Dhaka বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উপকূলের ভবিষ্যৎ কি আবারও অনিশ্চয়তার মুখে?

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০১:১০:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
  • / ৪৮ বার দেখা হয়েছে

উপকূলের মানুষের জীবনকে দূর থেকে বোঝা যায় না। প্রতিটি বর্ষা, প্রতিটি অমাবস্যার জোয়ার আর প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা তাদের কাছে শুধু আবহাওয়ার খবর নয়—বেঁচে থাকার এক কঠিন পরীক্ষা। বহু বছর ধরে তারা জানে, একটি দুর্বল বেড়িবাঁধ মানেই এক রাতে ঘর হারানোর আশঙ্কা, ফসল নষ্ট হওয়ার শঙ্কা, পুকুরের মিঠাপানি লবণাক্ত হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়া। ২০০৯ সালের প্রলয়ঙ্করী Cyclone Aila উপকূলবাসীকে শিখিয়েছিল, দুর্বল অবকাঠামোর মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই Gabura Union-সহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় একটি টেকসই ও আধুনিক বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারিত হয়েছে। অবশেষে যখন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলো, তখন মানুষের মনে জন্ম নিল নতুন আশা—হয়তো এবার দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান হবে। কিন্তু সেই আশার মাঝেই যদি অভিযোগ ওঠে যে নির্মাণাধীন বাঁধের ভেতরে অবৈধভাবে পানির সংযোগ স্থাপন করে মাছের ঘেরে লবণপানি প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে, তাহলে উদ্বেগের কারণ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ একটি বেড়িবাঁধের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে রক্ষা করা, দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো এবং কৃষি ও বসতভিটা নিরাপদ রাখা। সেই বাঁধ যদি ব্যক্তিস্বার্থের কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে প্রকল্পের মূল দর্শনই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এখানে বিষয়টি শুধু একটি অবৈধ স্থাপনা বা স্থানীয় বিরোধের নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থে বাস্তবায়ন হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের প্রকল্পের জবাবদিহির প্রশ্ন। জনগণের করের টাকায় নির্মিত অবকাঠামো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য নয়। বরং এটি সমগ্র এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা। অভিযোগ সত্য হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং মিথ্যা হলে স্পষ্টভাবে তা জনগণকে জানানো। নীরবতা কখনোই সমাধান নয়; বরং তা মানুষের সন্দেহ ও অনাস্থা আরও বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। একটি মেগা প্রকল্পের সাফল্য শুধু নির্মাণকাজ শেষ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে প্রকল্পটি তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারছে কি না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অবশ্য উপকূলের মানুষকেই ঘিরে। নিজেদের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে তাদেরও সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। কারণ একটি শক্তিশালী বেড়িবাঁধ কেবল কংক্রিটের দেয়াল নয়; এটি হাজারো পরিবারের নিরাপত্তা, শিশুদের ভবিষ্যৎ এবং একটি জনপদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রতীক। উপকূলকে টিকিয়ে রাখতে হলে উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সাময়িক লাভের কাছে যদি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরাজিত হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের সার্থকতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের উপকূল কতটা নিরাপদ থাকবে।

সম্পর্কিত

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

উপকূলের ভবিষ্যৎ কি আবারও অনিশ্চয়তার মুখে?

প্রকাশের সময় ০১:১০:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

উপকূলের মানুষের জীবনকে দূর থেকে বোঝা যায় না। প্রতিটি বর্ষা, প্রতিটি অমাবস্যার জোয়ার আর প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা তাদের কাছে শুধু আবহাওয়ার খবর নয়—বেঁচে থাকার এক কঠিন পরীক্ষা। বহু বছর ধরে তারা জানে, একটি দুর্বল বেড়িবাঁধ মানেই এক রাতে ঘর হারানোর আশঙ্কা, ফসল নষ্ট হওয়ার শঙ্কা, পুকুরের মিঠাপানি লবণাক্ত হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়া। ২০০৯ সালের প্রলয়ঙ্করী Cyclone Aila উপকূলবাসীকে শিখিয়েছিল, দুর্বল অবকাঠামোর মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই Gabura Union-সহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় একটি টেকসই ও আধুনিক বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারিত হয়েছে। অবশেষে যখন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলো, তখন মানুষের মনে জন্ম নিল নতুন আশা—হয়তো এবার দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান হবে। কিন্তু সেই আশার মাঝেই যদি অভিযোগ ওঠে যে নির্মাণাধীন বাঁধের ভেতরে অবৈধভাবে পানির সংযোগ স্থাপন করে মাছের ঘেরে লবণপানি প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে, তাহলে উদ্বেগের কারণ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ একটি বেড়িবাঁধের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে রক্ষা করা, দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো এবং কৃষি ও বসতভিটা নিরাপদ রাখা। সেই বাঁধ যদি ব্যক্তিস্বার্থের কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে প্রকল্পের মূল দর্শনই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এখানে বিষয়টি শুধু একটি অবৈধ স্থাপনা বা স্থানীয় বিরোধের নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থে বাস্তবায়ন হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের প্রকল্পের জবাবদিহির প্রশ্ন। জনগণের করের টাকায় নির্মিত অবকাঠামো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য নয়। বরং এটি সমগ্র এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা। অভিযোগ সত্য হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং মিথ্যা হলে স্পষ্টভাবে তা জনগণকে জানানো। নীরবতা কখনোই সমাধান নয়; বরং তা মানুষের সন্দেহ ও অনাস্থা আরও বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। একটি মেগা প্রকল্পের সাফল্য শুধু নির্মাণকাজ শেষ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে প্রকল্পটি তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারছে কি না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অবশ্য উপকূলের মানুষকেই ঘিরে। নিজেদের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে তাদেরও সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। কারণ একটি শক্তিশালী বেড়িবাঁধ কেবল কংক্রিটের দেয়াল নয়; এটি হাজারো পরিবারের নিরাপত্তা, শিশুদের ভবিষ্যৎ এবং একটি জনপদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রতীক। উপকূলকে টিকিয়ে রাখতে হলে উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সাময়িক লাভের কাছে যদি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরাজিত হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের সার্থকতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের উপকূল কতটা নিরাপদ থাকবে।