২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় আসে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন শেখ হাসিনা। একই দিন তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে যান। দুই বছর পর তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণা সেই দিনের ঘটনাপ্রবাহকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। নতুন করে সামনে এসেছে একটি প্রশ্ন—শেখ হাসিনার দেশত্যাগকে ‘পলায়ন’ বলা কতটা যুক্তিসংগত, নাকি ঘটনাটিকে ‘নিরাপত্তার স্বার্থে সরিয়ে নেওয়া’ হিসেবে বর্ণনা করা অধিকতর যথার্থ? রাজনৈতিক বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন’—এ কথাটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্যে শব্দটি একটি পরিচিত অভিধায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যের ভাষা আর সাংবাদিকতার ভাষা এক নয়। রাজনৈতিক বক্তব্যে আবেগ, বিদ্রূপ ও পক্ষপাত থাকতে পারে; সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রতিটি শব্দের ব্যবহার হতে হয় তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে ঢাকা ছাড়েন। পরে সামরিক পরিবহন বিমানে ভারতের উত্তর প্রদেশের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। পরদিন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর দেশটির সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় জানান, শেখ হাসিনা অল্প সময়ের নোটিশে সাময়িকভাবে ভারতে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছিলেন। একই দিন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের কথা জানান। এগুলো ঘটনাটির প্রকাশ্য ও তথ্যনির্ভর দিক। কিন্তু তিনি কেন দেশ ছেড়েছিলেন, সিদ্ধান্তটি কীভাবে নেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর নিজের ইচ্ছা কতটা এতে প্রতিফলিত হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর একমাত্র দেশত্যাগের ঘটনাক্রম দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। বিভিন্ন সংবাদপ্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে শেখ হাসিনার জন্য গোপালগঞ্জে যাওয়ার একটি পরিকল্পনা এবং আইনি সুরক্ষার বিষয়ও আলোচনায় এসেছিল। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই এখনো প্রয়োজন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা নিজেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও বক্তব্যে দাবি করেছেন, সেদিন তাঁর জীবন চরম ঝুঁকির মধ্যে ছিল এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর এসব বক্তব্যও যথাযথ সূত্র উল্লেখ করে উপস্থাপন করা উচিত। অর্থাৎ, একটি বিষয় নিশ্চিত—তিনি দেশ ছেড়েছিলেন। কিন্তু কেন এবং কার সিদ্ধান্তে দেশ ছেড়েছিলেন, সেই ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আরও তথ্য ও প্রমাণ প্রয়োজন।
পলায়ন শব্দটির সাধারণ অর্থ বিপদ, দায়িত্ব, শাস্তি কিংবা গ্রেপ্তার এড়াতে কোনো স্থান থেকে পালিয়ে যাওয়া। অন্যদিকে দেশত্যাগ একটি নিরপেক্ষ বর্ণনা। আর নিরাপত্তার স্বার্থে কাউকে সরিয়ে নেওয়া বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে তাঁকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা। তিনটি শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য আলাদা। ‘পালিয়ে যাওয়া’ বললে ব্যক্তির নিজস্ব উদ্যোগ, উদ্দেশ্য ও দায়িত্বের প্রশ্ন সামনে আসে। ‘সরিয়ে নেওয়া’ বললে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ভূমিকা গুরুত্ব পায়। আর ‘দেশত্যাগ’ কেবল ঘটনাটি বর্ণনা করে, এর পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত দেয় না। তাই শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের দেশত্যাগকে ‘পলায়ন’ কিংবা ‘নিরাপত্তার স্বার্থে সরিয়ে নেওয়া’—যেকোনো একটি অভিধায় চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রমাণ প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্য কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের দাবি—কোনোটিই এককভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হতে পারে না। সাংবাদিকতার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও নিরপেক্ষ বর্ণনা হতে পারে—‘ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ’। এতে ঘটনার সত্যতা প্রকাশ পায়, কিন্তু কারও উদ্দেশ্য বা নৈতিক অবস্থান সম্পর্কে আগাম রায় দেওয়া হয় না।
৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সেনাপ্রধানের বক্তব্য, হেলিকপ্টারে শেখ হাসিনার ঢাকা ত্যাগ এবং পরবর্তী সময়ে সামরিক পরিবহন বিমানে ভারতে পৌঁছানোর তথ্য ঘটনাটির নিরাপত্তা ও সামরিক ব্যবস্থাপনার দিকটি সামনে আনে। কিন্তু সামরিক বাহিনী তাঁকে ঠিক কোন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল, সিদ্ধান্তটি কে নিয়েছিলেন এবং এর পেছনে কী ধরনের নির্দেশনা ছিল—এসব বিষয়ে প্রকাশ্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। এখানেই সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশংসা বা সমালোচনা—দুটিই হতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের একক দায়িত্ব দেওয়া কিংবা তার ভূমিকার অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাও নতুন রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট ভারতের নয়াদিল্লিতে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের মাস হওয়ায় তিনি এই সময়কে বেছে নিয়েছেন। পরবর্তী সময়েও তিনি দেশে ফেরার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তাঁর ফেরার ঘোষণা এবং তাঁকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি এক নয়। কেউ নিজে দেশে ফিরতে চাইলে সেটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। অন্যদিকে প্রত্যর্পণ হলো দুই দেশের মধ্যে প্রচলিত আইন, চুক্তি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পৃথক বিষয়। এ ছাড়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। তিনি সেই রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য বা দেশে ফেরার ঘোষণা বিচারিক সিদ্ধান্তকে অকার্যকর করে না। দেশে ফিরলে তাঁর আইনি অবস্থান কী হবে, তা নির্ধারিত হবে দেশের প্রচলিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী। সুতরাং প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা, প্রত্যর্পণ এবং বিচারিক দায়—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের দেশত্যাগকে ইতিহাস কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে। কেউ ঘটনাটিকে পলায়ন হিসেবে দেখবেন, কেউ নিরাপত্তার কারণে দেশত্যাগ হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে এমন বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো কোনো পক্ষের অভিধা গ্রহণ না করে ঘটনার প্রমাণিত বাস্তবতা তুলে ধরা। যেখানে তথ্য নিশ্চিত, সেখানে নিশ্চিত ভাষা ব্যবহার করতে হবে। যেখানে দাবি রয়েছে, সেখানে দাবির উৎস উল্লেখ করতে হবে। আর যেখানে তথ্য অস্পষ্ট, সেখানে অস্পষ্টতাকে আড়াল না করে সেটিও পাঠককে জানাতে হবে। কারণ একটি শব্দ কখনো কখনো একটি ঘটনার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা বদলে দিতে পারে। ‘পলায়ন’, ‘দেশত্যাগ’ কিংবা ‘সরিয়ে নেওয়া’—শব্দগুলোর মধ্যে পার্থক্য কেবল ভাষাগত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উদ্দেশ্য, দায় ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন। আমাদের মনে রাখতে হবে, সংবাদমাধ্যম কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচারযন্ত্র নয়। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীল শব্দচয়নের ওপর। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের দেশত্যাগকে ‘পলায়ন’ বলার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ কি আমাদের হাতে রয়েছে? নাকি রাজনৈতিক অভিধার বাইরে গিয়ে ‘ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ’ বলাই সাংবাদিকতার জন্য অধিকতর দায়িত্বশীল অবস্থান?
লেখক: সম্পাদক, সাহিত্যপাতা।
আব্দুর রহমান 



























