Dhaka বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাউন্ট এভারেস্ট: মানুষের সীমা ভাঙার চিরন্তন অভিযাত্রা

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০৫:৫০:৫৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
  • / ১২০ বার দেখা হয়েছে

মাউন্ট এভারেস্ট

পৃথিবীর বুক জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পর্বত, অসংখ্য বিস্ময়। কিন্তু সেই বিস্ময়গুলোর মধ্যেও একটি নাম সর্বোচ্চ স্থানে দাঁড়িয়ে আছে—মাউন্ট এভারেস্ট। এটি শুধু একটি পর্বত নয়, এটি মানুষের স্বপ্ন, সাহস, ভয়, মৃত্যু আর সীমা অতিক্রম করার ইতিহাস।

মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা আট হাজার আটশ আটচল্লিশ দশমিক আট ছয় মিটার বা উনত্রিশ হাজার বত্রিশ ফুট। এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু, যেখানে আকাশ যেন আরও কাছাকাছি নেমে আসে, আর পৃথিবী হয়ে যায় এক দুর্বোধ্য দৃশ্য। এই শৃঙ্গটি অবস্থিত হিমালয় পর্বতমালা-তে, নেপালচীন-এর তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সীমান্তে। নেপালে এটি পরিচিত ‘সাগরমাথা’ নামে—অর্থ আকাশের মাথা। আর তিব্বতে বলা হয় ‘চমোলাংমা’—অর্থাৎ পৃথিবীর দেবী মাতা। এই নামগুলোই বলে দেয়, এভারেস্ট শুধু একটি বরফ-পাথরের পর্বত নয়; এটি মানুষের কল্পনা, শ্রদ্ধা আর আধ্যাত্মিক বিস্ময়ের এক অনন্য প্রতীক।

প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি বছর আগে ভারতীয় টেকটোনিক প্লেট ধীরে ধীরে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই ভয়ঙ্কর ভূ-গাঁথনিক সংঘর্ষের ফলে জন্ম নেয় হিমালয় পর্বতমালা, আর তার সর্বোচ্চ শিখর এভারেস্ট। আজও এই পর্বত প্রতি বছর কয়েক মিলিমিটার করে উঁচু হচ্ছে—যেন সময়ের সাথে সাথে আকাশ ছুঁতে চাইছে আরও উপরে।

মাউন্ট এভারেস্ট একসময় ‘পিক এক্সভি’ নামে পরিচিত ছিল। উনিশ শতকে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের মানচিত্র তৈরি ও পর্বতের উচ্চতা নির্ণয়ের জন্য “গ্রেট ত্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভে” নামে বিশাল এক জরিপ অভিযান শুরু করে। তখন স্যাটেলাইট বা আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না। বিজ্ঞানীরা দূর থেকে বিশেষ যন্ত্র দিয়ে পাহাড়ের চূড়ার কোণ মেপে গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে উচ্চতা নির্ণয় করতেন। ১৮৫২ সালে ভারতীয় গণিতবিদ রাধানাথ সিকদার প্রথম হিসাব করে জানান যে, পিক এক্সভি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। পরে ব্রিটিশ সার্ভেয়ার অ্যান্ড্রু ওয়া, তার সাবেক প্রধান জর্জ এভারেস্ট-এর সম্মানে এই শৃঙ্গের নাম “মাউন্ট এভারেস্ট” প্রস্তাব করেন। যদিও জর্জ এভারেস্ট নিজে কখনো এই পর্বত দেখেননি, তবুও ১৮৬৫ সালে ব্রিটিশ রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নামটি গ্রহণ করে।

স্থানীয় শেরপা জনগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে এই পর্বতকে দেবতাদের আবাসস্থল বলে বিশ্বাস করে আসছে। তাদের কাছে এটি শুধু একটি শৃঙ্গ নয়, বরং পবিত্র এক আত্মিক শক্তির প্রতীক।

এভারেস্টের সৌন্দর্য যেমন মোহময়, তেমনি এর প্রকৃতি ভয়ঙ্কর। এখানে তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে মাইনাস চল্লিশ থেকে মাইনাস ষাট ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বাতাসের গতি ঘণ্টায় দুইশো কিলোমিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এখানে অক্সিজেনের মাত্রা সমুদ্রপৃষ্ঠের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। এই কারণে আট হাজার মিটারের উপরের অঞ্চলকে বলা হয় ‘ডেথ জোন’, যেখানে মানুষের শরীর ধীরে ধীরে বেঁচে থাকার ক্ষমতা হারাতে শুরু করে।

উনিশশো তিপ্পান্ন সালের ২৯ মে মানব ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নোরগে প্রথমবারের মতো এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান। তারা প্রমাণ করেন—অসম্ভব বলে কিছু নেই। কিন্তু এই জয় সহজ ছিল না, আজও নয়।

এভারেস্ট অভিযানে প্রতিটি পদক্ষেপ জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। হিমবাহ ধস, ক্রেভাস, আকস্মিক তুষারঝড়, অক্সিজেনের সংকট—সব মিলিয়ে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক যাত্রাগুলোর একটি। এভারেস্টের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অংশগুলোর একটি হলো ‘খুম্বু আইসফল’, যেখানে বিশাল বরফখণ্ড যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

প্রতি বছর শত শত মানুষ এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আসে, কিন্তু সবাই ফিরতে পারে না। এখন পর্যন্ত ৩৫০-এর বেশি পর্বতারোহী এভারেস্ট অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন—সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ৩১০–৩৩০-এর মধ্যেও উল্লেখ করা হয়, কারণ সব মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক নথি নেই। অনেকের মরদেহ আজও বরফের নিচে রয়ে গেছে—প্রকৃতির কঠোর বাস্তবতার এক নীরব সাক্ষী হিসেবে।

এভারেস্টের আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক হলো উচ্চতাজনিত অসুস্থতা বা হাই অ্যাল্টিটিউড সিকনেস। এতে মাথাব্যথা, বমি, শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি—এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

এই অভিযানে শেরপাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা শুধু পথপ্রদর্শক নন, বরং প্রতিটি অভিযানের নীরব নায়ক। অক্সিজেন সিলিন্ডার, খাবার, তাবু বহন করা থেকে শুরু করে বিপদসংকুল পথে রশি স্থাপন—সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো তারাই করেন।

এভারেস্ট জয় করতে হলে শুধু সাহস নয়, প্রয়োজন কঠোর প্রস্তুতি। শারীরিক ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা এবং দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ছাড়া এখানে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। পুরো অভিযানের সময় লাগে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ দিন। কারণ শরীরকে ধীরে ধীরে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়—যাকে বলা হয় অ্যাক্লিমাটাইজেশন।

এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে, যাকে বলা হয় ‘সামিট উইন্ডো’। এই সময় আবহাওয়া কিছুটা স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরেকটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে—অতিরিক্ত ভিড়। “ট্রাফিক জ্যাম অন এভারেস্ট” এখন বাস্তবতা, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

এভারেস্টে পরিবেশ দূষণও উদ্বেগজনক। ফেলে যাওয়া অক্সিজেন সিলিন্ডার, প্লাস্টিক, তাবু—সব মিলিয়ে একে অনেকেই বিশ্বের সর্বোচ্চ ডাম্পিং গ্রাউন্ড বলে উল্লেখ করেন। তবে নেপাল সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা এখন নিয়মিত পরিষ্কার অভিযান চালাচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্যও এভারেস্ট এক গর্বের নাম। মুসা ইব্রাহিম ২০১০ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন। এরপর নিশাত মজুমদার, ওয়াসফিয়া নাজরীন, এম এ মুহিত—অনেকে এই শৃঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ একটি জাতির সাহস ও স্বপ্নের প্রতীক।

এভারেস্ট অভিযানে খরচও কম নয়—প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৮৫ হাজার মার্কিন ডলার, কখনো এর চেয়েও বেশি। কিন্তু যারা এই অভিযানে যায়, তাদের কাছে এটি কেবল অর্থের নয়, জীবনের বিনিয়োগ।

এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়ালে পৃথিবীর বাঁকানো দিগন্ত চোখে পড়ে। সূর্যোদয়ের দৃশ্য এতটাই অপার্থিব যে মনে হয় মানুষ অন্য কোনো গ্রহে দাঁড়িয়ে আছে। রাতের এভারেস্টও ভয়ঙ্কর সুন্দর—তারাভরা আকাশ, নিচে বরফে ঢাকা পৃথিবী, চারদিকে বাতাসের গর্জন—প্রকৃতি যেন নিজেই এক নীরব মহাকাব্য লিখছে।

তবুও মানুষ থেমে থাকে না। কারণ এভারেস্ট শুধু একটি পর্বত নয়, এটি একটি প্রশ্ন—মানুষের সীমা কতদূর?

এভারেস্টে ওঠা মানে শুধু একটি শিখরে পৌঁছানো নয়; এটি নিজের ভয়কে জয় করা, নিজের দুর্বলতাকে অতিক্রম করা এবং প্রকৃতির সঙ্গে এক অনন্ত লড়াই। মানুষের শরীর সীমাবদ্ধ হতে পারে, কিন্তু মানুষের স্বপ্ন নয়। যেখানে সাহস আছে, সেখানে পথ তৈরি হয়। যেখানে ইচ্ছাশক্তি আছে, সেখানে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে। মাউন্ট এভারেস্ট তাই শুধু পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নয়—এটি মানবতার সর্বোচ্চ উচ্চতার এক চিরন্তন প্রতীক।

সম্পর্কিত

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

মাউন্ট এভারেস্ট: মানুষের সীমা ভাঙার চিরন্তন অভিযাত্রা

প্রকাশের সময় ০৫:৫০:৫৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

পৃথিবীর বুক জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পর্বত, অসংখ্য বিস্ময়। কিন্তু সেই বিস্ময়গুলোর মধ্যেও একটি নাম সর্বোচ্চ স্থানে দাঁড়িয়ে আছে—মাউন্ট এভারেস্ট। এটি শুধু একটি পর্বত নয়, এটি মানুষের স্বপ্ন, সাহস, ভয়, মৃত্যু আর সীমা অতিক্রম করার ইতিহাস।

মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা আট হাজার আটশ আটচল্লিশ দশমিক আট ছয় মিটার বা উনত্রিশ হাজার বত্রিশ ফুট। এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু, যেখানে আকাশ যেন আরও কাছাকাছি নেমে আসে, আর পৃথিবী হয়ে যায় এক দুর্বোধ্য দৃশ্য। এই শৃঙ্গটি অবস্থিত হিমালয় পর্বতমালা-তে, নেপালচীন-এর তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সীমান্তে। নেপালে এটি পরিচিত ‘সাগরমাথা’ নামে—অর্থ আকাশের মাথা। আর তিব্বতে বলা হয় ‘চমোলাংমা’—অর্থাৎ পৃথিবীর দেবী মাতা। এই নামগুলোই বলে দেয়, এভারেস্ট শুধু একটি বরফ-পাথরের পর্বত নয়; এটি মানুষের কল্পনা, শ্রদ্ধা আর আধ্যাত্মিক বিস্ময়ের এক অনন্য প্রতীক।

প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি বছর আগে ভারতীয় টেকটোনিক প্লেট ধীরে ধীরে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই ভয়ঙ্কর ভূ-গাঁথনিক সংঘর্ষের ফলে জন্ম নেয় হিমালয় পর্বতমালা, আর তার সর্বোচ্চ শিখর এভারেস্ট। আজও এই পর্বত প্রতি বছর কয়েক মিলিমিটার করে উঁচু হচ্ছে—যেন সময়ের সাথে সাথে আকাশ ছুঁতে চাইছে আরও উপরে।

মাউন্ট এভারেস্ট একসময় ‘পিক এক্সভি’ নামে পরিচিত ছিল। উনিশ শতকে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের মানচিত্র তৈরি ও পর্বতের উচ্চতা নির্ণয়ের জন্য “গ্রেট ত্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভে” নামে বিশাল এক জরিপ অভিযান শুরু করে। তখন স্যাটেলাইট বা আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না। বিজ্ঞানীরা দূর থেকে বিশেষ যন্ত্র দিয়ে পাহাড়ের চূড়ার কোণ মেপে গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে উচ্চতা নির্ণয় করতেন। ১৮৫২ সালে ভারতীয় গণিতবিদ রাধানাথ সিকদার প্রথম হিসাব করে জানান যে, পিক এক্সভি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। পরে ব্রিটিশ সার্ভেয়ার অ্যান্ড্রু ওয়া, তার সাবেক প্রধান জর্জ এভারেস্ট-এর সম্মানে এই শৃঙ্গের নাম “মাউন্ট এভারেস্ট” প্রস্তাব করেন। যদিও জর্জ এভারেস্ট নিজে কখনো এই পর্বত দেখেননি, তবুও ১৮৬৫ সালে ব্রিটিশ রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নামটি গ্রহণ করে।

স্থানীয় শেরপা জনগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে এই পর্বতকে দেবতাদের আবাসস্থল বলে বিশ্বাস করে আসছে। তাদের কাছে এটি শুধু একটি শৃঙ্গ নয়, বরং পবিত্র এক আত্মিক শক্তির প্রতীক।

এভারেস্টের সৌন্দর্য যেমন মোহময়, তেমনি এর প্রকৃতি ভয়ঙ্কর। এখানে তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে মাইনাস চল্লিশ থেকে মাইনাস ষাট ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বাতাসের গতি ঘণ্টায় দুইশো কিলোমিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এখানে অক্সিজেনের মাত্রা সমুদ্রপৃষ্ঠের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। এই কারণে আট হাজার মিটারের উপরের অঞ্চলকে বলা হয় ‘ডেথ জোন’, যেখানে মানুষের শরীর ধীরে ধীরে বেঁচে থাকার ক্ষমতা হারাতে শুরু করে।

উনিশশো তিপ্পান্ন সালের ২৯ মে মানব ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নোরগে প্রথমবারের মতো এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান। তারা প্রমাণ করেন—অসম্ভব বলে কিছু নেই। কিন্তু এই জয় সহজ ছিল না, আজও নয়।

এভারেস্ট অভিযানে প্রতিটি পদক্ষেপ জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। হিমবাহ ধস, ক্রেভাস, আকস্মিক তুষারঝড়, অক্সিজেনের সংকট—সব মিলিয়ে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক যাত্রাগুলোর একটি। এভারেস্টের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অংশগুলোর একটি হলো ‘খুম্বু আইসফল’, যেখানে বিশাল বরফখণ্ড যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

প্রতি বছর শত শত মানুষ এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আসে, কিন্তু সবাই ফিরতে পারে না। এখন পর্যন্ত ৩৫০-এর বেশি পর্বতারোহী এভারেস্ট অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন—সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ৩১০–৩৩০-এর মধ্যেও উল্লেখ করা হয়, কারণ সব মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক নথি নেই। অনেকের মরদেহ আজও বরফের নিচে রয়ে গেছে—প্রকৃতির কঠোর বাস্তবতার এক নীরব সাক্ষী হিসেবে।

এভারেস্টের আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক হলো উচ্চতাজনিত অসুস্থতা বা হাই অ্যাল্টিটিউড সিকনেস। এতে মাথাব্যথা, বমি, শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি—এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

এই অভিযানে শেরপাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা শুধু পথপ্রদর্শক নন, বরং প্রতিটি অভিযানের নীরব নায়ক। অক্সিজেন সিলিন্ডার, খাবার, তাবু বহন করা থেকে শুরু করে বিপদসংকুল পথে রশি স্থাপন—সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো তারাই করেন।

এভারেস্ট জয় করতে হলে শুধু সাহস নয়, প্রয়োজন কঠোর প্রস্তুতি। শারীরিক ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা এবং দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ছাড়া এখানে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। পুরো অভিযানের সময় লাগে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ দিন। কারণ শরীরকে ধীরে ধীরে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়—যাকে বলা হয় অ্যাক্লিমাটাইজেশন।

এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে, যাকে বলা হয় ‘সামিট উইন্ডো’। এই সময় আবহাওয়া কিছুটা স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরেকটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে—অতিরিক্ত ভিড়। “ট্রাফিক জ্যাম অন এভারেস্ট” এখন বাস্তবতা, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

এভারেস্টে পরিবেশ দূষণও উদ্বেগজনক। ফেলে যাওয়া অক্সিজেন সিলিন্ডার, প্লাস্টিক, তাবু—সব মিলিয়ে একে অনেকেই বিশ্বের সর্বোচ্চ ডাম্পিং গ্রাউন্ড বলে উল্লেখ করেন। তবে নেপাল সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা এখন নিয়মিত পরিষ্কার অভিযান চালাচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্যও এভারেস্ট এক গর্বের নাম। মুসা ইব্রাহিম ২০১০ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন। এরপর নিশাত মজুমদার, ওয়াসফিয়া নাজরীন, এম এ মুহিত—অনেকে এই শৃঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ একটি জাতির সাহস ও স্বপ্নের প্রতীক।

এভারেস্ট অভিযানে খরচও কম নয়—প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৮৫ হাজার মার্কিন ডলার, কখনো এর চেয়েও বেশি। কিন্তু যারা এই অভিযানে যায়, তাদের কাছে এটি কেবল অর্থের নয়, জীবনের বিনিয়োগ।

এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়ালে পৃথিবীর বাঁকানো দিগন্ত চোখে পড়ে। সূর্যোদয়ের দৃশ্য এতটাই অপার্থিব যে মনে হয় মানুষ অন্য কোনো গ্রহে দাঁড়িয়ে আছে। রাতের এভারেস্টও ভয়ঙ্কর সুন্দর—তারাভরা আকাশ, নিচে বরফে ঢাকা পৃথিবী, চারদিকে বাতাসের গর্জন—প্রকৃতি যেন নিজেই এক নীরব মহাকাব্য লিখছে।

তবুও মানুষ থেমে থাকে না। কারণ এভারেস্ট শুধু একটি পর্বত নয়, এটি একটি প্রশ্ন—মানুষের সীমা কতদূর?

এভারেস্টে ওঠা মানে শুধু একটি শিখরে পৌঁছানো নয়; এটি নিজের ভয়কে জয় করা, নিজের দুর্বলতাকে অতিক্রম করা এবং প্রকৃতির সঙ্গে এক অনন্ত লড়াই। মানুষের শরীর সীমাবদ্ধ হতে পারে, কিন্তু মানুষের স্বপ্ন নয়। যেখানে সাহস আছে, সেখানে পথ তৈরি হয়। যেখানে ইচ্ছাশক্তি আছে, সেখানে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে। মাউন্ট এভারেস্ট তাই শুধু পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নয়—এটি মানবতার সর্বোচ্চ উচ্চতার এক চিরন্তন প্রতীক।