড়িয়েছিল এক আগস্টের সকালে।
























