গত এক বছরে আফগানিস্তানে পোস্তচাষ ও আফিম উৎপাদন বড় মাত্রায় বেড়েছে। ২০২২ সালে তালেবান শাসকগোষ্ঠী মাদক উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর এই প্রথম উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেল। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যের কারণে কৃষকেরা গোপনে পোস্ত চাষ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফসলটির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছে ইউএনওডিসি।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা দখল করে। তার আগ পর্যন্ত আফগানিস্তান ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আফিম উৎপাদনকারী দেশ এবং ইউরোপ ও এশিয়ায় হেরোইনের প্রধান উৎস। ক্ষমতা নেওয়ার পর তারা দেশের মাদক চাষ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং ২০২২ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ওই নিষেধাজ্ঞায় বিপুলসংখ্যক কৃষক ও দিনমজুরের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়, যাদের অনেকেই জীবিকা নির্বাহের জন্য এই ফসলের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
ইউএনওডিসির হিসাবে, গত বছরের তুলনায় চাষ বেড়েছে ৩৩০ শতাংশ এবং উৎপাদন বেড়েছে ৪০০ শতাংশ। ২০২৫ সালে চাষ হয়েছিল ১০ হাজার হেক্টরে; ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে। অর্থাৎ এক বছরে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় চার গুণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধরা পড়ার ভয় এড়াতে কৃষকেরা ছোট ছোট পোস্তের টুকরো জমি শস্যক্ষেত্রের ভেতরে লুকিয়ে রাখছেন, কখনো উঁচু দেয়ালঘেরা উঠান বা বাড়ির আঙিনার ভেতরে চাষ করছেন। জমির মালিকানা ও উৎপাদনের হিসাবও এতে কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মনিকা জুমা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘পোস্তচাষ চার গুণ বেড়ে যাওয়া দেখিয়ে দেয়—দরিদ্র কৃষকের পরিবার প্রতিপালনের কোনো বিকল্প না থাকলে অবৈধ আফিম চাষ কমিয়ে ধরে রাখা কতটা কঠিন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তালেবান কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে—জীবিকা, কৃষি অবকাঠামো ও বাজারে প্রবেশাধিকার তৈরিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কৃষক সম্প্রদায়কে সহায়তা করতে হবে।’
তালেবানের প্রতিক্রিয়া: তবে ইউএনওডিসির এই প্রতিবেদনের তথ্য মানতে রাজি হয়নি তালেবান। তাদের দাবি, প্রতিবেদনে ‘আসল পরিস্থিতি সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি’ এবং ‘মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাস্তবে অর্জিত সাফল্যকে উপেক্ষা করা হয়েছে’।
তালেবানের অভিযোগ, জাতিসংঘের এই সংস্থাটি ‘উপগ্রহচিত্র, আনুমানিক হিসাব এবং পক্ষপাতদুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর ভুল তথ্যের’ ওপর নির্ভর করেছে।
প্রসঙ্গত, মাদক অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা কেবল আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নয়, সীমান্ত পেরিয়ে আন্তর্জাতিক হেরোইন বাজারের সরবরাহও প্রভাবিত করে। নিষেধাজ্ঞার পর উৎপাদন কমে এলে অভাব পূরণে অন্য উৎসের ওপর চাপ বাড়ে এবং এর সঙ্গে জড়িত অপরাধচক্র আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে—এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
একই সঙ্গে, দারিদ্র্যের চাপে কৃষকেরা নিষিদ্ধ ফসলে ফিরে গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণ অভিযানের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। ইউএনওডিসির প্রতিবেদনটি তাই একই সঙ্গে দুটি কথা বলছে। এক, নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজে-কলমে টিকে থাকে না; কৃষকের হাতে বিকল্প ফসল ও বিকল্প আয় না এলে তা টেকসই হয় না। দুই, নিষেধাজ্ঞার সাফল্য মাপতে হলে উৎপাদনের পাশাপাশি দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বাজারের চিত্রও দেখতে হবে।
এক নজরে:
- চাষ: ১০ হাজার হেক্টর (২০২৫) থেকে ৪৩ হাজার হেক্টরের বেশি (২০২৬) — বৃদ্ধি ৩৩০ শতাংশ
- উৎপাদন: ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি
- কারণ হিসেবে দারিদ্র্যের কথা বলছে ইউএনওডিসি
- পদ্ধতি: শস্যক্ষেত্র ও দেয়ালঘেরা আঙিনার ভেতরে লুকানো চাষ
- তালেবানের অবস্থান: প্রতিবেদনের তথ্য ‘সঠিক নয়’
সূত্র: এপি, ইউএনওডিসি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 














































