একসময় সাতক্ষীরার গ্রামবাংলার পরিচিত দৃশ্য ছিল বাড়ির আঙিনা, জমির আইল ও রাস্তার পাশে সারি সারি খেজুরগাছ। শীত এলেই গাছিরা রস সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। সেই রস দিয়ে তৈরি হতো গুড়, পাটালি ও নানা ধরনের পিঠাপুলি। খেজুরপাতায় তৈরি হতো পাটি, শুকনো ডালপালা জ্বলত রান্নার চুলায়। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা সেই খেজুরগাছ এখন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
গাছের প্রতি অবহেলা, জ্বালানি হিসেবে ডালপালার ব্যবহার, লবণাক্ততা ও পরিবেশগত পরিবর্তনসহ নানা কারণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে খেজুরগাছের সংখ্যা কমছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এর প্রভাব পড়ছে রস, গুড় ও পাটালি উৎপাদন এবং গাছিদের জীবিকায়।
সম্প্রতি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার দলুয়া বাজারসংলগ্ন মাঠে বেশ কিছু খেজুরগাছ দেখা গেছে। একসময় গ্রামীণ জনপদের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হলেও এখন এসব গাছ অনেকের কাছে অতীতের স্মৃতি। গাছ দেখতে সেখানে মানুষের ভিড়ও লক্ষ করা যায়।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, তালা, কলারোয়া ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে একসময় প্রচুর খেজুরগাছ ছিল। অন্য ফসল ভালো হতো না—এমন জমির আইল, নিচু জায়গা ও পতিত জমিতে এসব গাছ লাগানো হতো। বিশেষ পরিচর্যা ছাড়াই বেড়ে ওঠা গাছগুলো বছরের পর বছর গ্রামীণ পরিবারের কাজে লাগত।
হারাচ্ছে জীবিকার পথ
খেজুরগাছের সঙ্গে বহু গাছির জীবিকা জড়িয়ে ছিল। শীত মৌসুমে গাছ প্রস্তুত করা, রস সংগ্রহ, গুড় তৈরি ও বাজারে বিক্রি করে তাঁরা সংসার চালাতেন। কিন্তু গাছ কমে যাওয়ায় এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তালা উপজেলার খলিষখালী এলাকার আব্দুল মালেক বলেন, “একসময় ৭০ থেকে ৮০টি খেজুরগাছ কাটতাম। এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বিক্রি করেই সংসার চালাতাম। এখন সেই দিন আর নেই।”
তাঁর মতো অনেক গাছি একসময় খেজুরের রস ও গুড় বিক্রির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। নতুন করে খেজুরগাছ লাগানোর প্রবণতা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এ পেশা আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী ব্যবহারও কমছে
খেজুরগাছ শুধু রস ও গুড়ের উৎস নয়, গ্রামীণ জীবনের নানা প্রয়োজনেও ব্যবহৃত হতো। এর পাতা দিয়ে তৈরি হতো পাটি ও ঘরোয়া সামগ্রী। শুকনো ডালপালা ব্যবহৃত হতো রান্নার জ্বালানি হিসেবে। তবে প্লাস্টিক ও আধুনিক শিল্পজাত পণ্যের প্রসারে খেজুরপাতার পাটির ব্যবহার কমেছে। এতে ঐতিহ্যবাহী এই কারুশিল্পও হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
খেজুরগাছের শিকড় মাটি ধরে রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এর রস, গুড় ও পাটালি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে। তাই গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকজ খাদ্যসংস্কৃতি, গ্রামীণ পেশা ও কারুশিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংরক্ষণে প্রয়োজন উদ্যোগ
সামাজিক বন বিভাগ সাতক্ষীরার সহকারী বন সংরক্ষক প্রিয়াংকা হালদার জানান, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে রাস্তার পাশে, জমির আইলে এবং উপযোগী পতিত জমিতে খেজুরের চারা রোপণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি পুরোনো গাছ সংরক্ষণ, গাছিদের প্রশিক্ষণ, চারা বিতরণ এবং রস ও গুড়ের নিরাপদ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সাতক্ষীরার গ্রাম থেকে খেজুরগাছ হারিয়ে যাওয়া কেবল প্রকৃতির পরিবর্তনের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবিকা, লোকজ সংস্কৃতি ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্য। অবশিষ্ট গাছগুলো সংরক্ষণ এবং নতুন করে খেজুরগাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে এই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হতে পারে।
Reporter Name 












































