সরকারি প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, আবার বেনামে নিজেই বাগিয়ে নিচ্ছেন শত কোটি টাকার সরকারি কাজের টেন্ডার। বাদ পড়ছেন না নিজ দপ্তরের জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারের কাজও; বিলের ভাগাভাগি না মিললে অন্য ঠিকাদারদের অফিসে প্রবেশেও ঝুলছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। এমনই এক বিশাল দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী ও ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর শাখা নির্বাহী সদস্য মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
শুধু স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীই নন, এ সিন্ডিকেটে খোদ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী জনাব মোঃ তারেক আনোয়ার জাহেদীর ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের চাঞ্চল্যকর তথ্যও উঠে এসেছে। এসব ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন সাকিল আহম্মেদ নামে বরিশালের এক সচেতন নাগরিক।
তদন্ত ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যানুযায়ী, বরিশাল শহরস্থ ভাটার খাল রোডে অবস্থিত জরাজীর্ণ ইইডি ভবন মেরামতে মেসার্স কবির এন্টারপ্রাইজ ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং মেসার্স খান ট্রেডিং ৭৮ লাখ টাকা ব্যয় করে মোট ৪ কোটি টাকার সংস্কার কাজ সম্পন্ন করে। কিন্তু কাজ শেষ হতেই বাধে বিপত্তি। নামমাত্র বিল বুঝিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটিকে নিজ কার্যালয়ে প্রবেশে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেন নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম।
পরবর্তীতে ওই কাজের বাকি টাকা আত্মসাৎ করতে অন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার ও পেপার টেন্ডার সাজিয়ে পুরো অর্থ তুলে নেন তিনি। অর্থ উত্তোলনে ব্যবহৃত এমন কিছু প্রতিষ্ঠান হলো: মেসার্স মাদার কনস্ট্রাকশন, মেসার্স কে পি বিল্ডার্স, মেসার্স পিপন কনস্ট্রাকশন, মেসার্স ওয়ারিসা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স আরিফ বিল্ডার্স।
এই পুরো জালিয়াতি প্রক্রিয়ায় মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন দপ্তরের হিসাবরক্ষক মোঃ শহিদুর রহমান।
নিজেই ঠিকাদারি ব্যবসা চালাতে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল বেশ কিছু বড় বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। এমনকি বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও তিনি আগলে রাখছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
গত ৭ অক্টোবর (২০২৬) বরিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ১ কোটি ৩৭ লক্ষ টাকার একটি পূর্ত কাজ দেওয়া হয় ‘মেসার্স মাদার কনস্ট্রাকশন’ নামে এক প্রতিষ্ঠানকে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিক সাবেক সংসদ সদস্য আমির হোসেন আমুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ঝালকাঠি জেলা ছাত্রলীগের বিতর্কিত নেতা ফয়সাল হোসেন জুয়েল। এভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্বৈরাচারের দোসরদের ব্যবসায়িক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মেসার্স মোমিন সিকদার, মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ, ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং মেসার্স রাফিদ ট্রেডার্সের নামে প্রায় ৩২ কোটি টাকার কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্প এবং বরিশাল নগরীর বরিশাল কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণকাজের বড় বড় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
দুদকের লিখিত আবেদনে অভিযোগকারী সাকিল আহম্মেদ যেসব মূল বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন:
১. পিএসসি প্রশ্নফাঁস লিংক: শহিদুলের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং পিএসসির প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের আলোচিত চরিত্র ড্রাইবার সৈয়দ আবেদ আলী জীবন চক্রের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না।
২. শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ: ঘুষ ও দুর্নীতির টাকায় ঢাকা ও বরিশালে নামে-বেনামে কেনা জমি, ফ্ল্যাট, উত্তরায় নিজস্ব বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি ও অঢেল সম্পদের ব্যাংক হিসাব।
৩. মানববন্ধনে হামলা: এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের মানববন্ধনে শহিদুলের নিজস্ব বাহিনী দিয়ে হামলা ও হুমকি প্রদান।
অফিসের মূল নথি, পরিমাপ বই (এমবি বুক), ব্যাংক লেনদেনের বিবরণী এবং আয়কর রিটার্ন ফাইল নিরপেক্ষভাবে যাচাই করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন ক্ষুব্ধ ঠিকাদার ও সচেতন নাগরিক সমাজ।
অভিযোগের বিষয়ে সাকিল আহম্মেদ জানান, একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে ইইডির প্রকাশ্য দুর্নীতির তথ্য প্রমাণসহ দুদকের কাছে জমা দিয়েছি। আশা করি কমিশন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও তাঁর সিন্ডিকেটের আসল রূপ প্রকাশ করবে।
আদনান অলি 

























