Dhaka শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাতক্ষীরায় দেশীয় খেজুরের ফলন থাকলেও নেই সংগ্রহ

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০৪:৩২:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
  • / ৬ বার দেখা হয়েছে

এসএম আশরাফুল ইসলাম: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। এ জেলার গ্রামাঞ্চলে এখনও চোখে পড়ে সারি সারি দেশি খেজুরগাছ। রাস্তার ধারে, বাড়ির আঙিনায় ও পতিত জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা এসব গাছে মৌসুম এলেই থোকায় থোকায় ধরে খেজুর। তবে একসময় গ্রামীণ মানুষের প্রিয় এই দেশি ফল এখন আগের মতো কদর না থাকায় অধিকাংশ ফল গাছেই পেকে নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস। একসময় গ্রামের মানুষ দেশি ফলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করলেও এখন বাজারনির্ভর বিদেশি ফল ও প্যাকেটজাত খাদ্যসংস্কৃতির কারণে দেশি খেজুরের প্রতি আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। জেলার শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, আশাশুনি, দেবহাটা, তালা ও কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অসংখ্য খেজুরগাছে পাকা ফল ঝুলে আছে। কিন্তু সেগুলো সংগ্রহ করতে খুব কম মানুষকেই দেখা যায়। কোথাও ফল মাটিতে ঝরে পড়ে পচে যাচ্ছে, আবার কোথাও পাখিরাই খেয়ে ফেলছে। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, দেশি খেজুর একসময় গ্রামবাংলার মানুষের কাছে ছিল অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় মৌসুমি ফল। বাজারে বিক্রির জন্য নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক আনন্দের অংশ হিসেবেই এই ফল খাওয়া হতো। শিশু-কিশোররা দল বেঁধে গাছে উঠে খেজুর পাড়ত, কেউ লবণ মিশিয়ে কয়েকদিন রেখে পাকিয়ে খেত। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বকচরা গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দা জানান, আগে খেজুর পাকলে পাড়ার ছেলেমেয়েরা গাছের নিচে ভিড় করত। সবাই মিলে খেত। এখন আর সেই আগ্রহ নেই। এই খেজুরের স্বাদ ছিল আলাদা। এখনকার নতুন প্রজন্ম অনেকেই দেশি খেজুর চেনে না, তারা মূলত বাজারের আমদানি করা ফলেই অভ্যস্ত। বর্তমানে সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় খেজুরগাছে প্রচুর ফল ধরলেও বড় একটি অংশই অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। কোথাও গাছের নিচে পড়ে পচে যাচ্ছে, কোথাও আবার পাখির খাদ্যে পরিণত হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, এখন মানুষ আগের মতো গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করতে চায় না। অনেকেই দেশি ফলকে ‘গ্রামীণ’ বা ‘অপ্রচলিত’ হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি সহজলভ্য বিদেশি ফলের কারণে দেশি খেজুরের প্রতি আগ্রহ আরও কমে গেছে। তবে একটি বিষয় স্থানীয়দের ভাবিয়ে তুলছে-যে ফল কোনো ধরনের রাসায়নিক বা কীটনাশক ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশি খেজুরগাছের বড় সুবিধা হলো এতে আলাদা কোনো পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। বছরের পর বছর স্বাভাবিকভাবেই গাছে ফল ধরে এবং কীটনাশক ব্যবহারেরও প্রায় প্রয়োজন পড়ে না। তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও বাজারজাতকরণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে দেশি খেজুর আবারও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সাতক্ষীরার উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা তামান্না তাছনীম বলেন, নতুন প্রজন্মকে দেশি ফলের সঙ্গে পরিচিত করানো এবং এর পুষ্টিগুণ ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নইলে একসময় গ্রামবাংলার পরিচিত দেশি খেজুর শুধু স্মৃতির অংশ হয়েই থেকে যাবে। স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতের উদ্যোগ নিলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশি খেজুরের এই অবহেলা শুধু একটি ফলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার ঘটনা নয়, বরং গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও জীবনধারার পরিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি। একসময় যে ফলকে ঘিরে মৌসুমি আনন্দ তৈরি হতো, এখন সেটিই নীরবে ঝরে পড়ছে মাটিতে।

সম্পর্কিত

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

সাতক্ষীরায় দেশীয় খেজুরের ফলন থাকলেও নেই সংগ্রহ

প্রকাশের সময় ০৪:৩২:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

এসএম আশরাফুল ইসলাম: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। এ জেলার গ্রামাঞ্চলে এখনও চোখে পড়ে সারি সারি দেশি খেজুরগাছ। রাস্তার ধারে, বাড়ির আঙিনায় ও পতিত জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা এসব গাছে মৌসুম এলেই থোকায় থোকায় ধরে খেজুর। তবে একসময় গ্রামীণ মানুষের প্রিয় এই দেশি ফল এখন আগের মতো কদর না থাকায় অধিকাংশ ফল গাছেই পেকে নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস। একসময় গ্রামের মানুষ দেশি ফলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করলেও এখন বাজারনির্ভর বিদেশি ফল ও প্যাকেটজাত খাদ্যসংস্কৃতির কারণে দেশি খেজুরের প্রতি আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। জেলার শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, আশাশুনি, দেবহাটা, তালা ও কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অসংখ্য খেজুরগাছে পাকা ফল ঝুলে আছে। কিন্তু সেগুলো সংগ্রহ করতে খুব কম মানুষকেই দেখা যায়। কোথাও ফল মাটিতে ঝরে পড়ে পচে যাচ্ছে, আবার কোথাও পাখিরাই খেয়ে ফেলছে। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, দেশি খেজুর একসময় গ্রামবাংলার মানুষের কাছে ছিল অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় মৌসুমি ফল। বাজারে বিক্রির জন্য নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক আনন্দের অংশ হিসেবেই এই ফল খাওয়া হতো। শিশু-কিশোররা দল বেঁধে গাছে উঠে খেজুর পাড়ত, কেউ লবণ মিশিয়ে কয়েকদিন রেখে পাকিয়ে খেত। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বকচরা গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দা জানান, আগে খেজুর পাকলে পাড়ার ছেলেমেয়েরা গাছের নিচে ভিড় করত। সবাই মিলে খেত। এখন আর সেই আগ্রহ নেই। এই খেজুরের স্বাদ ছিল আলাদা। এখনকার নতুন প্রজন্ম অনেকেই দেশি খেজুর চেনে না, তারা মূলত বাজারের আমদানি করা ফলেই অভ্যস্ত। বর্তমানে সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় খেজুরগাছে প্রচুর ফল ধরলেও বড় একটি অংশই অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। কোথাও গাছের নিচে পড়ে পচে যাচ্ছে, কোথাও আবার পাখির খাদ্যে পরিণত হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, এখন মানুষ আগের মতো গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করতে চায় না। অনেকেই দেশি ফলকে ‘গ্রামীণ’ বা ‘অপ্রচলিত’ হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি সহজলভ্য বিদেশি ফলের কারণে দেশি খেজুরের প্রতি আগ্রহ আরও কমে গেছে। তবে একটি বিষয় স্থানীয়দের ভাবিয়ে তুলছে-যে ফল কোনো ধরনের রাসায়নিক বা কীটনাশক ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশি খেজুরগাছের বড় সুবিধা হলো এতে আলাদা কোনো পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। বছরের পর বছর স্বাভাবিকভাবেই গাছে ফল ধরে এবং কীটনাশক ব্যবহারেরও প্রায় প্রয়োজন পড়ে না। তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও বাজারজাতকরণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে দেশি খেজুর আবারও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সাতক্ষীরার উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা তামান্না তাছনীম বলেন, নতুন প্রজন্মকে দেশি ফলের সঙ্গে পরিচিত করানো এবং এর পুষ্টিগুণ ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নইলে একসময় গ্রামবাংলার পরিচিত দেশি খেজুর শুধু স্মৃতির অংশ হয়েই থেকে যাবে। স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতের উদ্যোগ নিলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশি খেজুরের এই অবহেলা শুধু একটি ফলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার ঘটনা নয়, বরং গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও জীবনধারার পরিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি। একসময় যে ফলকে ঘিরে মৌসুমি আনন্দ তৈরি হতো, এখন সেটিই নীরবে ঝরে পড়ছে মাটিতে।