দেশে যখন কৃষকেরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না, তখনই সীমান্ত দিয়ে ইউরিয়া ও টিএসপি সার পাচারের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করে। সেই সার যদি অসাধু চক্রের হাত ধরে প্রতিবেশী দেশে চলে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হন দেশের কৃষকেরা। একই সঙ্গে অপচয় হয় সরকারি অর্থের। তাই সার পাচারের অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে সার পাচারের অভিযোগ উঠেছে। কক্সবাজার, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর ও সাতক্ষীরা সীমান্তকে পাচারের সম্ভাব্য পথ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। জল ও স্থলপথে এসব পণ্য সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিজিবি, কোস্ট গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে সারের চালান জব্দ করলেও পাচার পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। কোথা থেকে সার সংগ্রহ করা হচ্ছে, কারা পরিবহন ও মজুতের সঙ্গে জড়িত এবং কীভাবে সীমান্ত পার করা হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
পাচারের পেছনে বড় প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে দুই দেশের বাজারদরের পার্থক্য। অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকার নির্ধারিত দামে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হলেও মিয়ানমারে এর দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার টাকা হতে পারে। দেশের বাজারে নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে কৃষকদের বেশি দামে কিনতে হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কোথাও প্রতি বস্তা ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় সংগ্রহ করে পাচার করা হলে, ওপারের বাজারে বিক্রির মাধ্যমে বিপুল মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়। তবে এসব মূল্য ও মুনাফার হিসাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভর্তুকির সুবিধা প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না। সরকার কৃষি উৎপাদন ব্যয় সহনীয় রাখতে যে অর্থ ব্যয় করে, তার সুফল যদি পাচারকারীদের হাতে যায়, তবে ভর্তুকির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। সারসংকটের সময়ে কৃষককে বাড়তি দামে সার কিনতে বাধ্য হতে হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে ফসলের উৎপাদন, কৃষকের আয় এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যবাজারেও।
সার পাচার রোধে শুধু সীমান্তে নজরদারি বাড়ালেই হবে না; সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতাও চিহ্নিত করতে হবে। কোন ডিলার কতটুকু সার বরাদ্দ পাচ্ছেন, কোথায় তা বিতরণ করা হচ্ছে এবং বরাদ্দের সঙ্গে প্রকৃত বিক্রির হিসাব মিলছে কি না, তা নিয়মিত নিরীক্ষা করা দরকার। সন্দেহজনক মজুত, অস্বাভাবিক লেনদেন ও পরিবহনপথের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব। জব্দ করা প্রতিটি চালানের উৎস অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট ডিলার, পরিবহনকারী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা যাচাই করতে হবে। তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না; তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
মিয়ানমারে সিমেন্টসহ বিভিন্ন পণ্যের সংকটকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ থেকে পণ্য পাচারের অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে। একইভাবে সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালানের অভিযোগের সঙ্গে সার পাচারের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পৃথক অপরাধের মধ্যে সম্পর্ক আছে বলে আগাম সিদ্ধান্ত না নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য, জব্দ করা পণ্য এবং আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিত।
সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোর সমন্বিত তৎপরতা, স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি এবং সার বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন জরুরি। পাশাপাশি কৃষকেরা যেন নির্ধারিত দামে প্রয়োজনীয় সার পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু চালান আটক নয়, পাচারের মূল হোতাদের শনাক্ত করা, অবৈধ মুনাফার উৎস অনুসন্ধান এবং সরবরাহব্যবস্থায় অনিয়ম বন্ধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার কোনো অসাধু চক্রের মুনাফার পণ্য হতে পারে না। সীমান্ত দিয়ে সার পাচারের অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত করতে হবে। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সার বিতরণব্যবস্থাকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে ভর্তুকির সুফল সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছায়। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থেই এ বিষয়ে আর দেরি করা উচিত নয়।
আব্দুর রহমান 

























