Dhaka বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাতক্ষীরায় সাংবাদিকতা যেন সোনার হরিণ — পর্ব-২

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ১০:৪০:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
  • / ৩৫ বার দেখা হয়েছে

সাংবাদিকতা আমার কাছে হঠাৎ করে আসা কোনো পেশা নয়। এর পেছনে রয়েছে সাহিত্যচর্চার দীর্ঘ পথ। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি “মাসিক সাহিত্যপাতা” নামে একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করি। তখন মূলত পড়ালেখার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটত। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ এবং বিভিন্ন সৃজনশীল লেখা পড়া ও লেখার মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পেতাম।

সেই সময় বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার সাহিত্য পাতায় নিয়মিত লেখা পাঠাতাম। লেখা পাঠাতে পাঠাতে একসময় পত্রিকা অফিসে যাওয়া-আসা শুরু হয়। সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে সংবাদ লেখার প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয়। ছোট ছোট সংবাদ লেখা শুরু করি। আশ্চর্যের বিষয়, আমার পাঠানো অনেক সংবাদই প্রকাশিত হতে থাকে। সেখান থেকেই মূলত সংবাদ জগতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া।

সাহিত্য থেকে সাংবাদিকতায় আসার এই যাত্রা আমাকে একটি বিষয় শিখিয়েছে—লেখালেখি শুধু শব্দ সাজানো নয়, মানুষের কথা বলা। একজন সাহিত্যিক কল্পনার জগৎ নির্মাণ করেন, আর একজন সাংবাদিক বাস্তবতার দলিল তৈরি করেন। আমি চেষ্টা করেছি এই দুই জগতের ভালো দিকগুলো ধারণ করতে।

কিন্তু আজ প্রায় দুই দশকের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে এসে যখন সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা দেখি, তখন অনেক প্রশ্ন মনে জাগে। আমরা কি সত্যিই সাংবাদিকতার মূল আদর্শ ধরে রাখতে পেরেছি? নাকি ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছি, যেখানে পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে, কাজ নয়?

বর্তমান সময়ে সাতক্ষীরায় সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো হলুদ সাংবাদিকতার বিস্তার। সব সাংবাদিক বা সব গণমাধ্যমকে এক কাতারে ফেলা অবশ্যই অন্যায় হবে। এখনও অনেক নিষ্ঠাবান ও পেশাদার সাংবাদিক সততার সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, কিছু ব্যক্তি ও কিছু প্ল্যাটফর্মের কর্মকাণ্ড পুরো পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এমন ঘটনাও দেখছি, যেখানে একজন সম্পাদক আরেকজন সম্পাদকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশ করছেন, পাল্টা জবাব প্রকাশ হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিষয় সাধারণ মানুষের সামনে সাংবাদিক সমাজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিভক্তির চিত্র তুলে ধরছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাংবাদিকতার ভাবমূর্তি।

একজন সাধারণ পাঠক যখন প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকদের নিজেদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, কাদা ছোড়াছুড়ি কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ দেখতে পান, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার মনে প্রশ্ন জাগে—যারা অন্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলেন, তারা নিজেরা কতটা জবাবদিহির মধ্যে আছেন?

এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি বাস্তবতা। কারণ সাংবাদিকতা একটি আস্থার পেশা। মানুষ সংবাদমাধ্যমের ওপর বিশ্বাস রেখে তথ্য গ্রহণ করে। সেই বিশ্বাসে আঘাত লাগলে ক্ষতি শুধু কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হয় না; ক্ষতি হয় পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনের।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকতা প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার অস্ত্র নয়। এটি জনস্বার্থ রক্ষার একটি দায়িত্বশীল মাধ্যম। কোনো অভিযোগ থাকলে তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা যেতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতাকে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের মঞ্চে পরিণত করা হলে শেষ পর্যন্ত পেশার মর্যাদাই ক্ষুণ্ন হয়।

আমি বিশ্বাস করি, সাতক্ষীরার সাংবাদিক সমাজের সামনে এখনও সম্ভাবনার অনেক দুয়ার খোলা আছে। এ জেলার রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সুন্দরবন, উপকূলীয় জীবন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের অসংখ্য গল্প। এসব বিষয় নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিকতা করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, পেশাগত দক্ষতা এবং পারস্পরিক সম্মানবোধ।

আমরা যদি নিজেদের ভেতরের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে পারি, তাহলে সেগুলো কাটিয়ে ওঠাও সম্ভব। সাংবাদিকতার শক্তি বিভক্তিতে নয়, ঐক্যে। ব্যক্তি স্বার্থে নয়, জনস্বার্থে। প্রতিযোগিতায় নয়, পেশাদারিত্বে।

সাতক্ষীরার সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নতুন প্রজন্মের ওপর। তারা যদি সাংবাদিকতাকে পরিচয়ের মাধ্যম নয়, দায়িত্বের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে আগামী দিনে এ জেলার সাংবাদিকতা আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

চলবে…

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আলোর পরশ।

সম্পর্কিত

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

সাতক্ষীরায় সাংবাদিকতা যেন সোনার হরিণ — পর্ব-২

প্রকাশের সময় ১০:৪০:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

সাংবাদিকতা আমার কাছে হঠাৎ করে আসা কোনো পেশা নয়। এর পেছনে রয়েছে সাহিত্যচর্চার দীর্ঘ পথ। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি “মাসিক সাহিত্যপাতা” নামে একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করি। তখন মূলত পড়ালেখার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটত। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ এবং বিভিন্ন সৃজনশীল লেখা পড়া ও লেখার মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পেতাম।

সেই সময় বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার সাহিত্য পাতায় নিয়মিত লেখা পাঠাতাম। লেখা পাঠাতে পাঠাতে একসময় পত্রিকা অফিসে যাওয়া-আসা শুরু হয়। সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে সংবাদ লেখার প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয়। ছোট ছোট সংবাদ লেখা শুরু করি। আশ্চর্যের বিষয়, আমার পাঠানো অনেক সংবাদই প্রকাশিত হতে থাকে। সেখান থেকেই মূলত সংবাদ জগতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া।

সাহিত্য থেকে সাংবাদিকতায় আসার এই যাত্রা আমাকে একটি বিষয় শিখিয়েছে—লেখালেখি শুধু শব্দ সাজানো নয়, মানুষের কথা বলা। একজন সাহিত্যিক কল্পনার জগৎ নির্মাণ করেন, আর একজন সাংবাদিক বাস্তবতার দলিল তৈরি করেন। আমি চেষ্টা করেছি এই দুই জগতের ভালো দিকগুলো ধারণ করতে।

কিন্তু আজ প্রায় দুই দশকের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে এসে যখন সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা দেখি, তখন অনেক প্রশ্ন মনে জাগে। আমরা কি সত্যিই সাংবাদিকতার মূল আদর্শ ধরে রাখতে পেরেছি? নাকি ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছি, যেখানে পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে, কাজ নয়?

বর্তমান সময়ে সাতক্ষীরায় সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো হলুদ সাংবাদিকতার বিস্তার। সব সাংবাদিক বা সব গণমাধ্যমকে এক কাতারে ফেলা অবশ্যই অন্যায় হবে। এখনও অনেক নিষ্ঠাবান ও পেশাদার সাংবাদিক সততার সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, কিছু ব্যক্তি ও কিছু প্ল্যাটফর্মের কর্মকাণ্ড পুরো পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এমন ঘটনাও দেখছি, যেখানে একজন সম্পাদক আরেকজন সম্পাদকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশ করছেন, পাল্টা জবাব প্রকাশ হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিষয় সাধারণ মানুষের সামনে সাংবাদিক সমাজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিভক্তির চিত্র তুলে ধরছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাংবাদিকতার ভাবমূর্তি।

একজন সাধারণ পাঠক যখন প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকদের নিজেদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, কাদা ছোড়াছুড়ি কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ দেখতে পান, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার মনে প্রশ্ন জাগে—যারা অন্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলেন, তারা নিজেরা কতটা জবাবদিহির মধ্যে আছেন?

এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি বাস্তবতা। কারণ সাংবাদিকতা একটি আস্থার পেশা। মানুষ সংবাদমাধ্যমের ওপর বিশ্বাস রেখে তথ্য গ্রহণ করে। সেই বিশ্বাসে আঘাত লাগলে ক্ষতি শুধু কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হয় না; ক্ষতি হয় পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনের।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকতা প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার অস্ত্র নয়। এটি জনস্বার্থ রক্ষার একটি দায়িত্বশীল মাধ্যম। কোনো অভিযোগ থাকলে তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা যেতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতাকে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের মঞ্চে পরিণত করা হলে শেষ পর্যন্ত পেশার মর্যাদাই ক্ষুণ্ন হয়।

আমি বিশ্বাস করি, সাতক্ষীরার সাংবাদিক সমাজের সামনে এখনও সম্ভাবনার অনেক দুয়ার খোলা আছে। এ জেলার রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সুন্দরবন, উপকূলীয় জীবন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের অসংখ্য গল্প। এসব বিষয় নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিকতা করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, পেশাগত দক্ষতা এবং পারস্পরিক সম্মানবোধ।

আমরা যদি নিজেদের ভেতরের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে পারি, তাহলে সেগুলো কাটিয়ে ওঠাও সম্ভব। সাংবাদিকতার শক্তি বিভক্তিতে নয়, ঐক্যে। ব্যক্তি স্বার্থে নয়, জনস্বার্থে। প্রতিযোগিতায় নয়, পেশাদারিত্বে।

সাতক্ষীরার সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নতুন প্রজন্মের ওপর। তারা যদি সাংবাদিকতাকে পরিচয়ের মাধ্যম নয়, দায়িত্বের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে আগামী দিনে এ জেলার সাংবাদিকতা আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

চলবে…

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আলোর পরশ।