সুন্দরবনে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে জলদস্যুদের বেপরোয়া তৎপরতা, জেলে-বাওয়ালিদের অপহরণ, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সাতক্ষীরার উপকূলীয় বনজীবীরা। অগ্রিম ‘কার্ড’ বা টোকেনের নামে বিভিন্ন জলদস্যু দলকে টাকা দিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। কোনো দলের সঙ্গে কথিত কার্ডের সমঝোতা না হলে জেলেদের অপহরণ করে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। এতে একদিকে উপকূলের হাজার হাজার মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে, অন্যদিকে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
বনজীবীদের দাবি, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শর্তসাপেক্ষে ৫২ জন জলদস্যুর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সাধারণ ক্ষমা করার পর আরও সুন্দরবনে দস্যুতা বেড়েছে। বর্তমানে সাতক্ষীরার পশ্চিম সুন্দরবনে ৮ থেকে ১০টি জলদস্যু দল সক্রিয় রয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। এসব দলের হাতে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে, যা বন বিভাগের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। বনজীবীদের প্রশ্ন, আত্মসমর্পণের পরও যদি জলদস্যুরা আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
স্থানীয় বনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে জলদস্যুদের বিভিন্ন দলের কাছে অগ্রিম অর্থ দেওয়ার চাপ বেড়েছে। প্রতি ৫ থেকে ৭টি দলের নির্ধারিত ১৫ দিনের সময়সীমায় বনজীবীদের একাধিক দলের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা করতে হয়। প্রতিটি দলের জন্য ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম ‘কার্ডের’ টাকা দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্যামনগর উপকূলের প্রায় ২০ হাজার জেলে-বাওয়ালি এ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি তাঁদের। কোনো দলের কার্ড না করলে জেলেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন এবং ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে অনেক বাওয়ালি সুন্দরবনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের তথ্যের বরাত দিয়ে বনজীবীরা জানান, যেখানে আগে রাজস্ব দিয়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি নৌকা সুন্দরবনে প্রবেশের পারমিট নিত, সেখানে চলতি সপ্তাহে পারমিট নিয়েছে মাত্র ১৫০টি নৌকা। এই চিত্র সুন্দরবননির্ভর উপকূলীয় মানুষের জীবিকা সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সুন্দরবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সরকারি বাহিনীগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বনজীবীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বন বিভাগের অভয়ারণ্যে প্রবেশকারী জেলেদের শনাক্ত করতে ড্রোন ব্যবহার করা হলেও বন বিভাগের কার্যালয়ের কাছাকাছি এলাকা থেকে বনজীবীদের অপহরণের অভিযোগ উঠছে।
জলদস্যুদের অবাধ তৎপরতা শুধু মানুষের জীবিকা নয়, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর জন্যও বড় হুমকি বলে আশঙ্কা করছেন বনজীবীরা। নিজেদের নিরাপদ চলাচল ও অপরাধ আড়াল করতে জলদস্যুরা বাঘ, হরিণসহ বন্যপ্রাণী হত্যা বা শিকারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে জলদস্যুমুক্ত সুন্দরবনের দাবিতে উপকূলীয় গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামের জেলেরা এক দফা, এক দাবি নিয়ে ধারাবাহিক পাঁচ দিনের প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। কর্মসূচির সমন্বয়ক গাবুরার তরুণ নেতা সালাহউদ্দিন লিটন, সাতক্ষীরা জেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক। তাঁদের এই দাবি ইতোমধ্যে সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
কর্মসূচির চতুর্থ দিন আগামীকাল ১ নভেম্বর ২০২৬, রোববার, শ্যামনগর প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হবে। পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে ৩ নভেম্বর সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
বনজীবীদের দাবি, সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের গর্ব নয়, এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। প্রায় ৬ হাজার ৬০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সুন্দরবনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। তাই সুন্দরবন রক্ষায় বন ও পরিবেশ মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন উপকূলের জেলে-বাওয়ালিরা। তাঁদের একটাই প্রত্যাশা— জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে গিয়ে আর কোনো জেলেকে যেন জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হতে না হয়।
মনিরুজ্জামান মনির 











































