Dhaka সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে অনাবাদী জমি এখন তরমুজের ক্ষেত

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০১:৩১:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৩৩ বার দেখা হয়েছে

উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় লবণাক্ততার কারণে একসময় আমন মৌসুমের পর শতশত হেক্টর জমি পড়ে থাকত অনাবাদী। তবে সেই চিত্র এখন বদলে দিয়েছে ‘মিনি পুকুর’ প্রযুক্তি। বর্ষার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে তরমুজ চাষে ব্যবহার—এই সহজ কিন্তু কার্যকর কৌশলই আশাশুনি ও শ্যামনগরের প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জেলায় ৪৭১ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায়। ‘ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন’ প্রকল্পের আওতায় খনন করা মিনি পুকুরগুলোই এখন সেচের প্রধান উৎস। উপকূলের কৃষকদের কাছে এই মিনি পুকুর যেন ‘মিষ্টি পানির প্রাকৃতিক ব্যাংক’। চাষযোগ্য জমির এক কোণে খনন করা গভীর জলাধারে বর্ষার পানি জমে থাকে, যা শুষ্ক মৌসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়। অনেক কৃষক সোলার বা ডিজেল পাম্প ব্যবহার করে ফিতা পাইপের মাধ্যমে সেই পানি ক্ষেতে সরবরাহ করছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এক সময় পতিত পড়ে থাকা লোনা জমিতে এখন সারি সারি তরমুজের ক্ষেত। স্থানীয়রা জানান, আগে আমন ধান কাটার পর দীর্ঘ সময় জমি ফাঁকা থাকত। লবণাক্ততার কারণে বোরো আবাদে ঝুঁকি থাকায় কৃষকেরা চাষে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু তরমুজ লবণসহিষ্ণু হওয়ায় এবং পানির চাহিদা তুলনামূলক কম হওয়ায় এটি এখন লাভজনক বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে। স্বল্পমেয়াদি ফসল হওয়ায় তরমুজ তোলার পর একই জমিতে আউশ ধান, পাট বা গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে এক ফসলি জমি এখন বহু ফসলি জমিতে রূপ নিচ্ছে।

বড়দল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সত্যরঞ্জন বৈরাগী বলেন, “গত বছর তরমুজে কৃষকদের লাভ দেখে আমিও ১০ বিঘা জমিতে আবাদ করেছি। অনেকেই বিঘা প্রতি ৬০-৭০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। যদিও এবার খরচ কিছুটা বেড়েছে, তবে ফলন ভালো হওয়ায় আশা করছি ক্ষতি পুষিয়ে যাবে।”

জামালনগর গ্রামের কৃষক আফছার গাজীর সাফল্যের গল্প এখন এলাকায় অনুপ্রেরণা। গত মৌসুমে ১৬ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করে তিনি প্রায় ৮ লাখ টাকা মুনাফা করেন। তিনি বলেন, “আগে এই জমিতে কিছুই হতো না। এখন বৃষ্টির পানি জমিয়ে লোনা মাটিতেও সোনা ফলাচ্ছি।”

বড় চাষি মাসুম সরদার এবার ৭০ বিঘা জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। তার ভাষ্য, বিঘা প্রতি ৭০০-৮০০টি তরমুজ উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি বিঘায় খরচ প্রায় ৩০ হাজার টাকা হলেও ভালো বাজারদরে বিক্রি হলে আয় ৭০ হাজার টাকার বেশি, ফলে লাভ থাকে প্রায় ৪০ হাজার টাকা।

তরমুজ চাষে উপকূলীয় গ্রামে নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও বেড়েছে। প্রতিদিন কয়েকশ নারী ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। ঝর্ণা রানী নামে এক শ্রমিক বলেন, “আগে এই সময়ে কোনো কাজ থাকত না। এখন দুই মাস নিয়মিত কাজ পাই, সংসারে বাড়তি আয় করতে পারি।”

শ্যামনগর উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১৫২ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। কৈখালী, কাশিমাড়ী ও ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নে আবাদ সবচেয়ে বেশি। মাঠে এখন জাম্বু গ্লোরি, ড্রাগন, পাকিজা ও ওয়ার্ল্ড কুইনের মতো উচ্চফলনশীল জাতের তরমুজ চাষ হচ্ছে।

কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, “আগে লোনা পানির কারণে বসে থাকতে হতো। এখন মিনি পুকুরে পানি জমিয়ে তরমুজ চাষ করছি। ধানের চেয়ে তিনগুণ বেশি লাভ হচ্ছে।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “সাতক্ষীরার লোনা মাটি তরমুজ চাষের জন্য সম্ভাবনাময়। মিনি পুকুরের মাধ্যমে মিষ্টি পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। সরকারি সহায়তা বাড়ানো গেলে তরমুজ চাষ উপকূলের স্থায়ী অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।”

সম্পর্কিত

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে অনাবাদী জমি এখন তরমুজের ক্ষেত

প্রকাশের সময় ০১:৩১:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় লবণাক্ততার কারণে একসময় আমন মৌসুমের পর শতশত হেক্টর জমি পড়ে থাকত অনাবাদী। তবে সেই চিত্র এখন বদলে দিয়েছে ‘মিনি পুকুর’ প্রযুক্তি। বর্ষার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে তরমুজ চাষে ব্যবহার—এই সহজ কিন্তু কার্যকর কৌশলই আশাশুনি ও শ্যামনগরের প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জেলায় ৪৭১ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায়। ‘ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন’ প্রকল্পের আওতায় খনন করা মিনি পুকুরগুলোই এখন সেচের প্রধান উৎস। উপকূলের কৃষকদের কাছে এই মিনি পুকুর যেন ‘মিষ্টি পানির প্রাকৃতিক ব্যাংক’। চাষযোগ্য জমির এক কোণে খনন করা গভীর জলাধারে বর্ষার পানি জমে থাকে, যা শুষ্ক মৌসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়। অনেক কৃষক সোলার বা ডিজেল পাম্প ব্যবহার করে ফিতা পাইপের মাধ্যমে সেই পানি ক্ষেতে সরবরাহ করছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এক সময় পতিত পড়ে থাকা লোনা জমিতে এখন সারি সারি তরমুজের ক্ষেত। স্থানীয়রা জানান, আগে আমন ধান কাটার পর দীর্ঘ সময় জমি ফাঁকা থাকত। লবণাক্ততার কারণে বোরো আবাদে ঝুঁকি থাকায় কৃষকেরা চাষে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু তরমুজ লবণসহিষ্ণু হওয়ায় এবং পানির চাহিদা তুলনামূলক কম হওয়ায় এটি এখন লাভজনক বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে। স্বল্পমেয়াদি ফসল হওয়ায় তরমুজ তোলার পর একই জমিতে আউশ ধান, পাট বা গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে এক ফসলি জমি এখন বহু ফসলি জমিতে রূপ নিচ্ছে।

বড়দল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সত্যরঞ্জন বৈরাগী বলেন, “গত বছর তরমুজে কৃষকদের লাভ দেখে আমিও ১০ বিঘা জমিতে আবাদ করেছি। অনেকেই বিঘা প্রতি ৬০-৭০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। যদিও এবার খরচ কিছুটা বেড়েছে, তবে ফলন ভালো হওয়ায় আশা করছি ক্ষতি পুষিয়ে যাবে।”

জামালনগর গ্রামের কৃষক আফছার গাজীর সাফল্যের গল্প এখন এলাকায় অনুপ্রেরণা। গত মৌসুমে ১৬ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করে তিনি প্রায় ৮ লাখ টাকা মুনাফা করেন। তিনি বলেন, “আগে এই জমিতে কিছুই হতো না। এখন বৃষ্টির পানি জমিয়ে লোনা মাটিতেও সোনা ফলাচ্ছি।”

বড় চাষি মাসুম সরদার এবার ৭০ বিঘা জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। তার ভাষ্য, বিঘা প্রতি ৭০০-৮০০টি তরমুজ উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি বিঘায় খরচ প্রায় ৩০ হাজার টাকা হলেও ভালো বাজারদরে বিক্রি হলে আয় ৭০ হাজার টাকার বেশি, ফলে লাভ থাকে প্রায় ৪০ হাজার টাকা।

তরমুজ চাষে উপকূলীয় গ্রামে নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও বেড়েছে। প্রতিদিন কয়েকশ নারী ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। ঝর্ণা রানী নামে এক শ্রমিক বলেন, “আগে এই সময়ে কোনো কাজ থাকত না। এখন দুই মাস নিয়মিত কাজ পাই, সংসারে বাড়তি আয় করতে পারি।”

শ্যামনগর উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১৫২ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। কৈখালী, কাশিমাড়ী ও ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নে আবাদ সবচেয়ে বেশি। মাঠে এখন জাম্বু গ্লোরি, ড্রাগন, পাকিজা ও ওয়ার্ল্ড কুইনের মতো উচ্চফলনশীল জাতের তরমুজ চাষ হচ্ছে।

কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, “আগে লোনা পানির কারণে বসে থাকতে হতো। এখন মিনি পুকুরে পানি জমিয়ে তরমুজ চাষ করছি। ধানের চেয়ে তিনগুণ বেশি লাভ হচ্ছে।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “সাতক্ষীরার লোনা মাটি তরমুজ চাষের জন্য সম্ভাবনাময়। মিনি পুকুরের মাধ্যমে মিষ্টি পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। সরকারি সহায়তা বাড়ানো গেলে তরমুজ চাষ উপকূলের স্থায়ী অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।”