- সাবিত রিজওয়ান
রাত পৌনে একটার মফস্বল রেলস্টেশন।
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু এখনো টুপটাপ করে জল ঝরছে স্টেশনের শেড থেকে। লাইনের ওপর কুয়াশা আর সোডিয়াম বাতির হলুদ আলো মিলে তৈরি করছে এক অদ্ভুত আবছায়া। দেরিতে আসা উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনটা আরও দেরি করছে।
একমাত্র খোলা টং দোকানটায় চায়ের পানি ফুটছে। দোকানদার কাচের বয়ামগুলো গুছিয়ে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে টিনের কাপে চা ঢালার। কাঠের বেঞ্চে বসে আছেন একজন মাঝবয়সী লোক। গায়ে পাতলা চাদর, কোলে শক্ত করে ধরা একটা সুতির থলে।
তাঁর পাশে এসে দাঁড়াল এক যুবক। জ্যাকেটের পকেটে হাত গুঁজে কিছুক্ষণ রেললাইনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পকেট থেকে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া খালি সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে লাইনের দিকে ছুড়ে দিল।
যুবক লোকটার দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বলল, “দেশলাই হবে, চাচা?”
লোকটি কথা না বলে থলে থেকে চাবির রিংয়ে ঝোলানো ছোট দেশলাইয়ের খাপটা বের করে এগিয়ে দিলেন। যুবক একটা কাঠি জ্বেলে সিগারেট ধরাল। তারপর খাপটা ফেরত দিল।
লোকটার কোলের থলেটার দিকে চোখ যেতেই যুবক দেখতে পেল, ভেতরে দুটো পুরোনো ফাইল আর এক গোছা প্রেসক্রিপশন। ওপরের পাতায় পাঁচ বছর আগের একটা তারিখ, সঙ্গে পরিচিত এক হাসপাতালের সিল।
“পাবনা যাবেন?” যুবক স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল।
লোকটি শার্টের খুঁট দিয়ে চশমার কাচ মুছলেন।
“না। বগুড়া। ছেলের কাছে।”
“চিকিৎসা করাতে গেছিলেন?”
“না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ছেলে বলল, ঢাকা গিয়ে একবার বড় ডাক্তারকে দিয়ে ভালো করে দেখিয়ে আসি। প্রতি বছরই এই কাগজপত্র নিয়ে আমাকে ঢাকায় পাঠায়।”
যুবক রেললাইনের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল।
“আপনার শরীর তো ভালোই দেখাচ্ছে।”
“শরীর ভালোই।” লোকটি চশমা পরে থলেটা কোলের কাছে টেনে নিলেন। “বড় ডাক্তাররাও বলে আমার কিছু হয়নি। কিন্তু আমার ছেলেটা নিশ্চিত হতে চায়। যত দিন ও জানবে আমি ভালো আছি, তত দিন হয়তো ওর রাতের ঘুমটা ঠিকঠাক হবে।”
যুবক কিছু বলল না। তার সিগারেটের ছাই প্ল্যাটফর্মের জমে থাকা পানিতে টুপ করে খসে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর দোকানদার দুটো টিনের কাপে ধোঁয়া ওঠা চা এনে বেঞ্চের কোণায় রাখল। লোকটি টাকা দিয়ে একটা কাপ যুবকের দিকে এগিয়ে দিলেন।
“চা-টা খাও। রাতের বাতাসটা ভেজা।”
যুবক একটু থমকে গেল। কিছুক্ষণ কাপের ওপর ওঠা ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে চা তুলে নিল। টিনের কাপের তাপে তার ঠান্ডা আঙুলগুলো একটু উষ্ণ হলো।
দুজনে চুপচাপ চা খেতে লাগল। দূরে লাইন পরিবর্তনের ভারী ধাতব শব্দ ছাড়া স্টেশনে আর কোনো সাড়াশব্দ নেই।
চায়ের শেষ চুমুক দিয়ে যুবক নিচু গলায় বলল, “আমার বাপও এই রকমই ছিল। প্রতি রাতে খাওয়াদাওয়া শেষে ঘরের দরজায় টাঙানো ট্রেনের সময়সূচির দিকে তাকিয়ে থাকত। আমি ভাবতাম, ওটা উনার খামখেয়ালি। রাগ করে বাড়ি ছাড়ার সময় ঠিক করেছিলাম, বড় কিছু একটা করে তবেই বাড়ি ফিরব। তার আগে বাপের সামনে দাঁড়াব না।”
লোকটি যুবকের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে উপদেশ দেওয়ার তাগিদ নেই, শুধু একধরনের নীরবতা।
“চার বছর পার হয়ে গেল। পকেটে আজ আশিটা টাকা। আর এই এক কাপ চা।”
যুবক কথাটা বলেই খালি কাপের দিকে তাকিয়ে রইল।
লোকটি নিজের খালি কাপটা বেঞ্চের পাশে রাখলেন। তারপর ধীরে ধীরে সুতির থলেটা কাঁধে ঝোলালেন।
“ছেলেরা রাগ করে বাড়ি ছাড়লে ভাবে, নিজের মতো করে জীবন গড়তে পারলেই বুঝি সব হয়ে গেল।”
লোকটি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর খুব সাধারণ গলায় বললেন, “বাপেরা তো এই চিন্তাই করে, ছেলেটা খেয়েছে কি না, কোথায় আছে।”
দূরে তীব্র আলো ফেলে বাঁশি বাজাতে বাজাতে উত্তরবঙ্গের ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকল। ইস্পাতের চাকার শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল।
লোকটি যাত্রীদের ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেলেন। একবার পেছনে তাকালেন বটে, কিন্তু কিছু বললেন না। একটু পরেই ভিড়ের মধ্যে তাঁকে আর দেখা গেল না।
ট্রেনটা মিনিট দুয়েক থেমে আবার চলতে শুরু করল। কামরার জানালার আলো একে একে প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে গেল।
যুবক বেঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। পকেটে আশি টাকা। চারপাশে ভেজা রাত। কানে বাজছে লোকটার শেষ কথাগুলো।
ট্রেনটা দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে সে সিগারেটের অবশিষ্টাংশটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে নিভিয়ে দিল। তারপর স্টেশনের ফুটওভার ব্রিজের দিকে হাঁটল।
সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখার আগে একবার থামল যুবক। ওপরে কয়েকটা ম্লান বাতি জ্বলছে। ব্রিজের ওপারে শহরটা অন্ধকারে ডুবে আছে।
সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
সাবিত রিজওয়ান 



























