এক গ্রামে এক বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। ছেলের বিয়ে। বিয়ে উপলক্ষে বাড়িকে যেমন সুন্দর করে সাজানো হয়েছিলো ঠিক তেমনি সুন্দর দুধে আলতা গায়ের বরণ লাস্যময়ী এক বউ এনেছে। বাড়ির সবার নতুন বুউকে নিয়ে মাতামাতি। শুধু কি বাড়ির লোক, আশপাশের গ্রাম থেকেও অনেকেই নতুন বউ দেখার জন্য আসে। বউয়ের রুপ লাবন্য নিয়ে তাদের প্রশংসার কোনো কমতি নেই। যাই হোক বাংলাদেশের চিরাচরিত সমাজ ব্যবস্থায় নতুন বউ নিয়ে মাতামাতি সব সময়ই হয়। নতুন বউয়ের জন্য নতুন পোশাক, নতুন জিনিসপত্র, এককথায় তার জন্য সবই স্পেশাল। সকাল বেলা নতুন বউকে নদীর ঘাট থেকে পানি আনতে বলা হয়েছে। দেয়া হয়েছে বাহারি রঙে রাঙানো মাটির কলস। গ্রামের ছোট মাঠ পেরিয়ে ইছামতি নদী। নতুন বউ, দুধে আলতা গায়ের বরণ, মেহেদী রাঙা হাত, আলতাঁ মাখা পা, তার রুপে প্রকৃতিও যেনো নতুন সাজে সেজেছে। নদীর ঘাট থেকে নতুন বউ যখন কলসে পানি ভরছিলো, তখন নদীর পানি ও নদীর মাটি যেনো নতুন বউয়ের ছোয়ায় নিজেদের ধন্য মনে করে। এক সময় ঘাটের কাদামাটি আফসোসের সুরে বলে, হায়রে মাটির কলস। তুমিও মাটি আমিও মাটি অথচ তোমার কি কপাল আর আমারই বা কি কপাল। তখন মাটির কলস বলে,
: কপালের আবার কি দেখলে তুমি?
: কপাল নয়? তুমিও মাটি আমিও মাটি। অথচ তুমি আজ নতুন বউয়ের কোলে, আর আমি তার পায়ের তলে।
: ঠিকই বলেছো! আমার এটা কপাল। তবে এই কপাল এমনি হয় নি। এই কপালের গল্প যদি তুমি শোন, তাহলে আর আফসোস করবেনা।
: কি এমন গল্প, বলো দেখি। তুমি কি এমন কর্ম করেছো, যার জন্য আজ নতুন বউয়ের কোলে উঠতে পারলে।
:: তাহলে শোন, আমিও একদিন তোমার মতোই নদীর ঘাটে পরে ছিলাম। কত লোক আসছে, পায়ে মারাইছে। আবার দুষ্টু ছেলেরা মনে চাইলে খাবলা দিয়ে উঠিয়ে ছুরে মারছে অন্যের দিকে। দুঃখ ও কষ্টের কোনো শেষ ছিলো না।
: তো তুমি কি এমন কর্ম করলে যে সেই কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে একেবারে নতুন বউয়ের কোলে উঠে গেলে।
: হ্যা, সেই কথা বলছি, শোন। একদিন কুমার বাড়ির এক লোক এসে নদীর পার থেকে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গেলো। নিয়ে চৈত্র মাসের রোদে পেলে রাখলো বেশ কিছু দিন। সূর্যের তাপে পুরে গায়ের রং সাদা হয়ে যায়। হটাৎ একদিন কুমার বেটা একটা হামার নিয়ে এসে সেটা দিয়ে পেটাতে শুরু করে। হামারের আঘাতে শক্ত মাটি আমি পাউডারের মতো গুড়ো হয়ে যাই। তারপর তাতে পানি দিয়ে আাটার খামিরের মতো করে মেশায়। মিশ্রনটা যখন অনেকটা নরম ও স্বচ্ছ হয়, তখন আমাকে মেশিনে দেয়া হয়। মেশিনের চাপ ও কুমারনীর হাতের কারুকাজে আমি একটা কলসের রুপ নেই।
: এইতো একটু কাজ, কয়টা হামারের আগাত, এর পর একটু রোদের তাপ আর মেশিনের চাপ, তারপর নতুন বউয়ের কোল।
: না ভাই, আরো আছে, একটু ভালো করে শোনো। এরপর আমাকে আবার রোদে শুকাতে দেয়া হয়। রোদের তাপে পুরে আবার সাদা হয়ে গেলাম। তারপর একদিন কুমার বেটা এসে সেখান থেকে নিয়ে আগুনে পুরতে দিলো। আগুনে পুরতে পুরতে প্রথমে কালো এরপর কালো থেকে লাল হলাম। লাল হওয়ার পর আগুলন নেভানো হলো। আগুন নেভালে যখন ঠান্ডা হলাম, তখন কুমার বেটি এসে থাপরে থাপরে দেখে, কোথাও ভাঙা না ফাটা আছে কিনা। এ দফায় আমার সাতে থাকা অনেক কলস রোদ ও আগুনের তাপ সহ্য করতে না পেরে, ভেঙে বা ফেটে গেছে। তাদেরকে ফেলে দেয়া হলো। আমি এ দফায় টিকে যাওয়ায় আমাকে রেখে দিলো। কোনো এক হাটবারে কুমার বেটা আমাদেরকে হাটে নিয়ে গেলো বিক্রি করার জন্য। হাটে গিয়ে পরলাম আরেক বিপত্তিতে। কতো লোক হাটে আসে হাড়ি পাতিল কেনার জন্য। কেউ কিনে কেউ কিনে না। তবে যারাই আসে, থাপ্পর মারে। থাপরে থাপরে দেখে, কোথাও ফাটা আছে কিনা। এখান থেকেও অনেককে ফেলে দেয়া হলো, ভেঙে বা ফেটে যাওয়ার কারণে। আমি এ দফায়ও বেচে গেলাম। একদিন আজকে আমি যে নতুন বউয়ের কোলে এর ই কোনো এক আত্মীয় আমাকে কিনে আনে। বাড়ি এনে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে, নতুন বউয়ের কোলে তুলে দেয়। আর হাজারো পরীক্ষা নিরীক্ষা, হাজারো যাচাই বাচাইয়ের পর আমি নতুন বউয়ের কোলে উঠতে পেরেছি।
কলসের কথা শুনে ঘাটের কাদা বলে, আমি ভুল ভেবেছিলাম, তুমি তোমার কর্মগুনেই নতুন বউয়ের কোলে উঠতে পারেছো। তোমার জন্য শুভকামনা।
আসলে আমরা প্রত্যেকেই কাদা মাটির শরীর নিয়ে পৃথিবীতে আসি। হাজারো প্রতিকূলতা, হাজারো পরীক্ষা নিরীক্ষা, হাজারো যাচাই-বাছাইয়ের পর যারা টিকে থাকে, তারাই সমাজের মাঝে আত্ম-মর্যাদা, সম্মান ও সমৃদ্ধি নিয়ে জীবন যাপন করতে পারি। আর যারা জীবন যুদ্ধে, বিভিন্ন প্রতিকূলতা, বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষায় ব্যর্থ হয় তারা ভাঙা কলসের মতো অন্ধকারের মাঝে হারিয়ে যায়। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিৎ, জীবনের শুরুর সময়টা,ছাত্র জীবন বা যৌবনকালটা যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে নিজেকে পরিবার, সমাজ ও দেশের সুন্দরভাবে গড়তে অবদান রাখা।
মো. স্বাধীন 



























