চিংড়ির ঘের ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান
চিংড়ি-কাঁকড়ায় বদলে গেছে সাতক্ষীরার গ্রামীণ অর্থনীতি
- প্রকাশের সময় ১০:০২:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
- / ৬৩ বার দেখা হয়েছে
সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিন ধরে কৃষির জন্য বড় বাধা। তবে সেই প্রতিকূল পরিবেশই এখন অনেক মানুষের জীবিকার পথ তৈরি করেছে। কয়েক দশকে চিংড়ি, কাঁকড়া ও অন্যান্য মাছের চাষ বিস্তারের ফলে বদলে গেছে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র। আশির দশকের শেষ দিকে বাণিজ্যিকভাবে বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাষ শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয় ঘেরব্যবস্থা। বর্তমানে এসব ঘেরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পোনা, খাদ্য, ওষুধ, জাল, বরফ, পরিবহন, আড়ত ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবসা। এতে শুধু চাষিরাই নন, বিভিন্ন পেশার মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে।
জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ৭১ হেক্টর জলাশয় ও জলাভূমিতে বিভিন্ন ধরনের মাছ উৎপাদিত হয়। জেলার বার্ষিক মাছের চাহিদা প্রায় ৫৪ হাজার ৩৫৮ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে উৎপাদন প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন। চাহিদা মেটানোর পর বছরে প্রায় ৯৪ হাজার ৯২৭ মেট্রিক টন মাছ উদ্বৃত্ত থাকে। জেলার বাইরে বিভিন্ন বাজারে এসব মাছ সরবরাহ করা হয়। চিংড়ি ও কাঁকড়ার একটি অংশ যায় বিদেশের বাজারেও।
বাগদাই প্রধান ভরসা
সাতক্ষীরার মৎস্য অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় জায়গা দখল করে আছে বাগদা চিংড়ি। মৎস্য কার্যালয়ের হিসাবে, জেলার ৫৪ হাজার ৯৩৫টি জলাশয়ে প্রায় ৫৮ হাজার ২৯৪ হেক্টর জমিতে বাগদা চাষ হচ্ছে। বছরে উৎপাদন প্রায় ২৬ হাজার ২১৫ মেট্রিক টন।
উৎপাদিত বাগদার উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে রপ্তানি হয়। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশের বাজারে সাতক্ষীরার চিংড়ির চাহিদা রয়েছে। রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কারণে চিংড়িকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গলদার চাষেও আগ্রহ
বাগদার পাশাপাশি গলদা চিংড়ির চাষও বাড়ছে। জেলার ১১ হাজার ৬৬২টি জলাশয়ে প্রায় ৯ হাজার ৩৮৯ হেক্টর জমিতে গলদা চাষের তথ্য রয়েছে। বছরে উৎপাদন প্রায় ১০ হাজার ২০৪ মেট্রিক টন।
একই ঘেরে গলদার সঙ্গে রুই, কাতলা, মৃগেল ও তেলাপিয়ার মতো সাদা মাছ চাষ করছেন অনেকে। এতে একটি ঘের থেকেই বিভিন্ন ধরনের মাছ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। তবে চাষিদের অন্যতম সমস্যা মানসম্মত রেণু পোনার সরবরাহ। পর্যাপ্ত ভালো পোনা পাওয়া গেলে গলদার উৎপাদন আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
চিংড়ির বাইরে কাঁকড়ার দিকে ঝুঁকছেন চাষিরা
চিংড়ি চাষে রোগবালাই ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থাকায় অনেক চাষি এখন কাঁকড়ার দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় কাঁকড়া চাষ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় ৩৬৪টি কাঁকড়া ঘেরে প্রায় ৩২১ হেক্টর জমিতে বছরে প্রায় ১ হাজার ৯৬৫ মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদিত হয়।
দেশের কাঁকড়া রপ্তানিও বাড়ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৩ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাঁকড়া রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি বেড়েছে ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার কাঁকড়া চাষি আব্দুস সাত্তার কয়েক বছর ধরে কাঁকড়া চাষ করছেন। তিনি বলেন, চিংড়িতে ভাইরাসের আক্রমণ ও পোনা মারা যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এসব কারণে তিনি কাঁকড়া চাষে এসেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, কাঁকড়া চাষে লাভ ভালো এবং ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
ঘেরের বাইরেও অর্থনীতির বিস্তার
সাতক্ষীরার মৎস্য অর্থনীতির প্রভাব শুধু ঘেরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ঘেরের শ্রমিকের পাশাপাশি পোনা বিক্রেতা, মাছের খাদ্য ও ওষুধ ব্যবসায়ী, জাল ব্যবসায়ী, বরফকলের শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, আড়তদার ও পাইকারেরা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। মাছ বাছাই, পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজেও নারীরা যুক্ত রয়েছেন। ফলে মৎস্য খাত স্থানীয়ভাবে আয় ও কর্মসংস্থানের বড় একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিএম সেলিম বলেন, ‘সাতক্ষীরা দেশের মৎস্য চাষে একটি মডেল জেলা। এখান থেকে উৎপাদিত চিংড়ির দুই-তৃতীয়াংশ বিদেশে রপ্তানি হয়। আমরা মৎস্যচাষিদের আধুনিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি।’ তবে এই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। লবণাক্ততা, রোগবালাই, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানসম্মত পোনার সংকট চাষিদের জন্য বড় সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, ঘের ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, রোগ নিয়ন্ত্রণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে চিংড়ির পাশাপাশি কাঁকড়া ও অন্যান্য মাছ সাতক্ষীরার অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।



























