ঢাকা: যুদ্ধের প্রভাবে পণ্য পরিবহনে বাধা, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং এল নিনোর কারণে সৃষ্ট খরা—এই তিনের সম্মিলিত প্রভাবে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস, আগামী কয়েক মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে। এর প্রভাব ২০২৭ সালজুড়েও অব্যাহত থাকার শঙ্কা রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়বেন দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
খাদ্যের বাড়তি দামের প্রভাব ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের জীবনে। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার ৬৩ বছর বয়সী বাসিন্দা মুহাম্মদ ইয়াসিন এর একটি উদাহরণ। পেশায় গাড়ি পার্কিংয়ের তত্ত্বাবধায়ক ইয়াসিন জানান, খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে তাকে খাওয়ার পরিমাণ কমাতে হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা বর্তমানে নানা সংকটের মুখে রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, এল নিনোর প্রভাবে খরা দেখা দেওয়ায় কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে বাজারে খাদ্যের সরবরাহ কমে যেতে পারে, যা মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়িয়ে তুলবে।
ইন্দোনেশিয়ায় বৃষ্টিপাত দেরিতে হওয়ার পূর্বাভাসের মধ্যে চালের দাম এরই মধ্যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। মিসরে রুটির দাম বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে, এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল বর্ষার কারণে ভারতে চিনির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, এসব পরিস্থিতি খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের শেষ দিকে, আগামী বছরের শুরুতে এবং সম্ভবত পুরো ২০২৭ সালজুড়েই এর বড় প্রভাব দেখা যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে খাদ্যের দাম বাড়ায় দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি বাড়ছে। এসব দেশের অনেক পরিবারের ব্যয়ের বড় অংশই খাবার কেনার পেছনে চলে যায়। ফলে খাদ্যের দাম বাড়লে তাঁদের অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হয়।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে তাদের বিশ্লেষণ করা ১৫০টি দেশের মধ্যে ২২ শতাংশ দেশে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি ছিল। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ১৪ শতাংশ।
এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্য হওয়া বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম পর্যবেক্ষণকারী এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক গত সেপ্টেম্বরে গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর এটিই ছিল সূচকটির সর্বোচ্চ অবস্থান।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, খাদ্যের দাম বাড়তে থাকলে বিভিন্ন দেশে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলো নিজেদের বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। তাতে আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সরবরাহে একাধিক ধাক্কা
কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে শস্য পরিবহনের অবকাঠামোয় হামলার কারণে গমের চালান ব্যাহত হচ্ছে। ফলে গমের বড় আমদানিকারক মিসর ও ইন্দোনেশিয়াকে বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, লোহিত সাগরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে অনেক জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে পরিবহনের সময় ও ব্যয়—দুটিই বাড়ছে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার রপ্তানি ও পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় কৃষি উৎপাদনের খরচও বাড়ছে।
এর ওপর এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক আবহাওয়া ভারতের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। এর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হবে ইয়াসিনের মতো নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে, যাদের পক্ষে বাড়তি দামে প্রয়োজনীয় খাবার কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
সূত্র: রয়টার্স
সাহিত্যপাতা 



























