বাংলাদেশ 3:36 am, Wednesday, 4 November 2026

দারভাজা গ্যাস ক্রেটার: তুর্কমেনিস্তানের নরকের দরজা

  • Reporter Name
  • প্রকাশ 05:05:24 pm, Tuesday, 3 November 2026
  • 112 Time View

চারদিকে যত দূর চোখ যায়—শুধু বালু আর বালু।
মাথার ওপর কালো রাতের আকাশ।
নিস্তব্ধ মরুভূমির বুক চিরে হঠাৎ দেখা গেল আগুনের এক বিশাল গহ্বর!

মাটির গভীর থেকে উঠে আসছে আগুনের শিখা। কখনো ছোট, কখনো দাউদাউ করে জ্বলছে।
রাতের অন্ধকারে মনে হয়, পৃথিবীর বুকের ভেতরেই যেন জ্বলছে এক বিশাল চুল্লি।
কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও যার আভা চোখে পড়ে।

স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই আগুনের গহ্বরের নাম—দারভাজা গ্যাস ক্রেটার।
আর পৃথিবীজুড়ে এটি পরিচিত ‘ডোর টু হেল’—নরকের দরজা নামে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, মরুভূমির মাঝখানে এমন আগুনের সৃষ্টি হলো কীভাবে? কে জ্বালিয়েছিল এই আগুন? কেন প্রায় চার দশক ধরে জ্বলতে থাকা এই অগ্নিগহ্বর এখনো বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রে?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নরকের এই দরজা কি একদিন নিভে যাবে?
চলুন, জেনে নেওয়া যাক পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় এই অগ্নিগহ্বরের অজানা গল্প …

দারভাজা গ্যাস ক্রেটারের অবস্থান মধ্য এশিয়ার দেশ তুর্কমেনিস্তানে।
রাজধানী আশগাবাত থেকে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার উত্তরে,
বিস্তীর্ণ কারাকুম মরুভূমির মধ্যে এর অবস্থান।

কারাকুম অর্থ কালো বালু। দেশটির বড় একটি অংশজুড়ে বিস্তৃত এই মরুভূমি।
দিনের বেলায় এখানে তীব্র গরম, আর রাতে নেমে আসে গভীর অন্ধকার।

এই নির্জন মরুভূমির মাঝখানে রয়েছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ মিটার প্রশস্ত একটি বিশাল গর্ত।
গভীরতা আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ মিটার।
গর্তের ভেতরে বিভিন্ন জায়গা থেকে বেরিয়ে আসছে প্রাকৃতিক গ্যাস।
সেই গ্যাসে আগুন জ্বলছে।

কোথাও ছোট শিখা, কোথাও আবার জ্বলছে অসংখ্য আগুনের রেখা।
রাতের বেলায় দৃশ্যটি আরও ভয়ংকর।
অন্ধকারের মধ্যে আগুনের কমলা আভা পুরো এলাকাকে আলোকিত করে তোলে।

এ কারণেই জায়গাটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
তবে এর সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন।

দারভাজা গ্যাস ক্রেটারের উৎপত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা গল্প প্রচলিত।
সবচেয়ে পরিচিত গল্পটি ১৯৭১ সালের।
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তৎকালীন সোভিয়েত ভূতাত্ত্বিকেরা কারাকুম মরুভূমিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধানে খননকাজ চালাচ্ছিলেন।

একপর্যায়ে ভূগর্ভস্থ একটি গ্যাসসমৃদ্ধ স্তরের ওপরের মাটি ধসে পড়ে।
তৈরি হয় বিশাল গর্ত …
সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস বেরিয়ে আসতে থাকে।
গ্যাসের বিস্তার ঠেকাতে এবং আশপাশে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কমাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—এমনটাই প্রচলিত কাহিনি।

ধারণা ছিল, কয়েক দিনের মধ্যেই গ্যাস শেষ হয়ে যাবে এবং আগুন নিভে যাবে।
কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টো ঘটনা।
দিন পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছর। আগুন জ্বলতেই থাকল।

তবে এই গল্পের সব অংশই যে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত, তা নয়।
বিশেষ করে গর্তটি ঠিক কোন সালে তৈরি হয়েছিল এবং আগুন ধরানোর সিদ্ধান্তের পেছনে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই রহস্যের নতুন দিক সামনে এনেছে।

দারভাজা গ্যাস ক্রেটারের জন্মসাল নিয়ে বিজ্ঞানীদের সামনে রয়েছে দুটি সম্ভাবনা—১৯৬৩ এবং ১৯৭১। ২০২৬ সালের জুনে “Geophysical Research Letters” সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় স্যাটেলাইটের পুরোনো ছবি বিশ্লেষণ করে গর্তটির ইতিহাস অনুসন্ধান করা হয়েছে।

গবেষকেরা ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইটের ছবিসহ বিভিন্ন সময়ের উপগ্রহচিত্র পরীক্ষা করেছেন।
তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবরের একটি স্যাটেলাইট ছবিতেই গর্তটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ১৯৭২ সালের অক্টোবরের আগেই গর্তটি তৈরি হয়েছিল।

তবে এটি তৈরি হয়েছিল ১৯৬৩ সালে-
নাকি ১৯৭১ সালে—শুধু এই ছবির ভিত্তিতে তা নিশ্চিত করা যায়নি।

গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
১৯৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া শেষ স্যাটেলাইট ছবিতে গর্তে আগুন জ্বলতে দেখা যায়নি। কিন্তু ১৯৮৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির ছবিতে আগুনের উপস্থিতি স্পষ্ট।
অর্থাৎ, আগুন জ্বলা শুরু হয়েছিল ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে।

এ তথ্য প্রচলিত ১৯৭১ সালের আগুন ধরানোর গল্পকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
তাহলে গর্তটি আগে থেকেই ছিল, কিন্তু আগুন জ্বলতে শুরু করেছিল আরও পরে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

দারভাজা গ্যাস ক্রেটারের আগুনের উৎস বুঝতে হলে জানতে হবে প্রাকৃতিক গ্যাস কীভাবে মাটির নিচে জমা থাকে।
পৃথিবীর ভূগর্ভে কোটি কোটি বছর ধরে জৈব পদার্থের পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস তৈরি হতে পারে। উপযুক্ত ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতিতে এই গ্যাস শিলাস্তরের ফাঁকে জমা থাকে।

কোনো কোনো জায়গায় ভূগর্ভস্থ চাপ, ফাটল কিংবা দুর্বল স্তরের কারণে গ্যাস ওপরের দিকে উঠে আসে। দারভাজার ক্ষেত্রেও ভূতাত্ত্বিক স্তর, ফাটল এবং গ্যাসের চলাচল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে গবেষকেরা মনে করেন।

গর্তের ভেতর দিয়ে উঠে আসা গ্যাস বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে আগুন জ্বলে ওঠে। প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান মিথেন। মিথেন জ্বললে মূলত কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প তৈরি হয়।

কিন্তু সব গ্যাসই যে আগুনে পুড়ে যাচ্ছে, এমন নয়।
গর্তের কিছু ফাটল বা পথ দিয়ে গ্যাস সরাসরি বাতাসে মিশে যেতে পারে।
আর এখানেই পরিবেশবিজ্ঞানের বড় উদ্বেগ।

দারভাজার আগুনকে দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে- গ্যাস পুড়ে যাওয়ায় পরিবেশের ক্ষতি কম হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস।

বায়ুমণ্ডলে মিথেনের তাপ আটকে রাখার ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক বেশি—বিশেষ করে স্বল্প সময়ের হিসাব ধরলে।
মিথেন পুড়ে কার্বন ডাই-অক্সাইডে পরিণত হলে জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব কিছুটা কমে।
কিন্তু এতে কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়।
আবার যে মিথেন পুড়ে না গিয়ে সরাসরি বাতাসে মিশে যায়-
তা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ায়।

অর্থাৎ, আগুন জ্বলছে বলেই সব গ্যাস নিরাপদে পুড়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
২০২৬ সালে প্রকাশিত গবেষণাটি এই বিষয়টিকেই আরও স্পষ্ট করেছে।

গবেষকেরা ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন হাইপারস্পেকট্রাল স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করেন।
এতে EnMAP, PRISMA, EMIT, GF-5A এবং ZY-1E স্যাটেলাইটের পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করা হয়।

এই স্যাটেলাইটগুলো এমনভাবে কাজ করে-
যার মাধ্যমে পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে নির্গত বা প্রতিফলিত আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট কিছু গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব।

গবেষণায় দারভাজা গ্যাস ক্রেটারের আশপাশে মিথেনের ৪৪টি প্লুম বা গ্যাসের বিস্তারের চিহ্ন শনাক্ত করা হয়।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, মিথেন নির্গমনের হার ঘণ্টায় আনুমানিক শূন্য দশমিক ৬৩ থেকে ৩ দশমিক ১৮ টন পর্যন্ত হতে পারে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের পাঁচ বছরে মোট মিথেন নির্গমনের পরিমাণ অনুমান করা হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার টন। এর সঙ্গে রয়েছে প্রায় ২১ হাজার টনের অনিশ্চয়তার সীমা।

এটি কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়। কারণ, এই হিসাব দেখাচ্ছে—চোখে দেখা আগুনের পাশাপাশি অদৃশ্য গ্যাসও নিয়মিত পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

গবেষণায় আরও একটি দীর্ঘমেয়াদি হিসাব দেওয়া হয়েছে। গর্তটি ১৯৬৩ বা ১৯৭১ সালে তৈরি হয়েছে—কোন সময়কাল ধরা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘ সময়ের মোট মিথেন নির্গমনের অনুমান প্রায় ৮ লাখ থেকে ৯ লাখ টন বা তারও বেশি হতে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে, এটি কয়েক দশকের সরাসরি মাপা হিসাব নয়; বরং সীমিত পর্যবেক্ষণ ও মডেলের ভিত্তিতে করা একটি অনিশ্চিত দীর্ঘমেয়াদি অনুমান। দারভাজা গ্যাস ক্রেটারের রহস্য শুধু স্যাটেলাইটের ছবিতে সীমাবদ্ধ নেই।

২০১৩ সালে এই আগুনের গহ্বরের তলদেশে নেমেছিলেন কানাডীয় অভিযাত্রী ও অনুসন্ধানী চলচ্চিত্র নির্মাতা জর্জ কুরোনিস। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির অর্থায়নে পরিচালিত অভিযানে তিনি গর্তের ভেতরে প্রবেশ করেন। উদ্দেশ্য ছিল, এমন চরম পরিবেশে কোনো অণুজীব বেঁচে থাকতে পারে কি না, তা অনুসন্ধান করা। এই অভিযানের প্রস্তুতি নিতে প্রায় দেড় বছর সময় লেগেছিল বলে তুর্কমেনিস্তানের রাষ্ট্রীয় গ্যাসবিষয়ক প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ তাপ-সহনশীল পোশাক, শ্বাস-প্রশ্বাসের সরঞ্জাম এবং দড়ির সাহায্যে তিনি গর্তের তলদেশে নামেন। এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান।
চারপাশে আগুন, প্রচণ্ড তাপ এবং বিষাক্ত গ্যাসের সম্ভাবনা—সবকিছুই ছিল প্রাণঘাতী বিপদের কারণ।
অভিযানে সংগৃহীত নমুনা থেকে চরম পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম অণুজীবের বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হয়।
এ ঘটনা বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন একটি প্রশ্ন তুলে ধরে—পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশেও কি প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে? বছরের পর বছর ধরে জ্বলতে থাকা দারভাজার আগুন নিয়ে এখন নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।

তুর্কমেনিস্তানের সরকারও এই গ্যাস ক্রেটারের আগুন নিয়ন্ত্রণ বা নিভিয়ে ফেলার উপায় খুঁজতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

২০২২ সালের জানুয়ারিতে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গুরবাঙ্গুলি বেরদিমুহামেদভ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগুন নেভানোর উপায় খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন।

এর পেছনে পরিবেশগত ক্ষতি কমানো এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের অপচয় বন্ধ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে জানানো হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে গর্তের আশপাশে গ্যাস উত্তোলনের জন্য কূপ খননের উদ্যোগের কথাও প্রকাশিত হয়।

২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে Capterio -এর বিশ্লেষণের বরাতে বলা হয়,
আগের তিন বছরে গর্তটির তাপীয় তীব্রতা ৭৫ শতাংশের বেশি কমেছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।

আগুনের তাপীয় তীব্রতা কমে যাওয়া মানেই মিথেন নির্গমনও একই হারে কমেছে—এমন নয়।

আগুনের উজ্জ্বলতা, তাপমাত্রা এবং গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ এক জিনিস নয়।
এগুলো আলাদাভাবে পরিমাপ করতে হয়।

২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে-
নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে আগুন পুরোপুরি নিভে গেছে,
কিংবা মিথেন নির্গমন কতটা কমেছে।
তবে আগুনের তীব্রতা কমার খবর দারভাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

দারভাজা গ্যাস ক্রেটার শুধু একটি পর্যটন আকর্ষণ নয়।
এটি মানুষের প্রযুক্তি, প্রকৃতির শক্তি এবং পরিবেশের প্রতি আমাদের দায়িত্বের এক অদ্ভুত উদাহরণ।

একসময় হয়তো মনে করা হয়েছিল, কয়েক দিনের আগুনেই ভূগর্ভস্থ গ্যাস শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু সেই আগুন দশকের পর দশক ধরে পৃথিবীর মানুষকে বিস্মিত করেছে।

এখন বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইটের সাহায্যে হিসাব করছেন,
কত মিথেন বেরিয়ে যাচ্ছে।
ভূতাত্ত্বিকেরা বোঝার চেষ্টা করছেন, মাটির নিচে গ্যাসের উৎস কোথায়।
আর তুর্কমেনিস্তান খুঁজছে—কীভাবে এই আগুন নিয়ন্ত্রণ করে গ্যাসের অপচয় বন্ধ করা যায়।

হয়তো একদিন দারভাজার আগুন নিভে যাবে।
কিন্তু আগুন নিভে গেলেই কি রহস্যের সমাপ্তি ঘটবে?
নাকি তখনও ভূগর্ভের অদৃশ্য ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসবে গ্যাস-
যা আমাদের মনে করিয়ে দেবে— পৃথিবীর গভীরে এখনো কত অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে!

কারাকুম মরুভূমির এই অগ্নিগহ্বর আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—প্রকৃতির শক্তিকে অবহেলা করলে তার পরিণতি কত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

এটি শুধু নরকের দরজা নয়; এটি মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত
বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তার এক জীবন্ত স্মারক।

আপনার কী মনে হয়—দারভাজার আগুন পুরোপুরি নিভিয়ে ফেলা উচিত,
নাকি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলন করে এই প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগানো উচিত? মতামত জানাতে পারেন কমেন্টে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সম্পাদক

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

কাদামাটি”

দারভাজা গ্যাস ক্রেটার: তুর্কমেনিস্তানের নরকের দরজা

প্রকাশ 05:05:24 pm, Tuesday, 3 November 2026

চারদিকে যত দূর চোখ যায়—শুধু বালু আর বালু।
মাথার ওপর কালো রাতের আকাশ।
নিস্তব্ধ মরুভূমির বুক চিরে হঠাৎ দেখা গেল আগুনের এক বিশাল গহ্বর!

মাটির গভীর থেকে উঠে আসছে আগুনের শিখা। কখনো ছোট, কখনো দাউদাউ করে জ্বলছে।
রাতের অন্ধকারে মনে হয়, পৃথিবীর বুকের ভেতরেই যেন জ্বলছে এক বিশাল চুল্লি।
কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও যার আভা চোখে পড়ে।

স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই আগুনের গহ্বরের নাম—দারভাজা গ্যাস ক্রেটার।
আর পৃথিবীজুড়ে এটি পরিচিত ‘ডোর টু হেল’—নরকের দরজা নামে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, মরুভূমির মাঝখানে এমন আগুনের সৃষ্টি হলো কীভাবে? কে জ্বালিয়েছিল এই আগুন? কেন প্রায় চার দশক ধরে জ্বলতে থাকা এই অগ্নিগহ্বর এখনো বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রে?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নরকের এই দরজা কি একদিন নিভে যাবে?
চলুন, জেনে নেওয়া যাক পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় এই অগ্নিগহ্বরের অজানা গল্প …

দারভাজা গ্যাস ক্রেটারের অবস্থান মধ্য এশিয়ার দেশ তুর্কমেনিস্তানে।
রাজধানী আশগাবাত থেকে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার উত্তরে,
বিস্তীর্ণ কারাকুম মরুভূমির মধ্যে এর অবস্থান।

কারাকুম অর্থ কালো বালু। দেশটির বড় একটি অংশজুড়ে বিস্তৃত এই মরুভূমি।
দিনের বেলায় এখানে তীব্র গরম, আর রাতে নেমে আসে গভীর অন্ধকার।

এই নির্জন মরুভূমির মাঝখানে রয়েছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ মিটার প্রশস্ত একটি বিশাল গর্ত।
গভীরতা আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ মিটার।
গর্তের ভেতরে বিভিন্ন জায়গা থেকে বেরিয়ে আসছে প্রাকৃতিক গ্যাস।
সেই গ্যাসে আগুন জ্বলছে।

কোথাও ছোট শিখা, কোথাও আবার জ্বলছে অসংখ্য আগুনের রেখা।
রাতের বেলায় দৃশ্যটি আরও ভয়ংকর।
অন্ধকারের মধ্যে আগুনের কমলা আভা পুরো এলাকাকে আলোকিত করে তোলে।

এ কারণেই জায়গাটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
তবে এর সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন।

দারভাজা গ্যাস ক্রেটারের উৎপত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা গল্প প্রচলিত।
সবচেয়ে পরিচিত গল্পটি ১৯৭১ সালের।
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তৎকালীন সোভিয়েত ভূতাত্ত্বিকেরা কারাকুম মরুভূমিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধানে খননকাজ চালাচ্ছিলেন।

একপর্যায়ে ভূগর্ভস্থ একটি গ্যাসসমৃদ্ধ স্তরের ওপরের মাটি ধসে পড়ে।
তৈরি হয় বিশাল গর্ত …
সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস বেরিয়ে আসতে থাকে।
গ্যাসের বিস্তার ঠেকাতে এবং আশপাশে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কমাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—এমনটাই প্রচলিত কাহিনি।

ধারণা ছিল, কয়েক দিনের মধ্যেই গ্যাস শেষ হয়ে যাবে এবং আগুন নিভে যাবে।
কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টো ঘটনা।
দিন পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছর। আগুন জ্বলতেই থাকল।

তবে এই গল্পের সব অংশই যে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত, তা নয়।
বিশেষ করে গর্তটি ঠিক কোন সালে তৈরি হয়েছিল এবং আগুন ধরানোর সিদ্ধান্তের পেছনে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই রহস্যের নতুন দিক সামনে এনেছে।

দারভাজা গ্যাস ক্রেটারের জন্মসাল নিয়ে বিজ্ঞানীদের সামনে রয়েছে দুটি সম্ভাবনা—১৯৬৩ এবং ১৯৭১। ২০২৬ সালের জুনে “Geophysical Research Letters” সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় স্যাটেলাইটের পুরোনো ছবি বিশ্লেষণ করে গর্তটির ইতিহাস অনুসন্ধান করা হয়েছে।

গবেষকেরা ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইটের ছবিসহ বিভিন্ন সময়ের উপগ্রহচিত্র পরীক্ষা করেছেন।
তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবরের একটি স্যাটেলাইট ছবিতেই গর্তটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ১৯৭২ সালের অক্টোবরের আগেই গর্তটি তৈরি হয়েছিল।

তবে এটি তৈরি হয়েছিল ১৯৬৩ সালে-
নাকি ১৯৭১ সালে—শুধু এই ছবির ভিত্তিতে তা নিশ্চিত করা যায়নি।

গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
১৯৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া শেষ স্যাটেলাইট ছবিতে গর্তে আগুন জ্বলতে দেখা যায়নি। কিন্তু ১৯৮৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির ছবিতে আগুনের উপস্থিতি স্পষ্ট।
অর্থাৎ, আগুন জ্বলা শুরু হয়েছিল ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে।

এ তথ্য প্রচলিত ১৯৭১ সালের আগুন ধরানোর গল্পকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
তাহলে গর্তটি আগে থেকেই ছিল, কিন্তু আগুন জ্বলতে শুরু করেছিল আরও পরে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

দারভাজা গ্যাস ক্রেটারের আগুনের উৎস বুঝতে হলে জানতে হবে প্রাকৃতিক গ্যাস কীভাবে মাটির নিচে জমা থাকে।
পৃথিবীর ভূগর্ভে কোটি কোটি বছর ধরে জৈব পদার্থের পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস তৈরি হতে পারে। উপযুক্ত ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতিতে এই গ্যাস শিলাস্তরের ফাঁকে জমা থাকে।

কোনো কোনো জায়গায় ভূগর্ভস্থ চাপ, ফাটল কিংবা দুর্বল স্তরের কারণে গ্যাস ওপরের দিকে উঠে আসে। দারভাজার ক্ষেত্রেও ভূতাত্ত্বিক স্তর, ফাটল এবং গ্যাসের চলাচল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে গবেষকেরা মনে করেন।

গর্তের ভেতর দিয়ে উঠে আসা গ্যাস বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে আগুন জ্বলে ওঠে। প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান মিথেন। মিথেন জ্বললে মূলত কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প তৈরি হয়।

কিন্তু সব গ্যাসই যে আগুনে পুড়ে যাচ্ছে, এমন নয়।
গর্তের কিছু ফাটল বা পথ দিয়ে গ্যাস সরাসরি বাতাসে মিশে যেতে পারে।
আর এখানেই পরিবেশবিজ্ঞানের বড় উদ্বেগ।

দারভাজার আগুনকে দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে- গ্যাস পুড়ে যাওয়ায় পরিবেশের ক্ষতি কম হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস।

বায়ুমণ্ডলে মিথেনের তাপ আটকে রাখার ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক বেশি—বিশেষ করে স্বল্প সময়ের হিসাব ধরলে।
মিথেন পুড়ে কার্বন ডাই-অক্সাইডে পরিণত হলে জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব কিছুটা কমে।
কিন্তু এতে কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়।
আবার যে মিথেন পুড়ে না গিয়ে সরাসরি বাতাসে মিশে যায়-
তা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ায়।

অর্থাৎ, আগুন জ্বলছে বলেই সব গ্যাস নিরাপদে পুড়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
২০২৬ সালে প্রকাশিত গবেষণাটি এই বিষয়টিকেই আরও স্পষ্ট করেছে।

গবেষকেরা ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন হাইপারস্পেকট্রাল স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করেন।
এতে EnMAP, PRISMA, EMIT, GF-5A এবং ZY-1E স্যাটেলাইটের পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করা হয়।

এই স্যাটেলাইটগুলো এমনভাবে কাজ করে-
যার মাধ্যমে পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে নির্গত বা প্রতিফলিত আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট কিছু গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব।

গবেষণায় দারভাজা গ্যাস ক্রেটারের আশপাশে মিথেনের ৪৪টি প্লুম বা গ্যাসের বিস্তারের চিহ্ন শনাক্ত করা হয়।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, মিথেন নির্গমনের হার ঘণ্টায় আনুমানিক শূন্য দশমিক ৬৩ থেকে ৩ দশমিক ১৮ টন পর্যন্ত হতে পারে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের পাঁচ বছরে মোট মিথেন নির্গমনের পরিমাণ অনুমান করা হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার টন। এর সঙ্গে রয়েছে প্রায় ২১ হাজার টনের অনিশ্চয়তার সীমা।

এটি কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়। কারণ, এই হিসাব দেখাচ্ছে—চোখে দেখা আগুনের পাশাপাশি অদৃশ্য গ্যাসও নিয়মিত পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

গবেষণায় আরও একটি দীর্ঘমেয়াদি হিসাব দেওয়া হয়েছে। গর্তটি ১৯৬৩ বা ১৯৭১ সালে তৈরি হয়েছে—কোন সময়কাল ধরা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘ সময়ের মোট মিথেন নির্গমনের অনুমান প্রায় ৮ লাখ থেকে ৯ লাখ টন বা তারও বেশি হতে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে, এটি কয়েক দশকের সরাসরি মাপা হিসাব নয়; বরং সীমিত পর্যবেক্ষণ ও মডেলের ভিত্তিতে করা একটি অনিশ্চিত দীর্ঘমেয়াদি অনুমান। দারভাজা গ্যাস ক্রেটারের রহস্য শুধু স্যাটেলাইটের ছবিতে সীমাবদ্ধ নেই।

২০১৩ সালে এই আগুনের গহ্বরের তলদেশে নেমেছিলেন কানাডীয় অভিযাত্রী ও অনুসন্ধানী চলচ্চিত্র নির্মাতা জর্জ কুরোনিস। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির অর্থায়নে পরিচালিত অভিযানে তিনি গর্তের ভেতরে প্রবেশ করেন। উদ্দেশ্য ছিল, এমন চরম পরিবেশে কোনো অণুজীব বেঁচে থাকতে পারে কি না, তা অনুসন্ধান করা। এই অভিযানের প্রস্তুতি নিতে প্রায় দেড় বছর সময় লেগেছিল বলে তুর্কমেনিস্তানের রাষ্ট্রীয় গ্যাসবিষয়ক প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ তাপ-সহনশীল পোশাক, শ্বাস-প্রশ্বাসের সরঞ্জাম এবং দড়ির সাহায্যে তিনি গর্তের তলদেশে নামেন। এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান।
চারপাশে আগুন, প্রচণ্ড তাপ এবং বিষাক্ত গ্যাসের সম্ভাবনা—সবকিছুই ছিল প্রাণঘাতী বিপদের কারণ।
অভিযানে সংগৃহীত নমুনা থেকে চরম পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম অণুজীবের বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হয়।
এ ঘটনা বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন একটি প্রশ্ন তুলে ধরে—পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশেও কি প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে? বছরের পর বছর ধরে জ্বলতে থাকা দারভাজার আগুন নিয়ে এখন নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।

তুর্কমেনিস্তানের সরকারও এই গ্যাস ক্রেটারের আগুন নিয়ন্ত্রণ বা নিভিয়ে ফেলার উপায় খুঁজতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

২০২২ সালের জানুয়ারিতে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গুরবাঙ্গুলি বেরদিমুহামেদভ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগুন নেভানোর উপায় খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন।

এর পেছনে পরিবেশগত ক্ষতি কমানো এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের অপচয় বন্ধ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে জানানো হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে গর্তের আশপাশে গ্যাস উত্তোলনের জন্য কূপ খননের উদ্যোগের কথাও প্রকাশিত হয়।

২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে Capterio -এর বিশ্লেষণের বরাতে বলা হয়,
আগের তিন বছরে গর্তটির তাপীয় তীব্রতা ৭৫ শতাংশের বেশি কমেছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।

আগুনের তাপীয় তীব্রতা কমে যাওয়া মানেই মিথেন নির্গমনও একই হারে কমেছে—এমন নয়।

আগুনের উজ্জ্বলতা, তাপমাত্রা এবং গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ এক জিনিস নয়।
এগুলো আলাদাভাবে পরিমাপ করতে হয়।

২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে-
নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে আগুন পুরোপুরি নিভে গেছে,
কিংবা মিথেন নির্গমন কতটা কমেছে।
তবে আগুনের তীব্রতা কমার খবর দারভাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

দারভাজা গ্যাস ক্রেটার শুধু একটি পর্যটন আকর্ষণ নয়।
এটি মানুষের প্রযুক্তি, প্রকৃতির শক্তি এবং পরিবেশের প্রতি আমাদের দায়িত্বের এক অদ্ভুত উদাহরণ।

একসময় হয়তো মনে করা হয়েছিল, কয়েক দিনের আগুনেই ভূগর্ভস্থ গ্যাস শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু সেই আগুন দশকের পর দশক ধরে পৃথিবীর মানুষকে বিস্মিত করেছে।

এখন বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইটের সাহায্যে হিসাব করছেন,
কত মিথেন বেরিয়ে যাচ্ছে।
ভূতাত্ত্বিকেরা বোঝার চেষ্টা করছেন, মাটির নিচে গ্যাসের উৎস কোথায়।
আর তুর্কমেনিস্তান খুঁজছে—কীভাবে এই আগুন নিয়ন্ত্রণ করে গ্যাসের অপচয় বন্ধ করা যায়।

হয়তো একদিন দারভাজার আগুন নিভে যাবে।
কিন্তু আগুন নিভে গেলেই কি রহস্যের সমাপ্তি ঘটবে?
নাকি তখনও ভূগর্ভের অদৃশ্য ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসবে গ্যাস-
যা আমাদের মনে করিয়ে দেবে— পৃথিবীর গভীরে এখনো কত অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে!

কারাকুম মরুভূমির এই অগ্নিগহ্বর আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—প্রকৃতির শক্তিকে অবহেলা করলে তার পরিণতি কত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

এটি শুধু নরকের দরজা নয়; এটি মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত
বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তার এক জীবন্ত স্মারক।

আপনার কী মনে হয়—দারভাজার আগুন পুরোপুরি নিভিয়ে ফেলা উচিত,
নাকি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলন করে এই প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগানো উচিত? মতামত জানাতে পারেন কমেন্টে।