হাওরের বন্যা কেন হচ্ছে আরও ভয়াবহ
হাওরের কান্না: বন্যা, ফসল ও ভবিষ্যৎ (পর্ব–২)
- প্রকাশের সময় ১০:৩৩:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
- / ১১৯ বার দেখা হয়েছে
হাওরের বন্যা নিয়ে আলোচনা উঠলেই প্রথমেই সামনে আসে উজানের পাহাড়ি ঢল—বিশেষ করে ভারতের চেরাপুঞ্জি অঞ্চলের অতিবৃষ্টির বিষয়টি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বন্যার পেছনে আরও একটি নীরব অথচ গভীর সংকট কাজ করছে—নদী, খাল ও প্রাকৃতিক জলপথের নাব্যতা হ্রাস এবং ভরাট হয়ে যাওয়া।
একসময় হাওরের অতিরিক্ত পানি দ্রুত নদী ও খালের মাধ্যমে নেমে যেত। এই প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথগুলোই ছিল হাওর অঞ্চলের এক ধরনের “নিরাপত্তা বলয়”। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পথগুলোই আজ সংকুচিত, অনেক ক্ষেত্রে বিলুপ্ত।
হাওর অঞ্চল: দেশের খাদ্যভান্ডারের হৃদস্পন্দন
বাংলাদেশে মোট ৩৭৩টি হাওর রয়েছে, যা মূলত বিস্তৃত সুনামগঞ্জ, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জুড়ে বিস্তৃত।
এই অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় বোরো ধানের একটি বড় অংশ আসে এই হাওর থেকেই।
নদী ভরাট: সমস্যার শেকড় কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওর অঞ্চলের নদীগুলো ভরাট হওয়ার অন্যতম কারণ উজান থেকে নেমে আসা বিপুল পলি। ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চলে অতিবৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পলি এসে জমা হয় সুরমা নদী ও কুশিয়ারা নদীসহ সংশ্লিষ্ট নদীগুলোতে।
এই পলি বছরের পর বছর জমে—
- নদীর গভীরতা কমিয়ে দেয়
- পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস করে
- পানিপ্রবাহ ধীর করে
- বন্যার ঝুঁকি বাড়ায়
অর্থাৎ, শুধু পানির চাপ নয়—নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়াও এখন বড় সংকট।
কেন দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বন্যা?
নদী ও খালের নাব্যতা কমে যাওয়ার ফলে হাওরের স্বাভাবিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। কোথাও কোথাও হাওর ও নদীর প্রাকৃতিক সংযোগও দুর্বল হয়ে গেছে।
ফলে—
- বন্যার পানি দ্রুত নামতে পারছে না
- দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে
- কৃষিজমি দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকছে
- ফসলের ক্ষতি বাড়ছে
এতে কৃষক শুধু এক মৌসুম নয়, অনেক সময় পুরো বছরের ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
অপরিকল্পিত উন্নয়ন: নতুন বিপদের নাম
হাওর অঞ্চলে অনেক অবকাঠামো—বিশেষ করে সড়ক ও বাঁধ—নির্মাণ করা হয়েছে পানি প্রবাহের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়—
- পর্যাপ্ত কালভার্ট নেই
- পানি চলাচলের পথ সংকুচিত
- সংযোগ খাল বন্ধ হয়ে গেছে
- প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত
ফলে পানি আটকে গিয়ে আশপাশের এলাকা দ্রুত প্লাবিত হয়। উন্নয়নই তখন হয়ে ওঠে নতুন ঝুঁকির কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওর রক্ষায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সম্ভাব্য করণীয়গুলো হলো—
- নদী ও খাল পুনঃখনন
- নিয়মিত ড্রেজিং
- প্রাকৃতিক জলপথ পুনরুদ্ধার
- পর্যাপ্ত কালভার্ট ও রেগুলেটর নির্মাণ
- পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন
- পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এমন স্থাপনা চিহ্নিত ও অপসারণ
হাওরের বন্যা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়—এটি আমাদের পরিকল্পনারও প্রতিচ্ছবি। প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে উন্নয়ন করলে, সেই প্রকৃতিই একসময় তার মূল্য আদায় করে নেয়। হাওর বাঁচানো মানে শুধু একটি অঞ্চল রক্ষা করা নয়—এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন।


















