বাংলাদেশ 11:24 pm, Wednesday, 28 October 2026

জীবন থেকে মুছে যাওয়া দৃশ্য

এটি গ্রামীণ বাংলার একটি অত্যন্ত পরিচিত অথচ হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী সকালের দৃশ্য।

  • উত্তম ঘোষ

দূর থেকেই দৃশ্যটি চোখে আটকে গেছে। চোখের পাতা এক করতে পারছি না । ক্যামেরায় বন্দী করার উপকরণ নেই। তাই মনের সেলুলয়েড বেধে রাখছি। বুকের ভিতরটা শিরশির করে উঠছে। দৃশ্যটি কত চিরচেনা জানা আপন। চিরচেনা একটি গল্পের মতো। আমাদের বাড়ির সামনেই পুকুর পাড়ে রেললাইন। পাড়েই খেজুর গাছ, তালগাছ পাশাপাশি। শীতের বাতাস আগমনের সাথে সাথেই তোড় জোর শুরুর শুরু হয়ে যেত। বিশেষ করে আমার ঠাকুরমা, মা আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা। আর রস আহরন একধরনের নিপুণ হাতের কারিগরের একটা শিল্প। রসের হাঁড়িতে দড়ি বাধা, গাছে কত উচ্চতায় বাকল তুলতে হবে ত্রিকোনাকার করে এ যেন দক্ষ কারিগরী বিষয়। আর যে দাঁ দিয়ে গাছ ছিলতে হবে সেটাও অন্যরকম ভাবে তৈরি। কোমরে বাঁধার দড়ি, এক বাঁশের মাচা, রস চুয়ে হাঁড়িতে জমা হবার চোঙ নানান রঙের সব মিলিয়েই রস সংগ্রহের যুদ্ধ। আর এ যুদ্বে সেনাপতি আমার মেঝো দাদা। মানিকদা। আমরা ডাকি ধনদা। বাঁদুরে, পাখি যাতে নষৃট বা খেতে না পারে জাল দিয়ে ঢেকে দেওয়া। আবার ভোরের কুয়াশা কেটে যাবার আগেই রস নামিয়ে আনা। আজও কুয়াশায় ঢাকা খেজুর গাছ দেখলেই সেই দিনের সেই রসের হাঁড়ি নামানোর সময় নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার সোনালী অতীত এমন ভাবে শরীরকে কাঁপিয়ে দেয় আর এ জীবনেও ঐ শীত স্পর্শ করবে না কোনদিন।

শীতের কুয়াশায় ঢাকা খেজুরগাছ, মাটির হাঁড়িতে জমে থাকা মিষ্টি রস আর ভোরের অপেক্ষা—সব মিলিয়ে গ্রামবাংলার এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতিচারণ। উত্তম ঘোষের ‘জীবন থেকে মুছে যাওয়া দৃশ্য’ গদ্যে উঠে এসেছে শৈশবের মায়াময় দিন, ঠাকুরমা-মায়ের আয়োজন এবং মেজো দাদা মানিকদা ওরফে ধনদাকে ঘিরে থাকা পারিবারিক স্মৃতি। সময়ের স্রোতে অনেক দৃশ্য ও প্রিয় মুহূর্ত হারিয়ে গেলেও মনের পর্দায় তারা অমলিন থেকে যায়। স্মৃতিকাতর এই লেখাটি পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে যায় গ্রামবাংলার চিরচেনা শীতের সকাল ও সোনালি অতীতের কাছে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সম্পাদক

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
জনপ্রিয়

মর্দনলীলা

জীবন থেকে মুছে যাওয়া দৃশ্য

প্রকাশ 10:07:28 pm, Wednesday, 28 October 2026
  • উত্তম ঘোষ

দূর থেকেই দৃশ্যটি চোখে আটকে গেছে। চোখের পাতা এক করতে পারছি না । ক্যামেরায় বন্দী করার উপকরণ নেই। তাই মনের সেলুলয়েড বেধে রাখছি। বুকের ভিতরটা শিরশির করে উঠছে। দৃশ্যটি কত চিরচেনা জানা আপন। চিরচেনা একটি গল্পের মতো। আমাদের বাড়ির সামনেই পুকুর পাড়ে রেললাইন। পাড়েই খেজুর গাছ, তালগাছ পাশাপাশি। শীতের বাতাস আগমনের সাথে সাথেই তোড় জোর শুরুর শুরু হয়ে যেত। বিশেষ করে আমার ঠাকুরমা, মা আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা। আর রস আহরন একধরনের নিপুণ হাতের কারিগরের একটা শিল্প। রসের হাঁড়িতে দড়ি বাধা, গাছে কত উচ্চতায় বাকল তুলতে হবে ত্রিকোনাকার করে এ যেন দক্ষ কারিগরী বিষয়। আর যে দাঁ দিয়ে গাছ ছিলতে হবে সেটাও অন্যরকম ভাবে তৈরি। কোমরে বাঁধার দড়ি, এক বাঁশের মাচা, রস চুয়ে হাঁড়িতে জমা হবার চোঙ নানান রঙের সব মিলিয়েই রস সংগ্রহের যুদ্ধ। আর এ যুদ্বে সেনাপতি আমার মেঝো দাদা। মানিকদা। আমরা ডাকি ধনদা। বাঁদুরে, পাখি যাতে নষৃট বা খেতে না পারে জাল দিয়ে ঢেকে দেওয়া। আবার ভোরের কুয়াশা কেটে যাবার আগেই রস নামিয়ে আনা। আজও কুয়াশায় ঢাকা খেজুর গাছ দেখলেই সেই দিনের সেই রসের হাঁড়ি নামানোর সময় নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার সোনালী অতীত এমন ভাবে শরীরকে কাঁপিয়ে দেয় আর এ জীবনেও ঐ শীত স্পর্শ করবে না কোনদিন।

শীতের কুয়াশায় ঢাকা খেজুরগাছ, মাটির হাঁড়িতে জমে থাকা মিষ্টি রস আর ভোরের অপেক্ষা—সব মিলিয়ে গ্রামবাংলার এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতিচারণ। উত্তম ঘোষের ‘জীবন থেকে মুছে যাওয়া দৃশ্য’ গদ্যে উঠে এসেছে শৈশবের মায়াময় দিন, ঠাকুরমা-মায়ের আয়োজন এবং মেজো দাদা মানিকদা ওরফে ধনদাকে ঘিরে থাকা পারিবারিক স্মৃতি। সময়ের স্রোতে অনেক দৃশ্য ও প্রিয় মুহূর্ত হারিয়ে গেলেও মনের পর্দায় তারা অমলিন থেকে যায়। স্মৃতিকাতর এই লেখাটি পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে যায় গ্রামবাংলার চিরচেনা শীতের সকাল ও সোনালি অতীতের কাছে।