সাতক্ষীরায় সাংবাদিকতা যেন সোনার হরিণ পর্ব-১
- প্রকাশের সময় ০৯:২০:১৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
- / ১৪৬ বার দেখা হয়েছে
সাংবাদিকতা জীবনে আমার পথচলা শুরু ২০০৯ সালে। তখন হাতে ছিল একটি খাতা, একটি কলম আর সত্য তুলে ধরার প্রবল আগ্রহ। প্রথম কাজ শুরু করি দৈনিক কাফেলা পত্রিকায়। এরপর কাজ করেছি দৈনিক পত্রদূত, দৈনিক কালের চিত্র, দৈনিক সাতঘরিয়া, দৈনিক সাতনদী ও দৈনিক দক্ষিণের মশাল পত্রিকায়। বর্তমানে দৈনিক আলোর পরশ পত্রিকায় সহকারী বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। পাশাপাশি একাধিক জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায়ও কাজ করার সুযোগ হয়েছে। নিবন্ধিত অনলাইন নিউজপোর্টাল নিউজজি২৪ এর সাতক্ষীরা প্রতিনিধি। এই দীর্ঘ সময়ে সাংবাদিকতাকে কখনো শখ হিসেবে নিইনি। এটিই আমার একমাত্র পেশা। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর এবং সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে হাদিসে কামিল সম্পন্ন করেছি। ছোটবেলা থেকে সাতক্ষীরা আহ্ছানিয়া মিশনের পরিবেশে আমার বেড়ে ওঠা। সমাজ, মানুষ এবং জনকল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা সেখান থেকেই পেয়েছি। সেই শিক্ষা আমাকে সাংবাদিকতার পথে এনেছে। প্রায় ১৭ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে অসংখ্য পরিবর্তন দেখেছি। দেখেছি সংবাদপত্রের স্বর্ণালী সময়, দেখেছি অনলাইন সাংবাদিকতার উত্থান, আবার দেখেছি সাংবাদিকতার নামে নানা অপসংস্কৃতির বিস্তার। আজ যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয় সাতক্ষীরায় প্রকৃত সাংবাদিকতা যেন ক্রমেই সোনার হরিণে পরিণত হচ্ছে। একসময় একটি সংবাদ প্রকাশের আগে দিনের পর দিন তথ্য সংগ্রহ করা হতো। সম্পাদকরা সংবাদে একটি ভুল শব্দও সহ্য করতেন না। সংবাদকর্মীরা নিজেদের পরিচয়ের চেয়ে কাজকে বড় মনে করতেন। কিন্তু এখন বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। প্রযুক্তির কল্যাণে সংবাদ পরিবেশনের গতি বেড়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে কমেছে গভীরতা ও দায়বদ্ধতা। বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলায় জাতীয়, স্থানীয়, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অসংখ্য গণমাধ্যম সক্রিয়। সাংবাদিক পরিচয়ধারীর সংখ্যাও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এদের মধ্যে কতজন প্রকৃত অর্থে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন? কতজন নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ করেন? কতজন একটি সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে বাস্তবতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। সাতক্ষীরার মতো একটি জেলায় সাংবাদিকতা করা কখনোই সহজ ছিল না। সুন্দরবন, সীমান্ত, উপকূলীয় দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, চিংড়ি শিল্প, ভূমিদস্যুতা, মাদক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় রাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়। অনেক সময় ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু সেই তুলনায় সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা প্রায় নেই বললেই চলে। আজও জেলার অনেক সাংবাদিক কোনো নির্দিষ্ট বেতন ছাড়াই কাজ করছেন। সংবাদ সংগ্রহের জন্য নিজের অর্থ ব্যয় করছেন, নিজের মোটরসাইকেলের তেল কিনছেন, নিজের মোবাইল ও ইন্টারনেট বিল পরিশোধ করছেন। অথচ সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরার দায়িত্বও তাদের কাঁধেই। ফলে অনেক মেধাবী তরুণ সাংবাদিকতা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাংবাদিকতার নামে অপেশাদার কর্মকাণ্ডের বিস্তার। কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়কে পেশা নয়, প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। কোথাও কোথাও চাঁদাবাজি, তদবির, ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধার কিংবা সামাজিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে পুরো সাংবাদিক সমাজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। প্রকৃত সংবাদকর্মীদেরও অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের মুখে প্রায়ই একটি কথা শুনতে পাওয়া যায় “সব সাংবাদিক একরকম।” কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। একজন প্রকৃত সাংবাদিক দিনের পর দিন মাঠে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করেন, মানুষের সমস্যার কথা তুলে ধরেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লিখেন, অনেক সময় নিজের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়েও কাজ করেন। আর কিছু অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের দায় শেষ পর্যন্ত সেই প্রকৃত সাংবাদিকদেরও বহন করতে হয়। সাংবাদিকদের মধ্যেও আজ পারস্পরিক মূল্যায়নের সংকট দেখা যাচ্ছে। একজনের ভালো কাজের প্রশংসা করার পরিবর্তে তাকে ছোট করার প্রবণতা বাড়ছে। বিভাজন, গ্রুপিং এবং ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেশার জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। অথচ সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে সত্য ও জনস্বার্থই হওয়া উচিত সবার অভিন্ন লক্ষ্য। আমার নিজের জীবনেও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব দেখেছি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কোনো কোনো মহল আমাকে ‘শিবির’ বলে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছে। এমননি দৈনিক সাতনদী পত্রিকায় আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা বানোয়াট সম্মানহানীকর সংবাদ ছাপা হয়। পরবর্তীতে অবশ্যই ঐ পত্রিকাতেও আমি বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছি। আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেউ কেউ হয়তো উল্টো পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করবে। এটাই আমাদের সমাজের এক নির্মম বাস্তবতা। আমরা অনেক সময় একজন মানুষের কাজ, সততা বা পেশাগত অবদান দিয়ে মূল্যায়ন করি না; বরং তার গায়ে একটি রাজনৈতিক তকমা লাগিয়ে বিচার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কিন্তু একজন সাংবাদিকের পরিচয় তার রাজনৈতিক অবস্থান নয়; তার পরিচয় তার লেখা, তার অনুসন্ধান, তার সততা এবং জনস্বার্থে কাজ করার দায়বদ্ধতা। রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হতে পারে, সরকার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব কখনো পরিবর্তন হয় না।
এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। এজন্য সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমার বিশ্বাস, দেশে প্রকৃত সংবাদকর্মীদের একটি স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। সরকার, তথ্য অধিদপ্তর, প্রেস ইনস্টিটিউট এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে একটি আধুনিক অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
যারা দীর্ঘদিন ধরে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, বেতার বা অনলাইন গণমাধ্যমে নিয়মিত কাজ করছেন, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মঅভিজ্ঞতা, নিয়োগপত্র ও প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন যাচাই করে সরকারি তালিকাভুক্ত করা যেতে পারে। একবার নিবন্ধিত হলে সেই তথ্য অনলাইনে সংরক্ষিত থাকবে। প্রতি বছর নতুন করে তালিকা তৈরির প্রয়োজন হবে না। পরবর্তীতে নতুন কেউ সাংবাদিকতায় আসতে চাইলে তাকে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার কমবে, প্রকৃত সংবাদকর্মীরা মর্যাদা পাবেন এবং জনগণের কাছেও সাংবাদিকতার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে প্রয়োজন সাংবাদিকদের জন্য প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, বীমা সুবিধা এবং আইনি সুরক্ষা। কারণ একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
সাতক্ষীরার সাংবাদিকতার ইতিহাস গৌরবময়। এই জেলার অনেক সাংবাদিক জাতীয় পর্যায়ে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। এখনও অনেক তরুণ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সাংবাদিকতায় আসছেন। তাই হতাশার মধ্যেও আশা আছে। তবে সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পেশাকে অপব্যবহারমুক্ত করতে হবে, প্রকৃত সংবাদকর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে এবং সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা বাড়লেই সাংবাদিকতার উন্নয়ন হয় না। সাংবাদিক পরিচয়পত্রের সংখ্যা বাড়লেই গণমাধ্যম শক্তিশালী হয় না। শক্তিশালী হয় তখনই, যখন সত্য বলার সাহসী মানুষ তৈরি হয়, যখন একজন সংবাদকর্মী নির্ভয়ে কলম ধরতে পারেন, যখন সমাজ তাকে সম্মান দেয় এবং রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সাতক্ষীরার বাস্তবতায় আজ সেই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। অন্যথায় সাংবাদিকের সংখ্যা হয়তো আরও বাড়বে, কিন্তু প্রকৃত সাংবাদিকতা আমাদের চোখের সামনেই সোনার হরিণ হয়েই থেকে যাবে।
লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আলোর পরশ।
















