একটি মরদেহ, একটি মোবাইল ফোন, একটি মোটরসাইকেল—আর অসংখ্য প্রশ্ন। বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যু এখন শুধু একটি পরিবারের শোকের বিষয় নয়; এটি তদন্তের স্বচ্ছতা, রাষ্ট্রের জবাবদিহি এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। একজন তরুণ কর্মকর্তার মৃত্যু কীভাবে হলো, এর পেছনে কোনো অপরাধ বা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা জানা তাঁর পরিবারের অধিকার। একই সঙ্গে বিষয়টি জনস্বার্থেরও।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরিবারের ভাষ্য, ২৮ অক্টোবর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাঁর মুঠোফোন থেকে মাকে ‘আসছি’ লেখা একটি বার্তা পাঠানো হয়। সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষ যোগাযোগ। ওই দিন বিকেলে ঢাকার তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরদিন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে। সুরতহাল প্রতিবেদন মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করে না। তাই এ তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর ধরন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ও রাসায়নিক পরীক্ষার ফল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ৩০ অক্টোবর রাতে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। পরে দ্বীপকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ৩১ অক্টোবর আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে গ্রেপ্তার বা রিমান্ডে থাকা অপরাধ প্রমাণের সমান নয়। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারিত হবে।
এ ঘটনায় তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফ ও দ্বীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় কেন গিয়েছিলেন? ওই এলাকায় তাহসিফের আগে নিয়মিত যাতায়াত ছিল কি না, থাকলে কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল, সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাহসিফ ও দ্বীপের সম্পর্ক নিয়েও বিভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। কখনো তাঁকে ছোট ভাই, কখনো ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছে। তাঁদের প্রকৃত সম্পর্ক ও সেদিন একসঙ্গে সেখানে যাওয়ার কারণ স্পষ্ট হওয়া দরকার।
ঘটনার রাত নিয়ে দ্বীপের বক্তব্যেও অসংগতি রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর দাবি, কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। কিন্তু কারা তাঁদের ধাওয়া করেছিলেন, কেন করেছিলেন, তাঁদের পরিচয় কী এবং ঘটনাটি কোথায় ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। তাহসিফ সাঁতারে দক্ষ ছিলেন বলে তাঁর বাবার দাবি। তাহলে তিনি কেন নদীতে ঝাঁপ দিলেন, কী পরিস্থিতিতে পানিতে পড়লেন এবং দ্বীপ কীভাবে সেখান থেকে ফিরে এলেন—এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
ঘটনার আগের ও পরের ভিডিও ফুটেজও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একটি ভিডিওতে দ্বীপকে একা মোটরসাইকেল চালিয়ে ফিরতে দেখা গেছে বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই ভিডিওর আগের ও পরের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ কী, তাহসিফ তখন কোথায় ছিলেন এবং তাঁকে একা রেখে আসার কারণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। একইভাবে উত্তরায় তাহসিফ ও দ্বীপের সঙ্গে এক তরুণীকে দেখা যাওয়ার যে ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে, তাঁর পরিচয়, তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্য এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহও যাচাই করা দরকার। তবে শুধু কোনো ভিডিওতে উপস্থিত থাকার কারণে ওই তরুণীর সঙ্গে ঘটনার সংশ্লিষ্টতা ধরে নেওয়া যাবে না।
মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনাও তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। দ্বীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি কালো সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পিবিআই। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দ্বীপ মোটরসাইকেলটি তাহসিফের বলে শনাক্ত করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মোটরসাইকেলটি সেখানে কীভাবে গেল, কেন নম্বরপ্লেট ছিল না এবং ঘটনার রাতে এটি কী ভূমিকা রেখেছিল—এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
তাহসিফের মোবাইল ফোনও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাঁর কললিস্ট, মেসেঞ্জার, বার্তা, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল যোগাযোগ বিশ্লেষণ করলে ঘটনার আগে ও পরে তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন, তা জানা যেতে পারে। পরিবারের কাছে পাঠানো শেষ বার্তাটি কে পাঠিয়েছিলেন, সেটি প্রকৃতপক্ষে তাহসিফের পাঠানো কি না, প্রয়োজনে কণ্ঠস্বর ও ডিজিটাল তথ্যের ফরেনসিক পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। ফোনের তথ্য সংরক্ষণ ও যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে, যাতে কোনো প্রমাণ নষ্ট না হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর আগে কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না, তাঁকে কেউ অনুসরণ করছিলেন কি না, কিংবা কোনো অপরাধী চক্রের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ছিল কি না—এসব দাবিও যাচাই করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে অনুসরণ বা হুমকি দেওয়ার বিষয়ে কিছু বক্তব্য ছড়িয়েছে। প্রতিবেশীর বক্তব্যের কথাও সামনে এসেছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা, সময় এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। মাদক, অপরাধী চক্র, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা পূর্বপরিকল্পনার সম্ভাবনা থাকলে সেগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত।
তাহসিফের অতীত কর্মজীবন নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের একটি ভিডিওর সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন দাবি করা হচ্ছে। তাঁর চাকরি থেকে বিদায়ের বিষয়েও ‘অবসর’ ও ‘চাকরিচ্যুতি’—দুই ধরনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। অতীতের কোনো ঘটনা বা ব্যক্তিগত জীবনের তথ্যের সঙ্গে মৃত্যুর সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণ ছাড়া টানা উচিত নয়।
এখানে গণমাধ্যমের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের বক্তব্য, পরিবারের অভিযোগ, তদন্তে সন্দেহভাজন ব্যক্তির দাবি এবং সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য এক নয়। কোনটি অভিযোগ, কোনটি বক্তব্য, কোনটি তদন্তে পাওয়া তথ্য আর কোনটি প্রমাণিত সত্য—প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট করতে হবে। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় অসমর্থিত তথ্যকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করলে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পাশাপাশি তদন্তও প্রভাবিত হতে পারে।
এখন প্রয়োজন তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ও রাসায়নিক পরীক্ষার ফল সংগ্রহ, মোবাইল ফোনের ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ, মোটরসাইকেলের মালিকানা যাচাই, ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা এবং সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ করতে হবে। তাহসিফের মৃত্যুর আগে ও পরে দ্বীপসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্যও আইনসম্মতভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তির আইনি অধিকার ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানি না, তাহসিফ সাউরির মৃত্যু দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, নাকি হত্যাকাণ্ড। অনুমান, আবেগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। উত্তর দিতে হবে নির্ভরযোগ্য তদন্ত ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে। অপরাধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্য কোনো কারণ প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
একটি পরিবারের কাছে প্রিয়জনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা এবং ন্যায়বিচার পাওয়া সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। একই সঙ্গে এ ঘটনায় রাষ্ট্রীয় তদন্তব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি। কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন অন্যায়, তেমনি তদন্তে অযথা বিলম্বও গ্রহণযোগ্য নয়।
আমরা গুজব নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য চাই। তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটিত হোক, তাঁর পরিবার ন্যায়বিচার পাক—এটাই প্রত্যাশা।
আব্দুর রহমান 


























