Dhaka শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরিবেশ বিপর্যয়ের কবলে সাতক্ষীরা: বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়ার শঙ্কা

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০৪:৩৬:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
  • / ১৭ বার দেখা হয়েছে

বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ ৫ জুন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। সাতক্ষীরাতেও এ উপলক্ষে র‌্যালি, আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ ও পুরস্কার বিতরণসহ নানা আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু উৎসবের এই আড়ালে উপকূলীয় এই জেলার বাস্তবতা যেন একেবারেই ভিন্ন এক সতর্কবার্তা দিচ্ছে—ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে সাতক্ষীরা। পরিবেশ দিবসের সূচনা হয়েছিল ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে জাতিসংঘের মানব পরিবেশ সম্মেলনের মাধ্যমে। ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। পরিবেশ সংরক্ষণে জনসচেতনতা বাড়ানোই এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু সেই সচেতনতার বার্তা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে—সাতক্ষীরার চিত্রই তার কঠিন উত্তর হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব এখন তিনটি বড় পরিবেশগত সংকটে জর্জরিত—জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তীব্র তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। বন উজাড় ও প্রাকৃতিক আবাস ধ্বংসের ফলে অসংখ্য প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। প্লাস্টিক ও রাসায়নিক দূষণ মানুষের জীবনকেও মারাত্মকভাবে বিপন্ন করছে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা বিস্তারের কারণে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে দেশের ধান উৎপাদন ৬ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জসহ উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে সুপেয় পানির সংকট এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। বহু মানুষকে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। লবণাক্ততার কারণে মিঠা পানির মাছ ও কৃষিজমি ক্রমশ হুমকির মুখে পড়ছে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্যোগও। সিডর, আইলা, আম্পান ও ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষত এখনো বহন করছে উপকূলবাসী। নদীভাঙনও এ অঞ্চলের মানুষের জীবনে স্থায়ী আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবেশবাদী ও নাগরিক সমাজের নেতারা বলছেন, অব্যাহত লবণাক্ততা, নদী দখল, জলাবদ্ধতা, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন সাতক্ষীরাকে ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে। শহরের প্রাণ সায়ের খাল এখন দখল ও দূষণে অস্তিত্ব সংকটে। খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে শহরে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটি পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় ২১ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি জেলা প্রশাসকের কাছে দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সাতক্ষীরাকে দুর্যোগপ্রবণ এলাকা ঘোষণা, প্রাণ সায়ের খাল উদ্ধার, নদী দখলমুক্তকরণ, সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান, উপকূলীয় বাঁধ সংস্কার, বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ।

জেলা প্রশাসক মিজ্ কাউসার আজিজ বলেন, পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নাগরিক সমাজের দাবিগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূল রক্ষায় এখন সবচেয়ে জরুরি টেকসই বাঁধ নির্মাণ, ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, নদী-খাল পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একই সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, “উপকূলীয় অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সুপেয় পানির সংকট নিরসনে সরকারের কাছে আমরা বরাদ্দ চেয়েছি। নদী-খাল পুনরুদ্ধার ও পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।” বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সাতক্ষীরাবাসীর একটাই প্রত্যাশা—প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক, যাতে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য উপকূল গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

সম্পর্কিত

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

পরিবেশ বিপর্যয়ের কবলে সাতক্ষীরা: বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়ার শঙ্কা

প্রকাশের সময় ০৪:৩৬:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ ৫ জুন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। সাতক্ষীরাতেও এ উপলক্ষে র‌্যালি, আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ ও পুরস্কার বিতরণসহ নানা আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু উৎসবের এই আড়ালে উপকূলীয় এই জেলার বাস্তবতা যেন একেবারেই ভিন্ন এক সতর্কবার্তা দিচ্ছে—ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে সাতক্ষীরা। পরিবেশ দিবসের সূচনা হয়েছিল ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে জাতিসংঘের মানব পরিবেশ সম্মেলনের মাধ্যমে। ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। পরিবেশ সংরক্ষণে জনসচেতনতা বাড়ানোই এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু সেই সচেতনতার বার্তা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে—সাতক্ষীরার চিত্রই তার কঠিন উত্তর হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব এখন তিনটি বড় পরিবেশগত সংকটে জর্জরিত—জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তীব্র তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। বন উজাড় ও প্রাকৃতিক আবাস ধ্বংসের ফলে অসংখ্য প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। প্লাস্টিক ও রাসায়নিক দূষণ মানুষের জীবনকেও মারাত্মকভাবে বিপন্ন করছে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা বিস্তারের কারণে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে দেশের ধান উৎপাদন ৬ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জসহ উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে সুপেয় পানির সংকট এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। বহু মানুষকে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। লবণাক্ততার কারণে মিঠা পানির মাছ ও কৃষিজমি ক্রমশ হুমকির মুখে পড়ছে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্যোগও। সিডর, আইলা, আম্পান ও ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষত এখনো বহন করছে উপকূলবাসী। নদীভাঙনও এ অঞ্চলের মানুষের জীবনে স্থায়ী আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবেশবাদী ও নাগরিক সমাজের নেতারা বলছেন, অব্যাহত লবণাক্ততা, নদী দখল, জলাবদ্ধতা, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন সাতক্ষীরাকে ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে। শহরের প্রাণ সায়ের খাল এখন দখল ও দূষণে অস্তিত্ব সংকটে। খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে শহরে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটি পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় ২১ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি জেলা প্রশাসকের কাছে দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সাতক্ষীরাকে দুর্যোগপ্রবণ এলাকা ঘোষণা, প্রাণ সায়ের খাল উদ্ধার, নদী দখলমুক্তকরণ, সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান, উপকূলীয় বাঁধ সংস্কার, বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ।

জেলা প্রশাসক মিজ্ কাউসার আজিজ বলেন, পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নাগরিক সমাজের দাবিগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূল রক্ষায় এখন সবচেয়ে জরুরি টেকসই বাঁধ নির্মাণ, ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, নদী-খাল পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একই সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, “উপকূলীয় অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সুপেয় পানির সংকট নিরসনে সরকারের কাছে আমরা বরাদ্দ চেয়েছি। নদী-খাল পুনরুদ্ধার ও পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।” বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সাতক্ষীরাবাসীর একটাই প্রত্যাশা—প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক, যাতে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য উপকূল গড়ে তোলা সম্ভব হয়।