পৃথিবীতে এমন একটি হ্রদ আছে, যার বয়স প্রায় আড়াই কোটি বছর। এর গভীরতা এত বেশি যে পানির উপরিভাগ থেকে তলদেশ পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটারের কাছাকাছি। শুধু গভীরতাই নয়, পৃথিবীর বিপুল পরিমাণ স্বাদু পানির ভান্ডারও লুকিয়ে আছে এর বুকে। এর নাম বৈকাল হ্রদ। বৈকাল হ্রদ রাশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব সাইবেরিয়ায় অবস্থিত। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর হ্রদ। এর সর্বোচ্চ গভীরতা প্রায় ১ হাজার ৬৪০ মিটার। দৈর্ঘ্যে এটি প্রায় ৬৩৬ কিলোমিটার, আর সবচেয়ে প্রশস্ত জায়গায় প্রায় ৭৯ কিলোমিটার।
বৈকালের বয়স আনুমানিক আড়াই কোটি বছর। কিছু ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় এর বয়স আড়াই থেকে তিন কোটি বছর পর্যন্ত ধরা হয়েছে। ডাইনোসর পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়েছিল প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে। অর্থাৎ ডাইনোসর বিলুপ্তির প্রায় ৪ কোটি বছর পরে এই হ্রদের সৃষ্টি। এটি একটি সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক ফাটল বা রিফট অঞ্চলে অবস্থিত। পৃথিবীর ভূত্বকের গতিবিধির কারণে এখানে বিশাল অববাহিকা তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘ সময় ধরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ কারণেই বৈকাল হ্রদ ভূতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বৈকালে প্রায় ২৩ হাজার ঘনকিলোমিটার স্বাদু পানি রয়েছে। পৃথিবীর বরফমুক্ত ভূপৃষ্ঠের স্বাদু পানির প্রায় ২০ শতাংশ এই একটি হ্রদে জমা। আয়তনের দিক থেকে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বাদু পানির হ্রদ। এর পানির পরিমাণ উত্তর আমেরিকার পাঁচটি বৃহৎ হ্রদের সম্মিলিত পানির চেয়েও বেশি। এখানকার জীববৈচিত্র্যও অসাধারণ। বৈকাল হ্রদে হাজার হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী পাওয়া গেছে, যার ৮০ শতাংশের বেশি পৃথিবীর আর কোথাও প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় না। এই অনন্য জীববৈচিত্র্যের কারণে বৈকালকে অনেক সময় “রাশিয়ার গ্যালাপাগোস” বলা হয়।
এখানকার সবচেয়ে পরিচিত প্রাণী বৈকাল সিল। এটি স্বাদু পানির সিল প্রজাতিগুলোর একটি। সমুদ্র থেকে বহু দূরের এই হ্রদে এর পূর্বপুরুষ কীভাবে বসতি গড়েছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণা করছেন। হ্রদের আরেক বিস্ময় গলমিয়াঙ্কা মাছ। এর শরীর প্রায় স্বচ্ছ, দেহে চর্বির পরিমাণ অনেক বেশি। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এই মাছ ডিম না পেড়ে সরাসরি জীবন্ত বাচ্চা জন্ম দেয়।
বৈকাল হ্রদের তলদেশে জমে থাকা পলির স্তরও বিজ্ঞানীদের কাছে অমূল্য সম্পদ। এসব স্তর বিশ্লেষণ করে অতীতের জলবায়ু, তাপমাত্রা ও পরিবেশ পরিবর্তনের ইতিহাস জানা যায়। যেন হ্রদের তলদেশে পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসের এক বিশাল দলিল জমা আছে।
১৯৯৬ সালে ইউনেস্কো বৈকাল হ্রদকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। এর অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও জীববৈচিত্র্য এই স্বীকৃতির অন্যতম কারণ। তবে এই হ্রদও ঝুঁকিমুক্ত নয়। পর্যটনের চাপ, স্থানীয় দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন এর পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। তাই এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বৈকাল হ্রদ শুধু একটি বিশাল জলাধার নয়। এটি পৃথিবীর প্রায় আড়াই কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, বিপুল স্বাদু পানির ভান্ডার ও অনন্য জীববৈচিত্র্যের এক জীবন্ত দলিল। এই বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা শুধু রাশিয়ার নয়, সমগ্র বিশ্বের দায়িত্ব।
ভিডিও ডকুমেন্টরি দেখুন
নরকের দরজা! তুর্কমেনিস্তানের এই গর্তে কেন দশকের পর দশক ধরে জ্বলছে আগুন?
আব্দুর রহমান 




























