Dhaka ০৭:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
একটি অসমাপ্ত ভালোবাসার উপন্যাস

শেষ বিচার

  • মোঃ আলমগীর হোসেন
  • প্রকাশের সময় ০৬:৫৭:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
  • ২২ বার দেখা হয়েছে

মানুষের আদালতে যার বিচার হয়, তারও কখনো কখনো আরেকটি আদালত থাকে—সেটি হলো বিবেকের আদালত

অধ্যায় ১

মাছখোলার সেই সকাল, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার একটি শান্ত-সবুজ গ্রাম—মাছখোলা।
গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নদী। বর্ষায় নদী ফুলে ওঠে, আর শীতকালে তার বুক শান্ত হয়ে আসে। দুই পাশে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। শীতের সকালে সরিষা ফুলের ওপর জমে থাকা শিশির সূর্যের আলোয় ঝিলমিল করে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজের ওপর কেউ যেন অসংখ্য মুক্তো ছড়িয়ে দিয়েছে।
এই গ্রামেই বাস করত রহিম সরদারের পরিবার।
রহিম সরদার ছিলেন ভ্যানচালক।
অর্থ ছিল না, জমিজমা ছিল না, বড় বাড়ি ছিল না। কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে তার সম্মান ছিল।
কেউ অসুস্থ হলে তিনি ভ্যানে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতেন। কোনো বৃদ্ধ বাজারে যেতে না পারলে বিনা ভাড়ায় পৌঁছে দিতেন। কারও ঘরে বিপদ হলে নিজের সাধ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়াতেন।
একদিন ভোরে তিনি ভ্যানের চাকা পরীক্ষা করছিলেন।
রাহিলা বেগম দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন,
—এত সকালে বের হচ্ছেন?
—শহরে যাব।
—কেন?
—শাহাজানের কলেজের ফি দিতে হবে।
রাহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—ঘরে তো টাকা নেই।
রহিম সরদার মৃদু হাসলেন।
—টাকা নেই বলেই তো ভ্যান আছে।
ঠিক তখনই ঘর থেকে বের হলো শাহাজান।
সুদর্শন, শান্ত, ভদ্র একটি ছেলে।
—আব্বা, আপনি আবার বের হচ্ছেন?
—তুই কলেজে যা। আমার চিন্তা করিস না।
—আপনার শরীরের অবস্থা তো ভালো না।
রহিম সরদার ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
—আমার শরীর একদিন থাকবে না। কিন্তু তোর স্বপ্নটা থাকতে হবে।
শাহাজান চুপ করে গেল।
রহিম সরদার বললেন,
—তুই ডাক্তার হবি বাবা। গরিব মানুষের চিকিৎসা করবি। এই আমার স্বপ্ন।
শাহাজান বাবার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
—আপনার স্বপ্ন আমি পূরণ করব, আব্বা।
রহিম সরদার ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
শাহাজান অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
সে জানত না—তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের সঙ্গে একদিন সবচেয়ে বড় দুঃখটিও জড়িয়ে যাবে।

অধ্যায় ২
বিউটির চোখে শাহাজান
মাছখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে তখন টিফিনের সময়।
ছাত্রছাত্রীরা হৈচৈ করছে।
শাহাজান মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছিল।
তার কথা বলার ধরন ছিল আলাদা।
বড়দের সঙ্গে সম্মান করে কথা বলত, ছোটদের সঙ্গে হাসিমুখে।
এই বিষয়টাই বিউটির সবচেয়ে ভালো লাগত।
বিউটি ছিল রইচ মিয়ার মেয়ে।
রইচ মিয়া রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। পরে ঠিকাদারি ও নানা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বেশ অর্থবিত্তের মালিক হন।
একদিন বিউটি তার বান্ধবী স্নেহাকে বলল,
—স্নেহা, শাহাজান ভাইকে তোমার কেমন লাগে?
স্নেহা হাসল।
—আমার কেমন লাগে সেটা দিয়ে কী হবে? তোর কেমন লাগে বল।
বিউটি মুখ নিচু করল।
—ভালো লাগে।
—শুধু ভালো?
বিউটি কোনো উত্তর দিল না।
স্নেহা বলল,
—তুই ওকে ভালোবাসিস।
বিউটির গাল লাল হয়ে গেল।
—চুপ কর!
স্নেহা হেসে বলল,
—তোর চোখ কিন্তু সব বলে দেয়।
বিউটি দূরে তাকাল।
শাহাজান তখনও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে।
তার মনে হলো—
এই মানুষটিই যদি একদিন তার জীবনের সঙ্গী হয়!
তখনও সে জানত না, সেই একটি ইচ্ছাই একদিন তার জীবনকে এমন এক মোড়ে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ আর থাকবে না।

অধ্যায় ৩
প্রথম স্বীকারোক্তি
একদিন স্কুল ছুটির পর স্নেহা শাহাজানকে ডাকল।
—শাহাজান ভাই!
—কী হয়েছে?
—বিউটি আপনাকে ডাকছে।
শাহাজান অবাক।
—আমাকে?
—হ্যাঁ। স্কুলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
শাহাজান ধীরে ধীরে সেখানে গেল।
বিউটি একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।
শাহাজান কাছে যেতেই সে কেঁদে ফেলল।
—কাঁদছ কেন?
বিউটি মাথা নিচু করে বলল,
—আপনি আমাকে পছন্দ করেন না?
শাহাজান অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
—এমন কথা বলছ কেন?
—আপনি আমার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলেন না।
—তুমি তো আমার চেয়ে ছোট।
—তাতে কী?
শাহাজান মৃদু হাসল।
—এখন পড়াশোনা করো।
বিউটি হঠাৎ বলল,
—আমি আপনাকে ভালোবাসি।
শাহাজান স্তব্ধ।
কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
বিউটি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আপনি যদি আমাকে ভালো না বাসেন, আমি বাঁচব না।
শাহাজান ভয় পেয়ে বলল,
—এমন কথা আর কখনো বলবে না।
—তাহলে আমাকে কথা দিন।
—কী কথা?
—আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না।
শাহাজান জানত না কী বলবে।
শেষ পর্যন্ত শুধু বলল,
—আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।
বিউটি সেই কথার মধ্যেই নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পেল।

অধ্যায় ৪
নদীর ঘাটে ভালোবাসা
দিন গড়িয়ে যায়।
তাদের দেখা হয় কখনো স্কুলের পথে, কখনো নদীর ঘাটে, কখনো গ্রামের কোনো নির্জন জায়গায়।
এক বিকেলে নদীর পাড়ে বসে ছিল তারা।
নৌকা ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছিল।
বিউটি বলল,
—তুমি ডাক্তার হলে আমাকে ভুলে যাবে না তো?
শাহাজান হেসে বলল,
—কেন ভুলব?
—ডাক্তার হলে তো তোমার অনেক সুন্দর সুন্দর মানুষ পরিচিত হবে।
—আমার কাছে তুমি থাকলেই হবে।
বিউটি হেসে বলল,
—সত্যি?
—সত্যি।
বিউটি নদীর পানির দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করব না।
শাহাজান একটু গম্ভীর হলো।
—বিউটি, জীবন শুধু ভালোবাসা দিয়ে চলে না।
—তাহলে কী দিয়ে চলে?
—দায়িত্ব দিয়ে।
—আমি দায়িত্ব নেব।
শাহাজান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
সে বুঝতে পারছিল না—ভালোবাসার এই মধুর দিনগুলো একদিন এত বিষাদময় হয়ে উঠবে।অধ্যায় ৫
বাবার স্বপ্ন
শাহাজান এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করল।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলো।
ফলাফল হাতে নিয়ে সে বাড়িতে ছুটে এল।
—আব্বা!
রহিম সরদার ভ্যান রেখে ছুটে এলেন।
—কী হয়েছে?
শাহাজান ফলাফল দেখাল।
রহিম সরদারের চোখ জ্বলে উঠল।
—আমার ছেলে পাশ করেছে!
তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
রাহিলা বেগম চোখ মুছলেন।
টুম্পা দৌড়ে এসে বলল,
—ভাইয়া, তুমি এখন ডাক্তার হবে?
শাহাজান হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
রহিম সরদার বললেন,
—তুই শুধু পড়। টাকা আমি জোগাড় করব।
শাহাজান বলল,
—আব্বা, আপনার তো অনেক কষ্ট।
—কষ্ট?
রহিম হাসলেন।
—তোর জন্য কষ্ট করলে সেটা কষ্ট থাকে না।
সেই দিন থেকে রহিম সরদার আগের চেয়ে বেশি সময় ভ্যান চালাতে লাগলেন।
রোদে।
বৃষ্টিতে।
শীতে।
ক্ষুধার্ত অবস্থায়ও।
তার চোখে একটাই স্বপ্ন—
ছেলে ডাক্তার হবে।অধ্যায় ৬
রইচ মিয়ার সিদ্ধান্ত
বিউটি তখন দশম শ্রেণিতে।
এক সন্ধ্যায় রইচ মিয়া মেয়েকে ডাকলেন।
—বিউটি!
—জি বাবা।
—তোর জন্য পাত্র ঠিক করেছি।
বিউটির বুক কেঁপে উঠল।
—আমি বিয়ে করব না।
রইচ মিয়া অবাক।
—কেন?
বিউটি চুপ।
—কাউকে ভালোবাসিস?
বিউটির চোখে পানি।
রইচ মিয়ার মুখ কঠিন হয়ে গেল।
—শাহাজান?
বিউটি মাথা নিচু করল।
রইচ মিয়া বললেন,
—ভ্যানচালকের ছেলে?
বিউটি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—সে গরিব হতে পারে, কিন্তু খারাপ না।
—গরিবের ছেলে দিয়ে সংসার চলে?
—মানুষ ভালো হলে চলে।
রইচ মিয়া টেবিলে হাত মারলেন।
—তুই আমার কথা অমান্য করবি?
বিউটি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—বাবা, আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু শাহাজানকে ভুলতে পারব না।
রইচ মিয়া বললেন,
—সময় হলে বুঝবি, বাবার কথা না শুনলে জীবন কত কঠিন হয়।
বিউটি সেদিন রাতে একা ঘরে বসে কাঁদল।
তার সামনে দুটি পথ।
একটি বাবার।
অন্যটি শাহাজানের।
কোনোটিই সহজ নয়।

অধ্যায় ৭
সিদ্ধান্তের রাত
বিয়ের তারিখ প্রায় ঠিক হয়ে গেছে।
বিউটির বুকের ভেতর ভয়।
সে শাহাজানকে খবর দিল।
তারা দেখা করল।
বিউটি বলল,
—আমাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দেবে।
শাহাজান স্তব্ধ।
—তুমি বাবাকে বোঝাও।
—চেষ্টা করেছি।
—আরেকবার চেষ্টা করো।
বিউটি কাঁদল।
—তুমি কি আমাকে ছেড়ে দেবে?
—না।
—তাহলে আমাকে নিয়ে চলো।
শাহাজান মাথা নিচু করল।
—আমার কাছে তো কিছু নেই।
—তোমার কাছে তুমি আছ।
—আমার পড়াশোনা?
—আমি তোমার পড়াশোনার পথে বাধা হব না।
শাহাজান অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।
তার সামনে বাবার মুখ ভেসে উঠল।
“তুই ডাক্তার হবি।”
আবার সামনে বিউটির কান্না।
শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার কাছে সে দুর্বল হয়ে গেল।
বিউটি বলল,
—আজ রাত বারোটায় সাতক্ষীরা কামাননগর কাউন্টারে থাকবে।
শাহাজান মাথা নেড়ে বলল,
—এসো।অধ্যায় ৮
কামাননগরের রাত
রাত বারোটা।
কামাননগর কাউন্টারে দাঁড়িয়ে শাহাজান।
বারোটা দশ।
বারোটা বিশ।
বারোটা ত্রিশ।
বিউটি এল।
হাতে ছোট ব্যাগ।
চোখে পানি।
শাহাজান বলল,
—তুমি সত্যিই এসেছ?
—হ্যাঁ।
—শেষবার জিজ্ঞেস করছি। ফিরে যেতে চাইলে এখনো পারো।
বিউটি মাথা নাড়ল।
—না।
—জীবন কঠিন হবে।
—তোমার সঙ্গে হলে কষ্টও মেনে নেব।
দূর থেকে বাসের আলো দেখা গেল।
বিউটি শাহাজানের হাত শক্ত করে ধরল।
বাসে উঠতে উঠতে সে একবার পেছনে তাকাল।
মাছখোলার রাত।
অন্ধকার।
তার শৈশব।
তার বাবা।
তার মা।
সবকিছু যেন পিছনে পড়ে গেল।

অধ্যায় ৯
যশোরে নতুন জীবন
যশোরে বিউটির এক পরিচিত আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিল তারা।
কিছুদিন পর বিয়ে করল।
ছোট ঘর।
সামান্য আসবাব।
কিন্তু দুজনের চোখে স্বপ্ন।
বিউটি বলল,
—আমাদের সংসার ছোট হলেও ভালোবাসা বড় হবে।
শাহাজান হেসে বলল,
—আর আমার পড়াশোনা?
—চলবে।
—তুমি কষ্ট পাবে।
—তোমার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন আমারও স্বপ্ন।
কয়েকদিন তারা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।
কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
একদিন খবর এলো—
বিউটির বাবা মামলা করেছেন।
বিউটির মুখ সাদা হয়ে গেল।
—মামলা?
শাহাজান বলল,
—হ্যাঁ।
—কিন্তু আমি তো নিজের ইচ্ছায় এসেছি!
—আমি জানি।
বিউটি কাঁদতে লাগল।
—বাবা আমাকে কেন বুঝল না?
শাহাজান তাকে শান্ত করে বলল,
—সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু তার নিজের বুকেও তখন ভয় ঢুকে গেছে।

অধ্যায় ১০
মীমাংসার নামে ফাঁদ
দুই পক্ষের বসার কথা হলো।
রহিম সরদার ছেলেকে বললেন,
—বাবা, তুই বাড়ি আয়। কথা বলে সব ঠিক করব।
শাহাজান বাবাকে বিশ্বাস করল।
সে বাড়ি ফিরল।
বাড়ির উঠানে পা রাখতেই কয়েকজন পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলল।
—আপনাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।
শাহাজান হতভম্ব।
—কেন?
পুলিশ তাকে ধরে ফেলল।
সে বাবার দিকে তাকাল।
—আব্বা!
রহিম সরদার ছুটে এলেন।
—আমি জানতাম না বাবা!
শাহাজান হাতকড়া পরতে পরতে বলল,
—আপনি কাঁদবেন না।
—আমি তোকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম।
—আমি জানি।
পুলিশ তাকে নিয়ে গেল।
রাহিলা বেগম মাটিতে বসে চিৎকার করে কাঁদলেন।
বিউটি সব দেখছিল।
তার মনে হলো—
এই মানুষটির বিপদ কি আমার কারণেই?

অধ্যায় ১১
আদালতের কাঠগড়ায়
আদালত কক্ষ কানায় কানায় পূর্ণ।
বিচারক মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
শাহাজান আসামির কাঠগড়ায়।
বিউটি আদালতে উপস্থিত।
বিচারক শান্ত কণ্ঠে বললেন,
—মা, ভয় পেয়ো না। সত্য কথা বলবে।
বিউটি কাঁপছিল।
—তোমাকে কি জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?
—না, স্যার।
আদালত নিস্তব্ধ।
—তাহলে তুমি নিজেই গিয়েছিলে?
—জি।
—আসামি কি তোমাকে জোর করে বিয়ে করেছে?
—না।
শাহাজান মাথা নিচু করল।
বিউটির চোখে পানি।
বিচারক আবার বললেন,
—তুমি কি তার সঙ্গে থাকতে চাও?
বিউটি শাহাজানের দিকে তাকাল।
এক মুহূর্তে তার মনে হলো—এই মানুষটিই তার পৃথিবী।
সে বলল,
—জি স্যার। ও আমার স্বামী। আমি ওর সঙ্গে থাকতে চাই।
শাহাজানের চোখে পানি এসে গেল।
কিন্তু আইন তার নিজস্ব পথে চলল।
বিউটির বয়স তখনও আঠারো পূর্ণ হয়নি।
আদালতের আদেশে তাকে পিতার জিম্মায় দেওয়া হলো।
শাহাজানকে পাঠানো হলো কারাগারে।
বিউটি আদালত থেকে বের হওয়ার সময় একবার পেছনে তাকাল।
শাহাজান দাঁড়িয়ে।
তাদের চোখে চোখ পড়ল।
শাহাজান শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে বলল—
“ভয় পেয়ো না।”
বিউটির বুক ফেটে গেল।

অধ্যায় ১২
বিউটির দ্বিতীয় বিয়ে
বিউটিকে অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যত্র বিয়ে দেওয়া হলো।
বিয়ের সাজে বসে সে ভাবছিল—
“আমি কি সত্যিই এই জীবন চাই?”
বরের বাড়িতে যাওয়ার সময় তার চোখে পানি।
নতুন স্বামী খারাপ মানুষ ছিল না।
সংসারে অভাবও ছিল না।
কিন্তু বিউটির মনে একটি শূন্যতা।
রাতে একা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে ফিসফিস করে বলত,
—শাহাজান, তুমি কোথায়?
কেউ উত্তর দিত না।
সময় চলে গেল।
তার একটি ছেলে হলো।
তারপর একটি মেয়ে।
সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মাতৃত্ব জেগে উঠল।
কিন্তু অতীতকে সে মুছে ফেলতে পারল না।

অধ্যায় ১৩
পাঁচ বছরের অপেক্ষা
মামলা চলতে লাগল।
এক বছর।
দুই বছর।
তিন বছর।
চার বছর।
পাঁচ বছর।
এই পাঁচ বছরে রহিম সরদারের জীবন বদলে গেল।
মামলার খরচ চালাতে তিনি নিজের একমাত্র ভিটা বিক্রি করলেন।
ভ্যান চালিয়ে টাকা জোগাড় করলেন।
শেষে সরকারি খাস জমিতে ঘর তুলতে হলো।
রাহিলা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
টুম্পা তখন নবম শ্রেণিতে।
একদিন টুম্পা মাকে বলল,
—মা, ভাইয়া কি আর কখনো বাড়ি আসবে?
রাহিলা চোখ মুছে বললেন,
—আল্লাহ জানেন মা।
টুম্পা বলল,
—ভাইয়া ডাক্তার হতে চেয়েছিল।
তারপর মাথা নিচু করে বলল,
—ভাইয়া হতে পারেনি। আমি ডাক্তার হব।
রাহিলা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

অধ্যায় ১৪
কারাগারের দিনরাত্রি
কারাগারের একটি ছোট ঘরে বসে শাহাজান জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখত।
তার হাতে বই।
কিন্তু পড়ায় মন বসত না।
একদিন একজন কারারক্ষী জিজ্ঞেস করল,
—তুমি এত চুপচাপ থাকো কেন?
শাহাজান হাসল।
—কথা বলার মতো মানুষ তো নেই।
—পরিবার?
—আছে।
—তাহলে?
শাহাজান আকাশের দিকে তাকাল।
—দূরে।
একদিন সে একটি চিঠি পেল।
টুম্পার চিঠি।
“ভাইয়া,
তুমি ডাক্তার হতে পারোনি। আমি হব।
তোমার স্বপ্ন আমি পূরণ করব।”
চিঠি পড়ে শাহাজান দীর্ঘক্ষণ কাঁদল।
তারপর কাগজে লিখল—
“টুম্পা, আমার জীবন হয়তো থেমে গেছে। কিন্তু আমার স্বপ্ন থামেনি।”

অধ্যায় ১৫
বিউটির ভেতরের যুদ্ধ
বিউটি তখন দুই সন্তানের মা।
একদিন মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে ছিল।
মেয়ে বলল,
—মা, তুমি কাঁদছ কেন?
বিউটি চোখ মুছে হাসল।
—কিছু না।
ছেলে বলল,
—মা, তুমি দুঃখী?
বিউটি তাদের বুকে জড়িয়ে ধরল।
তার মনে হলো—
“এই সন্তানদের জন্য আমাকে শক্ত থাকতে হবে।”
কিন্তু রাত হলেই বিবেকের আদালত বসত।
একটি প্রশ্ন—
“তুমি শাহাজানকে ভালোবাসতে?”
—হ্যাঁ।
“তাহলে কেন তাকে ছেড়ে দিলে?”
—আমি ভয় পেয়েছিলাম।
“কাকে?”
—বাবাকে।
“আর?”
—সমাজকে।
“আর শাহাজান?”
বিউটির চোখে পানি।
কোনো উত্তর নেই।অধ্যায় ১৬
চূড়ান্ত সাক্ষ্য
মামলার শেষ পর্যায়।
আদালত আবার কানায় কানায় পূর্ণ।
শাহাজান কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে।
বিউটি সাক্ষীর আসনে।
বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে তার বুক কাঁপছিল।
সে শাহাজানের দিকে তাকাল।
এই মানুষটিই একসময় তার হাত ধরে বলেছিল—
“তুমি থাকলে আমার কিছু চাই না।”
আজ তাকে নিয়েই বলতে হবে এমন কথা, যা তার জীবনকে আরও অন্ধকার করবে।
বিউটির মনে হলো—
“আমি যদি সত্যের পুরো কথাটা বলি?”
“আমি যদি বলি, আমি নিজেই তাকে নিয়ে পালিয়েছিলাম?”
“আমি যদি বলি, সে আমাকে জোর করেনি?”
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার সন্তানদের মুখ ভেসে উঠল।
সমাজের ভয়।
সংসার হারানোর ভয়।
সবকিছু মিলিয়ে সে দুর্বল হয়ে পড়ল।
তার সাক্ষ্য শাহাজানের বিরুদ্ধে গেল।
আদালত থেকে বেরিয়ে এসে সে একটি দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
তার ঠোঁট কাঁপছিল।
—শাহাজান, আমাকে ক্ষমা করো।

অধ্যায় ১৭
রায়
রায়ের দিন।
আদালতে অস্বাভাবিক নীরবতা।
বিচারক রায় পড়তে শুরু করলেন।
শেষে উচ্চারিত হলো—
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
মুহূর্তেই আদালতে কান্নার শব্দ।
কেউ কাঁদছে।
কেউ চুপ করে আছে।
কেউ অবিশ্বাসে তাকিয়ে।
বিউটির মুখে কোনো কথা নেই।
শাহাজান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে।
তার চোখে পানি।
কিন্তু মুখে অভিশাপ নেই।
সে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—হে আল্লাহ, তুমি মহান। মানুষের বিচার শেষ বিচার নয়। তোমার আদালতে সত্য সবসময় সত্য।
বিউটি দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিল।
তার বুকের ভেতর যেন কেউ ছুরি চালাল।
সে মনে মনে বলল,
“আমি তাকে হারাইনি। আমি তাকে হারিয়ে দিয়েছি।”

অধ্যায় ১৮
বাবার শেষ দিন
রহিম সরদার রায় শোনার পর আর আগের মতো থাকলেন না।
একদিন তিনি ভ্যান নিয়ে বের হলেন।
কিন্তু শরীর আর চলছিল না।
বাড়ি ফিরে ছেলের পুরোনো বই হাতে নিলেন।
বইয়ের পাতায় শাহাজানের হাতের লেখা।
তিনি আঙুল বুলিয়ে বললেন,
—বাবা, তুই ডাক্তার হতে পারলি না।
রাহিলা কাঁদছিলেন।
রহিম বললেন,
—আমি তোকে রক্ষা করতে পারলাম না।
কয়েকদিন পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
মৃত্যুর আগে টুম্পার হাত ধরে বললেন,
—তুই পড়বি।
—জি আব্বা।
—তোর ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণ করবি।
—করব।
রহিম সরদার চোখ বন্ধ করলেন।
তার মুখে তখনও ছেলের প্রতি ভালোবাসা।অধ্যায় ১৯
বহু বছর পর
সময় থেমে থাকে না।
টুম্পা বড় হলো।
পড়াশোনা করল।
একদিন সে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলো।
ভাইয়ের স্বপ্ন তার নিজের জীবনের স্বপ্ন হয়ে গেল।
অন্যদিকে বিউটির সন্তানরাও বড় হতে লাগল।
একদিন বিউটির ছেলে জিজ্ঞেস করল,
—মা, তুমি কি ছোটবেলায় কাউকে খুব ভালোবাসতে?
বিউটির বুক কেঁপে উঠল।
—কেন?
—তোমার পুরোনো একটা ছবি পেয়েছি।
বিউটি কিছু বলল না।
ছেলে বলল,
—তুমি তখন খুব হাসতে।
বিউটি মৃদু হাসল।
—মানুষের জীবনে কিছু হাসি থাকে, যেগুলো পরে মনে করলে কষ্ট হয়।অধ্যায় ২০
কারাগারে সাক্ষাৎ
বহু বছর পর বিউটি শাহাজানের সঙ্গে দেখা করতে গেল।
লোহার গ্রিলের ওপারে শাহাজান।
চুলে পাক।
মুখে বয়সের রেখা।
কিন্তু চোখে সেই শান্তি।
বিউটি বসতে পারছিল না।
শাহাজান বলল,
—বসো।
বিউটি বসে পড়ল।
দীর্ঘ নীরবতা।
শেষে বিউটি বলল,
—আমাকে ঘৃণা করো?
শাহাজান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—অনেক চেষ্টা করেছি।
—পেরেছ?
—না।
বিউটির চোখ দিয়ে পানি পড়ল।
—কেন?
শাহাজান মৃদু স্বরে বলল,
—কারণ তোমাকে একসময় সত্যিই ভালোবাসতাম।
বিউটি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আমি তোমার জীবন নষ্ট করেছি।
—তুমি আমার জীবন বদলে দিয়েছ।
—আমার জন্য তুমি সব হারিয়েছ।
—হ্যাঁ।
—তবুও আমাকে ক্ষমা করেছ?
শাহাজান তাকিয়ে রইল।
—অনেক আগেই।
বিউটি মাথা নিচু করল।
—আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য পালিয়েছিলাম।
—জানি।
—তারপর তোমাকে হারিয়ে ফেললাম।
শাহাজান ধীরে বলল,
—তুমি আমাকে হারাওনি, বিউটি। আমরা দুজনেই নিজেদের ভয়, সমাজ আর পরিস্থিতির কাছে হেরে গিয়েছিলাম।
বিউটি কাঁদতে লাগল।অধ্যায় ২১

বিউটির স্বীকারোক্তি
বিউটি বলল,
—আমি তোমাকে প্রতারণা করতে চাইনি।
শাহাজান চুপ।
—আমি শুধু ভয় পেয়েছিলাম।
—কিসের ভয়?
—বাবাকে হারানোর ভয়।
—সমাজের ভয়।
—নতুন সংসার ভেঙে যাওয়ার ভয়।
—আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের ভয়।
সে চোখ মুছে বলল,
—কিন্তু এত ভয় পেতে পেতে আমি এমন একজন মানুষকে হারালাম, যে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত।
শাহাজান বলল,
—মানুষ কখনো কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।
—আমার ভুলের শাস্তি তুমি পেয়েছ।
—আমার শাস্তি শুধু কারাগার নয়।
বিউটি তাকাল।
—তাহলে?
—তুমি যে আমাকে ভালোবাসতে, সেই স্মৃতিটা নিয়েই আমাকে বাঁচতে হয়েছে।
বিউটির কান্না থামল না।

অধ্যায় ২২

শেষ চিঠি
কয়েকদিন পর শাহাজান একটি চিঠি পেল।
বিউটির চিঠি।
“শাহাজান,
তুমি হয়তো ভাবো আমি তোমাকে ভুলে গেছি।
না।
আমি সংসার করেছি, সন্তান হয়েছে, জীবন চলেছে।
কিন্তু আমার ভেতরে একটি জায়গা কখনো পূর্ণ হয়নি।
সেই জায়গাটির নাম—শাহাজান।
আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেটিই শেষ পর্যন্ত তোমাকে হারানোর কারণ হয়েছে।
আমি যদি সেদিন একটু সাহসী হতাম!
আমি যদি বাবাকে সত্যি করে বোঝাতে পারতাম!
আমি যদি সমাজের ভয়কে জয় করতে পারতাম!
তাহলে হয়তো আজ তোমার জীবন অন্যরকম হতো।
আমি জানি, হারানো সময় ফিরিয়ে দিতে পারব না।
শুধু চাই—
তুমি আমাকে খারাপ মানুষ হিসেবে মনে রেখো না।
আমি ভুল করেছি।
কিন্তু তোমাকে ভালোবাসিনি—এ কথা কখনো বলো না।
কারণ তোমাকে আমি সত্যিই ভালোবেসেছিলাম।
শুধু তোমার পাশে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ানোর মতো সাহস আমার ছিল না।
—বিউটি।”

অধ্যায় ২৩
শাহাজানের উত্তর
শাহাজান চিঠির উত্তর দিল।
“বিউটি,
তোমার চিঠি পেয়েছি।
তুমি জানতে চেয়েছ আমি তোমাকে কীভাবে মনে রেখেছি।
আমি তোমাকে খলনায়িকা হিসেবে মনে রাখিনি।
আমি তোমাকে সেই মেয়েটি হিসেবেই মনে রেখেছি, যে একদিন নদীর ঘাটে বসে বলেছিল—
‘তুমি ডাক্তার হলে আমাকে ভুলে যেও না।’
আমি ভুলিনি।
তুমি ভুল করেছ।
আমিও করেছি।
তোমাকে নিয়ে পালানোর সিদ্ধান্ত আমারও ছিল।
কিন্তু আজ আর কাউকে দোষ দিতে চাই না।
তুমি তোমার সন্তানদের ভালো মানুষ করো।
তাদের শেখাও—
ভালোবাসা শুধু কাউকে পাওয়া নয়।
ভালোবাসার জন্য কখনো কখনো সত্যের পাশে দাঁড়াতেও হয়।
আর নিজের ভয়কে জয় করতে হয়।
তুমি ভালো থেকো।
আমি তোমার জন্য দোয়া করি।
—শাহাজান।”অধ্যায় ২৪
টুম্পার কাছে ভাই
একদিন টুম্পা কারাগারে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেল।
এখন সে একজন চিকিৎসক।
শাহাজান তাকিয়ে রইল।
—তুই সত্যিই ডাক্তার হয়েছিস?
টুম্পা হেসে বলল,
—তোমার জন্য।
শাহাজানের চোখ ভিজে গেল।
—আমি পারিনি।
—তুমি পেরেছ।
—কীভাবে?
—তোমার স্বপ্ন আমার মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছ।
শাহাজান বোনের হাত ধরে বলল,
—তুই গরিব মানুষের চিকিৎসা করবি।
—করব।
—আমাদের মতো মানুষদের ভুল বুঝিস না।
টুম্পা বলল,
—কখনো না।
ভাই-বোন দুজনেই কাঁদল।
সেদিন কারাগারের দেয়ালও যেন একটু নরম হয়ে এসেছিল।

অধ্যায় ২৫
মাছখোলায় ফিরে আসা
বহু বছর পর একদিন টুম্পা মাছখোলা গ্রামে গেল।
নদী আগের মতোই আছে।
সরিষার ক্ষেত আগের মতোই হলুদ।
শুধু মানুষগুলো বদলে গেছে।
সে স্কুলের সামনে দাঁড়াল।
যে গাছটির নিচে একদিন বিউটি শাহাজানকে ভালোবাসার কথা বলেছিল, গাছটি এখনও আছে।
টুম্পা গাছটির দিকে তাকিয়ে বলল,
—কত গল্প জানো তুমি!
বাতাসে পাতাগুলো কেঁপে উঠল।
সে নদীর ঘাটে গিয়ে দাঁড়াল।
মনে হলো—
দূরে কোথাও ভাইয়ের কণ্ঠ ভেসে আসছে।
“তুমি ডাক্তার হলে আমাকে ভুলে যেও না।”
টুম্পা চোখ মুছে বলল,
—ভাইয়া, কেউ তোমাকে ভুলেনি।অধ্যায় ২৬
বিউটির শেষ উপলব্ধি
বছর কেটে যায়।
বিউটির সন্তানরা বড় হয়।
একদিন তার ছেলে মায়ের পাশে বসে বলল,
—মা, মানুষ কি ভুল করলে সারাজীবন অপরাধী থাকে?
বিউটি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—না।
ছেলে বলল,
—তাহলে?
—মানুষ ভুলের পর কী করে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
—তুমি কি কোনো ভুল করেছ?
বিউটির চোখে পানি।
—হ্যাঁ।
—কী ভুল?
বিউটি দূরে তাকিয়ে বলল,
—একদিন আমি ভয়কে ভালোবাসার চেয়ে বড় করে দেখেছিলাম।
ছেলে বুঝল না।
কিন্তু বিউটি জানত—
এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।

অধ্যায় ২৭
শেষ দেখা
একদিন খবর এলো—
শাহাজানের শরীর খুব খারাপ।
বিউটি আবার কারাগারে গেল।
শাহাজান বিছানায় শুয়ে।
বিউটি কাছে গিয়ে বসতেই শাহাজান চোখ খুলল।
—তুমি এসেছ?
—হ্যাঁ।
—কাঁদছ কেন?
—আমি পারি না নিজেকে ক্ষমা করতে।
শাহাজান ধীরে বলল,
—নিজেকে ক্ষমা করো।
—কীভাবে?
—মানুষকে ক্ষমা করতে পারলে নিজেকেও করতে হয়।
বিউটি বলল,
—তুমি কি সুখী ছিলে?
শাহাজান মৃদু হাসল।
—সুখের সংজ্ঞা বদলে গেছে।
—আমাকে নিয়ে তোমার কোনো অভিযোগ নেই?
—আছে।
বিউটি তাকাল।
—কী?
—তুমি যদি সেদিন একটু সাহসী হতে!
বিউটির চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ল।
শাহাজান বলল,
—কিন্তু এখন আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে কী হবে?
বিউটি তার হাত ধরল।
দুজনের হাতের মাঝে লোহার শিক।
একদিকে অতীত।
অন্যদিকে বর্তমান।
মাঝখানে একটি অসমাপ্ত ভালোবাসা।অধ্যায় ২৮

শেষ বিচার
সন্ধ্যা নামছে।
কারাগারের আকাশে লাল আভা।
শাহাজান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।
দূরে আজানের ধ্বনি।
সে দুহাত তুলে দোয়া করল—
—হে আল্লাহ, তুমি সব জানো। মানুষের চোখ যা দেখে না, তুমি তা দেখো। মানুষের বিচার যেখানে শেষ, তোমার বিচার সেখানে শুরু। আমি যাদের কারণে কষ্ট পেয়েছি, তাদের ক্ষমা করো। আমার বাবা-মাকে শান্তি দাও। আমার বোনকে সুখী করো। আর বিউটিকে শান্তি দাও।
তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু মুখে প্রশান্তি।
অন্যদিকে বিউটি নিজের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে একই আকাশের দিকে তাকিয়ে।
তার মনে পড়ছে মাছখোলার সেই নদী।
সরিষার ক্ষেত।
স্কুলের বারান্দা।
শাহাজানের হাসি।
কামাননগরের সেই রাত।
বাসের জানালা।
আদালতের কাঠগড়া।
রায়ের দিন।
সবকিছু।
সে চোখ বন্ধ করে বলল,
—শাহাজান, আমি তোমাকে হারাইনি। আমি আমার নিজের ভয়কে হারাতে পারিনি।
ভালোবাসা মরে না
মাছখোলার নদী এখনও বয়ে যায়।
শীতের সকালে সরিষার ফুলের ওপর এখনও শিশির জমে।
সূর্যের আলো পড়লে এখনও সেগুলো মুক্তোর মতো ঝিকমিক করে।
মাছখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা খেলছে।
কেউ জানে না—
এই মাঠে একদিন শাহাজান দাঁড়িয়ে বই পড়ত।
কেউ জানে না—
একটি মেয়ে দূর থেকে তাকিয়ে তাকে ভালোবাসত।
কেউ জানে না—
একজন ভ্যানচালক বাবা ছেলেকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন।
কেউ জানে না—
একটি ভুল সিদ্ধান্ত একটি পরিবারের ভিটে কেড়ে নিয়েছিল।
কেউ জানে না—
একটি মামলার কারণে একজন তরুণের যৌবন কারাগারের অন্ধকারে কেটে গেছে।
কেউ জানে না—
বিউটি আজও মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে উঠে জানালার পাশে দাঁড়ায়।
তার সন্তানরা ঘুমিয়ে থাকে।
ঘর নিস্তব্ধ।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে—
—শাহাজান, তুমি কি সত্যিই আমাকে ক্ষমা করেছ?
কোনো উত্তর আসে না।
শুধু দূরের বাতাস জানালার পর্দা দুলিয়ে যায়।
বিউটি চোখ মুছে।
তারপর ধীরে ধীরে বলে—
—আমি তোমাকে হারানোর পর বুঝেছি, মানুষ কখনো কখনো ভালোবাসার মানুষকে হারায় না; নিজের ভয়কে জয় করতে না পারার কারণে তাকে হারিয়ে ফেলে।
দূরে নদীর ঢেউ ভাঙে।
কারাগারের জানালার পাশে শাহাজানও হয়তো একই আকাশের দিকে তাকিয়ে।
তার জীবনে বিউটি এখন আর কোনো দাবি নয়।
কোনো অভিযোগ নয়।
শুধু একটি স্মৃতি।
একটি অসমাপ্ত গান।
একটি দীর্ঘশ্বাস।
আর একটি প্রার্থনা—
“হে আল্লাহ, মানুষের আদালতে যে বিচার হয়েছে, তার সত্য তুমি জানো।
যদি কোথাও অন্যায় হয়ে থাকে, তুমি তার ন্যায়বিচার করো।
যারা ভুল করেছে, তাদের ক্ষমা করো।
আর যারা কষ্ট পেয়েছে, তাদের হৃদয়ে শান্তি দাও।”
মাছখোলার নদী বয়ে চলে।
সময় চলে যায়।
মানুষ চলে যায়।
কিন্তু কিছু ভালোবাসা—
মরে না।
তারা মানুষের জীবনের ভেতরে নীরবে বেঁচে থাকে।
কখনো অশ্রু হয়ে।
কখনো স্মৃতি হয়ে।
কখনো অনুতাপ হয়ে।
আর কখনো—
শেষ বিচারের অপেক্ষা হয়ে।

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

একটি অসমাপ্ত ভালোবাসার উপন্যাস

শেষ বিচার

প্রকাশের সময় ০৬:৫৭:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

মানুষের আদালতে যার বিচার হয়, তারও কখনো কখনো আরেকটি আদালত থাকে—সেটি হলো বিবেকের আদালত

অধ্যায় ১

মাছখোলার সেই সকাল, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার একটি শান্ত-সবুজ গ্রাম—মাছখোলা।
গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নদী। বর্ষায় নদী ফুলে ওঠে, আর শীতকালে তার বুক শান্ত হয়ে আসে। দুই পাশে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। শীতের সকালে সরিষা ফুলের ওপর জমে থাকা শিশির সূর্যের আলোয় ঝিলমিল করে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজের ওপর কেউ যেন অসংখ্য মুক্তো ছড়িয়ে দিয়েছে।
এই গ্রামেই বাস করত রহিম সরদারের পরিবার।
রহিম সরদার ছিলেন ভ্যানচালক।
অর্থ ছিল না, জমিজমা ছিল না, বড় বাড়ি ছিল না। কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে তার সম্মান ছিল।
কেউ অসুস্থ হলে তিনি ভ্যানে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতেন। কোনো বৃদ্ধ বাজারে যেতে না পারলে বিনা ভাড়ায় পৌঁছে দিতেন। কারও ঘরে বিপদ হলে নিজের সাধ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়াতেন।
একদিন ভোরে তিনি ভ্যানের চাকা পরীক্ষা করছিলেন।
রাহিলা বেগম দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন,
—এত সকালে বের হচ্ছেন?
—শহরে যাব।
—কেন?
—শাহাজানের কলেজের ফি দিতে হবে।
রাহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—ঘরে তো টাকা নেই।
রহিম সরদার মৃদু হাসলেন।
—টাকা নেই বলেই তো ভ্যান আছে।
ঠিক তখনই ঘর থেকে বের হলো শাহাজান।
সুদর্শন, শান্ত, ভদ্র একটি ছেলে।
—আব্বা, আপনি আবার বের হচ্ছেন?
—তুই কলেজে যা। আমার চিন্তা করিস না।
—আপনার শরীরের অবস্থা তো ভালো না।
রহিম সরদার ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
—আমার শরীর একদিন থাকবে না। কিন্তু তোর স্বপ্নটা থাকতে হবে।
শাহাজান চুপ করে গেল।
রহিম সরদার বললেন,
—তুই ডাক্তার হবি বাবা। গরিব মানুষের চিকিৎসা করবি। এই আমার স্বপ্ন।
শাহাজান বাবার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
—আপনার স্বপ্ন আমি পূরণ করব, আব্বা।
রহিম সরদার ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
শাহাজান অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
সে জানত না—তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের সঙ্গে একদিন সবচেয়ে বড় দুঃখটিও জড়িয়ে যাবে।

অধ্যায় ২
বিউটির চোখে শাহাজান
মাছখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে তখন টিফিনের সময়।
ছাত্রছাত্রীরা হৈচৈ করছে।
শাহাজান মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছিল।
তার কথা বলার ধরন ছিল আলাদা।
বড়দের সঙ্গে সম্মান করে কথা বলত, ছোটদের সঙ্গে হাসিমুখে।
এই বিষয়টাই বিউটির সবচেয়ে ভালো লাগত।
বিউটি ছিল রইচ মিয়ার মেয়ে।
রইচ মিয়া রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। পরে ঠিকাদারি ও নানা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বেশ অর্থবিত্তের মালিক হন।
একদিন বিউটি তার বান্ধবী স্নেহাকে বলল,
—স্নেহা, শাহাজান ভাইকে তোমার কেমন লাগে?
স্নেহা হাসল।
—আমার কেমন লাগে সেটা দিয়ে কী হবে? তোর কেমন লাগে বল।
বিউটি মুখ নিচু করল।
—ভালো লাগে।
—শুধু ভালো?
বিউটি কোনো উত্তর দিল না।
স্নেহা বলল,
—তুই ওকে ভালোবাসিস।
বিউটির গাল লাল হয়ে গেল।
—চুপ কর!
স্নেহা হেসে বলল,
—তোর চোখ কিন্তু সব বলে দেয়।
বিউটি দূরে তাকাল।
শাহাজান তখনও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে।
তার মনে হলো—
এই মানুষটিই যদি একদিন তার জীবনের সঙ্গী হয়!
তখনও সে জানত না, সেই একটি ইচ্ছাই একদিন তার জীবনকে এমন এক মোড়ে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ আর থাকবে না।

অধ্যায় ৩
প্রথম স্বীকারোক্তি
একদিন স্কুল ছুটির পর স্নেহা শাহাজানকে ডাকল।
—শাহাজান ভাই!
—কী হয়েছে?
—বিউটি আপনাকে ডাকছে।
শাহাজান অবাক।
—আমাকে?
—হ্যাঁ। স্কুলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
শাহাজান ধীরে ধীরে সেখানে গেল।
বিউটি একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।
শাহাজান কাছে যেতেই সে কেঁদে ফেলল।
—কাঁদছ কেন?
বিউটি মাথা নিচু করে বলল,
—আপনি আমাকে পছন্দ করেন না?
শাহাজান অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
—এমন কথা বলছ কেন?
—আপনি আমার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলেন না।
—তুমি তো আমার চেয়ে ছোট।
—তাতে কী?
শাহাজান মৃদু হাসল।
—এখন পড়াশোনা করো।
বিউটি হঠাৎ বলল,
—আমি আপনাকে ভালোবাসি।
শাহাজান স্তব্ধ।
কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
বিউটি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আপনি যদি আমাকে ভালো না বাসেন, আমি বাঁচব না।
শাহাজান ভয় পেয়ে বলল,
—এমন কথা আর কখনো বলবে না।
—তাহলে আমাকে কথা দিন।
—কী কথা?
—আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না।
শাহাজান জানত না কী বলবে।
শেষ পর্যন্ত শুধু বলল,
—আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।
বিউটি সেই কথার মধ্যেই নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পেল।

অধ্যায় ৪
নদীর ঘাটে ভালোবাসা
দিন গড়িয়ে যায়।
তাদের দেখা হয় কখনো স্কুলের পথে, কখনো নদীর ঘাটে, কখনো গ্রামের কোনো নির্জন জায়গায়।
এক বিকেলে নদীর পাড়ে বসে ছিল তারা।
নৌকা ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছিল।
বিউটি বলল,
—তুমি ডাক্তার হলে আমাকে ভুলে যাবে না তো?
শাহাজান হেসে বলল,
—কেন ভুলব?
—ডাক্তার হলে তো তোমার অনেক সুন্দর সুন্দর মানুষ পরিচিত হবে।
—আমার কাছে তুমি থাকলেই হবে।
বিউটি হেসে বলল,
—সত্যি?
—সত্যি।
বিউটি নদীর পানির দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করব না।
শাহাজান একটু গম্ভীর হলো।
—বিউটি, জীবন শুধু ভালোবাসা দিয়ে চলে না।
—তাহলে কী দিয়ে চলে?
—দায়িত্ব দিয়ে।
—আমি দায়িত্ব নেব।
শাহাজান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
সে বুঝতে পারছিল না—ভালোবাসার এই মধুর দিনগুলো একদিন এত বিষাদময় হয়ে উঠবে।অধ্যায় ৫
বাবার স্বপ্ন
শাহাজান এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করল।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলো।
ফলাফল হাতে নিয়ে সে বাড়িতে ছুটে এল।
—আব্বা!
রহিম সরদার ভ্যান রেখে ছুটে এলেন।
—কী হয়েছে?
শাহাজান ফলাফল দেখাল।
রহিম সরদারের চোখ জ্বলে উঠল।
—আমার ছেলে পাশ করেছে!
তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
রাহিলা বেগম চোখ মুছলেন।
টুম্পা দৌড়ে এসে বলল,
—ভাইয়া, তুমি এখন ডাক্তার হবে?
শাহাজান হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
রহিম সরদার বললেন,
—তুই শুধু পড়। টাকা আমি জোগাড় করব।
শাহাজান বলল,
—আব্বা, আপনার তো অনেক কষ্ট।
—কষ্ট?
রহিম হাসলেন।
—তোর জন্য কষ্ট করলে সেটা কষ্ট থাকে না।
সেই দিন থেকে রহিম সরদার আগের চেয়ে বেশি সময় ভ্যান চালাতে লাগলেন।
রোদে।
বৃষ্টিতে।
শীতে।
ক্ষুধার্ত অবস্থায়ও।
তার চোখে একটাই স্বপ্ন—
ছেলে ডাক্তার হবে।অধ্যায় ৬
রইচ মিয়ার সিদ্ধান্ত
বিউটি তখন দশম শ্রেণিতে।
এক সন্ধ্যায় রইচ মিয়া মেয়েকে ডাকলেন।
—বিউটি!
—জি বাবা।
—তোর জন্য পাত্র ঠিক করেছি।
বিউটির বুক কেঁপে উঠল।
—আমি বিয়ে করব না।
রইচ মিয়া অবাক।
—কেন?
বিউটি চুপ।
—কাউকে ভালোবাসিস?
বিউটির চোখে পানি।
রইচ মিয়ার মুখ কঠিন হয়ে গেল।
—শাহাজান?
বিউটি মাথা নিচু করল।
রইচ মিয়া বললেন,
—ভ্যানচালকের ছেলে?
বিউটি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—সে গরিব হতে পারে, কিন্তু খারাপ না।
—গরিবের ছেলে দিয়ে সংসার চলে?
—মানুষ ভালো হলে চলে।
রইচ মিয়া টেবিলে হাত মারলেন।
—তুই আমার কথা অমান্য করবি?
বিউটি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—বাবা, আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু শাহাজানকে ভুলতে পারব না।
রইচ মিয়া বললেন,
—সময় হলে বুঝবি, বাবার কথা না শুনলে জীবন কত কঠিন হয়।
বিউটি সেদিন রাতে একা ঘরে বসে কাঁদল।
তার সামনে দুটি পথ।
একটি বাবার।
অন্যটি শাহাজানের।
কোনোটিই সহজ নয়।

অধ্যায় ৭
সিদ্ধান্তের রাত
বিয়ের তারিখ প্রায় ঠিক হয়ে গেছে।
বিউটির বুকের ভেতর ভয়।
সে শাহাজানকে খবর দিল।
তারা দেখা করল।
বিউটি বলল,
—আমাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দেবে।
শাহাজান স্তব্ধ।
—তুমি বাবাকে বোঝাও।
—চেষ্টা করেছি।
—আরেকবার চেষ্টা করো।
বিউটি কাঁদল।
—তুমি কি আমাকে ছেড়ে দেবে?
—না।
—তাহলে আমাকে নিয়ে চলো।
শাহাজান মাথা নিচু করল।
—আমার কাছে তো কিছু নেই।
—তোমার কাছে তুমি আছ।
—আমার পড়াশোনা?
—আমি তোমার পড়াশোনার পথে বাধা হব না।
শাহাজান অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।
তার সামনে বাবার মুখ ভেসে উঠল।
“তুই ডাক্তার হবি।”
আবার সামনে বিউটির কান্না।
শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার কাছে সে দুর্বল হয়ে গেল।
বিউটি বলল,
—আজ রাত বারোটায় সাতক্ষীরা কামাননগর কাউন্টারে থাকবে।
শাহাজান মাথা নেড়ে বলল,
—এসো।অধ্যায় ৮
কামাননগরের রাত
রাত বারোটা।
কামাননগর কাউন্টারে দাঁড়িয়ে শাহাজান।
বারোটা দশ।
বারোটা বিশ।
বারোটা ত্রিশ।
বিউটি এল।
হাতে ছোট ব্যাগ।
চোখে পানি।
শাহাজান বলল,
—তুমি সত্যিই এসেছ?
—হ্যাঁ।
—শেষবার জিজ্ঞেস করছি। ফিরে যেতে চাইলে এখনো পারো।
বিউটি মাথা নাড়ল।
—না।
—জীবন কঠিন হবে।
—তোমার সঙ্গে হলে কষ্টও মেনে নেব।
দূর থেকে বাসের আলো দেখা গেল।
বিউটি শাহাজানের হাত শক্ত করে ধরল।
বাসে উঠতে উঠতে সে একবার পেছনে তাকাল।
মাছখোলার রাত।
অন্ধকার।
তার শৈশব।
তার বাবা।
তার মা।
সবকিছু যেন পিছনে পড়ে গেল।

অধ্যায় ৯
যশোরে নতুন জীবন
যশোরে বিউটির এক পরিচিত আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিল তারা।
কিছুদিন পর বিয়ে করল।
ছোট ঘর।
সামান্য আসবাব।
কিন্তু দুজনের চোখে স্বপ্ন।
বিউটি বলল,
—আমাদের সংসার ছোট হলেও ভালোবাসা বড় হবে।
শাহাজান হেসে বলল,
—আর আমার পড়াশোনা?
—চলবে।
—তুমি কষ্ট পাবে।
—তোমার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন আমারও স্বপ্ন।
কয়েকদিন তারা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।
কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
একদিন খবর এলো—
বিউটির বাবা মামলা করেছেন।
বিউটির মুখ সাদা হয়ে গেল।
—মামলা?
শাহাজান বলল,
—হ্যাঁ।
—কিন্তু আমি তো নিজের ইচ্ছায় এসেছি!
—আমি জানি।
বিউটি কাঁদতে লাগল।
—বাবা আমাকে কেন বুঝল না?
শাহাজান তাকে শান্ত করে বলল,
—সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু তার নিজের বুকেও তখন ভয় ঢুকে গেছে।

অধ্যায় ১০
মীমাংসার নামে ফাঁদ
দুই পক্ষের বসার কথা হলো।
রহিম সরদার ছেলেকে বললেন,
—বাবা, তুই বাড়ি আয়। কথা বলে সব ঠিক করব।
শাহাজান বাবাকে বিশ্বাস করল।
সে বাড়ি ফিরল।
বাড়ির উঠানে পা রাখতেই কয়েকজন পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলল।
—আপনাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।
শাহাজান হতভম্ব।
—কেন?
পুলিশ তাকে ধরে ফেলল।
সে বাবার দিকে তাকাল।
—আব্বা!
রহিম সরদার ছুটে এলেন।
—আমি জানতাম না বাবা!
শাহাজান হাতকড়া পরতে পরতে বলল,
—আপনি কাঁদবেন না।
—আমি তোকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম।
—আমি জানি।
পুলিশ তাকে নিয়ে গেল।
রাহিলা বেগম মাটিতে বসে চিৎকার করে কাঁদলেন।
বিউটি সব দেখছিল।
তার মনে হলো—
এই মানুষটির বিপদ কি আমার কারণেই?

অধ্যায় ১১
আদালতের কাঠগড়ায়
আদালত কক্ষ কানায় কানায় পূর্ণ।
বিচারক মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
শাহাজান আসামির কাঠগড়ায়।
বিউটি আদালতে উপস্থিত।
বিচারক শান্ত কণ্ঠে বললেন,
—মা, ভয় পেয়ো না। সত্য কথা বলবে।
বিউটি কাঁপছিল।
—তোমাকে কি জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?
—না, স্যার।
আদালত নিস্তব্ধ।
—তাহলে তুমি নিজেই গিয়েছিলে?
—জি।
—আসামি কি তোমাকে জোর করে বিয়ে করেছে?
—না।
শাহাজান মাথা নিচু করল।
বিউটির চোখে পানি।
বিচারক আবার বললেন,
—তুমি কি তার সঙ্গে থাকতে চাও?
বিউটি শাহাজানের দিকে তাকাল।
এক মুহূর্তে তার মনে হলো—এই মানুষটিই তার পৃথিবী।
সে বলল,
—জি স্যার। ও আমার স্বামী। আমি ওর সঙ্গে থাকতে চাই।
শাহাজানের চোখে পানি এসে গেল।
কিন্তু আইন তার নিজস্ব পথে চলল।
বিউটির বয়স তখনও আঠারো পূর্ণ হয়নি।
আদালতের আদেশে তাকে পিতার জিম্মায় দেওয়া হলো।
শাহাজানকে পাঠানো হলো কারাগারে।
বিউটি আদালত থেকে বের হওয়ার সময় একবার পেছনে তাকাল।
শাহাজান দাঁড়িয়ে।
তাদের চোখে চোখ পড়ল।
শাহাজান শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে বলল—
“ভয় পেয়ো না।”
বিউটির বুক ফেটে গেল।

অধ্যায় ১২
বিউটির দ্বিতীয় বিয়ে
বিউটিকে অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যত্র বিয়ে দেওয়া হলো।
বিয়ের সাজে বসে সে ভাবছিল—
“আমি কি সত্যিই এই জীবন চাই?”
বরের বাড়িতে যাওয়ার সময় তার চোখে পানি।
নতুন স্বামী খারাপ মানুষ ছিল না।
সংসারে অভাবও ছিল না।
কিন্তু বিউটির মনে একটি শূন্যতা।
রাতে একা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে ফিসফিস করে বলত,
—শাহাজান, তুমি কোথায়?
কেউ উত্তর দিত না।
সময় চলে গেল।
তার একটি ছেলে হলো।
তারপর একটি মেয়ে।
সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মাতৃত্ব জেগে উঠল।
কিন্তু অতীতকে সে মুছে ফেলতে পারল না।

অধ্যায় ১৩
পাঁচ বছরের অপেক্ষা
মামলা চলতে লাগল।
এক বছর।
দুই বছর।
তিন বছর।
চার বছর।
পাঁচ বছর।
এই পাঁচ বছরে রহিম সরদারের জীবন বদলে গেল।
মামলার খরচ চালাতে তিনি নিজের একমাত্র ভিটা বিক্রি করলেন।
ভ্যান চালিয়ে টাকা জোগাড় করলেন।
শেষে সরকারি খাস জমিতে ঘর তুলতে হলো।
রাহিলা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
টুম্পা তখন নবম শ্রেণিতে।
একদিন টুম্পা মাকে বলল,
—মা, ভাইয়া কি আর কখনো বাড়ি আসবে?
রাহিলা চোখ মুছে বললেন,
—আল্লাহ জানেন মা।
টুম্পা বলল,
—ভাইয়া ডাক্তার হতে চেয়েছিল।
তারপর মাথা নিচু করে বলল,
—ভাইয়া হতে পারেনি। আমি ডাক্তার হব।
রাহিলা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

অধ্যায় ১৪
কারাগারের দিনরাত্রি
কারাগারের একটি ছোট ঘরে বসে শাহাজান জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখত।
তার হাতে বই।
কিন্তু পড়ায় মন বসত না।
একদিন একজন কারারক্ষী জিজ্ঞেস করল,
—তুমি এত চুপচাপ থাকো কেন?
শাহাজান হাসল।
—কথা বলার মতো মানুষ তো নেই।
—পরিবার?
—আছে।
—তাহলে?
শাহাজান আকাশের দিকে তাকাল।
—দূরে।
একদিন সে একটি চিঠি পেল।
টুম্পার চিঠি।
“ভাইয়া,
তুমি ডাক্তার হতে পারোনি। আমি হব।
তোমার স্বপ্ন আমি পূরণ করব।”
চিঠি পড়ে শাহাজান দীর্ঘক্ষণ কাঁদল।
তারপর কাগজে লিখল—
“টুম্পা, আমার জীবন হয়তো থেমে গেছে। কিন্তু আমার স্বপ্ন থামেনি।”

অধ্যায় ১৫
বিউটির ভেতরের যুদ্ধ
বিউটি তখন দুই সন্তানের মা।
একদিন মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে ছিল।
মেয়ে বলল,
—মা, তুমি কাঁদছ কেন?
বিউটি চোখ মুছে হাসল।
—কিছু না।
ছেলে বলল,
—মা, তুমি দুঃখী?
বিউটি তাদের বুকে জড়িয়ে ধরল।
তার মনে হলো—
“এই সন্তানদের জন্য আমাকে শক্ত থাকতে হবে।”
কিন্তু রাত হলেই বিবেকের আদালত বসত।
একটি প্রশ্ন—
“তুমি শাহাজানকে ভালোবাসতে?”
—হ্যাঁ।
“তাহলে কেন তাকে ছেড়ে দিলে?”
—আমি ভয় পেয়েছিলাম।
“কাকে?”
—বাবাকে।
“আর?”
—সমাজকে।
“আর শাহাজান?”
বিউটির চোখে পানি।
কোনো উত্তর নেই।অধ্যায় ১৬
চূড়ান্ত সাক্ষ্য
মামলার শেষ পর্যায়।
আদালত আবার কানায় কানায় পূর্ণ।
শাহাজান কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে।
বিউটি সাক্ষীর আসনে।
বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে তার বুক কাঁপছিল।
সে শাহাজানের দিকে তাকাল।
এই মানুষটিই একসময় তার হাত ধরে বলেছিল—
“তুমি থাকলে আমার কিছু চাই না।”
আজ তাকে নিয়েই বলতে হবে এমন কথা, যা তার জীবনকে আরও অন্ধকার করবে।
বিউটির মনে হলো—
“আমি যদি সত্যের পুরো কথাটা বলি?”
“আমি যদি বলি, আমি নিজেই তাকে নিয়ে পালিয়েছিলাম?”
“আমি যদি বলি, সে আমাকে জোর করেনি?”
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার সন্তানদের মুখ ভেসে উঠল।
সমাজের ভয়।
সংসার হারানোর ভয়।
সবকিছু মিলিয়ে সে দুর্বল হয়ে পড়ল।
তার সাক্ষ্য শাহাজানের বিরুদ্ধে গেল।
আদালত থেকে বেরিয়ে এসে সে একটি দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
তার ঠোঁট কাঁপছিল।
—শাহাজান, আমাকে ক্ষমা করো।

অধ্যায় ১৭
রায়
রায়ের দিন।
আদালতে অস্বাভাবিক নীরবতা।
বিচারক রায় পড়তে শুরু করলেন।
শেষে উচ্চারিত হলো—
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
মুহূর্তেই আদালতে কান্নার শব্দ।
কেউ কাঁদছে।
কেউ চুপ করে আছে।
কেউ অবিশ্বাসে তাকিয়ে।
বিউটির মুখে কোনো কথা নেই।
শাহাজান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে।
তার চোখে পানি।
কিন্তু মুখে অভিশাপ নেই।
সে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—হে আল্লাহ, তুমি মহান। মানুষের বিচার শেষ বিচার নয়। তোমার আদালতে সত্য সবসময় সত্য।
বিউটি দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিল।
তার বুকের ভেতর যেন কেউ ছুরি চালাল।
সে মনে মনে বলল,
“আমি তাকে হারাইনি। আমি তাকে হারিয়ে দিয়েছি।”

অধ্যায় ১৮
বাবার শেষ দিন
রহিম সরদার রায় শোনার পর আর আগের মতো থাকলেন না।
একদিন তিনি ভ্যান নিয়ে বের হলেন।
কিন্তু শরীর আর চলছিল না।
বাড়ি ফিরে ছেলের পুরোনো বই হাতে নিলেন।
বইয়ের পাতায় শাহাজানের হাতের লেখা।
তিনি আঙুল বুলিয়ে বললেন,
—বাবা, তুই ডাক্তার হতে পারলি না।
রাহিলা কাঁদছিলেন।
রহিম বললেন,
—আমি তোকে রক্ষা করতে পারলাম না।
কয়েকদিন পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
মৃত্যুর আগে টুম্পার হাত ধরে বললেন,
—তুই পড়বি।
—জি আব্বা।
—তোর ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণ করবি।
—করব।
রহিম সরদার চোখ বন্ধ করলেন।
তার মুখে তখনও ছেলের প্রতি ভালোবাসা।অধ্যায় ১৯
বহু বছর পর
সময় থেমে থাকে না।
টুম্পা বড় হলো।
পড়াশোনা করল।
একদিন সে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলো।
ভাইয়ের স্বপ্ন তার নিজের জীবনের স্বপ্ন হয়ে গেল।
অন্যদিকে বিউটির সন্তানরাও বড় হতে লাগল।
একদিন বিউটির ছেলে জিজ্ঞেস করল,
—মা, তুমি কি ছোটবেলায় কাউকে খুব ভালোবাসতে?
বিউটির বুক কেঁপে উঠল।
—কেন?
—তোমার পুরোনো একটা ছবি পেয়েছি।
বিউটি কিছু বলল না।
ছেলে বলল,
—তুমি তখন খুব হাসতে।
বিউটি মৃদু হাসল।
—মানুষের জীবনে কিছু হাসি থাকে, যেগুলো পরে মনে করলে কষ্ট হয়।অধ্যায় ২০
কারাগারে সাক্ষাৎ
বহু বছর পর বিউটি শাহাজানের সঙ্গে দেখা করতে গেল।
লোহার গ্রিলের ওপারে শাহাজান।
চুলে পাক।
মুখে বয়সের রেখা।
কিন্তু চোখে সেই শান্তি।
বিউটি বসতে পারছিল না।
শাহাজান বলল,
—বসো।
বিউটি বসে পড়ল।
দীর্ঘ নীরবতা।
শেষে বিউটি বলল,
—আমাকে ঘৃণা করো?
শাহাজান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—অনেক চেষ্টা করেছি।
—পেরেছ?
—না।
বিউটির চোখ দিয়ে পানি পড়ল।
—কেন?
শাহাজান মৃদু স্বরে বলল,
—কারণ তোমাকে একসময় সত্যিই ভালোবাসতাম।
বিউটি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আমি তোমার জীবন নষ্ট করেছি।
—তুমি আমার জীবন বদলে দিয়েছ।
—আমার জন্য তুমি সব হারিয়েছ।
—হ্যাঁ।
—তবুও আমাকে ক্ষমা করেছ?
শাহাজান তাকিয়ে রইল।
—অনেক আগেই।
বিউটি মাথা নিচু করল।
—আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য পালিয়েছিলাম।
—জানি।
—তারপর তোমাকে হারিয়ে ফেললাম।
শাহাজান ধীরে বলল,
—তুমি আমাকে হারাওনি, বিউটি। আমরা দুজনেই নিজেদের ভয়, সমাজ আর পরিস্থিতির কাছে হেরে গিয়েছিলাম।
বিউটি কাঁদতে লাগল।অধ্যায় ২১

বিউটির স্বীকারোক্তি
বিউটি বলল,
—আমি তোমাকে প্রতারণা করতে চাইনি।
শাহাজান চুপ।
—আমি শুধু ভয় পেয়েছিলাম।
—কিসের ভয়?
—বাবাকে হারানোর ভয়।
—সমাজের ভয়।
—নতুন সংসার ভেঙে যাওয়ার ভয়।
—আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের ভয়।
সে চোখ মুছে বলল,
—কিন্তু এত ভয় পেতে পেতে আমি এমন একজন মানুষকে হারালাম, যে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত।
শাহাজান বলল,
—মানুষ কখনো কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।
—আমার ভুলের শাস্তি তুমি পেয়েছ।
—আমার শাস্তি শুধু কারাগার নয়।
বিউটি তাকাল।
—তাহলে?
—তুমি যে আমাকে ভালোবাসতে, সেই স্মৃতিটা নিয়েই আমাকে বাঁচতে হয়েছে।
বিউটির কান্না থামল না।

অধ্যায় ২২

শেষ চিঠি
কয়েকদিন পর শাহাজান একটি চিঠি পেল।
বিউটির চিঠি।
“শাহাজান,
তুমি হয়তো ভাবো আমি তোমাকে ভুলে গেছি।
না।
আমি সংসার করেছি, সন্তান হয়েছে, জীবন চলেছে।
কিন্তু আমার ভেতরে একটি জায়গা কখনো পূর্ণ হয়নি।
সেই জায়গাটির নাম—শাহাজান।
আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেটিই শেষ পর্যন্ত তোমাকে হারানোর কারণ হয়েছে।
আমি যদি সেদিন একটু সাহসী হতাম!
আমি যদি বাবাকে সত্যি করে বোঝাতে পারতাম!
আমি যদি সমাজের ভয়কে জয় করতে পারতাম!
তাহলে হয়তো আজ তোমার জীবন অন্যরকম হতো।
আমি জানি, হারানো সময় ফিরিয়ে দিতে পারব না।
শুধু চাই—
তুমি আমাকে খারাপ মানুষ হিসেবে মনে রেখো না।
আমি ভুল করেছি।
কিন্তু তোমাকে ভালোবাসিনি—এ কথা কখনো বলো না।
কারণ তোমাকে আমি সত্যিই ভালোবেসেছিলাম।
শুধু তোমার পাশে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ানোর মতো সাহস আমার ছিল না।
—বিউটি।”

অধ্যায় ২৩
শাহাজানের উত্তর
শাহাজান চিঠির উত্তর দিল।
“বিউটি,
তোমার চিঠি পেয়েছি।
তুমি জানতে চেয়েছ আমি তোমাকে কীভাবে মনে রেখেছি।
আমি তোমাকে খলনায়িকা হিসেবে মনে রাখিনি।
আমি তোমাকে সেই মেয়েটি হিসেবেই মনে রেখেছি, যে একদিন নদীর ঘাটে বসে বলেছিল—
‘তুমি ডাক্তার হলে আমাকে ভুলে যেও না।’
আমি ভুলিনি।
তুমি ভুল করেছ।
আমিও করেছি।
তোমাকে নিয়ে পালানোর সিদ্ধান্ত আমারও ছিল।
কিন্তু আজ আর কাউকে দোষ দিতে চাই না।
তুমি তোমার সন্তানদের ভালো মানুষ করো।
তাদের শেখাও—
ভালোবাসা শুধু কাউকে পাওয়া নয়।
ভালোবাসার জন্য কখনো কখনো সত্যের পাশে দাঁড়াতেও হয়।
আর নিজের ভয়কে জয় করতে হয়।
তুমি ভালো থেকো।
আমি তোমার জন্য দোয়া করি।
—শাহাজান।”অধ্যায় ২৪
টুম্পার কাছে ভাই
একদিন টুম্পা কারাগারে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেল।
এখন সে একজন চিকিৎসক।
শাহাজান তাকিয়ে রইল।
—তুই সত্যিই ডাক্তার হয়েছিস?
টুম্পা হেসে বলল,
—তোমার জন্য।
শাহাজানের চোখ ভিজে গেল।
—আমি পারিনি।
—তুমি পেরেছ।
—কীভাবে?
—তোমার স্বপ্ন আমার মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছ।
শাহাজান বোনের হাত ধরে বলল,
—তুই গরিব মানুষের চিকিৎসা করবি।
—করব।
—আমাদের মতো মানুষদের ভুল বুঝিস না।
টুম্পা বলল,
—কখনো না।
ভাই-বোন দুজনেই কাঁদল।
সেদিন কারাগারের দেয়ালও যেন একটু নরম হয়ে এসেছিল।

অধ্যায় ২৫
মাছখোলায় ফিরে আসা
বহু বছর পর একদিন টুম্পা মাছখোলা গ্রামে গেল।
নদী আগের মতোই আছে।
সরিষার ক্ষেত আগের মতোই হলুদ।
শুধু মানুষগুলো বদলে গেছে।
সে স্কুলের সামনে দাঁড়াল।
যে গাছটির নিচে একদিন বিউটি শাহাজানকে ভালোবাসার কথা বলেছিল, গাছটি এখনও আছে।
টুম্পা গাছটির দিকে তাকিয়ে বলল,
—কত গল্প জানো তুমি!
বাতাসে পাতাগুলো কেঁপে উঠল।
সে নদীর ঘাটে গিয়ে দাঁড়াল।
মনে হলো—
দূরে কোথাও ভাইয়ের কণ্ঠ ভেসে আসছে।
“তুমি ডাক্তার হলে আমাকে ভুলে যেও না।”
টুম্পা চোখ মুছে বলল,
—ভাইয়া, কেউ তোমাকে ভুলেনি।অধ্যায় ২৬
বিউটির শেষ উপলব্ধি
বছর কেটে যায়।
বিউটির সন্তানরা বড় হয়।
একদিন তার ছেলে মায়ের পাশে বসে বলল,
—মা, মানুষ কি ভুল করলে সারাজীবন অপরাধী থাকে?
বিউটি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—না।
ছেলে বলল,
—তাহলে?
—মানুষ ভুলের পর কী করে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
—তুমি কি কোনো ভুল করেছ?
বিউটির চোখে পানি।
—হ্যাঁ।
—কী ভুল?
বিউটি দূরে তাকিয়ে বলল,
—একদিন আমি ভয়কে ভালোবাসার চেয়ে বড় করে দেখেছিলাম।
ছেলে বুঝল না।
কিন্তু বিউটি জানত—
এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।

অধ্যায় ২৭
শেষ দেখা
একদিন খবর এলো—
শাহাজানের শরীর খুব খারাপ।
বিউটি আবার কারাগারে গেল।
শাহাজান বিছানায় শুয়ে।
বিউটি কাছে গিয়ে বসতেই শাহাজান চোখ খুলল।
—তুমি এসেছ?
—হ্যাঁ।
—কাঁদছ কেন?
—আমি পারি না নিজেকে ক্ষমা করতে।
শাহাজান ধীরে বলল,
—নিজেকে ক্ষমা করো।
—কীভাবে?
—মানুষকে ক্ষমা করতে পারলে নিজেকেও করতে হয়।
বিউটি বলল,
—তুমি কি সুখী ছিলে?
শাহাজান মৃদু হাসল।
—সুখের সংজ্ঞা বদলে গেছে।
—আমাকে নিয়ে তোমার কোনো অভিযোগ নেই?
—আছে।
বিউটি তাকাল।
—কী?
—তুমি যদি সেদিন একটু সাহসী হতে!
বিউটির চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ল।
শাহাজান বলল,
—কিন্তু এখন আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে কী হবে?
বিউটি তার হাত ধরল।
দুজনের হাতের মাঝে লোহার শিক।
একদিকে অতীত।
অন্যদিকে বর্তমান।
মাঝখানে একটি অসমাপ্ত ভালোবাসা।অধ্যায় ২৮

শেষ বিচার
সন্ধ্যা নামছে।
কারাগারের আকাশে লাল আভা।
শাহাজান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।
দূরে আজানের ধ্বনি।
সে দুহাত তুলে দোয়া করল—
—হে আল্লাহ, তুমি সব জানো। মানুষের চোখ যা দেখে না, তুমি তা দেখো। মানুষের বিচার যেখানে শেষ, তোমার বিচার সেখানে শুরু। আমি যাদের কারণে কষ্ট পেয়েছি, তাদের ক্ষমা করো। আমার বাবা-মাকে শান্তি দাও। আমার বোনকে সুখী করো। আর বিউটিকে শান্তি দাও।
তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু মুখে প্রশান্তি।
অন্যদিকে বিউটি নিজের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে একই আকাশের দিকে তাকিয়ে।
তার মনে পড়ছে মাছখোলার সেই নদী।
সরিষার ক্ষেত।
স্কুলের বারান্দা।
শাহাজানের হাসি।
কামাননগরের সেই রাত।
বাসের জানালা।
আদালতের কাঠগড়া।
রায়ের দিন।
সবকিছু।
সে চোখ বন্ধ করে বলল,
—শাহাজান, আমি তোমাকে হারাইনি। আমি আমার নিজের ভয়কে হারাতে পারিনি।
ভালোবাসা মরে না
মাছখোলার নদী এখনও বয়ে যায়।
শীতের সকালে সরিষার ফুলের ওপর এখনও শিশির জমে।
সূর্যের আলো পড়লে এখনও সেগুলো মুক্তোর মতো ঝিকমিক করে।
মাছখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা খেলছে।
কেউ জানে না—
এই মাঠে একদিন শাহাজান দাঁড়িয়ে বই পড়ত।
কেউ জানে না—
একটি মেয়ে দূর থেকে তাকিয়ে তাকে ভালোবাসত।
কেউ জানে না—
একজন ভ্যানচালক বাবা ছেলেকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন।
কেউ জানে না—
একটি ভুল সিদ্ধান্ত একটি পরিবারের ভিটে কেড়ে নিয়েছিল।
কেউ জানে না—
একটি মামলার কারণে একজন তরুণের যৌবন কারাগারের অন্ধকারে কেটে গেছে।
কেউ জানে না—
বিউটি আজও মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে উঠে জানালার পাশে দাঁড়ায়।
তার সন্তানরা ঘুমিয়ে থাকে।
ঘর নিস্তব্ধ।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে—
—শাহাজান, তুমি কি সত্যিই আমাকে ক্ষমা করেছ?
কোনো উত্তর আসে না।
শুধু দূরের বাতাস জানালার পর্দা দুলিয়ে যায়।
বিউটি চোখ মুছে।
তারপর ধীরে ধীরে বলে—
—আমি তোমাকে হারানোর পর বুঝেছি, মানুষ কখনো কখনো ভালোবাসার মানুষকে হারায় না; নিজের ভয়কে জয় করতে না পারার কারণে তাকে হারিয়ে ফেলে।
দূরে নদীর ঢেউ ভাঙে।
কারাগারের জানালার পাশে শাহাজানও হয়তো একই আকাশের দিকে তাকিয়ে।
তার জীবনে বিউটি এখন আর কোনো দাবি নয়।
কোনো অভিযোগ নয়।
শুধু একটি স্মৃতি।
একটি অসমাপ্ত গান।
একটি দীর্ঘশ্বাস।
আর একটি প্রার্থনা—
“হে আল্লাহ, মানুষের আদালতে যে বিচার হয়েছে, তার সত্য তুমি জানো।
যদি কোথাও অন্যায় হয়ে থাকে, তুমি তার ন্যায়বিচার করো।
যারা ভুল করেছে, তাদের ক্ষমা করো।
আর যারা কষ্ট পেয়েছে, তাদের হৃদয়ে শান্তি দাও।”
মাছখোলার নদী বয়ে চলে।
সময় চলে যায়।
মানুষ চলে যায়।
কিন্তু কিছু ভালোবাসা—
মরে না।
তারা মানুষের জীবনের ভেতরে নীরবে বেঁচে থাকে।
কখনো অশ্রু হয়ে।
কখনো স্মৃতি হয়ে।
কখনো অনুতাপ হয়ে।
আর কখনো—
শেষ বিচারের অপেক্ষা হয়ে।